সহকারী শিক্ষক
০৮ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ১১:৫৬ অপরাহ্ণ
প্রশ্ন গ্রিড শিখন কৌশল
প্রশ্ন গ্রিড শিখন কৌশল (Question Grid Learning Strategy), যা অনেক সময় কোয়েশ্চেন ম্যাট্রিক্স (Question Matrix) নামেও পরিচিত, হলো শিক্ষার্থীদের সমালোচনামূলক চিন্তাভাবনা (Critical thinking) এবং উচ্চতর স্তরের বুদ্ধিবৃত্তিক দক্ষতা (Higher-order thinking skills) বিকাশের একটি পরিকল্পিত পদ্ধতি। এটি মূলত শিক্ষার্থীদের প্রশ্ন তৈরি করতে এবং তথ্যের গভীরে প্রবেশ করতে উৎসাহিত করে।
Chuck Weiderhold এই কৌশলটি তৈরি করেছিলেন। এটি ব্লুমের ট্যাক্সোনমি (Bloom's Taxonomy)—স্মরণ করা থেকে শুরু করে মূল্যায়ন ও সৃষ্টি করা পর্যন্ত—ভিত্তি করে সাজানো হয়েছে।
১. প্রশ্ন গ্রিড কীভাবে কাজ করে?
এই কৌশলে একটি গ্রিড বা ছক ব্যবহার করা হয় যার উপরে এবং বাম পাশে নির্দিষ্ট কিছু শব্দ বা শব্দের অংশ থাকে। বাম পাশের কলামে থাকে প্রশ্নবোধক শব্দ (যেমন: কী, কোথায়, কখন, কেন, কীভাবে, কে) এবং উপরের সারিতে থাকে সাহায্যকারী ক্রিয়া/কাল (যেমন: হয়, ছিল, পারে, করবে, উচিত, হতে পারে)।
শিক্ষার্থীরা বাম পাশ থেকে একটি শব্দ এবং উপর থেকে একটি শব্দ মিলিয়ে একটি পূর্ণাঙ্গ প্রশ্ন তৈরি করে।
প্রশ্ন গ্রিডের একটি নমুনা (সহজ সংস্করণে):
| হয় / কী (Present/Factual) | ছিল (Past/Factual) | পারে (Possibility) | উচিত (Opinion/Advice) | হবে (Future/Prediction) | |
| কী (What) | কী হয়? | কী ছিল? | কী হতে পারে? | কী করা উচিত? | কী হবে? |
| কোথায় (Where) | কোথায় হয়? | কোথায় ছিল? | কোথায় হতে পারে? | কোথায় যাওয়া উচিত? | কোথায় হবে? |
| কখন (When) | কখন হয়? | কখন ছিল? | কখন হতে পারে? | কখন করা উচিত? | কখন হবে? |
| কে (Who) | কে হয়? | কে ছিল? | কে হতে পারে? | কার করা উচিত? | কে হবে? |
| কেন (Why) | কেন হয়? | কেন ছিল? | কেন হতে পারে? | কেন করা উচিত? | কেন হবে? |
| কীভাবে (How) | কীভাবে হয়? | কীভাবে ছিল? | কীভাবে হতে পারে? | কীভাবে করা উচিত? | কীভাবে হবে? |
২. কাঠামোর বিশ্লেষণ (সহজ থেকে জটিল)
গ্রিডে আমরা যখন বাম থেকে ডানে এবং উপর থেকে নিচে যাই, তখন প্রশ্নের জটিলতা বা গভীরতা বাড়ে।
উপরের বাম কোণ (কী হয়? কখন ছিল?): এই প্রশ্নগুলো মূলত তথ্যভিত্তিক (Factual) বা স্মৃতিশক্তি নির্ভর। এগুলোর উত্তর সরাসরি বইয়ে বা তথ্যে পাওয়া যায়। (ব্লুমের: জ্ঞান ও অনুধাবন)।
নিচের ডান কোণ (কেন হওয়া উচিত? কীভাবে হবে?): এই প্রশ্নগুলো চিন্তাশীল এবং বিশ্লেষণধর্মী। এগুলোর উত্তর দেওয়ার জন্য শিক্ষার্থীদের তথ্য বিশ্লেষণ করতে হয়, মতামত দিতে হয় বা ভবিষ্যদ্বাণী করতে হয়। (ব্লুমের: বিশ্লেষণ, মূল্যায়ন, সৃষ্টি)।
৩. এই কৌশলের প্রধান সুবিধাসমূহ
সক্রিয় অংশগ্রহণ: শিক্ষার্থীরা কেবল শিক্ষকের প্রশ্নের উত্তর দেয় না, তারা নিজেরাই প্রশ্ন তৈরি করতে শেখে।
উচ্চতর চিন্তাভাবনা: গ্রিড শিক্ষার্থীদের সহজ তথ্যমূলক প্রশ্নের গণ্ডি পেরিয়ে "কেন" এবং "কীভাবে" এর মতো গভীর প্রশ্ন করতে অনুপ্রাণিত করে।
পঠন অনুধাবন বৃদ্ধি: কোনো অধ্যায় বা অনুচ্ছেদ পড়ার পর এই কৌশল ব্যবহার করলে শিক্ষার্থীরা বিষয়বস্তু আরও গভীরভাবে বুঝতে পারে।
সৃজনশীলতা বৃদ্ধি: নতুন নতুন প্রশ্ন তৈরি করার মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের মধ্যে সৃজনশীল মানসিকতা তৈরি হয়।
সহজ ও নমনীয়: এই গ্রিড যেকোনো বিষয় (বিজ্ঞান, ইতিহাস, সাহিত্য) এবং যেকোনো শ্রেণীর শিক্ষার্থীদের জন্য ব্যবহার করা সম্ভব।
৪. শ্রেণিকক্ষে ব্যবহারের উদাহরণ
ধরা যাক, শিক্ষার্থীরা "১৯৭১ সালের বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ" সম্পর্কে পড়ছে। পড়ার পর শিক্ষক গ্রিডটি বোর্ডে এঁকে দিতে পারেন এবং শিক্ষার্থীদের দলবদ্ধভাবে প্রশ্ন তৈরি করতে বলতে পারেন:
সহজ প্রশ্ন (গ্রিডের উপরের অংশ থেকে): মুক্তিযুদ্ধ কখন শুরু ছিল? বাংলাদেশের প্রথম রাষ্ট্রপতি কে ছিলেন?
জটিল প্রশ্ন (গ্রিডের নিচের অংশ থেকে): বঙ্গবন্ধু কেন স্বাধীনতার ডাক দিয়েছিলেন? সাধারণ মানুষ কীভাবে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিতে পেরেছিল? যুদ্ধের পর দেশ পুনর্গঠনে কী করা উচিত ছিল?
এই কৌশল ব্যবহার করে শিক্ষকরা শিক্ষার্থীদের শিখনের মূল্যায়ন করতে পারেন এবং শিক্ষার্থীরাও নিজেদের বোঝার গভীরতা যাচাই করতে পারে।
৭
৬ মন্তব্য