রসায়নের বাজারে পরমাণুর ভেতরকার ইলেকট্রন বাবুরা এক-একজন বড়দরের আমীর আদমি। তারা কখন কোন মহলে থাকেন, কোন তায়ফায় নাচেন আর কোন দিকে মুখ করে ঘুমান—তার হিসাব রাখা সাধারণ মানুষের কম্ম নয়। বিজ্ঞানী পণ্ডিতেরা তাই এক অদ্ভুত পাহারাদার নিয়োগ করলেন—যার নাম ‘কোয়ান্টাম সংখ্যা’। এটি মূলত চার খানা সংখ্যার এক চতুর পঞ্চায়েত, যারা চোরের মতো পিছু নিয়ে ইলেকট্রনের চৌদ্দপুরুষের ঠিকুজী বের করে আনে। এ যেন ঠিক কাবুলের কোতোয়ালি পুলিশ, কার পকেটে কয়টা নিষ্কৃতি-পরোয়ানা আছে তার তল্লাশি নিচ্ছে!
প্রথম পাহারাদারের নাম প্রধান কোয়ান্টাম সংখ্যা (n)। ইনি হলেন পরমাণুর অন্দরমহলের প্রধান দেওয়ান। ইলেকট্রন বাবু কোন তলার বাসিন্দা, অর্থাৎ তার প্রধান শক্তিস্তর কোনটি, তা ইনিই বাতলে দেন। n = 1 হলে সে প্রথম তলার চুনোপুঁটি, আর n = 4 হলে সে চার তলার বড়বাবু। এই তলা যত বাড়ে, ইলেকট্রনের আমীরি চাল আর অহংকারও তত বৃদ্ধি পায়।
তার ঠিক পরেই আসেন নায়েব মহাশয়—সহকারী কোয়ান্টাম সংখ্যা (l)। প্রধান দেওয়ান তো শুধু তলা বা শক্তিস্তর বলেই খালাস, কিন্তু সেই তলার ভেতর কয়খানা কামরা বা উপস্তর আছে, তার হিসাব রাখেন এই নায়েব বাবু। কামরাগুলোর নামও আবার খাসা—s, p, d, f। শুনতে ভারী মিষ্টি, যেন লখনৌয়ের কোনো বাঈজি পাড়ার মহলা! s হলো গোলগাল নিরীহ কামরা, আর f কামরাটি এতই জটিল যে সেখানে ঢুকলে খোদ মজনুও লাইলির নাম ভুলে উল্টো পথ ধরবে।
তিন নম্বর ইয়ারের নাম চৌম্বক কোয়ান্টাম সংখ্যা (m)। ইনি হলেন পরমাণুর অন্দরের নকশাকার। কামরাগুলো মহাশূন্যে ত্রিমাত্রিকভাবে কোন দিকে মুখ করে হেলে আছে, তার হদিস দেন ইনি। এর হিসাব মেলাতে গিয়ে প্লাস-মাইনাস আর জিরোর যে গোলকধাঁধা তৈরি হয়, তা দেখলে মগজের ঘিলু একদম কান্দাহারের বেদানা আর কাবুলের পেস্তার মতো চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে যায়।
আর সবার শেষে যিনি আসেন, তিনি হলেন খোদ ঘূর্ণন কোয়ান্টাম সংখ্যা (s)। ইলেকট্রন বাবু নিজের অক্ষের ওপর কোন দিকে পাক খাচ্ছেন—ডানে নাকি বাঁয়ে—তা ইনিই ঠিক করেন। মান মাত্র দুটি, হয় +১/২ নয়তো -১/২. অর্থাৎ, হয় সোজা ঘোরো, নয়তো উল্টো ঘোরো! এ যেন সেই কলকাতার ট্রাম গাড়ি, হয় ডানে যাবে নয়তো বাঁয়ে, মাঝখানের কোনো রাস্তা নেই।
পরীক্ষার হলে বসে যখন এই চার ইয়ারের মান—n, l, m, s—একসঙ্গে মেলাতে যাই, তখন পলির বর্জন নীতি এসে এমন এক ধাক্কা মারে যে আমাদের মার্কসগুলোও ওই ঘূর্ণন কোয়ান্টাম সংখ্যার মতো উল্টো পাক খেয়ে সোজা খাতায় মাইনাস হয়ে যায়!
হে কোয়ান্টাম সংখ্যার কারিগরগণ, ইলেকট্রন বাবুরা পরমাণুর ঘরে কোন দিকে মুখ করে শুলেন আর কোন দিকে তাকালেন, তা দিয়ে আমাদের কী ফায়দা? তারা শান্তিতে ঘুমালে আমরাও অন্তত পরীক্ষার হলে একটু শান্তিতে চোখটা বুজতে পারতুম!
৪
৬ মন্তব্য