সহকারী শিক্ষক
০৮ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ০৭:২৮ পূর্বাহ্ণ
ডায়ানা বাউমরিন্ডের শিশু প্রতিপালনের (Parenting Styles) এই চারটি মূল নীতিকে শিক্ষাক্ষেত্রে বা শ্রেণিকক্ষ ব্যবস্থাপনায় (Classroom Management) চমৎকারভাবে প্রয়োগ করা যায়
মোশারফ হোসাইন
১৯৬০ এর দশকে ডায়না বমরাইন্ড (Daina Baumrind) শিশু প্রতিপালনের কয়েকটি ধরণ/স্টাইল চিহ্নিত করেন যা পরবর্তীতে শিশু প্রতিপালন পদ্ধতি হিসেবে বিবেচনা করা হয়। মনোবিজ্ঞানীদের মতে ,বাবা-মায়ের আচরণ, স্নেহ, শাসন এবং যোগাযোগের ধরন শিশুর মেধা ও ব্যাক্তিত্ব গঠনে গভীর প্রভাব ফেলে।
ডায়ানা বমরাইন্ডের শিশু প্রতিপালনের (Parenting Styles) এই চারটি মূল নীতিকে শিক্ষাক্ষেত্রে বা শ্রেণিকক্ষ ব্যবস্থাপনায় (Classroom Management) চমৎকারভাবে প্রয়োগ করা যায়। শিক্ষাবিদদের মতে, একজন শিক্ষকের শ্রেণিকক্ষ পরিচালনার ধরণ বা টিচিং স্টাইল (Teaching Style) অনেকখানি এই প্রতিপালন কৌশলের মতোই কাজ করে।
শ্রেণিকক্ষে এই চার ধরনের কৌশলের প্রয়োগ এবং তার ফলাফল নিচে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো:
১. একনায়কতান্ত্রিক বা কর্তৃত্ববাদী শিক্ষক (Authoritarian Educator)
শ্রেণিকক্ষে প্রয়োগ:
এই ধরণের শিক্ষকেরা শ্রেণিকক্ষে চরম কঠোর অনুশাসন বজায় রাখেন। তারা একতরফা নিয়ম তৈরি করেন এবং শিক্ষার্থীদের কোনো মতামত না নিয়ে তা কঠোরভাবে চাপিয়ে দেন। এখানে শিক্ষকের মূল লক্ষ্য থাকে নিছক "নিয়ন্ত্রণ"। ভুল করলে কোনো ক্ষমা বা আলোচনার সুযোগ থাকে না, সরাসরি শাস্তি (যেমন: ক্লাসের বাইরে দাঁড় করিয়ে রাখা, অতিরিক্ত হোমওয়ার্ক দেওয়া বা তিরস্কার করা) দেওয়া হয়। শিক্ষার্থীদের প্রশ্ন করার স্বাধীনতা থাকে না, শিক্ষকের কথাই শেষ কথা।
এই ধরণের শিক্ষকেরা শ্রেণিকক্ষে চরম কঠোর অনুশাসন বজায় রাখেন। তারা একতরফা নিয়ম তৈরি করেন এবং শিক্ষার্থীদের কোনো মতামত না নিয়ে তা কঠোরভাবে চাপিয়ে দেন। এখানে শিক্ষকের মূল লক্ষ্য থাকে নিছক "নিয়ন্ত্রণ"। ভুল করলে কোনো ক্ষমা বা আলোচনার সুযোগ থাকে না, সরাসরি শাস্তি (যেমন: ক্লাসের বাইরে দাঁড় করিয়ে রাখা, অতিরিক্ত হোমওয়ার্ক দেওয়া বা তিরস্কার করা) দেওয়া হয়। শিক্ষার্থীদের প্রশ্ন করার স্বাধীনতা থাকে না, শিক্ষকের কথাই শেষ কথা।
ফলাফল:
- স্বল্পমেয়াদী ইতিবাচক দিক: ক্লাসরুম সাময়িকভাবে খুব শান্ত ও পিনপতন নীরব থাকে। শিক্ষার্থীরা শাস্তির ভয়ে দ্রুত কাজ জমা দেয়।
- নেতিবাচক দিক: শিক্ষার্থীদের মনে শিক্ষকের প্রতি শ্রদ্ধা নয়, বরং গভীর ভীতি তৈরি হয়। ফলে তাদের স্বাভাবিক সৃজনশীলতা ও প্রশ্ন করার ক্ষমতা নষ্ট হয়ে যায়। এরা শিক্ষকের অনুপস্থিতিতে চরম বিশৃঙ্খলা করতে পারে এবং পড়ালেখার প্রতি আগ্রহ হারিয়ে ফেলে।
২. গণতান্ত্রিক বা কর্তৃত্বপূর্ণ শিক্ষক (Authoritative Educator)
শ্রেণিকক্ষে প্রয়োগ:
এটি শ্রেণিকক্ষ ব্যবস্থাপনার সবচেয়ে আদর্শ ও কার্যকর কৌশল। এই পদ্ধতিতে শিক্ষক যেমন নিয়মানুবর্তিতা ও পড়াশোনার উচ্চ মান বজায় রাখেন, তেমনি শিক্ষার্থীদের প্রতি অত্যন্ত স্নেহশীল ও সহযোগিতাপূর্ণ হন। শিক্ষক ক্লাসের নিয়মগুলো শিক্ষার্থীদের সাথে আলোচনা করে তৈরি করেন এবং কেন এই নিয়মগুলো জরুরি, তা বুঝিয়ে বলেন। শিক্ষার্থীরা ভুল করলে শিক্ষক তাদের অপমান না করে, ভুল থেকে শেখার (Positive Reinforcement) সুযোগ দেন এবং যেকোনো যুক্তিসঙ্গত প্রশ্নকে স্বাগত জানান।
এটি শ্রেণিকক্ষ ব্যবস্থাপনার সবচেয়ে আদর্শ ও কার্যকর কৌশল। এই পদ্ধতিতে শিক্ষক যেমন নিয়মানুবর্তিতা ও পড়াশোনার উচ্চ মান বজায় রাখেন, তেমনি শিক্ষার্থীদের প্রতি অত্যন্ত স্নেহশীল ও সহযোগিতাপূর্ণ হন। শিক্ষক ক্লাসের নিয়মগুলো শিক্ষার্থীদের সাথে আলোচনা করে তৈরি করেন এবং কেন এই নিয়মগুলো জরুরি, তা বুঝিয়ে বলেন। শিক্ষার্থীরা ভুল করলে শিক্ষক তাদের অপমান না করে, ভুল থেকে শেখার (Positive Reinforcement) সুযোগ দেন এবং যেকোনো যুক্তিসঙ্গত প্রশ্নকে স্বাগত জানান।
ফলাফল:
- ফলাফল: শিক্ষার্থীরা অত্যন্ত আত্মবিশ্বাসী ও স্বাবলম্বী হয়ে ওঠে। তারা ভয়মুক্ত পরিবেশে পড়াশোনা করতে পারে বলে তাদের পরীক্ষার ফলাফল ভালো হয় এবং সৃজনশীল চিন্তা বিকশিত হয়।
- শিক্ষকের সাথে শিক্ষার্থীদের একটি চমৎকার ও শ্রদ্ধাপূর্ণ সম্পর্ক তৈরি হয়, ফলে শিক্ষার্থীরা আনন্দের সাথে পড়ালেখা শেখে এবং ক্লাসে ফাঁকি দেওয়ার প্রবণতা কমে যায়।
৩. প্রশ্রয়মূলক বা শিথিল শিক্ষক (Permissive Educator)
শ্রেণিকক্ষে প্রয়োগ:
এই ধরণের শিক্ষকেরা শিক্ষার্থীদের কাছে ভীষণ "জনপ্রিয়" হতে চান এবং তাদের বন্ধুর মতো আচরণ করেন। তারা শ্রেণিকক্ষে কোনো শক্ত নিয়ম বা সীমারেখা তৈরি করেন না। শিক্ষার্থীরা হোমওয়ার্ক না আনলে বা ক্লাসে গল্প করলেও শিক্ষক "বাচ্চা মানুষ, ঠিক আছে" বলে হেসে উড়িয়ে দেন। পড়াশোনার কোনো নির্দিষ্ট লক্ষ্য বা চাপ থাকে না। শিক্ষক শিক্ষার্থীদের খুশি রাখতে তাদের সব ধরণের স্বাধীনতা দিয়ে দেন।
এই ধরণের শিক্ষকেরা শিক্ষার্থীদের কাছে ভীষণ "জনপ্রিয়" হতে চান এবং তাদের বন্ধুর মতো আচরণ করেন। তারা শ্রেণিকক্ষে কোনো শক্ত নিয়ম বা সীমারেখা তৈরি করেন না। শিক্ষার্থীরা হোমওয়ার্ক না আনলে বা ক্লাসে গল্প করলেও শিক্ষক "বাচ্চা মানুষ, ঠিক আছে" বলে হেসে উড়িয়ে দেন। পড়াশোনার কোনো নির্দিষ্ট লক্ষ্য বা চাপ থাকে না। শিক্ষক শিক্ষার্থীদের খুশি রাখতে তাদের সব ধরণের স্বাধীনতা দিয়ে দেন।
ফলাফল:
- নেতিবাচক দিক: শ্রেণিকক্ষে চরম বিশৃঙ্খলা ও হট্টগোল তৈরি হয়। শিক্ষার্থীরা শিক্ষককে বা পড়াশোনাকে গুরুত্ব দেয় না।
- কোনো শাসন না থাকায় শিক্ষার্থীরা সময়ের কাজ সময়ে শেষ করার মানসিকতা (Time management) এবং আত্মনিয়ন্ত্রণ হারায়। এর ফলে সামগ্রিকভাবে ক্লাসের শিক্ষার্থীদের অ্যাকাডেমিক মান বা রেজাল্ট খুব খারাপ হয়।
৪. উদাসীন বা সম্পর্কহীন শিক্ষক (Uninvolved Educator)
শ্রেণিকক্ষে প্রয়োগ:
এই ধরণের শিক্ষকেরা ক্লাসে আসেন কেবল নিজের দায়িত্বটুকু কোনোমতে শেষ করতে। শিক্ষার্থীদের পড়ালেখার অগ্রগতি হলো কি হলো না, কে ক্লাসে এলো বা কে পেছনের বেঞ্চে বসে ঘুমাচ্ছে—তা নিয়ে শিক্ষকের কোনো মাথাব্যথা থাকে না। তিনি শুধু বোর্ডে কিছু লিখে দিয়ে বা লেকচার দিয়ে চলে যান। শিক্ষার্থীদের সাথে তার কোনো মানসিক বা আবেগীয় যোগাযোগ থাকে না।
এই ধরণের শিক্ষকেরা ক্লাসে আসেন কেবল নিজের দায়িত্বটুকু কোনোমতে শেষ করতে। শিক্ষার্থীদের পড়ালেখার অগ্রগতি হলো কি হলো না, কে ক্লাসে এলো বা কে পেছনের বেঞ্চে বসে ঘুমাচ্ছে—তা নিয়ে শিক্ষকের কোনো মাথাব্যথা থাকে না। তিনি শুধু বোর্ডে কিছু লিখে দিয়ে বা লেকচার দিয়ে চলে যান। শিক্ষার্থীদের সাথে তার কোনো মানসিক বা আবেগীয় যোগাযোগ থাকে না।
ফলাফল:
- ফলাফল: এটি শিক্ষার্থীদের জন্য সবচেয়ে মারাত্মক। শিক্ষার্থীরা নিজেদের চরম অবহেলিত ও দিকনির্দেশনাহীন মনে করে।
- ক্লাসের পরিবেশ পুরোপুরি ভেঙে পড়ে। শিক্ষার্থীরা পড়াশোনায় মনোযোগ সম্পূর্ণ হারিয়ে ফেলে এবং অনেকের মধ্যে স্কুল পালানো বা বখাটেপনা করার প্রবণতা দেখা দেয়।
উপসংহার ও সেরা কৌশল
প্যারেন্টিংয়ের মতো শিক্ষাক্ষেত্রেও গণতান্ত্রিক বা কর্তৃত্বপূর্ণ (Authoritative) কৌশলটি সবচেয়ে সেরা ফলাফল দেয়। একজন শিক্ষক যখন শ্রেণিকক্ষে কঠোর শৃঙ্খলা এবং স্নেহ-ভালোবাসার সঠিক ভারসাম্য বজায় রাখেন, তখনই কেবল শিক্ষার্থীরা সেরা মানুষ হিসেবে গড়ে উঠতে পারে।
মন্তব্য করুন
১
১ মন্তব্য