৮ সেপ্টেম্বর ‘আন্তর্জাতিক সাক্ষরতা দিবস’। উপকূলের ভুক্তভোগী নারীদের নতুন হাতিয়ার পরিবেশগত সাক্ষরতা। জলবাযু পরিবর্তন উপকূলের নারীদের এক ভিন্ন বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে। খুলনার এক গ্রামের নারী জানেন, কোন মাসে পুকুরের জল বেশি লবণাক্ত হয়ে ওঠে। সাতক্ষীরায় জলবায়ু সমস্যায় জর্জরিত এক নারী জানেন, জোয়ারের জল কতদূর এগোলে ধানখেত আর বাঁচানো যায় না। বাগেরহাটের কোনো নারী চেনেন ঘূর্ণিঝড়ের আগের সেই বদলে যাওয়া আকাশ, বাতাসের অন্য রকম গন্ধ। বরগুনার এক বৃদ্ধা জানেন, নদীর পানি বৃদ্ধি পেলে এবার হয়তো আর নিস্তার মিলবে না! এই জ্ঞান কোনো বই থেকে আসেনি। এসেছে বছরের পর বছর প্রকৃতির সঙ্গে থেকে| মা থেকে মেয়েতে, অভিজ্ঞতালব্ধ জ্ঞান থেকে।
অথচ নারীর পরিবেশগত সাক্ষরতাকে আমলে নেওয়া হয় না! পরিবেশগত সাক্ষরতার কথা উঠলে নারীর বহুমুখী বাস্তব অভিজ্ঞতা প্রায় বাদই পড়ে যায়। পরিবেশগত সাক্ষরতা মানে শুধু ˆবজ্ঞানিক তথ্য জানা নয়। এই সংকট নিজের জীবনকে কীভাবে ছুঁয়ে যাচ্ছে, তা বোঝা। আর সেই বোঝা থেকে একটা প্রতিরোধের পথ খুঁজে নেওয়া। বাংলাদেশের উপকূলে জলবায়ু সংকট যত বাড়ছে, ততই স্পষ্ট হচ্ছে একটা কথা। আর সেটি হলো- এই লড়াইয়ে নারীর জায়গাটা মূল কেন্দ্রে। নারীকেই সবচেয়ে বেশি ভুগতে হচ্ছে। কিন্তু নারীর সাক্ষরতা আর স্কীকৃতি, দুটোই এখনও পিছিয়ে। এটা শুধু তথ্যের অভাব নয়| বলা যেতে পারে, এটা একরকম অগোচরে রেখে দেওয়া বা পাশ কাটিয়ে যাওয়ার সংস্কৃতি। নারীর জ্ঞানকে ‘অপ্রাতিষ্ঠানিক’ বলে সরিয়ে রাখার একটা পুরোনো অভ্যাস!
উপকূলের নারীদের সঙ্গে কথা বললে বোঝা যায়, জ্ঞানের কোনো অভাব তাদের নেই। কোন ফসল লবণাক্ত মাটিতে টিকবে, তারা জানেন। বৃষ্টির জল কখন ধরে রাখতে হবে, সেটাও জানেন। ঘূর্ণিঝড়ের খবর পেলে ঘরের জিনিস আর গবাদিপশু কোন দিকে সরাতে হবে, সেই সিদ্ধান্তও তারা তাৎক্ষণিকভাবে নিতে পারেন। মিষ্টি জলের পুকুর বাঁচিয়ে রাখা, বর্ষার জল ট্যাংকে জমানো, লবণ বাড়লে কোন সবজি ফলাতে হবে- এসব ছোট ছোট সিদ্ধান্ত তারা প্রতিদিন নেন নিজেদের মতো করে, এমনকি কারও সাহায্য ছাড়াই! এই জ্ঞান ˆতরি হয়েছে প্রতিদিনকার জীবন থেকে, প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে। কিন্তু এই অভিজ্ঞতা আর প্রাতিষ্ঠানিক সাক্ষরতার মধ্যে একটা বড় দূরত্ব রয়ে গেছে। জলবায়ু পরিবর্তনের ˆবশ্বিক কারণ, নীতিনির্ধারণের প্রক্রিয়া, লবণসহনশীল ধানের নতুন জাত, সৌরচালিত সেচ-এসব খবর আগে পৌঁছায় মূলত শহরের শিক্ষিত মানুষের কাছে। উপকুলের মানুষের কাছে নতুন জ্ঞান পৌঁছায় আরও অনেক পরে। উপকূলের নারী যে জ্ঞান দিয়ে টিকে আছেন, তার কোনো প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতি নেই। আবার ক্ষেএবিশেষে নতুন জ্ঞান প্রান্তিক নারীদের কাছে পৌঁছায় না! ফলে একটা অদ্ভুত সমীকরণ তৈরি হয়। যিনি সংকটের সবচেয়ে কাছে, তথ্যের স্রোতে তিনিই সবচেয়ে দূরে| সময়ের সঙ্গে কখনো কখনো এই দূরত্ব বিপজ্জনক হয়ে ওঠে।
জলবায়ুর চরিত্রই পাল্টে যাচ্ছে দ্রুত। সে বিবেচনায় নারীর পুরোনো অভিজ্ঞতা একদিকে একা আবার গুরুত্বহীনভাবে দেখা হয়। দুর্যোগের সময় এই ঘাটতি সবচেয়ে স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ঘূর্ণিঝড় বা জলোচ্ছ্বাসের পর যে ক্ষয়ক্ষতির হিসাব বেরোয়, তাতে নারীর প্রাণহানির খবর বেশি থাকে। কারণ সতর্কবার্তা যেভাবে বা যে প্রক্রিয়ায় ছড়ায়, তাতে নারীর ˆদনন্দিন জীবনযাপনের সঙ্গে অনেক সময় মেলে না। দেখা যায় বার্তা পৌঁছায় হাটে, চায়ের দোকানে। যেখানে নারীর যাওয়া-আসা কম। আশ্রয়কেন্দ্রে যাওয়ার সিদ্ধান্তও অনেক সময় তার হাতে থাকে না। সিদ্ধান্তের বেলায় নারীর অভিজ্ঞতাকে অস্কীকার করার একটা প্রবণতা দেখা যায়! পরিবারের পুরুষ ফিরে না আসা পর্যন্ত নারীরা অপেক্ষা করেন। আর ততক্ষণে সময় ফুরিয়ে যায়। অথচ পুনর্গঠনের কাজ, বীজ বাঁচিয়ে রাখা, নতুন জীবিকা খুঁজে নেওয়া-এসবের ভার এসে পড়ে তাদের কাঁধেই। ঘর মেরামত থেকে পরিবারের খাবার জোগাড়, সবটাই সামলান তারা। এই ˆবপরীত্য থেকেই বোঝা যায়, নারীর পরিবেশগত সাক্ষরতা শুধু তাদের একার ক্ষমতায়নের প্রশ্ন নয়। এটা গোটা পরিবারের, গোটা জনগোষ্ঠীর টিকে থাকার প্রশ্ন। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কমিটি, বিশুদ্ধ জল ব্যবস্থাপনা কমিটি কিংবা ত্রাণ ব্যবস্থাপনা কমিটি, এগুলোতে এলাকার নারীর উপস্থিতি এখনও প্রতীকী। সিদ্ধান্তের টেবিলে তার কণ্ঠ পৌঁছায় না, যদিও বাস্তবায়নের কাজ তাদেরই। যারা লড়াইয়ের প্রথম সারিতে, তাদের হাতে তথ্য আর সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা না থাকলে গোটা সম্প্রদায়ের প্রতিরোধই দুর্বল হয়ে পড়ে। সিদ্ধান্ত গ্রহণ আর বাস্তবায়নের মতো জায়গাগুলোতে ভুক্তভোগী নারীদের অগ্রাধিকার দেওয়া মানেই সংশ্লিষ্ট কাজে লক্ষ্য পূরণের দিক থেকে এগিয়ে থাকা।
উপকূলের নারীর অভিজ্ঞতাকে মূল্যায়ন না করার ঘাটতির পেছনে কয়েকটা কারণ কাজ করে| আর সেখান থেকেই খুঁজে পাওয়া যায় সমাধানের পথ। প্রথম কারণ হলো পাঠ্যক্রম| পরিবেশ শিক্ষা যতটুকু আছে তার বেশিরভাগই তাত্ত্বিক। ˆবশ্বিক উষ্ণায়নের সাধারণ কথা বইয়ের পাতায় তুলে ধরা হয়েছে| উপকূলীয় বাস্তবতার সঙ্গে যার সরাসরি যোগ নেইঅ। মাঠ পর্যায়ে কীভাবে সমস্যার সমাধান সম্ভব- তাত্ত্বিকভাবে তার রূপরেখা পাওয়া বেশিরভাগ সময় সম্ভব হয় না। স্থানীয় প্রেক্ষাপটে ˆতরি সহজ পাঠ, লবণাক্ততা মোকাবিলার নির্দিষ্ট কৌশল, স্থানীয় দুর্যোগের ইতিহাস-এসব পাঠ্যক্রমে অন্তর্ভুক্ত করলে এই দূরত্ব কমবে বলে আশা করা যায়। আবার রয়েছে সংশ্লিষ্ট কাজে নারীদের সম্পৃক্ততার অভাব| কৃষি সম্প্রসারণ আর দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় নারী কর্মীর সংখ্যা এখনো কম। ফলে নতুন তথ্য নারীর কাছে পৌঁছানোর স্বাভাবিক পথটাই ছোট হয়ে আছে। সামাজিক বাস্তবতায় একজন পুরুষ কর্মীর পক্ষে গৃহস্থালির নারীর সঙ্গে নিয়মিত কথা বলা সহজ হয় না! নারী সম্প্রসারণ কর্মী বাড়লে এই বাধা কমে যাবে। কথা বলার, প্রশ্ন করার জায়গাও তৈরি হবে। অপর একটি কারণ হলো দূরত্ব। প্রত্যন্ত অঞ্চলে ইন্টারনেট আর প্রশিক্ষণ কেন্দ্র সহজলভ্য নয়। শহরের কর্মশালায় গিয়ে অংশ নেওয়া নারীর পক্ষে কঠিন। সময় নেই, সুযোগও নেই। এখানে মোবাইল ফোন আর কমিউনিটি রেডিওর মতো মাধ্যম কাজে আসতে পারে। সহজ ভাষার অডিও বার্তা, হাট-বাজারের ছোট আলোচনা, নারী স্বনির্ভর গোষ্ঠীর সাপ্তাহিক সভায় অল্প সময়ের প্রশিক্ষণ, গ্রামীণ পযায়ে নারীদের ছোট ছোট দল বা গোষ্ঠীকে সম্পৃক্তকরণ- এসব হয়তো ছোট উদ্যোগ, কিন্তু এদের প্রভাব বড়| এসব দিক থেকে একসঙ্গে এগোলে অভিজ্ঞতা আর তথ্যের মধ্যে সেতু ˆতরি হবে।
নারীর এই বাধা বা ঘাটতি পেরিয়ে যাওয়ার গল্পও কম নয়। উপকূলের অনেক নারী নিজের গ্রামে লবণসহনশীল চাষ নিয়ে এসেছেন। প্রতিবেশীকে শিখিয়েছেন বৃষ্টির জল ধরে রাখার ছোট কৌশল| কেউ কেউ আবার দুর্যোগ প্রস্তুতি কমিটিতে নেতৃত্ব দিচ্ছেন| কেউ ভাসমান সবজি বাগান শিখে জলাবদ্ধ জমিতেও ফসল ফলাচ্ছেন। কেউ স্বনির্ভর গোষ্ঠীর মাধ্যমে গড়ে তুলেছেন বীজ ব্যাংক, যাতে দুর্যোগের পরও চাষ থেমে না যায়। এই নারীরা শুরু করেছেন ছোট পরিসরে। নিজের উঠোনে, নিজের পুকুরে। কিন্তু তাদের সাফল্য দেখে প্রতিবেশীরাও একই পথে হেঁটেছেন। ধীরে ধীরে গড়ে উঠেছে একটা সম্মিলিত অভ্যাস, একটা সংস্কৃতি। তারা প্রমাণ করেছেন সুযোগ পেলে পুরনো জ্ঞান নতুন তথ্যের সঙ্গে জটিল পরিস্থিতিও বদলে ফেলা সম্ভব। আর তখনই সেটা হয়ে ওঠে আসল হাতিয়ার। এই গল্পগুলো বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়। এগুলো আমাদের পথনির্দেশ করে এই বার্তা বহন করে যে, বিনিয়োগ আসলে কোথায় দরকার। এসব উদ্যোগ প্রমাণ করে, ঠিক সহায়তা পেলে বদল আসতে সময় লাগে না।
জলবায়ু সংকট যত তীব্র হচ্ছে, উপকূলের নারীর হাতে থাকা জ্ঞান ততই দামি হয়ে উঠছে| এখন এই প্রশ্ন করার সুযোগ নেই যে, সংশ্লিষ্ট জ্ঞান ভুক্তভোগী নারীদের আছে কিনা! প্রশ্ন এখন এটাই যে, তাদের স্বীকৃতি দেওয়া হচ্ছে কিনা! নতুন তথ্য আর সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ দেওয়া হচ্ছে কিনা| পরিবেশগত সাক্ষরতা যদি সত্যিই উপকূলের নারীর নতুন হাতিয়ার হিসেবে বিবেচনা করা হয়, তবে সেই হাতিয়ার গড়ার দায়িত্ব শুধু তার একার নয়| এই দায়িত্ব রাষ্ট্রের, নীতিনির্ধারকের ও স্থানীয় প্রতিষ্ঠানের| এই দায়িত্ব যত দেরিতে মূল্যায়ন করা হবে, তত বেশি মাশুল গুনতে হবে গোটা উপকূলের মানুষকে!
৭
৬ মন্তব্য