রসায়নের বাজারে এই ‘রাসায়নিক বন্ধন’ চিজটি হলো একদম খাঁটি সমাজ-সংসারের বিয়েশাদির মতো কারবার! একা একা থাকা নাকি বড়ই কষ্টের, তাই পর্যায় সারণির মৌল বাবুরা সারাক্ষণ একজোড়া হওয়ার জন্য ছটফট করছেন। তাদের এই ছটফটানির মূল কারণ হলো অষ্টক (Octet) পূরণ করা—অর্থাৎ, শেষ ঘরে আটখানা ইলেকট্রন নিয়ে সমাজের বুকে মাথা উঁচু করে সুখে-শান্তিতে নিষ্ক্রিয় গ্যাসের মতো বাবু সেজে বসা। আর এই আট সংখ্যার চক্করে পড়েই রসায়নের দুনিয়ায় তিন কিসিমের ঘটকালি দেখতে পাওয়া যায়।
প্রথমটির পোশাকি নাম আয়নিক বন্ধন (Ionic Bond)। এ যেন সেই একদম রাজা-ফকিরের বিয়ে! একপক্ষে আছেন ক্ষার ধাতুর মতো দিলদরিয়া নবাব (যেমন সোডিয়াম), আর অন্যপক্ষে ওত পেতে আছে হ্যালোজেনের মতো লোভী সুন্দরী (যেমন ক্লোরিন)। নবাব বাবু নিজের পকেটের ইলেকট্রনটি এক্কেবারে দান করে দিয়ে ফকির সেজে যান, আর ক্লোরিন সুন্দরী সেই ইলেকট্রন টপ করে লুফে নিয়ে ধন্য হয়ে যান। ইলেকট্রন আদান-প্রদানের এই মহৎ ত্যাগের পর দুজনের মধ্যে যে তীব্র আকর্ষণের টান তৈরি হয়, তাতেই জন্ম নেয় নুন (NaCl)। এ যেন লাইলি-মজনুর সেই চিরন্তন প্রেম—এক পক্ষ উজার করে দেয়, অন্য পক্ষ দুহাত পেতে গ্রহণ করে!
দ্বিতীয় ঘটকালির নাম সমযোজী বন্ধন (Covalent Bond)। এখানে কোনো রাজা-ফকিরের বালাই নেই, এ হলো একদম আধুনিক জামানার ‘ফিফটি-ফিফটি শেয়ারিং’ বা মেসে থাকা দুই ছোকরার মেস-লাইফ! দুই বন্ধুই অধাতু, ইলেকট্রন ছাড়তে কেউই রাজি নয়। তখন তারা বুদ্ধি খাটিয়ে বলল, ‘ভাইরে, তোরও একটা দরকার, মোরও একটা দরকার; চল দুটো ইলেকট্রন মাঝখানে রেখে দুজনেই সমানভাবে ভোগ করি!’ হাইড্রোজেন আর অক্সিজেন মিলেমিশে এভাবেই মেসের ডাল-ভাতের মতো পানি (H₂O) বানিয়ে সংসার শুরু করে। তবে এখানেও প্যাঁচ আছে! কোনো কোনো মৌল আবার বড়ই ধূর্ত (তড়িৎ ঋণাত্মকতা যাদের বেশি)—তারা মাঝখানের ইলেকট্রন জোড়াকে নিজের দিকে একটু বেশি টেনে নিয়ে সংসারে অশান্তির পোলারায়ন (Polarization) ঘটায়। এ যেন সেই মেসের চালাক বন্ধু, যে তরকারির সব মাছের পেটি নিজে টেনে নিয়ে অন্যজনকে শুধু ঝোলটুকু দিয়ে সান্ত্বনা দেয়!
আর তিন নম্বর ইয়ারের নাম হলো সন্নিবেশ সমযোজী বন্ধন (Coordinate Bond)। এ হলো রসায়নের দুনিয়ার সবচেয়ে অদ্ভুত পরোপকার! এখানে বিয়ের রাজকীয় ভোজের সমস্ত খরচ মেটায় এক পক্ষ, আর অন্য পক্ষ শুধু পাত পেড়ে এসে গপাগপ গিলে খায়। অর্থাৎ, ইলেকট্রন জোড়া দেবে শুধু একজন, কিন্তু ভোগ করবে দুজনে মিলেই! এমন দাতা কর্ণ রসায়নের বাজারে খুব বেশি দেখা যায় না।
পরীক্ষার হলে বসে যখন এই আয়নিক, সমযোজী আর সন্নিবেশের গোলকধাঁধায় পড়ি—কার গলনাঙ্ক বেশি, কে পানিতে দ্রবীভূত হয় আর কার বন্ধন কোণ কত—তখন মগজের ঘিলু একদম কান্দাহারের বেদানা আর কাবুলের পেস্তার মতো চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে যায়। সিগমা বন্ধন আর পাই বন্ধনের জিলিপি মেলাতে মেলাতে আমাদের খাতার মার্কসগুলোও সমাজ-সংসার থেকে এক্কেবারে বিচ্ছিন্ন হয়ে বিদায় নেয়।
হে রাসায়নিক বন্ধনের ঘটকগণ, মৌলদের জোড়া লাগাতে গিয়ে তোমরা তো ল্যাবরেটরির খাতায় অমর হয়ে রইলে, আর আমরা এখানে পরীক্ষার হলে রসায়নের এই জটিল বন্ধনের চোটে একদম বেঘোরে মারা পড়লুম!
১৪
২৪ মন্তব্য