Loading..

ব্লগ

রিসেট

০৮ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ১০:২৯ পূর্বাহ্ণ

১৮ বছরেও সেই প্রারম্ভিক গ্রেড-১৩ তেই বেতন! এই চরম বৈষম্য ও মনোকষ্ট কি নীতিনির্ধারকরা কোনোদিন বুঝবেন?

১৮ বছরেও সেই প্রারম্ভিক গ্রেড-১৩ তেই বেতন! এই চরম বৈষম্য ও মনোকষ্ট কি নীতিনির্ধারকরা কোনোদিন বুঝবেন?

ভূমিকা:

দশকের পর দশক ধরে আমরা শুনে আসছি ‘শিক্ষকতা এক সম্মানজনক পেশা’, ‘শিক্ষকগণ মানুষ গড়ার কারিগর’। কিন্তু বাস্তবতার রুক্ষ জমিনে দাঁড়িয়ে যখন একজন প্রাথমিক শিক্ষক তার ১৮ বছরের দীর্ঘ চাকরিকাল শেষে মাসের শেষে বেতন স্লিপের দিকে তাকান, তখন তাকে এক বুক হাহাকার আর অপমানের মুখোমুখি হতে হয়। যে মহান কারিগরের হাতে দেশের ভবিষ্যৎ গড়ে ওঠে, তার নিজের ভবিষ্যৎ আজ আমলাতান্ত্রিক মারপ্যাঁচে পিষ্ট। নীতিনির্ধারকগণ এসি রুমে বসে যখন ফাইল চালাচালি করেন, তখন তারা কি একবারও উপলব্ধি করেন—চাকরির ১৮ বছর পার করার পরও প্রারম্ভিক গ্রেড বা ফিডার গ্রেড-১৩ তেই বেতন পাওয়া কতটা অমর্যাদাকর এবং যন্ত্রণাদায়ক?

সহজ সমীকরণের কঠিন তামাশা

যেকোনো সাধারণ বুদ্ধিসম্পন্ন মানুষও একটি সহজ অংক বোঝে:

সহকারী শিক্ষকদের প্রারম্ভিক বা নিয়োগকালীন ফিডার গ্রেড: ১৩তম।

আইন ও প্রচলিত বিধি অনুসারে ১০ বছর সন্তোষজনক চাকরিতে বেতন হওয়ার কথা: ১২তম গ্রেড।

১৬ বছর সন্তোষজনক চাকরিতে বেতন হওয়ার কথা: ১১তম গ্রেড।

অথচ ২০০৮ সালে নিয়োগ পাওয়া একজন সিনিয়র সহকারী শিক্ষক, যার চাকরিকাল আজ ১৮ বছর, তিনিও সেই ১৩তম গ্রেডেই বেতন পাচ্ছেন! মাঝখান দিয়ে মুলা ঝোলানোর মতো আমাদের সামনে আনা হয়েছে ‘উন্নীত স্কেল’ বা ‘প্রশিক্ষণ স্কেল’-এর দোহাই। যদি উন্নীত স্কেলকেই আপনারা ‘উচ্চতর গ্রেড’ হিসেবে গণ্য করেন, তবে জাতীয় বেতন স্কেলে তার বাস্তব প্রতিফলন কোথায়? ১৮ বছর একই গ্রেডে পড়ে থাকা কি কোনোভাবেই প্রবৃদ্ধি বা উন্নতির লক্ষণ হতে পারে? এটি কি শিক্ষকদের সাথে গত এক দশক ধরে চলা এক সুপরিকল্পিত ‘ধোঁয়াবাজি’ নয়?

৩০টি চিঠি এবং এসি রুমের অদূরদর্শিতা

বিগত বছরগুলোতে অর্থমন্ত্রণালয়, সিজিএ কার্যালয় আর অধিদপ্তরের মধ্যে ৩০টিরও অধিক চিঠি চালাচালি হয়েছে। প্রতিটি পত্রে নতুন নতুন মারপ্যাঁচে শিক্ষকদের প্রাপ্য অধিকারকে ধামাচাপা দেওয়া হয়েছে। নীতিনির্ধারকদের এই ‘অফিস আদেশ-পরিপত্র’ খেলার বলি হচ্ছেন মাঠ পর্যায়ের সহজ-সরল শিক্ষকগণ।

সম্প্রতি পে-স্কেল নিয়ে গঠিত সচিব কমিটির সুপারিশে এই উচ্চতর গ্রেড বা টাইমস্কেলের পুঞ্জীভূত সমস্যার কোনো সুনির্দিষ্ট সমাধানের লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। এই যে প্রশাসনিক স্থবিরতা, এটি কেবল শিক্ষকদের আর্থিক ক্ষতিই করছে না, বরং তাদের মানসিকভাবে পঙ্গু করে দিচ্ছে। পেটে ক্ষুধা আর মনে চরম হতাশা নিয়ে কি মানসম্মত পাঠদান সম্ভব? সিনিয়রের চেয়ে জুনিয়ররা বেশি বেতন পাবেন—এমন অদ্ভুত নিয়ম কি নীতিনির্ধারকদের বিবেকে একটুও নাড়া দেয় না?

আসন্ন ২০২৬ পে-স্কেল: আমাদের শেষ আর্তনাদ

আমরা আর জটিল আইনি ভাষা বা সুপারিশের গোলকধাঁধায় বন্দি হতে চাই না। আসন্ন ২০২৬ পে-স্কেল গেজেটে আমরা আমাদের যোগ্য মর্যাদার প্রতিফলন চাই।

আমাদের দাবি অত্যন্ত স্পষ্ট:

১. চাকরির ১০ ও ১৬ বছর পূর্ণ হওয়া মাত্রই সরকারের অন্যান্য বিভাগের কর্মচারীদের মতো প্রাথমিক শিক্ষকদের স্বয়ংক্রিয়ভাবে যথাক্রমে ১২তম এবং ১১তম গ্রেড নিশ্চিত করতে হবে।

২. প্রশিক্ষণ স্কেল বা সামগ্রিক পদের মানোন্নয়নকে (Substantive Upgrade) কোনোভাবেই ব্যক্তিগত উচ্চতর গ্রেডের প্রাপ্তিতে ‘বাঁধা’ হিসেবে দেখানো চলবে না।

৩. যদি নতুন পে-স্কেলে ৮ বছর পর পর উচ্চতর গ্রেড দেওয়া হয়, তবে ১৮-২০ বছর অভিজ্ঞ শিক্ষকদের দীর্ঘ বঞ্চনার অবসান ঘটিয়ে সরাসরি ১০ম গ্রেডে অবস্থান নিশ্চিত করতে হবে।

উপসংহার:

নীতিনির্ধারকদের বুঝতে হবে, শিক্ষকদের এই মনোকষ্ট কেবল ব্যক্তিগত নয়, এটি পুরো শিক্ষা ব্যবস্থার জন্য অশনিসংকেত। একজন শিক্ষক যখন দেখেন তার ১৮ বছরের অভিজ্ঞতাকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে তাকে সেই শুরুর গ্রেডেই বেতন দেওয়া হচ্ছে, তখন তার আত্মমর্যাদা ধুলোয় মিশে যায়। #প্রাথমিক_শিক্ষক #উচ্চতর_গ্রেড_বঞ্চনা #ফিডার_গ্রেড_১৩ #পে_স্কেল_২০২৬ #শিক্ষক_মর্যাদা #PrimaryTeacherDisparity

মন্তব্য করুন