Loading..

ব্লগ

রিসেট

১৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ০৭:৩১ পূর্বাহ্ণ

কিয়ামতের মহাদৃশ্য ও মানবজীবনের জবাবদিহি

কিয়ামতের মহাদৃশ্য মানবজীবনের জবাবদিহি

 ( সূরা আত-তাকভীরের আলোকে আখিরাতের প্রস্তুতি, ওহির সত্যতা সরল পথের আহ্বান)

মোঃ মুজিবুর রহমান
সহকারী অধ্যাপক
মোজাদ্দেদীয়া ইসলামিয়া আলিম মাদ্রাসা, কালিয়াকৈর, গাজীপুর

মানুষ পৃথিবীতে আসে, কিছুদিন জীবনযাপন করে এবং একদিন মৃত্যুর মাধ্যমে দুনিয়ার জীবন শেষ করে। কিন্তু ইসলামের দৃষ্টিতে মৃত্যু কোনো চূড়ান্ত সমাপ্তি নয়; বরং এটি আখিরাতের জীবনের সূচনা। দুনিয়ার জীবন হলো পরীক্ষা, আর আখিরাত হলো সেই পরীক্ষার ফল লাভের চূড়ান্ত পরিণতির স্থান। মানুষ যা বিশ্বাস করে, যা বলে, যা করে এবং যা গোপনে প্রকাশ্যে সম্পাদন করেসবকিছুর হিসাব একদিন তাকে দিতে হবে।

সূরা আত-তাকভীর কুরআনের এমন একটি শক্তিশালী সূরা, যেখানে কিয়ামতের ভয়াবহ পরিবর্তন, মানুষের আমলনামা প্রকাশ, নির্যাতিত শিশুকন্যার ন্যায়বিচারের প্রশ্ন, জান্নাত জাহান্নামের বাস্তবতা, ওহির সত্যতা এবং সোজা পথে চলার আহ্বান অত্যন্ত হৃদয়স্পর্শী ভাষায় তুলে ধরা হয়েছে। সূরার শুরুতেই একের পর এক মহাজাগতিক বিপর্যয়ের চিত্র অঙ্কিত হয়েছে। সূর্য গুটিয়ে যাবে, নক্ষত্ররাজি ঝরে পড়বে, পাহাড় চলমান হয়ে যাবে, সমুদ্র উত্তাল হয়ে উঠবে, আকাশের বর্তমান ব্যবস্থা পরিবর্তিত হবে। এরপর মানুষের সামনে তার কর্মের প্রকৃত পরিণতি প্রকাশিত হবে।

এই সূরা মানুষকে যেন প্রশ্ন করেযে দিন এত ভয়াবহভাবে আসবে, সে দিনের জন্য তুমি কী প্রস্তুতি নিয়েছ?

কিয়ামতঅবধারিত সত্য

কিয়ামত ইসলামী আকিদার মৌলিক বিষয়গুলোর অন্তর্ভুক্ত। প্রত্যেক মুসলিমের বিশ্বাস হলোআল্লাহ তাআলা একদিন সমগ্র সৃষ্টিজগতের বর্তমান ব্যবস্থা পরিবর্তন করে কিয়ামত সংঘটিত করবেন। পৃথিবীর জীবন শেষ হবে এবং মানুষ পুনরুত্থিত হয়ে আল্লাহর সামনে উপস্থিত হবে।

সূরা আত-তাকভীরের প্রথম কয়েকটি আয়াতেই কিয়ামতের সেই মহাদৃশ্য তুলে ধরা হয়েছে

যখন সূর্য গুটিয়ে নেওয়া হবে,
যখন নক্ষত্ররাজি খসে পড়বে,
যখন পর্বতমালা গতিশীল করা হবে...

দুনিয়ার মানুষ সূর্যকে প্রতিদিন দেখে। সূর্যের আলোয় পৃথিবী আলোকিত হয়, জীবজগৎ তার ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু যে সূর্যকে মানুষ এত শক্তিশালী মনে করে, আল্লাহর নির্দেশে একদিন তার বর্তমান ব্যবস্থা গুটিয়ে যাবে। নক্ষত্ররাজির যে শৃঙ্খলা মানুষকে মুগ্ধ করে, তাও পরিবর্তিত হবে। যে পর্বতমালাকে মানুষ অটল স্থির মনে করে, সেগুলোও আল্লাহর নির্দেশে নড়াচড়া করবে।

এতে মানুষের জন্য গভীর শিক্ষা রয়েছে। মানুষ তার শক্তি, সম্পদ, প্রযুক্তি, প্রাসাদ, ক্ষমতা জ্ঞান নিয়ে যতই অহংকার করুক না কেন, আল্লাহর সৃষ্টি বিধানের সামনে সে অত্যন্ত দুর্বল। অতএব মানুষের উচিত নিজের সীমাবদ্ধতা উপলব্ধি করা এবং সৃষ্টিকর্তার প্রতি বিনয়ী হওয়া।

দুনিয়ার প্রিয় সম্পদও কিয়ামতের দিন মূল্যহীন

সূরাটিতে বলা হয়েছে

যখন দশ মাসের গর্ভবতী উটনীগুলো পরিত্যক্ত হবে।

আরব সমাজে গর্ভবতী উট ছিল অত্যন্ত মূল্যবান সম্পদ। এমন উটকে মানুষ অত্যন্ত যত্নে রাখত। কিন্তু কিয়ামতের ভয়াবহতায় মানুষের এমন প্রিয় সম্পদের প্রতিও মনোযোগ থাকবে না।

এর মাধ্যমে বোঝানো হয়েছেযে সম্পদকে মানুষ দুনিয়ায় সবচেয়ে মূল্যবান মনে করে, কিয়ামতের ভয়াবহতার সামনে তা একেবারেই তুচ্ছ হয়ে যাবে।

আজ মানুষ অর্থের জন্য সম্পর্ক নষ্ট করে, সম্পদের জন্য অন্যের অধিকার হরণ করে, পদ-পদবির জন্য প্রতিযোগিতা করে, কখনো প্রতারণা করে, কখনো জুলুম করে। অথচ মৃত্যুর পর এসব সম্পদ সঙ্গে যাবে না। সঙ্গে যাবে কেবল ঈমান আমল।

তাই সম্পদ অর্জন করা ইসলামে নিষিদ্ধ নয়; বরং হালাল উপায়ে উপার্জন করা প্রশংসনীয়। কিন্তু সম্পদ যেন মানুষের হৃদয়ের মালিক হয়ে না যায়। সম্পদ হাতে থাকবে, হৃদয়ে নয়এই ভারসাম্যই মুমিনের কাম্য।

প্রাণিজগতের সমাবেশ মহাবিপর্যয়

আল্লাহ বলেন

যখন বন্য পশুগুলোকে একত্র করা হবে এবং যখন সমুদ্রগুলোকে উত্তাল করা হবে।

পৃথিবীর স্বাভাবিক পরিবেশ কিয়ামতের দিন আর স্বাভাবিক থাকবে না। যে প্রাণীরা সাধারণত মানুষের কাছ থেকে দূরে থাকে, তারাও একত্রিত হবে। সমুদ্রের শান্ত পরিচিত রূপ পরিবর্তিত হবে।

দৃশ্য মানুষের মনে একটি সত্য প্রতিষ্ঠিত করেপৃথিবী চিরস্থায়ী নয়।

মানুষ পৃথিবীকে নিজের স্থায়ী আবাস মনে করে বসে থাকে। অথচ কুরআন মানুষকে বারবার স্মরণ করিয়ে দেয় যে দুনিয়ার জীবন ক্ষণস্থায়ী এবং আখিরাতই স্থায়ী জীবন।

কন্যাশিশু হত্যাঅন্ধকার যুগের নির্মমতার বিচার

সূরা আত-তাকভীরের অন্যতম হৃদয়বিদারক আয়াত হলো

যখন জীবন্ত প্রোথিত কন্যাকে জিজ্ঞেস করা হবেকোন অপরাধে তাকে হত্যা করা হয়েছিল?”

ইসলামের আগমনের পূর্বে আরবের জাহেলি সমাজে কোনো কোনো ব্যক্তি কন্যাসন্তান জন্মকে অপমান মনে করে জীবন্ত কন্যাশিশুকে মাটিতে পুঁতে হত্যা করত। ইসলাম এই জঘন্য অপরাধের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান গ্রহণ করেছে।

কিয়ামতের দিন সেই নিরপরাধ শিশুকে প্রশ্ন করা হবে না তার অপরাধ কী ছিল; বরং অপরাধীদের অপরাধ প্রকাশ করার জন্য তাকে প্রশ্ন করা হবেকোন অপরাধে তাকে হত্যা করা হয়েছিল?

এখানে ইসলামের ন্যায়বিচারের এক অসাধারণ শিক্ষা রয়েছে। নিরপরাধের অধিকার নষ্ট হবে না। দুর্বল মানুষের কান্না হারিয়ে যাবে না। পৃথিবীতে কোনো অন্যায় যদি মানুষের চোখ এড়িয়ে যায়, আল্লাহর জ্ঞানের বাইরে তা কখনো যায় না।

শিক্ষা শুধু কন্যাশিশুর ক্ষেত্রেই নয়; বরং প্রতিটি নিরপরাধ মানুষের অধিকার রক্ষার শিক্ষা দেয়। শিশু, নারী, বৃদ্ধ, দরিদ্র, অসহায়, শ্রমিক কিংবা অধীনস্থকেউ যেন অন্যায়ের শিকার না হয়, বিষয়ে একজন মুমিনকে সতর্ক থাকতে হবে।

আমলনামামানুষের কর্মের পূর্ণ হিসাব

এরপর বলা হয়েছে

যখন আমলনামা উন্মুক্ত করা হবে।

এটি কিয়ামতের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দৃশ্যগুলোর একটি। দুনিয়ায় মানুষ অনেক কাজ গোপনে করে। কোনো কাজ মানুষের কাছ থেকে লুকানো যায়, কিন্তু আল্লাহর কাছ থেকে কিছুই লুকানো যায় না।

মানুষের কথা, কাজ, নিয়ত এবং দায়িত্বের হিসাব আল্লাহর কাছে সংরক্ষিত। কিয়ামতের দিন মানুষের কর্ম তার সামনে উপস্থিত হবে।

এই বিশ্বাস মানুষের চরিত্রকে বদলে দিতে পারে।

যে ব্যক্তি বিশ্বাস করে তার প্রতিটি কাজের হিসাব হবে, সে অন্যায় করতে ভয় পাবে। সে মানুষের অনুপস্থিতিতেও সতর্ক থাকবে। সে গোপনে পাপ করার আগে ভাববেমানুষ না দেখলেও আমার রব তো দেখছেন।

এই চেতনার নাম তাকওয়া।

জাহান্নাম প্রজ্জ্বলিত হবে, জান্নাত নিকটবর্তী হবে

সূরাটিতে বলা হয়েছে

যখন জাহান্নামকে প্রজ্জ্বলিত করা হবে এবং যখন জান্নাতকে নিকটবর্তী করা হবে, তখন প্রত্যেকে জানতে পারবে সে কী উপস্থিত করেছে।

এখানে মানুষের সামনে দুটি চূড়ান্ত পরিণতি তুলে ধরা হয়েছেজান্নাত জাহান্নাম।

জান্নাত আল্লাহর পক্ষ থেকে মুমিনদের জন্য চিরস্থায়ী পুরস্কারের স্থান। আর জাহান্নাম অবাধ্যতা কুফরের জন্য ভয়াবহ শাস্তির স্থান। ইসলামী আকিদায় উভয়ই সত্য।

কিয়ামতের দিন মানুষ বুঝতে পারবেদুনিয়ায় সে আসলে কী অর্জন করেছে।

আজ মানুষ বলে—“আমি অনেক সম্পদ করেছি।

কিন্তু কিয়ামতের প্রশ্ন হবেতুমি কী আমল করেছ?

আজ মানুষ বলে—“আমি অনেক পরিচিতি অর্জন করেছি।

কিন্তু সেদিন মূল্য পাবে না খ্যাতি; মূল্য পাবে ঈমান নেক আমল।

আজ মানুষ বলে—“আমি অনেক বড় পদে ছিলাম।

কিন্তু সেদিন পদ নয়, তাকওয়া আমল মানুষের মর্যাদার কারণ হবে।

মানুষ যা আগে পাঠাবে, তাই সামনে পাবে

সূরাটির অত্যন্ত গভীর শিক্ষা হলো

তখন প্রত্যেকে জানতে পারবে সে কী উপস্থিত করেছে।

মানুষ দুনিয়ায় প্রতিদিন নিজের আখিরাতের জন্য কিছু না কিছু পাঠাচ্ছে। কেউ সালাত পাঠাচ্ছে, কেউ সদকা পাঠাচ্ছে, কেউ জ্ঞান উপকারের কাজ পাঠাচ্ছে; আবার কেউ গুনাহ, জুলুম, প্রতারণা অবাধ্যতার বোঝা পাঠাচ্ছে।

অতএব আখিরাতের সফলতা হঠাৎ করে তৈরি হবে না। আজকের কাজই আগামী দিনের ফল তৈরি করবে।

একটি বীজ যেমন ভবিষ্যতে বৃক্ষে পরিণত হয়, তেমনি মানুষের কাজও একদিন তার সামনে ফলাফল হিসেবে উপস্থিত হবে।

তাই বুদ্ধিমান মানুষ ভবিষ্যতের জন্য প্রস্তুতি নেয়। দুনিয়ার ভবিষ্যতের জন্য মানুষ ঘর তৈরি করে, সঞ্চয় করে, সন্তানকে শিক্ষিত করে, ব্যবসা গড়ে। অথচ চিরস্থায়ী আখিরাতের জন্য প্রস্তুতি না নেওয়া সবচেয়ে বড় অবহেলা।

আল্লাহর সৃষ্টির নিদর্শন শপথ

সূরার পরবর্তী অংশে আল্লাহ রাত, সকাল এবং নক্ষত্রের প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন। এর উদ্দেশ্য মানুষকে সৃষ্টিজগতের নিদর্শন নিয়ে চিন্তা করতে উদ্বুদ্ধ করা।

রাত আসে, আবার বিদায় নেয়। অন্ধকারের পর সকাল আসে। নক্ষত্রগুলো নির্দিষ্ট নিয়মে চলাচল করে। এই মহাবিশ্বের শৃঙ্খলা কোনো অর্থহীন বিশৃঙ্খলা নয়।

মানুষ যদি চিন্তা করে, তবে এই সৃষ্টিজগত তাকে স্রষ্টার মহত্ত্বের দিকে নিয়ে যাবে।

কুরআনের দৃষ্টিতে প্রকৃতি শুধু সৌন্দর্যের বিষয় নয়; এটি আল্লাহর কুদরতের নিদর্শন।

জিবরাইল (.)আল্লাহর সম্মানিত ওহিবাহক

সূরা আত-তাকভীরে বলা হয়েছে

নিশ্চয় এটি এক সম্মানিত বাণীবাহকের আনীত বার্তা।

এখানে ওহি বহনকারী ফেরেশতা জিবরাইল (.)-এর মর্যাদা গুণাবলি উল্লেখ করা হয়েছে। তিনি শক্তিশালী, আরশের মালিক আল্লাহর কাছে মর্যাদাবান এবং বিশ্বস্ত।

এতে কুরআনের উৎ ওহি হওয়ার বিষয়টি সুস্পষ্ট হয়। কুরআন কোনো মানুষের রচিত গ্রন্থ নয়। এটি আল্লাহর কালাম, যা জিবরাইল (.)-এর মাধ্যমে রাসুলুল্লাহ -এর কাছে পৌঁছেছে।

অতএব কুরআনের প্রতি মুমিনের সম্পর্ক শুধু পাঠের সম্পর্ক নয়; বরং বিশ্বাস, সম্মান, আনুগত্য জীবন পরিচালনার সম্পর্ক।

রাসুলুল্লাহ কোনো উন্মাদ নন

সূরাটিতে মক্কার কাফিরদের অপবাদ প্রত্যাখ্যান করে বলা হয়েছে

তোমাদের সঙ্গী উন্মাদ নন।

রাসুলুল্লাহ ছিলেন সত্যবাদী, আমানতদার বিশ্বস্ত। নবুয়তের পূর্বেও মক্কার মানুষ তাঁকে বিশ্বাসযোগ্য ব্যক্তি হিসেবে জানত। অথচ যখন তিনি আল্লাহর বার্তা প্রচার করলেন, বিরোধীরা তাঁকে নানা অপবাদ দিতে শুরু করল।

কুরআন স্পষ্ট করে দিলমুহাম্মদ আল্লাহর রাসুল এবং তাঁর কাছে আগত ওহি সত্য।

মুমিনের জন্য রাসুলুল্লাহ -এর প্রতি ঈমান, তাঁর আনুগত্য এবং তাঁর সুন্নাহ অনুসরণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাঁর জীবন কুরআনের বাস্তব প্রয়োগের সর্বোত্তম দৃষ্টান্ত।

স্পষ্ট দিগন্তে জিবরাইল (.)-কে দেখা

সূরাটিতে বলা হয়েছে

নিশ্চিতভাবেই সে তাকে স্পষ্ট দিগন্তে দেখেছে।

এখানে রাসুলুল্লাহ -এর ওহি গ্রহণের সত্যতা তাঁর প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতার একটি দিক তুলে ধরা হয়েছে। তিনি জিবরাইল (.)-কে তাঁর প্রকৃত ফেরেশতাসুলভ রূপে দেখেছেন বিষয়টি সহিহ হাদিসের বর্ণনাতেও এসেছে।

এতে বোঝা যায়, রাসুলুল্লাহ -এর কাছে ওহি ছিল কোনো কল্পনা, স্বপ্ন বা মানসিক বিভ্রম নয়; বরং আল্লাহর পক্ষ থেকে আগত সত্য ওহি।

কুরআন শয়তানের কথা নয়

সূরাটিতে দৃঢ়ভাবে ঘোষণা করা হয়েছে

এটি কোনো বিতাড়িত শয়তানের কথা নয়।

কুরআনের বাণী শয়তানের প্ররোচনা নয়। বরং এটি আল্লাহর পক্ষ থেকে নাজিলকৃত হিদায়াত।

শয়তান মানুষকে কুফর, শিরক, পাপ, অন্যায় অবাধ্যতার দিকে আহ্বান করে। আর কুরআন মানুষকে তাওহিদ, ঈমান, তাকওয়া, ন্যায়বিচার, সত্যবাদিতা, সৎকর্ম এবং আল্লাহর আনুগত্যের দিকে আহ্বান করে।

অতএব কুরআনের পথ শয়তানের পথ পরস্পর বিপরীত।

সুতরাং তোমরা কোথায় চলেছ?”

সূরার সবচেয়ে শক্তিশালী প্রশ্নগুলোর একটি

সুতরাং তোমরা কোথায় চলেছ?”

এটি যেন সমগ্র মানবজাতির প্রতি এক গভীর আত্মজিজ্ঞাসা।

মানুষের কাছে জ্ঞান আছেকিন্তু সে কোথায় যাচ্ছে?

তার কাছে অর্থ আছেকিন্তু সে কোথায় যাচ্ছে?

তার হাতে প্রযুক্তি আছেকিন্তু সে কোথায় যাচ্ছে?

সে ভবিষ্যতের পরিকল্পনা করছেকিন্তু আখিরাতের জন্য কী পরিকল্পনা করছে?

জীবনের ব্যস্ততায় মানুষ কখনো কখনো ভুলে যায় তার গন্তব্য কোথায়। অথচ প্রতিটি দিন তাকে মৃত্যুর দিকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে।

তাই কুরআনের এই প্রশ্ন আমাদের প্রতিদিন নিজেকে করতে হবে

আমি কোথায় চলেছি?

আমার পথ কি আল্লাহর সন্তুষ্টির পথে?

আমার উপার্জন কি হালাল?

আমার কথা কি সত্য?

আমার আচরণ কি ন্যায়সঙ্গত?

আমার পরিবার কি আমার আচরণে নিরাপদ?

আমার প্রতিবেশী কি আমার কাছ থেকে নিরাপদ?

আমার অন্তর কি অহংকার, হিংসা বিদ্বেষ থেকে মুক্ত?

আমার সালাত, তাওবা, ইস্তিগফার নেক আমল কি আমাকে আখিরাতের জন্য প্রস্তুত করছে?

কুরআন সমগ্র মানবজাতির জন্য উপদেশ

আল্লাহ বলেন

এটি তো বিশ্ববাসীর জন্য এক উপদেশ মাত্র।

কুরআন কোনো নির্দিষ্ট শ্রেণি, জাতি বা অঞ্চলের জন্য সীমাবদ্ধ নয়। এটি সমগ্র মানবজাতির জন্য হিদায়াতের বার্তা।

কুরআন মানুষের বিশ্বাস সংশোধন করে, চিন্তা শুদ্ধ করে, চরিত্র গঠন করে এবং জীবন পরিচালনার সঠিক পথ দেখায়।

কুরআন মানুষকে শেখায়

তাওহিদ গ্রহণ করতে,
শিরক বর্জন করতে,
সত্যকে গ্রহণ করতে,
মিথ্যা পরিহার করতে,
ইনসাফ করতে,
জুলুম থেকে দূরে থাকতে,
পিতা-মাতার সঙ্গে সদাচরণ করতে,
অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়াতে,
হালাল উপার্জন করতে,
অন্যের অধিকার রক্ষা করতে এবং
আখিরাতের জন্য প্রস্তুতি নিতে।

সরল পথে চলার ইচ্ছা

সূরাটিতে বলা হয়েছে

তোমাদের মধ্যে যে সোজা পথে চলতে চায়, তার জন্য।

এখানে মানুষের দায়িত্ব আল্লাহর হিদায়াতদুইটি বিষয় একসঙ্গে বোঝা যায়। মানুষকে সত্য গ্রহণের ইচ্ছা চেষ্টা করতে হবে। তাকে অহংকার, জেদ প্রবৃত্তির দাসত্ব থেকে বের হয়ে সত্যের দিকে ফিরতে হবে।

সোজা পথ হলো আল্লাহর দেখানো পথতাওহিদ, ঈমান, ইবাদত, তাকওয়া, ন্যায়, সত্য, সৎচরিত্র এবং রাসুলুল্লাহ -এর সুন্নাহর অনুসরণের পথ।

আল্লাহর ইচ্ছা ছাড়া মানুষের ইচ্ছাও পূর্ণ নয়

সূরার শেষ আয়াতে বলা হয়েছে

আর তোমরা আল্লাহ, বিশ্বজগতের রবের ইচ্ছা ছাড়া অন্য কিছু চাও না।

এই আয়াত ইসলামী আকিদার একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় শিক্ষা দেয়। আল্লাহ তাআলা সর্বশক্তিমান এবং তাঁর ইচ্ছা অনুমতি ছাড়া সৃষ্টিজগতে কিছুই সংঘটিত হয় না। একই সঙ্গে মানুষকে ইচ্ছা, বোধশক্তি কর্মের সামর্থ্য দেওয়া হয়েছে এবং সে তার কাজের জন্য জবাবদিহি করবে।

অতএব ইসলামের শিক্ষা হলোমানুষ চেষ্টা করবে, সঠিক সিদ্ধান্ত নেবে, আল্লাহর ওপর ভরসা করবে এবং হিদায়াতের জন্য তাঁর কাছে দোয়া করবে। নিজের দায়িত্ব ছেড়ে দিয়ে শুধু ভাগ্যের অজুহাত দেওয়া ইসলামের শিক্ষা নয়।

মুমিনের অবস্থান হলো

চেষ্টা আমার, তাওফিক আল্লাহর;
কর্ম আমার দায়িত্ব, ফল আল্লাহর হাতে।

সূরা আত-তাকভীরের আলোকে আমাদের করণীয়

এই সূরা শুধু কিয়ামতের ভয়াবহ দৃশ্য বর্ণনা করে থেমে যায় না; বরং আমাদের জীবন সংশোধনের আহ্বান জানায়। একজন সচেতন মুসলিমের জন্য এর কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হলো

. তাওহিদের ওপর দৃঢ় থাকা

আল্লাহ এক অদ্বিতীয়। তিনি বিশ্বজগতের রব, সৃষ্টিকর্তা প্রকৃত অধিপতি। তাই কোনো ধরনের শিরক থেকে নিজেকে রক্ষা করতে হবে।

. কিয়ামতের প্রতি দৃঢ় বিশ্বাস রাখা

কিয়ামত অবশ্যম্ভাবী। পুনরুত্থান, হিসাব, জান্নাত জাহান্নাম সত্য বিশ্বাস অন্তরে জীবন্ত রাখতে হবে।

. আমলনামার কথা স্মরণ করা

প্রতিটি কাজের হিসাব হবেএই চেতনা মানুষকে গোপন প্রকাশ্য সব অন্যায় থেকে বিরত রাখতে সাহায্য করে।

. অন্যের অধিকার রক্ষা করা

কোনো দুর্বল, অসহায় বা নিরপরাধ মানুষের অধিকার নষ্ট করা যাবে না। আল্লাহর আদালতে জুলুমের হিসাব অবশ্যই হবে।

. কুরআনের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তোলা

শুধু তিলাওয়াত নয়; কুরআনের অর্থ বোঝা, শিক্ষা গ্রহণ করা এবং জীবনে বাস্তবায়ন করা জরুরি।

. রাসুলুল্লাহ -এর সুন্নাহ অনুসরণ করা

কুরআনের সঠিক বাস্তব প্রয়োগ শিখতে রাসুলুল্লাহ -এর জীবন সুন্নাহ অনুসরণ করতে হবে।

. দুনিয়ার মোহে আখিরাত ভুলে না যাওয়া

সম্পদ, পদ, খ্যাতি ভোগ-বিলাস জীবনের চূড়ান্ত লক্ষ্য নয়। এগুলো আল্লাহর দেওয়া আমানত পরীক্ষা।

. প্রতিদিন আত্মসমালোচনা করা

দিন শেষে নিজেকে প্রশ্ন করা উচিতআজ আমি কী ভালো কাজ করেছি? কোন ভুল করেছি? কার অধিকার নষ্ট করেছি? কোন গুনাহ থেকে তাওবা করা প্রয়োজন?

. হিদায়াতের জন্য আল্লাহর কাছে দোয়া করা

মানুষের হৃদয় আল্লাহর হাতে। তাই সঠিক পথে অটল থাকার জন্য আল্লাহর কাছে সাহায্য চাইতে হবে।

পরিবার সমাজজীবনে সূরা আত-তাকভীরের শিক্ষা

সূরাটির শিক্ষা ব্যক্তিজীবনের পাশাপাশি পরিবার সমাজজীবনেও গুরুত্বপূর্ণ।

একজন বাবা যদি কিয়ামতের জবাবদিহি মনে রাখেন, তাহলে তিনি সন্তানের প্রতি দায়িত্বশীল হবেন। একজন শিক্ষক যদি আল্লাহর সামনে জবাবদিহির কথা মনে রাখেন, তাহলে তিনি শিক্ষার্থীর প্রতি দায়িত্ব পালনে আন্তরিক হবেন। একজন ব্যবসায়ী যদি আমলনামার কথা স্মরণ করেন, তাহলে প্রতারণা ওজনে কম দেওয়া থেকে বিরত থাকবেন। একজন কর্মকর্তা যদি আল্লাহর আদালতের কথা মনে রাখেন, তাহলে ক্ষমতার অপব্যবহার করবেন না।

একজন স্বামী যদি আল্লাহর সামনে জবাবদিহির কথা মনে রাখেন, তাহলে স্ত্রীর অধিকার রক্ষা করবেন। একজন স্ত্রীও একইভাবে স্বামীর অধিকার, সন্তানদের অধিকার এবং পরিবারের দায়িত্বকে আমানত হিসেবে বিবেচনা করবেন।

এভাবেই আখিরাতের বিশ্বাস একটি সুন্দর পরিবার এবং ন্যায়ভিত্তিক সমাজ গঠনে ভূমিকা রাখে।

কিয়ামতের স্মরণহতাশার নয়, সংশোধনের আহ্বান

কিয়ামতের বর্ণনা শুনে মানুষ ভয় পেতে পারে। কিন্তু কুরআনের উদ্দেশ্য মানুষকে হতাশ করা নয়; বরং তাকে জাগিয়ে তোলা।

যে ব্যক্তি ভুল করেছে, তার জন্য তাওবার দরজা খোলা। যে ব্যক্তি গুনাহে ডুবে আছে, সে আল্লাহর দিকে ফিরে আসতে পারে। যে ব্যক্তি মানুষের অধিকার নষ্ট করেছে, সে অধিকার ফিরিয়ে দিয়ে ক্ষমা চাইতে পারে। যে ব্যক্তি সালাতে দুর্বল, সে আজ থেকেই সালাতের প্রতি যত্নবান হতে পারে।

তাই কিয়ামতের স্মরণ মানে শুধু ভয় নয়; বরং ফিরে আসার আহ্বান।

আজ সুযোগ আছেকাল নাও থাকতে পারে।

আজ তাওবা করা যায়মৃত্যুর পরে আর তাওবার সুযোগ থাকবে না।

আজ আমল করা যায়কিয়ামতের দিন শুধু ফলাফল প্রকাশিত হবে।

আত্মজিজ্ঞাসা: আমি কী নিয়ে আল্লাহর কাছে যাব?

একদিন আমাদের প্রত্যেককে পৃথিবীর সব পরিচয়, সম্পদ ব্যস্ততা পেছনে রেখে আল্লাহর সামনে দাঁড়াতে হবে।

সেদিন প্রশ্ন হবে নাতোমার বাড়ি কত বড় ছিল?

প্রশ্ন হবেতুমি কী আমল নিয়ে এসেছ?

প্রশ্ন হবে নাতোমার ব্যাংকে কত টাকা ছিল?

প্রশ্ন হবেতুমি সম্পদ কীভাবে উপার্জন ব্যয় করেছ?

প্রশ্ন হবে নাতোমার কত অনুসারী ছিল?

প্রশ্ন হবেতুমি সত্য হকের কতটা অনুসরণ করেছ?

প্রশ্ন হবে নামানুষ তোমাকে কতটা সম্মান করেছে?

বরং গুরুত্বপূর্ণ হবেআল্লাহ তোমার প্রতি সন্তুষ্ট কি না।

তাই জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তুতি হলো ঈমানকে শুদ্ধ করা, ফরজ ইবাদত প্রতিষ্ঠা করা, হারাম বর্জন করা, মানুষের অধিকার রক্ষা করা, উত্তম চরিত্র গঠন করা এবং আল্লাহর কাছে তাওবা করে ফিরে আসা।

উপসংহার

সূরা আত-তাকভীর আমাদের সামনে এমন এক দিনের ছবি তুলে ধরে, যেদিন পৃথিবীর পরিচিত ব্যবস্থা আর থাকবে না। সূর্য গুটিয়ে যাবে, নক্ষত্ররাজি খসে পড়বে, পাহাড় চলমান হবে, সমুদ্রের অবস্থা পরিবর্তিত হবে, আমলনামা খুলে দেওয়া হবে, জাহান্নাম প্রজ্জ্বলিত হবে এবং জান্নাত নিকটবর্তী করা হবে। সেদিন মানুষ স্পষ্টভাবে জানতে পারবেদুনিয়ায় সে কী পাঠিয়েছে।

এই সূরা একই সঙ্গে কুরআনের সত্যতা, জিবরাইল (.)-এর মাধ্যমে ওহি পৌঁছানোর বিষয়, রাসুলুল্লাহ -এর সত্যতা এবং কুরআনের মানবজাতির জন্য হিদায়াতের বার্তা হওয়ার কথা ঘোষণা করে। এরপর মানুষকে গভীর প্রশ্ন করা হয়

সুতরাং তোমরা কোথায় চলেছ?”

এই প্রশ্ন আজও আমাদের হৃদয়ে ধ্বনিত হওয়া উচিত।

আমরা কি দুনিয়ার মোহের দিকে ছুটছি, নাকি আখিরাতের সফলতার দিকে এগিয়ে যাচ্ছি?

আমরা কি প্রবৃত্তির অনুসরণ করছি, নাকি কুরআন-সুন্নাহর অনুসরণ করছি?

আমরা কি অন্যের অধিকার নষ্ট করছি, নাকি ইনসাফ প্রতিষ্ঠা করছি?

আমরা কি গুনাহকে ভালোবাসছি, নাকি তাওবার মাধ্যমে আল্লাহর দিকে ফিরে যাচ্ছি?

আমরা কি শুধু দুনিয়া গড়ছি, নাকি আখিরাতের ঘরও গড়ছি?

জীবন ক্ষণস্থায়ী, কিন্তু আমলের ফল স্থায়ী। সময় চলে যাচ্ছে, মৃত্যু এগিয়ে আসছে, আর প্রত্যেক মানুষ নিজের অজান্তেই আখিরাতের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। তাই আজই আত্মশুদ্ধির সময়, আজই তাওবার সময়, আজই আমল সংশোধনের সময়।

কুরআনের আহ্বান গ্রহণ করে আমরা যেন তাওহিদের ওপর অটল থাকি, শিরক কুফর থেকে বেঁচে থাকি, সালাত ইবাদতে যত্নবান হই, সত্য ন্যায়ের পথে চলি, মানুষের অধিকার রক্ষা করি, অন্যায় জুলুম বর্জন করি, কুরআন-সুন্নাহকে জীবনপথের নির্দেশনা হিসেবে গ্রহণ করি এবং আখিরাতের জন্য নেক আমল সঞ্চয় করি।

হে আল্লাহ, আমাদের ঈমানকে দৃঢ় করো, অন্তরকে পরিশুদ্ধ করো, কুরআনের হিদায়াত বুঝে তা অনুসরণ করার তাওফিক দাও। আমাদের গোপন প্রকাশ্য সব গুনাহ ক্ষমা করো। আমাদের আমলনামাকে নেক আমলে সমৃদ্ধ করো। কিয়ামতের ভয়াবহ দিনে আমাদের নিরাপদ রাখো এবং তোমার রহমতে আমাদের জান্নাতের অধিকারী করো।

হে আল্লাহ, আমাদের সোজা পথে অটল রাখোআমিন।

 

মন্তব্য করুন