রসায়নের বাজারে বিক্রিয়াগুলোর ঘরকন্না বড়ই অদ্ভুত। সেখানে হিসাব-নিকাশ চলে একদম খাঁটি লখনৌয়ের বাবুর্চিখানার মতো। কিন্তু এই রান্নাবান্নার আসরে হঠাৎ করেই এক খলনায়কের আবির্ভাব ঘটে, যার পোশাকি নাম ‘লিমিটিং বিক্রিয়ক’। এ যেন সেই লঙ্গরখানার কৃপণ ম্যানেজার—খাবার দাবার সব মওজুদ আছে, কিন্তু সে তার ভাণ্ডার বন্ধ করলেই পুরো ভোজবাড়ি একদম লাটে উঠে যায়!
সহজ ভাষায় বলতে গেলে, একটা বিক্রিয়া ঘটাতে গেলে তো অন্তত দুখানা পাত্র-পাত্রীর প্রয়োজন হয়। এখন আপনি মহা উৎসাহে এক বস্তা হাইড্রোজেন আর এক ছটাক অক্সিজেন নিয়ে বসে গেলেন পানি (H₂O) বানাতে। আপনার মনে আশা—আজ ল্যাবরেটরিতে একদম বুড়িগঙ্গার সমান পানি বানিয়ে ছাড়বেন! কিন্তু বিধি বাম। বিক্রিয়া শুরু হতেই ওই এক ছটাক অক্সিজেন ফুরিয়ে গিয়ে হাত-পা গুটিয়ে বসে রইল। অক্সিজেন ফুরানো মাত্রই বিক্রিয়া ওখানেই খতম! বাকি হাইড্রোজেন বাবুরা পাত্রের কোণায় বসে কান্নাকাটি জুড়ে দিলেও আর এক ফোঁটা পানি তৈরি হওয়ার জো নেই।
রসায়নের পণ্ডিতেরা তখন ফতোয়া দিলেন—যে বিক্রিয়কটি বিক্রিয়ায় অংশ নিয়ে সবার আগে ফুরিয়ে যায় এবং উৎপাদের পরিমাণ চিরদিনের মতো সীমিত করে দেয়, সে-ই হলো ‘লিমিটিং বিক্রিয়ক’। এ যেন সেই কলকাতার বনেদি বাড়ির বিয়েবাড়ির ভোজ! পোলাও-কোর্মা-কালিয়া সব মওজুদ আছে, কিন্তু পাত পেড়ে বসতেই দেখা গেল রসগোল্লা শেষ! ব্যস, রসগোল্লা ফুরানো মাত্রই ভোজবাড়ি বন্ধ। বাকি খাবারগুলো পড়ে পড়ে নষ্ট হবে, তবু ভোজ আর এগোবে না। এখানে ওই রসগোল্লাই হলো আসল লিমিটিং বিক্রিয়ক!
পরীক্ষার হলে বসে যখন স্টয়কিওমিট্রির (Stoichiometry) চক্করে পড়ে এই লিমিটিং বিক্রিয়ক খুঁজতে যাই—কোনটি আগে ফুরাবে, কার কত মোল বাকি থাকবে—তখন মগজের ঘিলু একদম কান্দাহারের বেদানা আর কাবুলের পেস্তার মতো চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে যায়। ঐকিক নিয়মের ডানে-বামে করতে করতে আমাদের পরীক্ষার সময়টাই সবার আগে ফুরিয়ে ‘লিমিটিং’ হয়ে দাঁড়ায়! খাতার পাতা তখনো ফাঁকা, অথচ ঘণ্টার ঢং ঢং আওয়াজে আমাদের মার্কস পাওয়ার আশা ওখানেই সাঙ্গ হয়ে যায়।
হে রসায়নের কারিগরগণ, কে আগে ফুরাল আর কার কতটুকু উদ্বৃত্ত রইল, তা নিয়ে মাথা না ঘামিয়ে যদি তোমরা শান্তিতে পেন্সিলভানিয়ার কফি হাউজে বসে চুরুট ফুঁকতে, তবে পরীক্ষার হলে আমাদের জীবনের এই নম্বরের খতিয়ান অন্তত এভাবে মাঝপথে ফুরিয়ে দেউলিয়া হয়ে যেত না!
১
১ মন্তব্য