সহকারী অধ্যাপক
১৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ০৭:২৫ পূর্বাহ্ণ
খাদ্যের প্রতি দৃষ্টি ও কিয়ামতের দিনের চূড়ান্ত পরিণতি
খাদ্যের প্রতি দৃষ্টি ও কিয়ামতের দিনের চূড়ান্ত পরিণতি
(আল্লাহর নিয়ামতের কৃতজ্ঞতা, সৃষ্টির নিদর্শনে চিন্তা ও আখিরাতের প্রস্তুতির আহ্বান)
মোঃ মুজিবুর রহমান
সহকারী অধ্যাপক
মোজাদ্দেদীয়া ইসলামিয়া আলিম মাদ্রাসা, কালিয়াকৈর, গাজীপুর
মানুষ পৃথিবীতে বসবাস করে, প্রতিদিন খাদ্য গ্রহণ করে, পানি পান করে, ফলমূল ও শাক-সবজি খায়, পশু-পাখি লালন-পালন করে এবং নানা ধরনের প্রাকৃতিক সম্পদ ব্যবহার করে। কিন্তু মানুষ কি কখনো গভীরভাবে চিন্তা করে—এই খাদ্য কোথা থেকে আসে? কে আকাশ থেকে বৃষ্টি বর্ষণ করেন? কে মাটিকে বিদীর্ণ করে তার বুক থেকে শস্য, ফল ও উদ্ভিদ বের করে দেন? কে মানুষের জন্য খাদ্যের ব্যবস্থা করেন এবং কে তাকে জীবনধারণের শক্তি দান করেন?
আল-কুরআন মানুষকে শুধু খাদ্য গ্রহণ করতে বলে না; বরং খাদ্যের দিকে চিন্তাশীল দৃষ্টিতে তাকাতে আহ্বান জানায়। আল্লাহ তাআলা বলেন—
“কাজেই মানুষ তার খাদ্যের প্রতি লক্ষ্য করুক।”
—সূরা আবাসা
এরপর আল্লাহ তাআলা বৃষ্টি, ভূমি, শস্য, আঙ্গুর, শাক-সবজি, যায়তূন, খেজুর, ঘন বৃক্ষশোভিত বাগান, ফল ও তৃণলতার কথা উল্লেখ করেছেন। এসব নিদর্শন মানুষের সামনে আল্লাহর কুদরত, রবুবিয়্যাত ও অসীম অনুগ্রহের পরিচয় তুলে ধরে।
কিন্তু এই দুনিয়ার জীবনই মানুষের চূড়ান্ত গন্তব্য নয়। খাদ্য, সম্পদ, পরিবার, ঘরবাড়ি ও পার্থিব ব্যস্ততার পর একদিন মানুষকে ফিরে যেতে হবে তার রবের কাছে। সেই দিন হবে কিয়ামতের দিন—যেদিন মানুষ নিজের সবচেয়ে কাছের মানুষ থেকেও দূরে সরে যাবে। কারণ প্রত্যেক মানুষ নিজের হিসাব ও পরিণতি নিয়ে এতটাই ব্যস্ত থাকবে যে অন্যের কথা চিন্তা করার অবকাশ থাকবে না।
এই আয়াতগুলো তাই একদিকে আল্লাহর নিয়ামতের কথা স্মরণ করায়, অন্যদিকে আখিরাতের কঠিন জবাবদিহির জন্য প্রস্তুত হতে সতর্ক করে।
খাদ্যের প্রতি দৃষ্টি—শুধু ভোগ নয়, চিন্তার আহ্বান
মানুষের জীবন খাদ্যের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত। খাদ্য ছাড়া দেহ বাঁচে না। কিন্তু খাদ্য শুধু ক্ষুধা নিবারণের উপকরণ নয়; খাদ্য আল্লাহর অসংখ্য নিয়ামতের একটি দৃশ্যমান নিদর্শন।
আমরা যখন একটি ধানের শীষ হাতে নিই, তখন তার পেছনে লুকিয়ে থাকা বিশাল ব্যবস্থার কথা ভাবতে পারি। একটি বীজ মাটিতে পড়ে, পানি পায়, সূর্যের আলো পায়, বাতাসের সাহায্য পায়, অঙ্কুরিত হয়, বড় হয় এবং অবশেষে শস্যে পরিণত হয়। মানুষ চেষ্টা করে, জমি চাষ করে, বীজ বপন করে; কিন্তু বীজের ভেতর প্রাণের সঞ্চার করা এবং তার বৃদ্ধি ঘটানোর ক্ষমতা মানুষের হাতে নেই।
এ কারণেই কুরআন মানুষকে খাদ্যের প্রতি লক্ষ্য করতে বলেছে। অর্থাৎ খাদ্য গ্রহণের পাশাপাশি খাদ্যের উৎপত্তি, তার বৈচিত্র্য এবং এর পেছনে আল্লাহর কুদরত সম্পর্কে চিন্তা করা উচিত।
একজন মুমিনের দৃষ্টিতে একটি ফল কেবল একটি ফল নয়; এটি আল্লাহর নিয়ামতের নিদর্শন। এক গ্লাস পানি শুধু তৃষ্ণা নিবারণের বস্তু নয়; এটি আল্লাহর দয়া। এক মুঠো ভাত শুধু খাদ্য নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে মাটি, পানি, আলো, কৃষকের শ্রম এবং সর্বোপরি আল্লাহর অনুমতি ও অনুগ্রহ।
বৃষ্টির পানি—জীবনের রহমত
আল্লাহ তাআলা বলেন—
“নিশ্চয়ই আমি প্রচুর পরিমাণে পানি বর্ষণ করি।”
—সূরা আবাসা, ৮০:২৫
পানি পৃথিবীর জীবনের অন্যতম মৌলিক ভিত্তি। মানুষ, পশু-পাখি, গাছপালা—সবাই পানির ওপর নির্ভরশীল।
মেঘ জমে, বৃষ্টি নামে, নদী-নালা পূর্ণ হয়, পুকুর-জলাশয়ে পানি জমে, মাটির নিচে পানির স্তর সৃষ্টি হয় এবং সেই পানি মানুষের জীবনধারণে কাজে লাগে।
একটু চিন্তা করলেই বোঝা যায়, মানুষের শক্তি কত সীমিত। মানুষ পানি সংরক্ষণ করতে পারে, সেচ দিতে পারে, বাঁধ নির্মাণ করতে পারে; কিন্তু আকাশ থেকে বৃষ্টি নামানোর ক্ষমতা তার নেই।
তাই বৃষ্টি মানুষের জন্য আল্লাহর এক বিরাট নিদর্শন। বৃষ্টির পানি যখন শুকনো জমিকে সজীব করে তোলে, তখন তা আমাদের মনে করিয়ে দেয়—জীবন ও জীবিকার প্রকৃত নিয়ন্ত্রণ আল্লাহর হাতে।
যমীন বিদীর্ণ হয়ে বেরিয়ে আসে জীবনোপকরণ
আল্লাহ বলেন—
“তারপর যমীনকে যথাযথভাবে বিদীর্ণ করি।”
—সূরা আবাসা, ৮০:২৬
বৃষ্টির পানি মাটিতে পৌঁছানোর পর আল্লাহর হুকুমে সেই মৃতপ্রায় ভূমি জীবনের জন্য প্রস্তুত হয়। মাটির বুক চিরে অঙ্কুর বের হয়। অঙ্কুর ধীরে ধীরে গাছে পরিণত হয়। গাছে ফুল আসে, ফল আসে, শস্য উৎপন্ন হয়।
একটি ছোট বীজের মধ্যে একটি পূর্ণাঙ্গ গাছের সম্ভাবনা লুকিয়ে থাকে। মানুষের চোখে সেটি ছোট ও তুচ্ছ মনে হলেও আল্লাহর সৃষ্টিব্যবস্থায় তার রয়েছে বিস্ময়কর ভূমিকা।
এ থেকে মানুষের শিক্ষা হলো—আল্লাহর সৃষ্টির দিকে অবহেলার চোখে তাকানো উচিত নয়। প্রকৃতির প্রতিটি উপাদান মানুষকে তার স্রষ্টার কুদরত স্মরণ করাতে পারে।
শস্য—মানুষের জীবনের অন্যতম প্রধান অবলম্বন
আল্লাহ তাআলা বলেন—
“অতঃপর তাতে আমি উৎপন্ন করি শস্য…”
—সূরা আবাসা, ৮০:২৭
ধান, গম, যব, ভুট্টা, ডালসহ বিভিন্ন শস্য মানুষের খাদ্যের প্রধান উৎস। পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলে ভিন্ন ভিন্ন ধরনের শস্য উৎপন্ন হয়। কোথাও ধান প্রধান, কোথাও গম, কোথাও ভুট্টা।
এই বৈচিত্র্য আল্লাহর সৃষ্টিশক্তির পরিচয় বহন করে।
একজন কৃষক জমি প্রস্তুত করেন, বীজ বপন করেন, সেচ দেন, আগাছা পরিষ্কার করেন এবং ফসল সংগ্রহ করেন। কিন্তু ফলন নিশ্চিত করার চূড়ান্ত ক্ষমতা তার হাতে নেই। তাই মুমিন কৃষক নিজের শ্রমের পাশাপাশি আল্লাহর ওপর ভরসা করেন এবং তাঁর কাছে কল্যাণ প্রার্থনা করেন।
এখানে ইসলামের একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা রয়েছে—তাওয়াক্কুল মানে চেষ্টা ছেড়ে দেওয়া নয়; বরং যথাসাধ্য চেষ্টা করে ফলাফলের জন্য আল্লাহর ওপর নির্ভর করা।
আঙ্গুর, শাক-সবজি, যায়তূন ও খেজুর—নিয়ামতের বৈচিত্র্য
আল্লাহ বলেন—
“আঙ্গুর ও শাক-সবজি, যায়তূন ও খেজুর বন, ঘনবৃক্ষ শোভিত বাগ-বাগিচা, আর ফল ও তৃণগুল্ম।”
—সূরা আবাসা, ৮০:২৮–৩১
আল্লাহ মানুষের খাদ্যব্যবস্থাকে একঘেয়ে রাখেননি। তিনি দিয়েছেন নানা ধরনের ফল, শাক-সবজি, শস্য ও উদ্ভিদ।
আঙ্গুর মানুষের পরিচিত সুস্বাদু ফল। খেজুর মরুভূমির কঠিন পরিবেশেও মানুষের জন্য খাদ্যের ব্যবস্থা করে। যায়তূনও একটি গুরুত্বপূর্ণ ফল ও উদ্ভিদ। বিভিন্ন ধরনের শাক-সবজি মানুষের খাদ্যকে পুষ্টিকর ও বৈচিত্র্যময় করে।
এভাবে কুরআন মানুষের দৃষ্টি খাদ্য থেকে খাদ্যের স্রষ্টার দিকে ফিরিয়ে দেয়।
ফল ও তৃণ—মানুষ ও পশুর জীবনোপকরণ
আল্লাহ তাআলা বলেন—
“তোমাদের ও তোমাদের চতুষ্পদ জন্তুগুলোর জীবনোপকরণস্বরূপ।”
—সূরা আবাসা, ৮০:৩২
মানুষ শুধু নিজের খাদ্যের ওপর নির্ভরশীল নয়; গৃহপালিত ও অন্যান্য প্রাণীরও খাদ্যের প্রয়োজন রয়েছে। গবাদিপশুর জন্য ঘাস, তৃণ ও নানা ধরনের উদ্ভিদ প্রয়োজন।
আল্লাহ এমন একটি প্রাকৃতিক ব্যবস্থা সৃষ্টি করেছেন, যেখানে উদ্ভিদ মানুষ ও প্রাণী উভয়ের জীবনধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
এ থেকে বোঝা যায়, মানুষ পৃথিবীর সম্পদের মালিক হিসেবে স্বেচ্ছাচারী নয়; বরং তাকে আল্লাহর দেওয়া আমানতের দায়িত্বশীল ব্যবহারকারী হতে হবে।
তাই পরিবেশ নষ্ট করা, অকারণে গাছ কেটে ফেলা, পানি অপচয় করা, খাদ্য নষ্ট করা এবং প্রাণীর প্রতি নিষ্ঠুরতা দেখানো একজন সচেতন মুমিনের আচরণ হতে পারে না।
নিয়ামতের কৃতজ্ঞতা—মুমিনের চরিত্র
আল্লাহর দেওয়া খাদ্য গ্রহণ করার পর মানুষের কর্তব্য হলো কৃতজ্ঞ হওয়া। কৃতজ্ঞতা শুধু মুখে “আলহামদুলিল্লাহ” বলা নয়; বরং নিয়ামতকে আল্লাহর সন্তুষ্টির পথে ব্যবহার করাও কৃতজ্ঞতার অংশ।
খাদ্য অপচয় করা উচিত নয়। প্রয়োজনের অতিরিক্ত ভোগবিলাসে ডুবে যাওয়া উচিত নয়। দরিদ্র ও অভাবী মানুষের কথা মনে রাখা উচিত।
ইসলাম মানুষকে ভারসাম্যপূর্ণ জীবনযাপনের শিক্ষা দেয়। আল্লাহ বলেন—
“খাও ও পান করো, কিন্তু অপচয় করো না।”
—সূরা আল-আ‘রাফ, ৭:৩১
তাই একজন মুমিনের খাদ্যাভ্যাসে থাকবে বৈধতা, পরিমিতি, কৃতজ্ঞতা ও সংযম।
দুনিয়ার নিয়ামত চূড়ান্ত গন্তব্য নয়
খাদ্য, সম্পদ, পরিবার, ঘরবাড়ি, জমিজমা ও সামাজিক মর্যাদা—সবই দুনিয়ার জীবনের অংশ। এগুলোর প্রয়োজন আছে; কিন্তু এগুলোই মানুষের চূড়ান্ত সফলতার মাপকাঠি নয়।
মানুষ যত সম্পদ অর্জন করুক, একদিন তাকে পৃথিবী ছেড়ে যেতে হবে। যে খাবার আজ তার শক্তির উৎস, একদিন সেই খাবার তার জন্য কোনো উপকার করতে পারবে না। যে ঘরকে সে নিজের স্থায়ী ঠিকানা মনে করে, একদিন তাকে সেই ঘর ছেড়ে কবরের পথে যেতে হবে।
অতএব দুনিয়ার নিয়ামত ভোগ করতে হবে বৈধ পথে, কিন্তু হৃদয়ের চূড়ান্ত আসন দিতে হবে আল্লাহকে।
কিয়ামতের বিকট আওয়াজ
খাদ্য ও দুনিয়ার নিয়ামতের আলোচনা থেকে কুরআন হঠাৎ মানুষের দৃষ্টি আখিরাতের দিকে ফিরিয়ে দেয়—
“অতঃপর যখন বিকট আওয়াজ আসবে…”
—সূরা আবাসা, ৮০:৩৩
এটি কিয়ামতের ভয়াবহতার স্মরণ করিয়ে দেয়। সেই দিন দুনিয়ার পরিচিত নিয়ম-ব্যবস্থা ভেঙে যাবে। মানুষ বুঝতে পারবে, যে জীবনের পেছনে সে এত ব্যস্ত ছিল, সেটি আসলে ছিল পরীক্ষার সময়।
সেদিন সম্পদ, পদমর্যাদা, সামাজিক পরিচয়—কোনো কিছুই মানুষের প্রকৃত আশ্রয় হবে না।
কিয়ামতের দিন মানুষ নিজের আপনজন থেকেও দূরে থাকবে
আল্লাহ বলেন—
“সেদিন মানুষ পালিয়ে যাবে তার ভাই থেকে, তার মা ও তার বাবা থেকে, তার স্ত্রী ও তার সন্তান-সন্ততি থেকে।”
—সূরা আবাসা, ৮০:৩৪–৩৬
দুনিয়ায় মানুষ পরিবারকে ভালোবাসে। ভাই ভাইয়ের পাশে দাঁড়ায়, মা সন্তানের জন্য কষ্ট করেন, বাবা সন্তানের দায়িত্ব পালন করেন, স্বামী-স্ত্রী পরস্পরের সহযোগী হন। কিন্তু কিয়ামতের দিন পরিস্থিতি হবে সম্পূর্ণ ভিন্ন।
মানুষ নিজের হিসাব নিয়ে এতটাই উদ্বিগ্ন থাকবে যে আপনজনের দিকেও তাকানোর অবকাশ থাকবে না।
এখানে পরিবারের প্রতি ভালোবাসাকে অস্বীকার করা হয়নি; বরং কিয়ামতের ভয়াবহতা বোঝানো হয়েছে। দুনিয়ায় আত্মীয়তার সম্পর্ক যত ঘনিষ্ঠই হোক, আখিরাতে প্রত্যেক মানুষকে নিজের ঈমান, আমল ও জবাবদিহির মুখোমুখি হতে হবে।
“প্রত্যেকেরই গুরুতর অবস্থা থাকবে”
আল্লাহ বলেন—
“সেদিন তাদের প্রত্যেকেরই একটি গুরুতর অবস্থা থাকবে, যা তাকে ব্যতিব্যস্ত করে রাখবে।”
—সূরা আবাসা, ৮০:৩৭
মানুষের জীবনে অনেক সমস্যা আসে—অর্থনৈতিক সমস্যা, পারিবারিক সমস্যা, শারীরিক অসুস্থতা, সামাজিক সংকট ইত্যাদি। কিন্তু কিয়ামতের দিনের অবস্থা এসবের তুলনায় সম্পূর্ণ ভিন্ন।
সেদিন মানুষ জানতে পারবে তার দুনিয়ার জীবনের প্রকৃত ফলাফল। সে জানতে পারবে তার ঈমান কেমন ছিল, তার সালাত কেমন ছিল, সে কীভাবে মানুষের অধিকার রক্ষা করেছে, কীভাবে সম্পদ উপার্জন করেছে, কীভাবে সময় ব্যয় করেছে এবং কী আমল নিয়ে আল্লাহর সামনে উপস্থিত হয়েছে।
তাই আজকের সুযোগকে অবহেলা করা উচিত নয়।
কিছু মুখ হবে উজ্জ্বল ও প্রফুল্ল
আল্লাহ বলেন—
“সেদিন কিছু কিছু চেহারা উজ্জ্বল হবে, সহাস্য, প্রফুল্ল।”
—সূরা আবাসা, ৮০:৩৮–৩৯
এটি মুমিনদের জন্য আশাব্যঞ্জক দৃশ্য।
যারা দুনিয়ায় ঈমান এনেছে, আল্লাহর আনুগত্য করেছে, সালাত কায়েম করেছে, সৎকর্ম করেছে, তাওবা করেছে, মানুষের অধিকার রক্ষা করেছে এবং আল্লাহর সন্তুষ্টিকে জীবনের লক্ষ্য বানিয়েছে—তাদের জন্য আখিরাতে আনন্দ ও সম্মানের সুসংবাদ রয়েছে।
দুনিয়ার জীবনে হয়তো তারা নানা পরীক্ষার সম্মুখীন হয়েছে। কখনো দারিদ্র্য, কখনো কষ্ট, কখনো অপমান, কখনো অসুস্থতা বা বিপদের মধ্য দিয়ে গেছে। কিন্তু মুমিন জানে—দুনিয়ার জীবন ক্ষণস্থায়ী এবং আল্লাহর কাছে তার প্রতিটি ধৈর্য ও সৎকর্ম সংরক্ষিত রয়েছে।
কিছু মুখে থাকবে মলিনতা
অন্যদিকে আল্লাহ বলেন—
“আর কিছু কিছু চেহারার ওপর সেদিন থাকবে মলিনতা; কালিমা সেগুলোকে আচ্ছন্ন করবে।”
—সূরা আবাসা, ৮০:৪০–৪১
এরপর আল্লাহ বলেন—
“তারাই কাফির, পাপাচারী।”
—সূরা আবাসা, ৮০:৪২
এখানে কুরআন মানুষের সামনে কঠিন সতর্কবার্তা তুলে ধরেছে। যারা কুফরি ও অবাধ্যতার ওপর মৃত্যুবরণ করবে, তাদের পরিণতি ভয়াবহ।
এ কারণেই কুরআন মানুষকে দুনিয়াতেই সতর্ক করে। মৃত্যুর পর আর ফিরে এসে আমল সংশোধনের সুযোগ থাকবে না।
তাওবার দরজা এখনো খোলা
কিয়ামতের এই ভয়াবহ বিবরণ শুধু ভয় দেখানোর জন্য নয়; বরং মানুষকে সংশোধনের সুযোগ দেওয়ার জন্যও।
মানুষ ভুল করতে পারে। আদমসন্তান হিসেবে মানুষ পাপ থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত নয়। কিন্তু মুমিনের বৈশিষ্ট্য হলো—সে ভুলের ওপর অটল থাকে না; বরং নিজের ভুল বুঝতে পারে, লজ্জিত হয়, আল্লাহর কাছে ক্ষমা চায় এবং সংশোধনের চেষ্টা করে।
তাই জীবিত থাকা অবস্থায় তাওবা করতে হবে। গুনাহ ছেড়ে দিতে হবে। মানুষের অধিকার নষ্ট করে থাকলে তা ফিরিয়ে দিতে হবে। অন্যায় সম্পদ থাকলে তা থেকে মুক্ত হতে হবে। কারও প্রতি জুলুম করে থাকলে যথাসাধ্য সংশোধন করতে হবে।
কারণ আখিরাতের সফলতার প্রস্তুতি শুরু করার শ্রেষ্ঠ সময় হলো—এখনই।
খাদ্য থেকে কিয়ামত—কুরআনের গভীর শিক্ষা
সূরা আবাসার এই আয়াতগুলোর একটি অসাধারণ শিক্ষণীয় দিক হলো—আল্লাহ প্রথমে মানুষের খাদ্যের কথা বলেছেন, তারপর কিয়ামতের কথা স্মরণ করিয়েছেন।
এর মাধ্যমে মানুষকে বোঝানো হয়েছে—
আজ তুমি খাদ্য গ্রহণ করছ; কাল তোমাকে হিসাব দিতে হবে।
আজ তুমি পানি পান করছ; কাল তোমার আমলের হিসাব হবে।
আজ তুমি পরিবার নিয়ে ব্যস্ত; কাল প্রত্যেকেই নিজের চিন্তায় ব্যস্ত থাকবে।
আজ তুমি দুনিয়ার সম্পদ সংগ্রহ করছ; কাল তোমার সঙ্গে থাকবে তোমার আমল।
তাই দুনিয়ার প্রয়োজন পূরণ করতে হবে, কিন্তু আখিরাতকে ভুলে গেলে চলবে না।
সময়ের মূল্য ও আখিরাতের প্রস্তুতি
মানুষের সবচেয়ে বড় সম্পদ তার সময়। হারানো অর্থ অনেক সময় পুনরায় অর্জন করা যায়; কিন্তু হারানো সময় কখনো ফিরে আসে না।
তাই প্রতিদিন নিজেকে প্রশ্ন করা প্রয়োজন—
আমি আজ কী শিখলাম?
কী ভালো কাজ করলাম?
কোন গুনাহ থেকে বেঁচে থাকলাম?
কাউকে কষ্ট দিলাম কি না?
কারও অধিকার নষ্ট করলাম কি না?
আমার সালাত কেমন হলো?
আমি কি আল্লাহকে স্মরণ করেছি?
আমি কি তাওবা ও ইস্তিগফার করেছি?
এই আত্মজিজ্ঞাসা মানুষকে আখিরাতের জন্য প্রস্তুত হতে সাহায্য করে।
পরিবার—ভালোবাসার পাশাপাশি আখিরাতের সহযোগী
কিয়ামতের দিন মানুষ পরিবার থেকে পালিয়ে যাবে—এই আয়াতের অর্থ এই নয় যে দুনিয়ায় পরিবারের প্রতি দায়িত্ব শেষ হয়ে যাবে। বরং দুনিয়ায় পরিবারকে ঈমান, নৈতিকতা ও সৎকর্মের পথে সহযোগিতা করা আরও গুরুত্বপূর্ণ।
পিতা-মাতার সম্মান, স্বামী-স্ত্রীর পারস্পরিক অধিকার, সন্তানের সঠিক শিক্ষা, আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা—এসব ইসলামের গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা।
পরিবারকে শুধু দুনিয়ার আরাম দেওয়াই যথেষ্ট নয়; বরং তাদের ঈমান ও চরিত্র গঠনে সহযোগিতা করাও দায়িত্বের অংশ।
খাদ্যের অপচয় নয়, কৃতজ্ঞতা ও দায়িত্বশীলতা
আল্লাহ যে খাদ্য দিয়েছেন, তার অপচয় করা উচিত নয়। পৃথিবীতে এমন মানুষ আছে যারা একবেলা খাবারের জন্য সংগ্রাম করে। তাই আমাদের উচিত খাদ্যের প্রতি সম্মান দেখানো, প্রয়োজন অনুযায়ী গ্রহণ করা এবং অপচয় থেকে বেঁচে থাকা।
একজন মুমিন জানে—খাদ্য আল্লাহর নিয়ামত। তাই সে খাদ্যের অপচয় করে না, অহংকার করে না এবং অন্যের অভাবকে উপহাস করে না।
বরং সামর্থ্য অনুযায়ী অভাবী মানুষকে সাহায্য করে।
সৃষ্টির প্রতি দায়িত্বশীল আচরণ
আল্লাহ মানুষের জন্য পৃথিবীর বহু সম্পদ সৃষ্টি করেছেন। কিন্তু সম্পদ ব্যবহার করার অর্থ ধ্বংস করা নয়।
গাছপালা, পানি, মাটি, প্রাণী ও পরিবেশ—সবকিছুর প্রতি দায়িত্বশীল হতে হবে। নদী-খাল দূষিত করা, অকারণে গাছ কাটা, পানি নষ্ট করা, প্রাণীর প্রতি নিষ্ঠুর হওয়া এবং প্রকৃতির ভারসাম্য নষ্ট করা থেকে বিরত থাকতে হবে।
আল্লাহর সৃষ্টি নিয়ে চিন্তা করা যেমন ইবাদতমূলক শিক্ষা দেয়, তেমনি সৃষ্টির প্রতি দায়িত্বশীল আচরণও একজন মানুষের নৈতিক দায়িত্ব।
সফলতার প্রকৃত সংজ্ঞা
দুনিয়ার মানুষ অনেক সময় সফলতা বলতে সম্পদ, বাড়ি, গাড়ি, পদ, ব্যবসা বা সামাজিক মর্যাদাকে বোঝে। কিন্তু কুরআনের শিক্ষা হলো—প্রকৃত সফলতা আখিরাতের সফলতা।
যে মানুষ দুনিয়ায় সম্পদ পেয়েও আল্লাহকে ভুলে যায়, সে প্রকৃত সফল নয়। আর যে মানুষ সীমিত সম্পদের মধ্যেও ঈমান, তাকওয়া, সৎকর্ম, সততা ও আল্লাহর আনুগত্য ধরে রাখে, তার জীবনই প্রকৃত সফলতার পথে।
সফল সেই ব্যক্তি, যার দুনিয়ার জীবন তাকে আখিরাতের জন্য প্রস্তুত করে।
আমাদের করণীয়
সূরা আবাসা ৮০:২৪–৪২-এর আলোকে আমাদের জীবনে কয়েকটি বিষয় বিশেষভাবে গ্রহণ করা উচিত—
১. খাদ্যের প্রতি চিন্তাশীল হওয়া।
২. আল্লাহর নিয়ামতের জন্য কৃতজ্ঞ হওয়া।
৩. খাদ্য ও পানি অপচয় না করা।
৪. হালাল খাদ্য গ্রহণ করা।
৫. প্রকৃতি ও পরিবেশের প্রতি দায়িত্বশীল হওয়া।
৬. আল্লাহর কুদরত নিয়ে চিন্তা করা।
৭. দুনিয়ার জীবনকে চূড়ান্ত গন্তব্য মনে না করা।
৮. কিয়ামতের দিনের জবাবদিহি স্মরণ করা।
৯. সালাত, তাওবা, ইস্তিগফার ও সৎকর্মে যত্নবান হওয়া।
১০. মানুষের অধিকার সংরক্ষণ করা।
১১. পরিবারের প্রতি দায়িত্বশীল হওয়া।
১২. গুনাহ থেকে বেঁচে থাকা এবং ভুল হলে দ্রুত তাওবা করা।
১৩. আল্লাহর রহমতের আশা রাখা এবং তাঁর শাস্তিকে ভয় করা।
১৪. মৃত্যুর আগে আখিরাতের জন্য প্রস্তুতি নেওয়া।
উপসংহার
সূরা আবাসার এই আয়াতগুলো মানুষের সামনে এক বিস্ময়কর জীবনচিত্র তুলে ধরে। একদিকে রয়েছে খাদ্য, পানি, মাটি, শস্য, ফল, তৃণলতা ও প্রাণীর জীবনোপকরণ—অন্যদিকে রয়েছে কিয়ামতের ভয়াবহ দিন, যখন মানুষ নিজের ভাই, মা-বাবা, স্ত্রী ও সন্তান থেকেও দূরে সরে যাবে।
এই দুই দৃশ্যের মধ্যে রয়েছে মানুষের জন্য গভীর শিক্ষা।
আজ আল্লাহ আমাদের খাদ্য দিয়েছেন—তাই কৃতজ্ঞ হই।
আজ পানি দিয়েছেন—তাই অপচয় না করি।
আজ পরিবার দিয়েছেন—তাই তাদের অধিকার আদায় করি।
আজ সময় দিয়েছেন—তাই সৎকর্মে ব্যয় করি।
আজ তাওবার সুযোগ দিয়েছেন—তাই দেরি না করি।
আজ কুরআন দিয়েছেন—তাই তার নির্দেশনা অনুসরণ করি।
কারণ একদিন সেই দিন আসবে, যেদিন পৃথিবীর সব ব্যস্ততা থেমে যাবে। মানুষ নিজের আমলের ফলাফলের মুখোমুখি হবে। সেদিন কারও মুখ হবে উজ্জ্বল, প্রফুল্ল ও আনন্দময়; আবার কারও মুখ হবে মলিন ও লাঞ্ছিত।
তাই আমাদের প্রত্যেকের উচিত দুনিয়ার নিয়ামত গ্রহণের সময় নিয়ামতদাতাকে স্মরণ করা এবং দুনিয়ার জীবনযাপনের পাশাপাশি আখিরাতের স্থায়ী জীবনের জন্য প্রস্তুতি নেওয়া।
হে আল্লাহ! আমাদের হালাল রিজিক দান করুন, আপনার নিয়ামতের কৃতজ্ঞতা আদায় করার তাওফিক দিন। আমাদের অপচয়, অহংকার, অবাধ্যতা ও গুনাহ থেকে রক্ষা করুন। আমাদের ঈমানকে দৃঢ় করুন, তাওবা কবুল করুন, সৎকর্মের তাওফিক দিন এবং কিয়ামতের দিন আমাদের চেহারা উজ্জ্বল, প্রফুল্ল ও সম্মানিত করুন। আমাদের পরিবার-পরিজনসহ সবাইকে আপনার আনুগত্যের পথে পরিচালিত করুন।
হে আমাদের রব! দুনিয়ার নিয়ামতকে যেন আখিরাতের সফলতার পথে কাজে লাগাতে পারি—সে তাওফিক দাও।
আমিন।
(সূরা আবাসা২৪-৪২ এর আলোকে)
১৪
২৪ মন্তব্য