Loading..

ব্লগ

রিসেট

২৩ জুলাই, ২০২৬ ০৮:৫৬ অপরাহ্ণ

সবুজ ভক্ষক ও প্রশাসনিক দায়বদ্ধতা: বনভূমি সুরক্ষায় এক যুগোপযোগী রূপরেখা

সবুজ ভক্ষক ও প্রশাসনিক দায়বদ্ধতা: বনভূমি সুরক্ষায় এক যুগোপযোগী রূপরেখা
(পরিবেশ, আইন ও জীববৈচিত্র্য রক্ষায় সংস্কার প্রস্তাব)
মুফিদুল আলম, কক্সবাজার।
​১. প্রস্তাবনা
​প্রকৃতি ও মানবসভ্যতা এক অবিদ্যেদ্য সুতায় গাঁথা। কিন্তু উন্নয়নের নামে প্রকৃতি ধ্বংসের যে মহোৎসব চলছে, তা মানব অস্তিত্বকে হুমকির মুখে ঠেলে দিয়েছে। বিশেষ করে বনবিভাগের জমিতে অবৈধ জবরদখল এবং পরবর্তীতে বন বিভাগের নির্বিচারে গাছ কেটে ফেলার হটকারী সিদ্ধান্ত—এই দ্বৈত সংকট আমাদের পরিবেশগত সুরক্ষাকে গভীর অচলাবস্থায় ফেলেছে।
​একটি স্বাধীন রাষ্ট্রে বনভূমি কেবল কাঠ বা জ্বালানির উৎস নয়; এটি জলবায়ু নিয়ন্ত্রক, জীববৈচিত্র্যের আবাস ও জাতীয় নিরাপত্তার অঙ্গ। এ প্রেক্ষাপটে, ‘সবুজ ভক্ষক’ বলতে আমি কেবল অবৈধ দখলদার চক্রকেই নয়, বরং প্রশাসনিক উদাসীনতা ও অপরিকল্পিত নীতির কারণে যারা সবুজ সম্পদকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দেয়, তাদের সকলকে চিহ্নিত করছি। নিম্নে একটি যুক্তিনির্ভর, সময়োপযোগী ও বৈজ্ঞানিক রূপরেখা উপস্থাপন করছি।
​২. সাংবিধানিক ও আইনগত দায়িত্বের পুনঃনির্ধারণ
​যেকোনো দেশের বন বিভাগের মূল দায়িত্ব হলো বনের প্রাকৃতিক রূপবৈচিত্র্য রক্ষা করা ও গাছপালা অক্ষুণ্ন রাখা। আইনের চোখে বনভূমি রাষ্ট্রের অমূল্য সম্পদ।
কেন্দ্রীয় প্রশ্ন: বনবিভাগের জমিতে যেভাবেই গাছ রোপিত হোক না কেন (অবৈধ হোক বা আগ্রাসী প্রজাতি হোক), আদালতের সুনির্দিষ্ট আইনগত নির্দেশ ছাড়া সেই জীবন্ত গাছ কেটে ফেলার কোনো নৈতিক বা আইনি অধিকার কারও নেই। যদি প্রচলিত কোনো আইনে পরিবেশ ধ্বংসের অনুমতি থাকে, তবে তা সংশোধন করা এখন সময়ের দাবি।
সংযোজিত নীতি: আদালতের নির্দেশনা অবশ্যই দেশের পরিবেশগত সর্বোচ্চ স্বার্থ ও বৈজ্ঞানিক মতামতের ভিত্তিতে হতে হবে, যেন তা কাঠ ব্যবসায়ীদের স্বার্থে নয়, বরং জীববৈচিত্র‍্য রক্ষায় নেওয়া হয়।
​৩. প্রশাসনিক জটিলতা, প্রযুক্তির ব্যবহার ও সময়ানুবর্তিতা
​আইনি প্রক্রিয়ায় দখলমুক্তকরণ বছরের পর বছর লেগে যায়, যা প্রশাসনের প্রধান বাধা। এই দীর্ঘসূত্রিতা কাটিয়ে উঠতে এবং আধুনিক ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে:
বন আদালত (Forest Tribunal) গঠন: প্রতিটি জেলায় দ্রুত বিচারের জন্য পৃথক বন আদালত স্থাপন করতে হবে, যা দখলমুক্তি মামলা ৯০ কার্যদিবসের মধ্যে নিষ্পত্তি করবে।
লিটিগেশন পেন্ডিং-এ সম্পদ রক্ষা: মামলা চলাকালীন সময়ে ওই গাছগুলোকে ‘রাষ্ট্রীয় সুরক্ষিত সম্পদ’ ঘোষণা করতে হবে। এই সময়ে কোনো কর্তৃপক্ষ ওই গাছ কাটতে বা স্থানান্তর করতে পারবে না। গাছ থাকবে, মাটি থাকবে—শুধু মালিকানা নিয়ে আদালত সিদ্ধান্ত দেবে।

প্রযুক্তির সর্বোচ্চ ব্যবহার: জবরদখল ও বনভূমি ধ্বংসের প্রাথমিক পর্যায়েই তা রোধ করতে আধুনিক প্রযুক্তি যেমন—রিমোট সেন্সিং, স্যাটেলাইট ইমেজিং এবং জিআইএস (GIS) ম্যাপিংয়ের ব্যবহার বাধ্যতামূলক করতে হবে। এর মাধ্যমে বনের সীমানা লঙ্ঘন বা অবৈধ দখলের রিয়েল-টাইম ডাটা সংগ্রহ করে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হবে।
​৪. আগ্রাসী প্রজাতি ব্যবস্থাপনা
​আমাদের বনভূমিতে ইউক্যালিপটাস, আকাশমণি বা অন্যান্য আগ্রাসী প্রজাতি স্থানীয় ভূগর্ভস্থ পানির স্তর ধ্বংস করে এবং দেশি জীববৈচিত্র্যকে বিলুপ্তির পথে ঠেলে দেয়। কিন্তু এই গাছগুলোর বেলায়ও ‘কেটে ফেলা’ প্রথম পদক্ষেপ হতে পারে না। প্রস্তাবিত কাঠামো:
বৈজ্ঞানিক কমিটি গঠন: পরিবেশবিদ, উদ্ভিদবিদ ও হাইড্রোলজিস্টদের নিয়ে একটি কমিটি নির্ধারণ করবে কোন প্রজাতি সত্যিই ‘আগ্রাসী’ এবং তা অপসারণের দরকার আছে কিনা।
শর্তসাপেক্ষ অপসারণ: যদি কোনো প্রজাতি প্রমাণিতভাবে ক্ষতিকর হয়, তবে শুধুমাত্র সেই আগ্রাসী প্রজাতিগুলোকে নিয়ন্ত্রিত পদ্ধতিতে অপসারণ করা যাবে। তবে অপসারণের পর তা পুড়িয়ে ফেলা বা ফেলে না দিয়ে, সেগুলোকে বায়োমাস/জ্বালানি বা কাঠশিল্পে ব্যবহার করে প্রাপ্ত অর্থ স্থানীয় দেশি প্রজাতির চারা রোপণ ও সংরক্ষণ তহবিলে জমা দিতে হবে।
কঠোর শর্ত: দেশি প্রজাতির কোনো গাছকে আগ্রাসী প্রজাতির আড়ালে কাটা যাবে না। আগ্রাসী প্রজাতি অপসারণের পর সেই জায়গায় অবশ্যই স্থানীয় ও বিরল প্রজাতির চারা রোপণ করতে হবে।
​৫. স্থানীয় জনগোষ্ঠীর অংশগ্রহণ ও সহ-ব্যবস্থাপনা (Co-management)
​বন সংরক্ষণে কেবল প্রশাসনিক নজরদারি যথেষ্ট নয়; এর দীর্ঘস্থায়ী সুরক্ষার জন্য স্থানীয় মানুষ ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর সম্পৃক্ততা অপরিহার্য:
​বনবিভাগের একক নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি সংলগ্ন এলাকার স্থানীয় বাসিন্দাদের নিয়ে ‘কমিউনিটি ফরেস্ট্রি’ বা সহ-ব্যবস্থাপনা কমিটি গঠন করতে হবে।
​অবৈধ দখলদারদের বিরুদ্ধে পাহারা দেওয়া এবং বনের তথ্য আদান-প্রদানে স্থানীয় জনসাধারণকে সম্পৃক্ত করে সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধি করতে হবে।
​৬. প্রশাসনিক ব্যর্থতা ও প্রতিকারের পূর্ণাঙ্গ রূপরেখা
​বন বিভাগ যখন প্রাথমিক পর্যায়ে দখল প্রতিরোধে ব্যর্থ হয়, তখন তাদের সেই গাছ কাটার কোনো লাইসেন্স পাওয়া উচিত নয়। বরং পদক্ষেপ হবে উৎপাদনমুখী ও সংরক্ষণমুখী:
অবৈধ দখলমুক্তকরণ (সময়বদ্ধ): নির্ধারিত ৯০ দিনের মধ্যে আইনি প্রক্রিয়া শেষে জমি দখলমুক্ত করতে হবে।
বৈজ্ঞানিক শ্রেণিবিভাগ: দখলমুক্ত জমিতে থাকা প্রতিটি গাছকে প্রথমে ‘আগ্রাসী’ ও ‘দেশি’—এই দুই শ্রেণিতে ভাগ করতে হবে।
দেশি সম্পদ রক্ষা ও রাজস্ব আহরণ: দেশি প্রজাতির গাছগুলো ধ্বংস না করে সেগুলোকে স্থায়ীভাবে রাষ্ট্রীয় সম্পদ ঘোষণা করতে হবে। উক্ত গাছ থেকে প্রাপ্ত ফল, বীজ, পাতা বা অন্যান্য বনজ সম্পদ বিক্রির সমস্ত অর্থ সরাসরি রাষ্ট্রীয় পরিবেশ তহবিলে জমা হবে।
আগ্রাসী প্রজাতির পুনর্ব্যবহার: আগ্রাসী প্রজাতিগুলো কেবল বৈজ্ঞানিক কমিটির সুপারিশে অপসারণ করে সেখান থেকে প্রাপ্ত আয় দিয়ে স্থানীয় প্রজাতির ব্যাপক বনায়ন করতে হবে।
জবাবদিহিতা নিশ্চিতকরণ: দখল হতে দেওয়া থেকে শুরু করে গাছ কাটার অনুমতি দেওয়া—এই প্রক্রিয়ায় প্রত্যক্ষ/পরোক্ষভাবে জড়িত অসাধু চক্র ও দায়িত্বশীল কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ভূমি দখল ও পরিবেশ ধ্বংসের পৃথক মামলা দায়ের বাধ্যতামূলক করতে হবে।
​৭. উপসংহার
​পরিবেশ রক্ষার লড়াই আনুষ্ঠানিকতা নয়; এটি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের বেঁচে থাকার মৌলিক অধিকার। বন বিভাগকে হতে হবে প্রকৃত রক্ষাকর্তা, যারা সময়মতো দখল প্রতিরোধ করবে, আইনি জটিলতা দূর করতে দ্রুত আদালতের সহায়তা নেবে এবং আগ্রাসী প্রজাতির ক্ষেত্রে বিজ্ঞানসম্মত পন্থা অবলম্বন করবে।
স্মরণীয়: কোনো অবস্থাতেই আদালতের নির্দেশ ও বৈজ্ঞানিক প্রমাণ ছাড়া একটি সুস্থ সবুজ গাছও কাটা যাবে না। দেশের স্বার্থে, মাটির টানে এবং জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলায় বন ব্যবস্থাপনায় এই আমূল সংস্কার ও কঠোর প্রশাসনিক জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার বিকল্প নেই।
২৩ জুলাই ২০২৬

মন্তব্য করুন

ব্লগ