সহকারী শিক্ষক
১১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ০৩:০৭ অপরাহ্ণ
সহকারী শিক্ষক
সরকারি চাকরিতে ১১ থেকে ২০ গ্রেডের কর্মচারী নিয়োগে মৌখিক পরীক্ষার নম্বর বাড়ানোর সরকারের একটি প্রস্তাবে শিক্ষার্থী ও চাকরিপ্রার্থীদের মধ্যে চরম ক্ষোভ ও উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।
শিক্ষার্থী ও জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞদের মতে, মৌখিক পরীক্ষায় নম্বর বাড়ালে নিয়োগে স্বজনপ্রীতি, দুর্নীতি এবং অনিয়মের সুযোগ বহুলাংশে বৃদ্ধি পাবে। 'পছন্দের' প্রার্থীকে ভাইভায় অন্যায্য সুবিধা দিয়ে এগিয়ে নেওয়ার ঝুঁকি তৈরি হবে—এমন আশঙ্কায় মঙ্গলবার রাত ও বুধবার দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে বিক্ষোভ ও মানববন্ধন অনুষ্ঠিত হয়েছে।
তবে উদ্ভূত পরিস্থিতির মধ্যে জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী মো. আব্দুল বারী জানিয়েছেন, মৌখিক পরীক্ষার নম্বর বাড়ানোর বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি। বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগের ভিন্ন ভিন্ন পরীক্ষা পদ্ধতিকে একটি সুনির্দিষ্ট কাঠামোর আওতায় আনার চিন্তা করা হলেও বিষয়টি এখনো পর্যালোচনার পর্যায়ে রয়েছে।
জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের খসড়া বিধিমালা অনুযায়ী ১১ থেকে ২০তম গ্রেডের নিয়োগ পরীক্ষার প্রস্তাবিত নম্বর বণ্টন ও পাস নম্বর মোট ১৫০। এর মধ্যে লিখিত পরীক্ষায় ১০০ (বাংলায় ২৫, ইংরেজিতে ২৫, গণিতে ২৫ এবং প্রাসঙ্গিক টেকনিক্যাল বা সাধারণ জ্ঞানে ২৫ নম্বর) এবং মৌখিক পরীক্ষায় ৫০ নম্বর থাকবে। লিখিত পরীক্ষায় পাস নম্বর ৩৫ শতাংশ এবং মৌখিক পরীক্ষায় ৪০ শতাংশ। ১৩-১৬তম গ্রেডে দুই পরীক্ষার মোট নম্বর হবে ১০০। এর মধ্যে লিখিত পরীক্ষায় ৬০ (বাংলা, ইংরেজি, গণিত এবং প্রাসঙ্গিক টেকনিক্যাল বা সাধারণ জ্ঞানে ১৫ নম্বর করে) এবং মৌখিক পরীক্ষায় ৪০ নম্বর। লিখিত ও মৌখিক-উভয় পরীক্ষাতেই পাস নম্বর ৪০ শতাংশ। ১৭-২০তম গ্রেডে লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষার নম্বর হবে ২৫ করে। লিখিত পরীক্ষায় বাংলা, ইংরেজি, গণিত এবং প্রাসঙ্গিক টেকনিক্যাল বা সাধারণ জ্ঞানে ৫ নম্বর করে থাকবে। লিখিত ও মৌখিক-উভয় পরীক্ষায় পাস নম্বর ৪০ শতাংশ।
খসড়া বিধিমালায় বলা হয়েছে, কোনো প্রার্থী লিখিত পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার পর তাঁর জন্য ব্যবহারিক পরীক্ষা নির্ধারিত থাকলে তাঁকে সেই পরীক্ষাতেও উত্তীর্ণ হতে হবে। প্রস্তাবিত বিধিমালা শৃঙ্খলা বাহিনী, পুলিশ বাহিনী, বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি), আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনী, ব্যাটালিয়ন আনসার, বাংলাদেশ কোস্ট গার্ড, র্যাব বা অন্য কোনো বাহিনী এবং বাংলাদেশ সরকারি কর্ম কমিশনের (পিএসসি) আওতাধীন কোনো পদে নিয়োগের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে না।
বর্তমানে মন্ত্রণালয় বা বিভাগের সংযুক্ত অধিদপ্তর, পরিদপ্তর ও দপ্তরের 'কমন পদ' নিয়োগ বিধিমালা অনুযায়ী উচ্চমান সহকারীসহ সংশ্লিষ্ট সমপর্যায়ের বিভিন্ন পদে নিয়োগে লিখিত পরীক্ষায় ৭০ এবং মৌখিক পরীক্ষায় ৩০ নম্বর রয়েছে। তবে মন্ত্রণালয় ও বিভাগের ক্ষেত্রে ভিন্নতা রয়েছে। বাংলাদেশ সচিবালয় (ক্যাডার-বহির্ভূত গেজেটেড কর্মকর্তা এবং নন-গেজেটেড কর্মচারী) নিয়োগ বিধিমালা অনুযায়ী ব্যক্তিগত কর্মকর্তা, সাঁট মুদ্রাক্ষরিক কাম কম্পিউটার অপারেটর, অফিস সহকারীসহ বিভিন্ন পদে সরাসরি নিয়োগে ১০০ নম্বরের লিখিত পরীক্ষা এবং ১০ নম্বরের মৌখিক পরীক্ষা নেওয়া হয়।
প্রস্তাবিত বিধিমালায় ১১ থেকে ২০তম গ্রেডে নিয়োগে মৌখিক পরীক্ষার নম্বর বৃদ্ধির প্রস্তাবের প্রতিবাদ, আপত্তি, ক্ষোভ ও উদ্বেগ জানিয়েছেন চাকরিপ্রার্থী ও শিক্ষার্থীরা। এই উদ্যোগের বিষয়টি জানাজানি হলে মঙ্গলবার রাতে এর প্রতিবাদে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় এবং নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে বিক্ষোভকরেন শিক্ষার্থীদের একাংশ।
প্রস্তাবিত বিধিমালার প্রতিবাদে গতকাল দুপুরে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে মানববন্ধন করে চাকসু। বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ে মানববন্ধন করেন সাধারণ শিক্ষার্থীরা। মানববন্ধনে বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের শিক্ষার্থী ইমন আলী বলেন, 'আমরা চাই, দেশের সব নাগরিকের চাকরিতে সমান অধিকার থাকবে। এখানে কোনো দলপন্থী বা দলীয় গোষ্ঠীর লোকজন চাকরি করবে, এমনটা হবে না। আমরা এসব মানি না।'
গতকাল রাতে রংপুরে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে (বেরোবি) এবং ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়েও (ইবি) বিক্ষোভমিছিল ও প্রতিবাদ সমাবেশ হয়েছে।
এদিকে চাকরিপ্রার্থীরা খসড়া বিধিমালায় মৌখিক পরীক্ষার নম্বর বাড়ানোর প্রস্তাবের সমালোচনা করে এ নিয়ে ক্ষোভ ও উদ্বেগ জানিয়েছেন। তাঁরা বলছেন, লিখিত পরীক্ষা তুলনামূলকভাবে কাঠামোবদ্ধ ও যাচাইযোগ্য হলেও মৌখিক পরীক্ষায় নম্বর দেওয়ার ক্ষেত্রে পরীক্ষকের ব্যক্তিগত মূল্যায়নের প্রভাব অনেক ক্ষেত্রে বেশি। ফলে লিখিত পরীক্ষায় প্রার্থীদের নম্বর কাছাকাছি হলে মৌখিক পরীক্ষার নম্বরই চূড়ান্ত ফলাফলে বড় পার্থক্য করবে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক অন্তত ১০ জন চাকরিপ্রার্থী বলেছেন, মৌখিক পরীক্ষার নম্বর বাড়ানো হলে নিয়োগে অনিয়ম, দুর্নীতি ও স্বজনপ্রীতি বাড়বে। এতে মেধাবীরা বঞ্চিত হবেন।
২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সাবেক অন্যতম সমন্বয়ক ও জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সাবেক যুগ্ম সদস্যসচিব আরিফ সোহেল বলেন, 'মৌখিক পরীক্ষায় নম্বর বৃদ্ধি দুর্নীতি ও স্বজনপ্রীতির জায়গাটাকে আরও উন্মুক্ত করে দিতে পারে। যাঁরা সরকারি চাকরিপ্রত্যাশী, সত্যিকার অর্থে যোগ্য, তাঁদের জায়গাটা সংকুচিত করে দিতে পারে। মৌখিক পরীক্ষায় নম্বর বৃদ্ধির বিষয়টিকে খুব আশঙ্কাজনক হিসেবে দেখছি।'
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের আরেক সাবেক সমন্বয়ক ও এনসিপির দক্ষিণাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক হাসনাত আবদুল্লাহ এমপি ফেসবুক পোস্টে লিখেছেন, সরকারি কর্মচারী নিয়োগে গ্রেড ১১-২০-এর ক্ষেত্রে ভাইভার নম্বর বাড়ানোর সিদ্ধান্ত গ্রহণযোগ্য নয়। এটি একটি চরম আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত।
মৌখিক পরীক্ষার নম্বর বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়ে জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞদের মধ্যেও উদ্বেগ রয়েছে। জানতে চাইলে গতকাল জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞ ফিরোজ মিয়া বলেন, ১১- ২০তম গ্রেডের নিয়োগে মৌখিক পরীক্ষার নম্বর বাড়ালে নিজেদের পছন্দের ব্যক্তিদের নিয়োগের পথ তৈরি হবে। এতে দুর্নীতি বাড়বে। তিনি বলেন, মৌখিক পরীক্ষার নম্বর বাড়ানো হলে নিয়োগ কমিটির সদস্যদের 'মর্জির ওপর' নিয়োগ নির্ভর করবে। সত্যিকার মেধার মূল্যায়ন হবে না। মৌখিক পরীক্ষার কোনো রেকর্ড থাকে না। কেউ লিখিত পরীক্ষায় কম নম্বর পেলেও মৌখিক পরীক্ষায় নম্বর বাড়িয়ে নিয়োগ দেওয়া সম্ভব হবে। আবার লিখিত পরীক্ষায় বেশি নম্বর পাওয়া কাউকে মৌখিকে কম নম্বর দিয়ে নিয়োগ থেকে বাদও দেওয়া যাবে, কেউ ধরতে পারবে না।
খসড়া বিধিমালার মৌখিক পরীক্ষার নম্বর বাড়ানোর প্রস্তাবের সমালোচনা করেছেন সাবেক সচিব ও বাংলাদেশ লোকপ্রশাসন প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের (বিপিএটিসি) সাবেক রেক্টর এ কে এম আবদুল আউয়াল মজুমদারও। তিনি বলেন, তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী নিয়োগে মৌখিক পরীক্ষার নম্বর ২০-এর বেশি করা যৌক্তিক নয়। এতে দুর্নীতির বিস্তার, সুশাসনে বাধা এবং রাষ্ট্রের ক্ষতির আশঙ্কা রয়েছে।
অবশ্য সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, বিশেষ কোনো উদ্দেশ্যে বা বৈষম্য সৃষ্টির জন্য এই পরিবর্তন আনা হচ্ছে না।
মঙ্গলবার সচিবালয়ে সংবাদ সম্মেলনে খসড়া বিধিমালায় মৌখিক পরীক্ষার নম্বর বাড়ানোর প্রস্তাবের বিষয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচার
উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমান বলেন, দক্ষ ও যোগ্য প্রশাসনিক জনবল নিশ্চিত করতেই সরকার এই পরিবর্তন আনছে। নিয়োগের জন্য মৌখিক পরীক্ষায় বেশি নম্বর রাখার সিদ্ধান্তকে নিয়োগের মানোন্নয়নের সঙ্গে যুক্ত বলে মন্তব্য করেন তিনি।
১৪
২৪ মন্তব্য