প্রভাষক
২৪ জুলাই, ২০২৬ ০৬:১৪ পূর্বাহ্ণ
মানুষের জীবনের পাঁচটি স্তর: আমরা এখন কোথায় দাঁড়িয়ে আছি?
মানুষের জীবনের পাঁচটি স্তর: আমরা এখন কোথায় দাঁড়িয়ে আছি?
বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম
আল্লাহ তাআলা মানুষকে উদ্দেশ্যহীনভাবে সৃষ্টি করেননি। মানুষের জীবন কেবল জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত সীমাবদ্ধ নয়; বরং এটি একটি দীর্ঘ যাত্রার অংশ। কুরআন ও সহীহ হাদিসের আলোকে মানুষের জীবনের পাঁচটি গুরুত্বপূর্ণ স্তর রয়েছে। প্রতিটি স্তরের উদ্দেশ্য আলাদা, কিন্তু চূড়ান্ত লক্ষ্য একটিই—আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন এবং জান্নাত লাভ।
আসুন, আমরা সেই পাঁচটি স্তর সম্পর্কে গভীরভাবে চিন্তা করি।
প্রথম স্তর: রূহের জগৎ (আলমুল আরওয়াহ)
এটি এমন একটি জগৎ, যেখানে আমাদের আত্মা (রূহ) অবস্থান করেছিল দুনিয়ায় আগমনের পূর্বে।
আল্লাহ তাআলা বলেন—
"আর স্মরণ করুন, যখন আপনার রব আদম সন্তানের পৃষ্ঠদেশ থেকে তাদের বংশধরদের বের করে তাদের নিজেদের সম্পর্কে সাক্ষী করেছিলেন (এবং জিজ্ঞেস করেছিলেন), ‘আমি কি তোমাদের রব নই?’ তারা বলেছিল, ‘অবশ্যই, আমরা সাক্ষ্য দিলাম।’"
(সূরা আল-আ'রাফ ৭:১৭২)
এই আয়াত থেকে জানা যায়, আল্লাহ তাআলা মানুষের রূহ সৃষ্টি করে তাঁর রবুবিয়্যাতের সাক্ষ্য গ্রহণ করেছিলেন। সেই জগতের প্রকৃত অবস্থা সম্পর্কে আমাদের জ্ঞান খুবই সীমিত। আল্লাহ যতটুকু জানিয়েছেন, আমরা ততটুকুই জানি।
দ্বিতীয় স্তর: মাতৃগর্ভের জীবন
রূহের জগত থেকে নির্ধারিত সময়ে মানুষ মায়ের গর্ভে আসে।
আল্লাহ তাআলা বলেন—
"অতঃপর আমি শুক্রবিন্দুকে জমাট রক্তে পরিণত করলাম, তারপর সেই রক্তপিণ্ডকে মাংসপিণ্ডে, অতঃপর মাংসপিণ্ডকে অস্থিতে এবং অস্থিকে মাংস দ্বারা আবৃত করলাম। তারপর তাকে অন্য এক সৃষ্টি হিসেবে গড়ে তুললাম। সুতরাং কতই না বরকতময় আল্লাহ, সর্বোত্তম স্রষ্টা।"
(সূরা আল-মু'মিনুন ২৩:১২–১৪)
সহীহ হাদিসে এসেছে—
মানুষের সৃষ্টি প্রথম চল্লিশ দিন শুক্রবিন্দু, পরবর্তী চল্লিশ দিন জমাট রক্ত, এরপর চল্লিশ দিন মাংসপিণ্ড থাকে। তারপর একজন ফেরেশতা প্রেরিত হন, তিনি তার মধ্যে রূহ ফুঁকে দেন এবং চারটি বিষয় লিখে দেন—তার রিজিক, জীবনকাল, আমল এবং সে সৌভাগ্যবান হবে না দুর্ভাগা হবে।
(সহীহ আল-বুখারী, সহীহ মুসলিম)
মায়ের গর্ভে অবস্থানকালে মানুষ নিজের কোনো উন্নয়ন নিজে করতে পারে না। সবকিছুই আল্লাহর অসীম ক্ষমতা ও রহমতের প্রকাশ।
তৃতীয় স্তর: দুনিয়ার জীবন (আমাদের বর্তমান জীবন)
জন্মের পর থেকে মৃত্যু পর্যন্ত সময়ই দুনিয়ার জীবন।
এই জীবনই আমাদের পরীক্ষার হল।
আল্লাহ বলেন—
"তিনি মৃত্যু ও জীবন সৃষ্টি করেছেন যাতে তিনি তোমাদের পরীক্ষা করেন—তোমাদের মধ্যে কে উত্তম আমল করে।"
(সূরা আল-মুলক ৬৭:২)
আরও বলেন—
"প্রত্যেক প্রাণীকেই মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করতে হবে। আর কিয়ামতের দিনই তোমাদের প্রতিদান পূর্ণরূপে দেওয়া হবে।"
(সূরা আলে ইমরান ৩:১৮৫)
আমরা আজ সম্পদ, পদ-পদবি, পরিবার, শিক্ষা, ব্যবসা কিংবা চাকরি নিয়ে ব্যস্ত। অথচ এসবই ক্ষণস্থায়ী। দুনিয়া আমাদের স্থায়ী আবাস নয়; এটি কেবল আখিরাতের প্রস্তুতির স্থান।
রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন—
"দুনিয়াতে এমনভাবে থাকো যেন তুমি একজন অপরিচিত ব্যক্তি বা পথিক।"
(সহীহ আল-বুখারী)
চতুর্থ স্তর: কবরের জীবন (বারযাখ)
মৃত্যুর পর থেকে কিয়ামত পর্যন্ত সময়কে বলা হয় আলমে বারযাখ।
আল্লাহ তাআলা বলেন—
"তাদের সামনে রয়েছে একটি বারযাখ (প্রতিবন্ধক), যেদিন তারা পুনরুত্থিত হবে সেই দিন পর্যন্ত।"
(সূরা আল-মু'মিনূন ২৩:১০০)
হাদিসে এসেছে—
"কবর হলো আখিরাতের প্রথম ধাপ। যদি কেউ এখানে সফল হয়, তাহলে পরবর্তী ধাপগুলো তার জন্য সহজ হবে। আর যদি এখানে ব্যর্থ হয়, তবে পরবর্তী ধাপগুলো আরও কঠিন হবে।"
(জামে আত-তিরমিযী)
কবর হবে কারও জন্য জান্নাতের একটি বাগান, আবার কারও জন্য জাহান্নামের একটি গর্ত।
পঞ্চম স্তর: আখিরাতের অনন্ত জীবন
এটি মানুষের চূড়ান্ত ও চিরস্থায়ী জীবন।
আল্লাহ বলেন—
"যেদিন মানুষ তার কৃতকর্ম দেখতে পাবে।"
(সূরা আন-নাবা ৭৮:৪০)
আরও বলেন—
"যার আমলনামা ডান হাতে দেওয়া হবে, তার হিসাব সহজ হবে।"
(সূরা আল-ইনশিকাক ৮৪:৭–৯)
এবং—
"অতঃপর যার পাল্লা ভারী হবে, সে থাকবে সুখময় জীবনে। আর যার পাল্লা হালকা হবে, তার আশ্রয় হবে হাবিয়া (জাহান্নাম)।"
(সূরা আল-কারিয়াহ ১০১:৬–১১)
জান্নাতের জীবন কখনো শেষ হবে না। জাহান্নামের শাস্তিও অত্যন্ত ভয়াবহ।
দুনিয়া ও আখিরাতের তুলনা
রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন—
"আল্লাহর শপথ! আখিরাতের তুলনায় দুনিয়ার উদাহরণ হলো এমন, যেমন তোমাদের কেউ সমুদ্রে একটি আঙুল ডুবিয়ে তুলে দেখে—আঙুলে যতটুকু পানি লেগে আসে, সেটুকুই দুনিয়া; আর সমুদ্রের অবশিষ্ট পানি হলো আখিরাত।"
(সহীহ মুসলিম)
কত গভীর এই শিক্ষা! আমরা যে জীবন নিয়ে এত ব্যস্ত, তা সমুদ্রের তুলনায় আঙুলে লেগে থাকা এক ফোঁটা পানির মতো ক্ষণস্থায়ী।
তাহলে আমাদের করণীয় কী?
আমরা এখন তৃতীয় স্তরে—দুনিয়ার জীবনে অবস্থান করছি। এটিই আমাদের আমল করার একমাত্র সুযোগ।
আল্লাহ বলেন—
"হে মুমিনগণ! তোমরা আল্লাহকে ভয় কর এবং প্রত্যেক ব্যক্তি যেন লক্ষ্য করে আগামী দিনের জন্য সে কী পাঠিয়েছে।"
(সূরা আল-হাশর ৫৯:১৮)
তাই আমাদের উচিত—
I. পাঁচ ওয়াক্ত সালাত যথাযথভাবে আদায় করা।
II. কুরআন তিলাওয়াত, বোঝা এবং সে অনুযায়ী জীবন পরিচালনা করা।
III. হালাল উপার্জন করা এবং হারাম থেকে বেঁচে থাকা।
IV. পিতা-মাতা, আত্মীয়স্বজন ও প্রতিবেশীর হক আদায় করা।
V. সততা, ন্যায়বিচার, দয়া ও মানবসেবাকে জীবনের অংশ করা।
VI. বেশি বেশি তওবা, ইস্তিগফার ও দোয়া করা।
VII. রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর সুন্নাহ অনুসরণ করা।
নিজের কাছে কয়েকটি প্রশ্ন
১। আমার ২৪ ঘণ্টার মধ্যে কত সময় দুনিয়ার জন্য ব্যয় হয়, আর কত সময় আখিরাতের জন্য?
২। আমি কি সত্যিই কিয়ামত ও আখিরাতে বিশ্বাস করি, নাকি শুধু মুখে বলি?
৩। যদি আজই আমার মৃত্যুর ডাক আসে, আমি কি প্রস্তুত?
৪। আমি কি জাহান্নামের আগুন থেকে বাঁচার জন্য যথেষ্ট চেষ্টা করছি?
৫। আল্লাহর সামনে দাঁড়িয়ে আমার প্রতিটি কথা, কাজ ও আচরণের হিসাব দিতে পারব?
৬। আমার সন্তানদের কি আমি শুধু দুনিয়ার শিক্ষা দিচ্ছি, নাকি আখিরাতের প্রস্তুতিও শেখাচ্ছি?
৭। আমার সম্পদ, সময় ও সামর্থ্যের কতটুকু আল্লাহর পথে ব্যয় করছি?
আমরা এমন এক সফরের পথিক, যার শেষ গন্তব্য মৃত্যু নয়; বরং মৃত্যু হলো আরেকটি জীবনের সূচনা। দুনিয়ার জীবন অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত, কিন্তু আখিরাতের জীবন চিরস্থায়ী।
আসুন, আমরা নিজেদের আমল, চরিত্র, ইবাদত ও মানবিকতা নতুন করে মূল্যায়ন করি। আল্লাহর নির্দেশ ও রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর সুন্নাহ অনুযায়ী জীবন গড়ে তুলি। আল্লাহ যেন আমাদের ঈমানের সাথে জীবন অতিবাহিত করার, উত্তম আমল করার, কবরের আযাব থেকে মুক্ত থাকার এবং কিয়ামতের দিন সহজ হিসাবের মাধ্যমে জান্নাতুল ফিরদাউস লাভের তাওফিক দান করেন।
আমীন, ইয়া রব্বাল আলামীন।
৩
৩ মন্তব্য