রসায়নের বাজারে বিক্রিয়াগুলো সাধারণত দুই কিসিমের হয়। একদল হলো একমুখী—সোজা সামনের দিকে দৌড় লাগায়, পেছনে ফেরার নামও নেয় না। এরা যেন সেই কান্দাহারের খ্যাপাটে পাঠান, একবার তরবারি উঁচিয়ে ছুটলে শহীদ না হওয়া পর্যন্ত থামে না। কিন্তু অন্য দলটি বড়ই অদ্ভুত, রসায়নের পরিভাষায় তাদের নাম ‘উভমুখী বিক্রিয়া’। এরা যেমন সামনে যায়, তেমনই আবার সুড়সুড় করে পেছন পানেও হাঁটা দেয়। আর এই উভমুখী বাবুদের ঘরকন্নার শেষ পরিণতিই হলো এই ‘রাসায়নিক সাম্যাবস্থা’।
সহজ ভাষায় বলতে গেলে, এ যেন এক আজব যুদ্ধক্ষেত্র! সমুখ পানে ছুটছে বিক্রিয়ক দল আর পেছন থেকে ধেয়ে আসছে উৎপাদের ফৌজ। দুপক্ষেরই গতি সমান। বাইরে থেকে দেখলে মনে হবে—আহা, কী শান্ত, কী সুবোধ! যুদ্ধ বুঝি থেমে গেছে, ল্যাবরেটরিতে যেন পরম শান্তির সুবাতাস বইছে। কিন্তু ভেতরে গিয়ে উঁকি মারলেই বুঝবেন, এ কেবলি চোখের ধোকা! ভেতরে তখন চলছে মহাপ্রলয়। সমুখের ফৌজ যে গতিতে এগোচ্ছে, পেছনের ফৌজও ঠিক সেই গতিতেই হানা দিচ্ছে। এ যেন আমাদের ঘরের সেই ঝগড়াটে বুড়ো-বুড়ি—বাইরে পরম বৈষ্ণব, কিন্তু ভেতরে চিল্কার চিলির মতো কোঁদল লেগেই আছে!
এই সাম্যাবস্থার বাজারে আবার এক মস্ত বড় ফতোয়া জারি করেছেন ফরাসি হাকিম লা শাতেলিঁয়ে (Le Chatelier)। তাঁর নীতিখানা বড়ই খতরনাক। আপনি যদি বাইরে থেকে এই সাম্যাবস্থার ওপর একটুখানি চাপ দেন, কিংবা একটুখানি তাপ বাড়িয়ে দেন—ব্যস, বিক্রিয়া বাবু তখন গোস্বা করে এমন এক দিকে মোড় নেবেন যাতে আপনার দেওয়া সেই তাপ বা চাপের জারিজুরি একদম ভণ্ডুল হয়ে যায়!
যেমন ধরুন, আপনি চাইলেন বিক্রিয়ায় একটু তাপ বাড়িয়ে বেশি করে উৎপাদ ঘরে তুলবেন। কিন্তু বিক্রিয়াটি যদি হয় তাপোৎপাদী, তবে লা শাতেলিঁয়ে সাহেবের ভূত এসে বিক্রিয়াটিকে সোজা পেছনের দিকে ঠেলে দেবে। আপনার গুড় দিয়ে ক্ষীর খাওয়ার স্বপ্ন তখন বুড়িগঙ্গার জলে ভেসে যাবে! এ যেন সেই অবাধ্য ঘোড়া—যারে ডানে যেতে বললে সে সোজা বাঁয়ে দৌড় মারে।
পরীক্ষার হলে বসে যখন এই সাম্যাবস্থার ধ্রুবক Kp আর Kc এর মেলা মেলাতে যাই, আর লা শাতেলিঁয়ে সাহেবের নীতি দিয়ে চাপের প্রভাব খুঁজতে যাই—তখন মগজের ঘিলু একদম কাবুলের পেস্তা আর কান্দাহারের আঙুরের মতো পিষে একাকার হয়ে যায়। বিক্রিয়ার সাম্যাবস্থা আসুক আর না আসুক, পরীক্ষার খাতায় আমাদের নম্বরের সাম্যাবস্থা যে ক্রমাগত শূন্যের কোঠায় এসে স্থির হচ্ছে, সেই খবর কোনো বিজ্ঞানী রাখেনি।
হে লা শাতেলিঁয়ে সাহেব, আপনি যদি সাম্যাবস্থার এই ঘিলু-পাকানো নীতি না দিয়ে শান্তিতে পেন্সিলভানিয়ার কফি হাউজে বসে চুরুট ফুঁকতেন, তবে পরীক্ষার হলে আমাদের মগজের এই রাসায়নিক ভারসাম্য অন্তত এভাবে বিগড়ে যেত না!
১
২ মন্তব্য