প্রধান শিক্ষক
০৯ আগস্ট, ২০২৬ ০৫:১২ অপরাহ্ণ
প্রধান শিক্ষক
🌿 আমার মা—একজন সংগ্রামী নারীর জীবনকথা 🌿
কিছু মানুষ পৃথিবী থেকে চলে যান, কিন্তু তাঁদের ভালোবাসা, ত্যাগ আর স্মৃতিগুলো কখনো চলে যায় না। আমার মা তেমনই একজন মানুষ—যাঁকে হারানোর পর বুঝতে পেরেছি, একজন মা আসলে একটি পরিবারের কত বড় শক্তি।
আমার মা ছিলেন আমার নানা-নানীর সবচেয়ে বড় সন্তান। তাঁর কোনো ভাই ছিল না, ছিলেন ছয়জন বোন। আর আমার বাবা ছিলেন আমার দাদার সবচেয়ে বড় সন্তান। বাবার আরও চারজন ভাই ছিলেন। বাপ-চাচাদের ছেলে-মেয়ে মিলিয়ে একসময় আমাদের ছিল বিশাল একান্নবর্তী পরিবার।
সেই বড় পরিবারের দিনগুলো আজ শুধু স্মৃতি।
একসময় বাপ-চাচারা আলাদা হয়ে গেলেন। আমাদের সংসারের আয়ের প্রধান অবলম্বন ছিল দাদার রেখে যাওয়া জায়গা-জমি। অভাবের সংসারে সন্তানদের মুখে খাবার তুলে দিতে বাবা একে একে ধানি জমি বিক্রি করে জীবন ও জীবিকার পথ খুঁজেছেন।
বাবার কোনো নির্দিষ্ট পেশা ছিল না। যখন যে কাজ মনে ধরেছে, সেটিই করেছেন—কখনো চালের ব্যবসা, কখনো গরুর ব্যবসা, কখনো পাথরের ব্যবসা। জীবনের সঙ্গে যুদ্ধ করে সন্তানদের বড় করার চেষ্টা করেছেন।
আমরা ছিলাম ৮ ভাই ও ৩ বোন—মোট ১১ সন্তান।
এত বড় সংসার সামলানো ছিল মায়ের জন্য এক বিশাল দায়িত্ব। অথচ মা নিজেও প্রায়ই অসুস্থ হয়ে পড়তেন। মায়ের অসুস্থতার সময় আমিও আমার ভাইয়েরা ঘর ঝাড়ু দেওয়া, রান্নাবান্না, কাপড়চোপড় ধোয়া—সংসারের নানা কাজ করতাম। আমাদের তিন বোন তখন ছোট।
মা ছিলেন অত্যন্ত শক্ত-সামর্থ্যবান একজন নারী। তিনি ছিলেন আমাদের পরিবারের শাসনকর্ত্রী। প্রয়োজন হলে সবাইকে শাসন করতেন। তখন হয়তো তাঁর শাসন কঠিন মনে হতো, কিন্তু আজ বুঝি—সেই শাসনের প্রতিটি মুহূর্তের পেছনে ছিল সন্তানদের ভালো রাখার অদম্য চেষ্টা।
আমাদের বড় ভাই সৌদি আরবে প্রবাসে ছিলেন। তাঁর উপার্জনের টাকা দিয়ে আমাদের পড়াশোনা, সংসারের খরচসহ অনেক প্রয়োজন মিটত। পরে বড় বোনের বিয়ে হয় এবং তিনি লন্ডনে প্রবাসী হন। মা-বাবার চিকিৎসার প্রায় সব বড় খরচের ভারও অনেক সময় বোনের পাঠানো অর্থে চলেছে।
এভাবেই আমরা সবাই মিলে সংসারটাকে কোনোভাবে ধরে রেখেছিলাম।
কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে মায়ের শরীরে একের পর এক রোগ বাসা বাঁধতে শুরু করল। ধীরে ধীরে তিনি অনেক অসুস্থ হয়ে পড়লেন। জীবনের শেষ দিকে তিনি দুই-তিনবার স্ট্রোকও করেছিলেন।
তখনও আমাদের কেউ স্থায়ী চাকরিতে ছিলাম না।
তবুও মাকে বাঁচানোর চেষ্টা থেমে থাকেনি।
আমি এবং আমার ছোট ভাইয়েরা যার যার সামর্থ্য অনুযায়ী কিছু কিছু আয় করতে শুরু করি। মায়ের চিকিৎসার জন্য তাঁকে নিয়ে ছুটেছি সিলেট, ঢাকা—বিভিন্ন হাসপাতাল ও চিকিৎসকের কাছে। কত রাতের দুশ্চিন্তা, কত প্রার্থনা, কত আশা—সবকিছুর কেন্দ্রবিন্দু ছিলেন আমাদের মা।
আমরা চেয়েছিলাম মা আবার সুস্থ হয়ে আমাদের মাঝে ফিরে আসুন।
কিন্তু মানুষের চেষ্টা যেখানে শেষ, সেখান থেকেই আল্লাহর সিদ্ধান্ত শুরু।
শেষ পর্যন্ত মহান রবের ডাকে সাড়া দিয়ে মা আমাদের ছেড়ে চলে গেলেন।
💔 মা নেই—এই কথাটি আজও মেনে নিতে কষ্ট হয়।
মা চলে যাওয়ার পর বুঝেছি, ঘরের একজন মানুষ চলে গেলে শুধু একজন মানুষ কমে যায় না—একটি পুরো পৃথিবী যেন শূন্য হয়ে যায়।
আজ মায়ের শাসন নেই, বকুনি নেই, অসুস্থ শরীর নিয়েও আমাদের জন্য চিন্তা করা নেই। কিন্তু তাঁর স্মৃতি আছে। তাঁর ভালোবাসা আছে। তাঁর শেখানো কথা আছে। তাঁর হাতের রান্নার স্মৃতি আছে। তাঁর কণ্ঠস্বরের স্মৃতি আছে। সবচেয়ে বড় কথা—আমাদের ৮ ভাই ও ৩ বোনের হৃদয়ের গভীরে তাঁর অস্তিত্ব আজও অমলিন।
আমাদের মা ছিলেন একজন নীরব যোদ্ধা।
অভাবের সঙ্গে যুদ্ধ করেছেন, অসুস্থতার সঙ্গে যুদ্ধ করেছেন, সন্তানদের ভবিষ্যৎ নিয়ে যুদ্ধ করেছেন। নিজের কষ্টকে আড়াল করে সন্তানদের জন্য বেঁচে থেকেছেন।
মায়ের জীবনের কাছে আমরা ঋণী।
এই ঋণ কোনোদিন শোধ করার নয়।
শুধু মহান আল্লাহর দরবারে হাত তুলে বলতে পারি—
🤲 হে আল্লাহ, আমার মাকে ক্ষমা করে দিন।
তাঁর জীবনের জানা-অজানা সব ভুল-ত্রুটি ক্ষমা করুন। তাঁর কবরকে নূরে ভরে দিন। কবরকে প্রশস্ত করে দিন। সকল প্রকার আজাব থেকে তাঁকে হেফাজত করুন।
তাঁর নেক আমলগুলো কবুল করুন। তাঁর সন্তানদের পক্ষ থেকে করা দোয়া, দান-সদকা ও সাদাকায়ে জারিয়ার সওয়াব তাঁর আমলনামায় পৌঁছে দিন।
হে আল্লাহ, আমার মাকে জান্নাতুল ফেরদাউসের সর্বোচ্চ স্থান দান করুন।
আর আমাদের এমন সন্তান হওয়ার তাওফিক দিন, যাদের দোয়া ও নেক আমলের কারণে আমাদের মা-বাবার মর্যাদা আখিরাতে আরও বৃদ্ধি পায়।
মা, তুমি আমাদের চোখের আড়ালে চলে গেছো, কিন্তু আমাদের হৃদয় থেকে কখনো হারিয়ে যাবে না।
তুমি বেঁচে থাকবে আমাদের প্রতিটি স্মৃতিতে, প্রতিটি দোয়ায়, প্রতিটি অশ্রুবিন্দুতে।
🌹 মা, তোমাকে খুব মনে পড়ে।
🤲 আল্লাহ তোমাকে জান্নাতুল ফেরদাউস নসিব করুন।
আমিন, ইয়া রাব্বাল আলামিন।
৬
৬ মন্তব্য