Loading..

ব্লগ

রিসেট

২১ জুলাই, ২০২৬ ১০:১০ পূর্বাহ্ণ

আরেক বিড়ম্বনার নাম - প্রাইভেট

আরেক বিড়ম্বনার নাম— "প্রাইভেট"।


বিদ্যালয়ে পাঠদান করতে গিয়ে নানা ধরনের প্রতিকূল পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়। তার মধ্যে সবচেয়ে বড় একটি সমস্যা হলো— বিদ্যালয়ের পাঠ্যবই ও নির্দেশনা অনুসরণ না করে আগে থেকেই ভুল বা ভিন্ন পদ্ধতিতে প্রাইভেট পড়ানো।

প্রথম শ্রেণির গণিত বইয়ের ৬০ নম্বর পৃষ্ঠায় যোগের একটি সহজ কৌশল শেখানো হয়েছে। যেমন, ৮+৫ = ? এখানে উদ্দেশ্য হলো ৮-কে আগে ১০ বানানো। তাই ৫-কে ভাঙতে হবে ২+৩ হিসেবে। অর্থাৎ, ৮+২=১০, তারপর ১০+৩=১৩। এই পদ্ধতিতে শিশুদের সংখ্যাবোধ (Number Sense) তৈরি হয় এবং পরবর্তীতে বড় অংক করতেও সুবিধা হয়।

আমি শ্রেণিকক্ষে ছবি এঁকে, উপকরণ ব্যবহার করে, বারবার বুঝিয়ে এই পদ্ধতি শেখানোর চেষ্টা করেছি। কিন্তু যখন শিক্ষার্থীদের করতে দিই, তখন তারা ৫-কে ইচ্ছেমতো ভেঙে ১+৪, ৪+১ কিংবা ৩+২ লিখে ফেলে। জিজ্ঞেস করলে প্রায় একই উত্তর— "স্যার, প্রাইভেটে এভাবেই করিয়েছে।"

এই একটি বিষয় শেখাতেই আমাকে চারটি ক্লাস নিতে হয়েছে। তবুও কাঙ্ক্ষিত ফল পাইনি। কারণ, বিদ্যালয়ে আসার আগেই ভুল পদ্ধতিটি তাদের মনে এমনভাবে গেঁথে গেছে যে, পরে সঠিক পদ্ধতি শেখানো অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়ে।

একই সমস্যা পঞ্চম শ্রেণির গণিতেও দেখা যায়। সহজ পদ্ধতিতে গুণ করার ক্ষেত্রে কোথাও গুণকে যোগে ভেঙে, আবার কোথাও বিয়োগের সাহায্যে সমাধান করতে বলা হয়েছে। কিন্তু শিক্ষার্থীরা বইয়ের নির্দেশনা অনুসরণ না করে সরাসরি প্রচলিত পদ্ধতিতে গুণ করে ফেলে। কারণ জানতে চাইলে আবারও সেই একই উত্তর— "প্রাইভেট স্যার এভাবেই শিখিয়েছেন।"

এ সমস্যা শুধু গণিতেই সীমাবদ্ধ নয়। বাংলা, ইংরেজি, এমনকি শিশু শ্রেণিতেও একই চিত্র। বর্ণ, বর্ণাংশ বা হাতের লেখা শেখানোর সময়ও দেখা যায়, বিদ্যালয়ে সঠিক নিয়ম শেখানো হলেও শিশুরা আগের ভুল পদ্ধতিই অনুসরণ করছে। কারণ বিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার আগেই তারা কারও না কারও কাছ থেকে সেটিই শিখে এসেছে। ছোটবেলায় যা মস্তিষ্কে গেঁথে যায়, তা পরে পরিবর্তন করা সত্যিই কঠিন।

বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলে ঘরে ঘরে অনানুষ্ঠানিকভাবে প্রাইভেট পড়ানোর প্রবণতা এই সমস্যাকে আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে যারা পড়ান, তারা পাঠ্যবই, শিক্ষক নির্দেশিকা বা বর্তমান শিক্ষাক্রম না দেখেই নিজেদের পরিচিত পুরোনো পদ্ধতিতে পড়ান। অথচ বর্তমানে অনেক বিষয়, অনেক কৌশল এবং অনেক নিয়ম আগের মতো নেই। ফলে বিদ্যালয়ে এসে শিক্ষার্থীরা দ্বিধায় পড়ে যায়, আর শিক্ষকদের অতিরিক্ত সময় ব্যয় করতে হয় শুধু ভুল ধারণা সংশোধন করতেই।

তাই সকল প্রাইভেট শিক্ষক-শিক্ষিকাদের প্রতি বিনীত অনুরোধ— অনুগ্রহ করে আগে পাঠ্যবই ও বর্তমান শিক্ষাক্রম ভালোভাবে দেখে নিন। বইয়ে যে পদ্ধতি অনুসরণ করতে বলা হয়েছে, সেটিই শেখানোর চেষ্টা করুন। নিজের জানা পুরোনো বা সুবিধাজনক পদ্ধতি আগে শেখালে শিক্ষার্থীরই ক্ষতি হয় এবং বিদ্যালয়ের পাঠদানও ব্যাহত হয়।

অভিভাবক সমাবেশে বিষয়টি বারবার তুলে ধরা হয়, কিন্তু বাস্তবে খুব একটা পরিবর্তন দেখা যায় না। ফলে প্রশ্ন থেকেই যায়—

এই সমস্যা থেকে পরিত্রাণের উপায় কী? এটি কি শুধু একজন শিক্ষকের সমস্যা, নাকি আমাদের পুরো শিক্ষা ব্যবস্থার জন্যই ভাবনার বিষয়?

মন্তব্য করুন

ব্লগ