প্রভাষক
২১ জুলাই, ২০২৬ ১০:৫০ অপরাহ্ণ
প্রভাষক
বিশ্ব এখন এক নতুন প্রযুক্তিগত বিপ্লবের মধ্য দিয়ে অগ্রসর হচ্ছে। বাষ্পীয় ইঞ্জিন প্রথম শিল্পবিপ্লবের, বিদ্যুৎ দ্বিতীয় শিল্পবিপ্লবের এবং ইন্টারনেট তৃতীয় শিল্পবিপ্লবের ভিত্তি স্থাপন করেছিল। আর চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই)। এটি আর কেবল কম্পিউটার বিজ্ঞানের একটি শাখা নয়; বরং অর্থনীতি, শিল্প, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, কৃষি, ব্যবসা-বাণিজ্য, রাষ্ট্র পরিচালনা ও জাতীয় নিরাপত্তাসহ প্রায় প্রতিটি খাতের রূপান্তরের প্রধান চালিকাশক্তিতে পরিণত হয়েছে। যে দেশ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার গবেষণা, উদ্ভাবন ও দক্ষ মানবসম্পদ গঠনে যত বেশি বিনিয়োগ করবে, ভবিষ্যতের বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় সে দেশ তত এগিয়ে থাকবে।
এআই শুধু একটি প্রযুক্তি নয়; এটি ভবিষ্যৎ অর্থনীতি, কর্মসংস্থান, উদ্ভাবন এবং জাতীয় প্রতিযোগিতা সক্ষমতার অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি।
বিশ্ব অর্থনীতিতেও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার গুরুত্ব দ্রুত বাড়ছে। আন্তর্জাতিক পরামর্শক প্রতিষ্ঠান প্রাইস ওয়াটার হাউস কুপারস (PwC)-এর বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ২০৩০ সালের মধ্যে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বৈশ্বিক অর্থনীতিতে প্রায় ১৫ দশমিক ৭ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলার অতিরিক্ত মূল্য সংযোজন করতে পারে। এর মধ্যে উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধির মাধ্যমে প্রায় ৬ দশমিক ৬ ট্রিলিয়ন এবং নতুন পণ্য ও সেবার মাধ্যমে প্রায় ৯ ট্রিলিয়ন ডলার অর্থনৈতিক কার্যক্রম সৃষ্টি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। অন্যদিকে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) মনে করে, বিশ্বের প্রায় ৪০ শতাংশ কর্মক্ষেত্র কোনো না কোনোভাবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রভাবে পরিবর্তিত হবে। ফলে ভবিষ্যতের অর্থনীতির মূল ভিত্তি হবে প্রযুক্তি, উদ্ভাবন এবং দক্ষ মানবসম্পদ।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এমন একটি প্রযুক্তি, যা মানুষের মতো তথ্য বিশ্লেষণ, অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা, সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং সমস্যার সমাধান করতে সক্ষম। বিপুল পরিমাণ তথ্য, উন্নত অ্যালগরিদম এবং উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন কম্পিউটিং ব্যবস্থার সমন্বয়ে এটি কাজ করে। বর্তমানে মেশিন লার্নিং, ডিপ লার্নিং, নিউরাল নেটওয়ার্ক এবং লার্জ ল্যাঙ্গুয়েজ মডেলের মতো প্রযুক্তি এআইকে এমন এক পর্যায়ে নিয়ে গেছে, যেখানে এটি মানুষের ভাষা বুঝতে, ছবি বিশ্লেষণ করতে, সফটওয়্যার তৈরি করতে, গবেষণায় সহায়তা করতে এবং জটিল সমস্যার সমাধান দিতে সক্ষম হচ্ছে।
চ্যাটজিপিটি, জেমিনি, ক্লড ও কোপাইলটের মতো প্রযুক্তি এখন আর কেবল প্রযুক্তিপ্রেমীদের কৌতূহলের বিষয় নয়; শিক্ষা, চিকিৎসা, ব্যবসা, গণমাধ্যম, গবেষণা ও সরকারি সেবার বাস্তব কর্মপরিবেশে এগুলোর ব্যবহার দ্রুত বাড়ছে। চিকিৎসক রোগ নির্ণয়ে, শিক্ষক পাঠদানে, প্রকৌশলী নকশা প্রণয়নে, ব্যাংকার ঝুঁকি বিশ্লেষণে এবং গবেষক তথ্য বিশ্লেষণে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সহায়তা নিচ্ছেন। তাই অনেক প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ একে ‘নতুন যুগের বিদ্যুৎ’ বলে অভিহিত করেন। যেমন বিদ্যুৎ একসময় শিল্প ও অর্থনীতির প্রতিটি খাতে বিপ্লব ঘটিয়েছিল, তেমনি আগামী দিনের প্রায় প্রতিটি প্রযুক্তি ও উৎপাদন ব্যবস্থার কেন্দ্রেও থাকবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা। এটি শুধু উৎপাদনশীলবাংলাদেশেও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বিকাশে একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা হয়েছে। গত এক দশকে ডিজিটাল অবকাঠামো, মোবাইল ইন্টারনেট, ডিজিটাল আর্থিক সেবা, ই-গভর্ন্যান্স এবং তথ্যপ্রযুক্তি শিল্পের যে ভিত্তি গড়ে উঠেছে, তার ওপর দাঁড়িয়ে সরকার এখন এআইভিত্তিক দক্ষ মানবসম্পদ গঠনে বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে। এই ধারাবাহিকতায় ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটিতে প্রতিষ্ঠিত কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা গবেষণা ল্যাব দেশের গবেষণা, উদ্ভাবন ও প্রযুক্তিনির্ভর মানবসম্পদ উন্নয়নের ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।তা বাড়াবে না, বরং সিদ্ধান্ত গ্রহণকে আরও দ্রুত, তথ্যনির্ভর ও নির্ভুল করে তুলবে।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সবচেয়ে বড় শক্তি হলো এটি কোনো একক খাতের প্রযুক্তি নয়; বরং বিদ্যুৎ বা ইন্টারনেটের মতো একটি সাধারণ উদ্দেশ্যভিত্তিক প্রযুক্তি, যা অর্থনীতি ও সমাজের প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রে পরিবর্তন আনছে। শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, কৃষি, শিল্প, ব্যাংকিং, পরিবহন, বিচার, প্রশাসন, গণমাধ্যম, প্রতিরক্ষা ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনাসহ প্রায় সব ক্ষেত্রেই এর ব্যবহার দ্রুত বিস্তৃত হচ্ছে।
বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, আগামী কয়েক বছরে ডেটা সায়েন্টিস্ট, এআই ইঞ্জিনিয়ার, মেশিন লার্নিং বিশেষজ্ঞ, সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ, রোবটিক্স প্রকৌশলী এবং প্রম্পট ইঞ্জিনিয়ারের মতো পেশায় চাহিদা দ্রুত বাড়বে। অন্যদিকে পুনরাবৃত্তিমূলক ও নিয়মভিত্তিক অনেক কাজ স্বয়ংক্রিয় হয়ে যাবে। ফলে ভবিষ্যতের শ্রমবাজারে টিকে থাকতে হলে নতুন দক্ষতা অর্জনের কোনো বিকল্প নেই।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ভবিষ্যতের নয়, বর্তমানের প্রযুক্তি। যে দেশ এটি দ্রুত আয়ত্ত করবে এবং গবেষণা, উদ্ভাবন ও দক্ষ মানবসম্পদে বিনিয়োগ বাড়াবে, সেই দেশই আগামী দিনের বৈশ্বিক অর্থনীতিতে নেতৃত্ব দেবে। বাংলাদেশের জন্য এটি একটি ঐতিহাসিক সুযোগ। সরকারের সাম্প্রতিক উদ্যোগ সেই সম্ভাবনারই প্রতিফলন। এখন প্রয়োজন ধারাবাহিক নীতিগত সমর্থন, পর্যাপ্ত বিনিয়োগ এবং গবেষণাভিত্তিক দক্ষ জনশক্তি গড়ে তোলার মাধ্যমে এই অভিযাত্রাকে আরও গতিশীল করা।
এআই শুধু একটি প্রযুক্তি নয়; এটি ভবিষ্যৎ অর্থনীতি, কর্মসংস্থান, উদ্ভাবন এবং জাতীয় প্রতিযোগিতা সক্ষমতার অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি। এই উপলব্ধিকে সামনে রেখে সরকার, বিশ্ববিদ্যালয়, গবেষণা প্রতিষ্ঠান, শিল্পখাত এবং তরুণ সমাজ সমন্বিতভাবে কাজ করতে পারলে বাংলাদেশ শুধু কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহারকারী নয়, বরং উদ্ভাবন ও জ্ঞানভিত্তিক অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হিসেবেও বিশ্বে নিজেদের সুপ্রতিষ্ঠিত করতে সক্ষম হবে।
১৩
১৫ মন্তব্য