প্রভাষক
১৮ জুলাই, ২০২৬ ০২:৩২ পূর্বাহ্ণ
বুক বিভিউ: দেওয়ানা মদিনা।
দেওয়ানা মদিনা: মৈমনসিংহ গীতিকার এক অনন্য করুণ প্রেমকাব্য
উদ্ধৃতি
“দুলাল জিগায় সুরুজ, মদিনা কোথায়। চোখে হাত দিয়া সুরুজ কবর দেখায়।।"
বাংলা লোকসাহিত্যের অমূল্য সম্পদ মৈমনসিংহ গীতিকা-র অন্যতম জনপ্রিয় ও হৃদয়স্পর্শী পালা হলো ‘দেওয়ানা মদিনা’। প্রেম, পারিবারিক দ্বন্দ্ব, সৎ মায়ের নিষ্ঠুরতা, ত্যাগ, বিচ্ছেদ এবং চিরন্তন মানবিক অনুভূতির অপূর্ব সমন্বয়ে গঠিত এই গীতিকাটি আজও পাঠকের হৃদয় স্পর্শ করে।
রচয়িতা মনসুর বয়াতি সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য ঐতিহাসিক তথ্য খুব বেশি পাওয়া যায় না। তবে তাঁর এই সৃষ্টি বাংলা লোকসাহিত্যে এক অমর সংযোজন হিসেবে স্বীকৃত।
প্রধান নারী চরিত্র
আলাল-দুলালের মা
ছায়াবিবি (আলাল-দুলালের সৎ মা)
আমিনা
মমিনা
মদিনা
প্রধান পুরুষ চরিত্র
আলাল
দুলাল
সোনাফর দেওয়ান
মদিনার বাবা
আমিনা-মমিনার বাবা
গীতিকার প্রধান তিনটি কাহিনি
আলাল-দুলাল ও সৎ মায়ের কাহিনি
কবুতরের কাহিনি
মদিনা ও দুলালের প্রেম ও বিচ্ছেদের কাহিনি
কাহিনির সংক্ষিপ্ত পরিচয়
আলাল ও দুলালের মা মৃত্যুশয্যায় স্বামী সোনাফর দেওয়ানের কাছে সন্তানদের দায়িত্ব অর্পণ করেন এবং দ্বিতীয় বিয়ে না করার অনুরোধ জানান। তাঁর আশঙ্কা ছিল, সৎ মায়ের হাতে সন্তানদের অকল্যাণ ঘটতে পারে।
স্ত্রীর মৃত্যুর পর সোনাফর দেওয়ান প্রথমে দ্বিতীয় বিয়ে না করার সিদ্ধান্ত নিলেও প্রতিবেশীদের প্ররোচনায় শেষ পর্যন্ত ছায়াবিবিকে বিয়ে করেন। নতুন স্ত্রীকে ঘরে আনলেও তিনি সন্তানদের সৎ মায়ের কাছ থেকে দূরে রাখতেন। এতে ছায়াবিবির মনে ক্ষোভ জন্ম নেয়। একসময় তিনি কৌশলে আলাল-দুলালকে নিজের কাছে এনে তাদের হত্যার ষড়যন্ত্র করেন এবং জল্লাদের হাতে তুলে দেন।
কিন্তু জল্লাদ মানবিকতার পরিচয় দিয়ে দুই শিশুকে হত্যা না করে এক ব্যবসায়ীর নৌকায় তুলে দেন। ভাগ্যের পরিহাসে দুই ভাই আলাদা হয়ে যায়। আলাল এক দেওয়ানের বাড়িতে আশ্রয় নিয়ে ধীরে ধীরে যোগ্য ও সাহসী যুবকে পরিণত হয়। অন্যদিকে দুলাল এক গৃহস্থের পরিবারে বড় হয়ে ওঠে। সেই গৃহস্থ মৃত্যুর আগে নিজের কন্যা মদিনার সঙ্গে দুলালের বিয়ে দিয়ে যান।
এদিকে আলালের সৌন্দর্য, বুদ্ধিমত্তা ও ব্যক্তিত্বে মুগ্ধ হয়ে আশ্রয়দাতা দেওয়ান তাঁর কন্যা মমিনার সঙ্গে আলালের বিয়ের প্রস্তাব দেন। কিন্তু আলাল সিদ্ধান্ত নেয়, আগে পৈতৃক সম্পত্তি ও দেওয়ানগিরি উদ্ধার করবে এবং হারিয়ে যাওয়া ভাইকে খুঁজে বের করবে।
অবশেষে আলাল পিতার সম্পত্তি ও দেওয়ানগিরি পুনরুদ্ধার করে। এরপর দুলালকে খুঁজে বের করে এবং তাকে মদিনাকে তালাক দিতে রাজি করায়। পরে দুই ভাই আশ্রয়দাতা দেওয়ানের দুই কন্যা আমিনা ও মমিনাকে বিয়ে করে পিতার রাজ্যে সুখে-শান্তিতে বসবাস শুরু করে।
কিন্তু মদিনা বিশ্বাসই করতে পারে না যে তার স্বামী তাকে পরিত্যাগ করতে পারে। স্বামীর প্রত্যাবর্তনের আশায় সে দিন গুনতে থাকে। দীর্ঘ প্রতীক্ষা, গভীর বিরহ ও অসীম বেদনা একসময় তাকে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেয়।
অনেক দিন পর দুলালের মনে মদিনার কথা জেগে ওঠে। সে গোপনে মদিনার বাড়িতে এসে তাদের সন্তান সুরুজের কাছে জানতে চায়, “মদিনা কোথায়?” তখন সুরুজ নীরবে কবরের দিকে ইশারা করে। এই সংক্ষিপ্ত অথচ মর্মস্পর্শী দৃশ্যই সমগ্র গীতিকার করুণ পরিণতির চূড়ান্ত প্রকাশ।
স্ত্রীর মৃত্যুতে গভীর অনুতাপে দুলাল মদিনার কবরের পাশে বাকি জীবন কাটিয়ে দেয়। এভাবেই সমাপ্তি ঘটে বাংলা লোকসাহিত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ করুণ প্রেমগাথা দেওয়ানা মদিনা-র।
সাহিত্যিক মূল্যায়ন
‘দেওয়ানা মদিনা’ কেবল একটি প্রেমের কাহিনি নয়; এটি মধ্যযুগীয় বাংলার পারিবারিক জীবন, সামাজিক মূল্যবোধ, নারীর আত্মত্যাগ, দাম্পত্য বিশ্বস্ততা এবং মানবিক বেদনার এক অনন্য দলিল।
গীতিকাটিতে কাহিনির বিন্যাস, চরিত্র নির্মাণ, সংলাপ, ছন্দ, উপমা ও উৎপ্রেক্ষার সার্থক প্রয়োগ লক্ষ করা যায়। বিশেষ করে মদিনা চরিত্রে বাঙালি নারীর চিরায়ত ভালোবাসা, ধৈর্য, অপেক্ষা ও আত্মত্যাগ অত্যন্ত মর্মস্পর্শীভাবে ফুটে উঠেছে।
বাংলা লোকসাহিত্যের ইতিহাসে ‘দেওয়ানা মদিনা’ এক অনন্য সৃষ্টি। এর করুণ পরিণতি পাঠকের হৃদয়ে দীর্ঘস্থায়ী আবেগের জন্ম দেয় এবং মানবিক মূল্যবোধের গুরুত্ব নতুনভাবে উপলব্ধি করতে সাহায্য করে।
১৩
১৫ মন্তব্য