মূল্যায়ন: শিক্ষা, প্রশিক্ষণ ও ব্যবস্থাপনার মতো বিভিন্ন ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট লক্ষ্য বা উদ্দেশ্য অর্জনের অগ্রগতি পরিমাপ করার প্রক্রিয়াই হলো মূল্যায়ন। প্রয়োগের সময়, উদ্দেশ্য, মানদণ্ড এবং পদ্ধতির ওপর ভিত্তি করে মূল্যায়নকে প্রধানত কয়েকটি শ্রেণিতে ভাগ করা হয়:
১. উদ্দেশ্য ও সময়সূচী অনুযায়ী মূল্যায়ন
- গঠনমূলক মূল্যায়ন (Formative Evaluation):
- সংজ্ঞা: শিখন-শেখানো প্রক্রিয়া চলমান থাকা অবস্থায় শিক্ষার্থীদের প্রতিদিনের অগ্রগতি যাচাই এবং ভুলত্রুটি চিহ্নিত করার জন্য যে মূল্যায়ন করা হয়।
- উদ্দেশ্য: শিক্ষাদান পদ্ধতির তাৎক্ষণিক উন্নতি করা এবং শিক্ষার্থীদের সময়মতো প্রতিক্রিয়া (Feedback) দেওয়া।
- উদাহরণ: শ্রেণিকক্ষের প্রশ্নোত্তর, কুইজ, সাপ্তাহিক পরীক্ষা, শ্রেণির কাজ (Classwork) ও বাড়ির কাজ।
- সমষ্টিগত মূল্যায়ন (Summative Evaluation):
- সংজ্ঞা: একটি কোর্স, নির্দিষ্ট মেয়াদ বা শিক্ষাবর্ষ শেষে অর্জিত সামগ্রিক যোগ্যতা ও শিখনফল পরিমাপের জন্য যে মূল্যায়ন পরিচালনা করা হয়।
- উদ্দেশ্য: শিক্ষার্থীর দক্ষতা অনুযায়ী গ্রেড দেওয়া, সার্টিফিকেট প্রদান করা বা পরবর্তী শ্রেণিতে উন্নীত করা।
- উদাহরণ: বার্ষিক পরীক্ষা, বোর্ড পরীক্ষা (যেমন: এসএসসি/এইচএসসি), সেমিস্টার ফাইনাল।
- নিদানিক বা নির্ণায়ক মূল্যায়ন (Diagnostic Evaluation):
- সংজ্ঞা: পাঠদানের পরও শিক্ষার্থীর কোথায় ও কেন শিখন ঘাটতি বা সমস্যা হচ্ছে, তা গভীরভাবে চিহ্নিত করার প্রক্রিয়া।
- উদ্দেশ্য: শিক্ষার্থীর বিশেষ দুর্বলতার মূল কারণ অনুসন্ধান করে প্রতিকারমূলক শিক্ষার (Remedial Teaching) ব্যবস্থা করা।
- উদাহরণ: গণিত বা ব্যাকরণের বিশেষ কোনো অংশে বারবার ভুল করার কারণ চিহ্নিত করতে প্রস্তুতকৃত বিশেষ পরীক্ষা।
- স্থান নির্ধারণী বা প্রাক-মূল্যায়ন (Placement Evaluation):
- সংজ্ঞা: কোনো শিক্ষা প্রোগ্রাম বা কোর্সে প্রবেশের আগে শিক্ষার্থীর পূর্বজ্ঞান, দক্ষতা ও উপযুক্ততা যাচাইয়ের জন্য যে মূল্যায়ন করা হয়।
- উদ্দেশ্য: শিক্ষার্থী নির্দিষ্ট কোর্সের জন্য প্রস্তুত কি না তা নির্ধারণ করা এবং সঠিক স্তর বেছে নেওয়া।
- উদাহরণ: বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষা (Admission Test) বা যেকোনো কোর্সের যোগ্যতা যাচাই পরীক্ষা।
২. মানদণ্ড বা তুলনার ভিত্তি অনুযায়ী মূল্যায়ন
- মানদণ্ডভিত্তিক মূল্যায়ন (Criterion-Referenced Evaluation):
- সংজ্ঞা: পূর্বনির্ধারিত কোনো নির্দিষ্ট মান বা লক্ষ্যের (Criterion) সাপেক্ষে শিক্ষার্থীর পারফরম্যান্স পরিমাপ করার পদ্ধতি।
- বৈশিষ্ট্য: এখানে অন্য কোনো শিক্ষার্থীর অর্জনের সাথে তুলনা করা হয় না; কেবল নির্দিষ্ট লক্ষ্য অর্জিত হয়েছে কি না তা দেখা হয়।
- উদাহরণ: ড্রাইভিং লাইসেন্স পরীক্ষা, কীবোর্ড টাইপিং স্পিড টেস্ট, বা ৮০% নম্বর পেলে 'A+' গ্রেড পাওয়ার নিয়ম।
- দলীয় মানদণ্ডভিত্তিক মূল্যায়ন (Norm-Referenced Evaluation):
- সংজ্ঞা: একটি নির্দিষ্ট দল বা গোষ্ঠীর অন্যান্য প্রতিযোগীদের অর্জনের সাথে তুলনা করে ব্যক্তির অবস্থান নির্ধারণ করার মূল্যায়ন।
- বৈশিষ্ট্য: এটি মেধা স্থান, র্যাঙ্কিং বা পার্সেন্টাইল (Percentile) নির্ধারণে ব্যবহৃত হয়।
- উদাহরণ: বিসিএস বা অন্যান্য প্রতিযোগিতামূলক চাকরি পরীক্ষা, যেখানে সেরা নির্ধারিতসংখ্যক পরীক্ষার্থীকে নির্বাচন করা হয়।
৩. পরিমাপের প্রকৃতি ও পদ্ধতি অনুযায়ী মূল্যায়ন
- আনুষ্ঠানিক মূল্যায়ন (Formal Evaluation):
- পূর্বনির্ধারিত নিয়ম, নির্দিষ্ট সময়সূচি, প্রশ্নপত্র ও কাঠামোগত পরীক্ষার মাধ্যমে যে মূল্যায়ন করা হয় (যেমন: লিখিত, মৌখিক বা প্র্যাকটিক্যাল পরীক্ষা)।
- অনানুষ্ঠানিক মূল্যায়ন (Informal Evaluation):
- কোনো আনুষ্ঠানিক পরীক্ষা ছাড়াই শিক্ষক দ্বারা শ্রেণিকক্ষে শিক্ষার্থীর আচরণ, মনোযোগ, দলের সাথে কাজ করার মানসিকতা ইত্যাদি পর্যবেক্ষণ করে মূল্যায়ন।
- ধারাবাহিক মূল্যায়ন (Continuous Assessment):
- কেবল একটি চূড়ান্ত পরীক্ষার ওপর নির্ভর না করে সারা বছর ধরে অ্যাকাডেমিক ও সহ-পাঠ্যক্রমিক কাজের সার্বিক অগ্রগতি পর্যবেক্ষণ ও নথিভুক্ত করার প্রক্রিয়া।
- স্ব-মূল্যায়ন (Self-Evaluation) ও সহপাঠী মূল্যায়ন (Peer Evaluation):
- স্ব-মূল্যায়ন: শিক্ষার্থী নিজেই নিজ কাজের মান ও অগ্রগতি পর্যালোচনা করে।
- সহপাঠী মূল্যায়ন: শিক্ষার্থীরা একে অপরের কাজ বা প্রেজেন্টেশন পর্যবেক্ষণ করে বস্তুনিষ্ঠ মতামত দেয়।
১৪
২৪ মন্তব্য