সহকারী অধ্যাপক
১৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ০৭:৩৩ পূর্বাহ্ণ
দুনিয়ার মোহ থেকে মুক্তি ও আখিরাতের প্রস্তুতি
|
|
দুনিয়ার মোহ থেকে মুক্তি ও আখিরাতের প্রস্তুতি
(— কিয়ামতের স্মরণ, আত্মসংযম ও চিরস্থায়ী সফলতার পথে)
মোঃ মুজিবুর রহমান
সহকারী অধ্যাপক
মোজাদ্দেদীয়া ইসলামিয়া আলিম মাদ্রাসা, কালিয়াকৈর, গাজীপুর
মানুষ এই পৃথিবীতে এসেছে একটি নির্দিষ্ট উদ্দেশ্য নিয়ে। তার জীবন কেবল খাওয়া-পরা, অর্থ উপার্জন, সম্পদ অর্জন, ভোগ-বিলাস ও পার্থিব সাফল্যের জন্য নয়। আল্লাহ তাআলা মানুষকে সৃষ্টি করেছেন তাঁর ইবাদত করার জন্য, পরীক্ষার জন্য এবং সৎকর্মের মাধ্যমে আখিরাতের চিরস্থায়ী জীবনের জন্য প্রস্তুত হওয়ার উদ্দেশ্যে। পৃথিবীর জীবন ক্ষণস্থায়ী; কিন্তু আখিরাতের জীবন চিরস্থায়ী। তাই বুদ্ধিমান মানুষ দুনিয়াকে প্রয়োজন অনুযায়ী গ্রহণ করে, কিন্তু দুনিয়াকে তার জীবনের চূড়ান্ত লক্ষ্য বানায় না।
পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা কিয়ামতের ভয়াবহতা এবং মানুষের চূড়ান্ত পরিণতির কথা স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন। যখন মহাপ্রলয় সংঘটিত হবে, তখন মানুষ তার জীবনের প্রতিটি চেষ্টা ও কর্মের কথা স্মরণ করবে। জাহান্নামকে স্পষ্টভাবে প্রকাশ করা হবে। যে ব্যক্তি সীমালঙ্ঘন করেছে এবং দুনিয়ার জীবনকে আখিরাতের ওপর প্রাধান্য দিয়েছে, তার পরিণতি হবে জাহান্নাম। পক্ষান্তরে যে ব্যক্তি তার রবের সামনে দাঁড়ানোর ভয় হৃদয়ে ধারণ করেছে এবং নিজের নফসের কুপ্রবৃত্তিকে সংযত করেছে, তার আবাস হবে জান্নাত।
এই শিক্ষা মানুষের জীবনকে নতুনভাবে মূল্যায়ন করতে শেখায়। আজ আমরা যে কাজ করছি, যে কথা বলছি, যে সিদ্ধান্ত নিচ্ছি এবং যে পথে জীবন পরিচালনা করছি—সবকিছুরই একদিন হিসাব দিতে হবে।
কিয়ামত অবশ্যম্ভাবী
মানুষ যতই দুনিয়ার কাজে ব্যস্ত থাকুক, একদিন তাকে এই পৃথিবী ছেড়ে যেতে হবে। পৃথিবীর কোনো শক্তি, সম্পদ, প্রযুক্তি কিংবা ক্ষমতা মৃত্যুকে প্রতিহত করতে পারে না। মৃত্যু প্রত্যেক মানুষের জন্য অবধারিত।
তবে ইসলামের শিক্ষা শুধু মৃত্যুর মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। মৃত্যুর পর রয়েছে বরযখ, অতঃপর কিয়ামত, পুনরুত্থান, হিসাব-নিকাশ, মীযান, আমলনামা, পুলসিরাত এবং শেষ পর্যন্ত জান্নাত অথবা জাহান্নাম। এগুলো গায়েবের বিষয় এবং কুরআন ও সহিহ সুন্নাহ আমাদের এ বিষয়ে শিক্ষা দিয়েছে।
কিয়ামতের দিন মানুষ বুঝতে পারবে—পৃথিবীর জীবন ছিল অত্যন্ত অল্প সময়ের। যে বিষয়গুলো নিয়ে সে অহংকার করত, সেগুলোর অনেক কিছুই তখন মূল্যহীন হয়ে যাবে। তখন সম্পদের পরিমাণ নয়, বরং ঈমান, তাকওয়া ও সৎকর্মের গুরুত্ব প্রকাশ পাবে।
মানুষ তার কর্ম স্মরণ করবে
কিয়ামতের দিন মানুষ তার জীবনের কর্মগুলো স্মরণ করবে। সে বুঝতে পারবে, জীবনের কোনো কাজই প্রকৃত অর্থে হারিয়ে যায়নি। মানুষের কথা, কাজ, উদ্দেশ্য ও দায়িত্ববোধ—সবকিছুরই মূল্য রয়েছে।
দুনিয়ায় মানুষ অনেক সময় নিজের কাজকে ছোট মনে করে। একটি ভালো কথা, একজন অসহায় মানুষকে সাহায্য করা, পিতা-মাতার সঙ্গে সদাচরণ, মানুষের অধিকার রক্ষা, সত্য কথা বলা, অন্যায় থেকে বিরত থাকা—এসবকে হয়তো সে সামান্য মনে করে। আবার মিথ্যা, প্রতারণা, গিবত, অহংকার, জুলুম কিংবা হারাম উপার্জনকে সাময়িক বিষয় মনে করে এড়িয়ে যায়।
কিন্তু আখিরাতের বিচারে কোনো কাজই তুচ্ছ নয়।
তাই মুমিনের উচিত প্রতিদিন নিজের আমল পর্যালোচনা করা—আজ আমি কী বলেছি? কাকে কষ্ট দিয়েছি? কার অধিকার নষ্ট করেছি? কোন ভালো কাজ করেছি? কোন গুনাহ থেকে বেঁচেছি? কোথায় তাওবা করা প্রয়োজন?
এই আত্মসমালোচনা মানুষকে সংশোধনের পথে নিয়ে যায়।
দুনিয়ার জীবন—পরীক্ষার ক্ষেত্র
দুনিয়ার জীবন আল্লাহর পক্ষ থেকে একটি পরীক্ষা। এখানে মানুষকে স্বাধীন ইচ্ছা, বিবেক, জ্ঞান ও সামর্থ্য দেওয়া হয়েছে। সে চাইলে ভালো পথ গ্রহণ করতে পারে, আবার চাইলে অন্যায়ের পথে যেতে পারে। কিন্তু তার প্রতিটি সিদ্ধান্তের পরিণতি রয়েছে।
আল্লাহ তাআলা দুনিয়ার সম্পদ, সন্তান, সৌন্দর্য, ক্ষমতা ও সম্মানকে মানুষের জন্য পরীক্ষা হিসেবে দিয়েছেন। তাই এগুলো অর্জন করা নিষিদ্ধ নয়; বরং হালাল পথে অর্জন করে আল্লাহর সন্তুষ্টির কাজে ব্যবহার করা প্রশংসনীয়। সমস্যা তখনই সৃষ্টি হয়, যখন মানুষ দুনিয়াকে তার চূড়ান্ত লক্ষ্য বানিয়ে আখিরাতকে ভুলে যায়।
ইসলাম দুনিয়া ত্যাগ করতে বলে না; ইসলাম দুনিয়ার প্রতি অতিরিক্ত আসক্তি ত্যাগ করতে শেখায়।
একজন মুসলিম ব্যবসা করবে, চাকরি করবে, শিক্ষা অর্জন করবে, পরিবার পরিচালনা করবে, সমাজের উন্নয়নে কাজ করবে—কিন্তু এসবের মধ্যেও আল্লাহর বিধান মেনে চলবে। দুনিয়ার কাজ তার হাতে থাকবে, হৃদয়ের চূড়ান্ত আসন দখল করবে না।
দুনিয়ার জীবনকে প্রাধান্য দেওয়ার বিপদ
মানুষের সবচেয়ে বড় দুর্বলতার একটি হলো তাৎক্ষণিক আনন্দের প্রতি আকর্ষণ। দুনিয়ার সুখ চোখে দেখা যায়, হাতে পাওয়া যায় এবং দ্রুত উপভোগ করা যায়। পক্ষান্তরে জান্নাতের প্রতিশ্রুতি গায়েবের বিষয়; তাই দুর্বল ঈমানের মানুষ অনেক সময় দুনিয়ার সাময়িক লাভকে আখিরাতের চিরস্থায়ী সফলতার ওপর প্রাধান্য দেয়।
সে নামাজের সময় ব্যবসাকে বেছে নেয়, সত্যের পরিবর্তে স্বার্থকে বেছে নেয়, হালালের পরিবর্তে হারাম উপার্জনের পথ নেয়, মানুষের অধিকার রক্ষা করার পরিবর্তে নিজের লাভকে বড় করে দেখে।
এভাবেই দুনিয়ার মোহ ধীরে ধীরে মানুষের হৃদয়কে আখিরাত থেকে দূরে সরিয়ে দেয়।
দুনিয়ার সম্পদ ব্যবহার করা অপরাধ নয়; বরং সম্পদকে জীবনের উদ্দেশ্য বানানো বিপজ্জনক। সম্পদ যদি মানুষকে আল্লাহর আনুগত্যে সাহায্য করে, তবে তা নিয়ামত। আর সম্পদ যদি মানুষকে অহংকারী, জালিম ও অবাধ্য বানায়, তবে তা পরীক্ষায় পরিণত হয়।
সীমালঙ্ঘন মানুষের পতনের কারণ
আয়াতগুলোতে সীমালঙ্ঘনের ব্যাপারে সতর্ক করা হয়েছে। সীমালঙ্ঘন বলতে আল্লাহর নির্ধারিত সীমা অতিক্রম করা বোঝায়। এর মধ্যে শিরক, কুফর, আল্লাহর অবাধ্যতা, জুলুম, অন্যের অধিকার নষ্ট করা, হারাম উপার্জন, অশ্লীলতা, প্রতারণা, অহংকার ও নানা ধরনের গুনাহ অন্তর্ভুক্ত হতে পারে।
মানুষ যখন নিজের প্রবৃত্তির অনুসরণ করতে করতে আল্লাহর বিধানকে অগ্রাহ্য করে, তখন সে ধীরে ধীরে সীমালঙ্ঘনের দিকে চলে যায়।
প্রথমে ছোট গুনাহকে তুচ্ছ মনে হয়। পরে সেই গুনাহ অভ্যাসে পরিণত হয়। একসময় মানুষ গুনাহকে গুনাহ বলেই মনে করে না। এটাই আত্মার জন্য ভয়ংকর অবস্থা।
তাই মুমিনের উচিত ছোট-বড় সব গুনাহ থেকে সতর্ক থাকা এবং ভুল হয়ে গেলে দ্রুত তাওবা করা।
নফসের কুপ্রবৃত্তি দমন
মানুষের মধ্যে বিভিন্ন প্রবৃত্তি রয়েছে। ক্ষুধা, রাগ, ভালোবাসা, আকাঙ্ক্ষা, সম্পদের প্রতি আগ্রহ—এসব মানুষের স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্য। ইসলাম এগুলোকে সম্পূর্ণ ধ্বংস করতে বলে না; বরং শরিয়তের সীমার মধ্যে নিয়ন্ত্রণ করতে শেখায়।
রাগ আসবে—কিন্তু অন্যায় করা যাবে না।
সম্পদের আকাঙ্ক্ষা থাকবে—কিন্তু হারাম পথে উপার্জন করা যাবে না।
ভালোবাসা থাকবে—কিন্তু আল্লাহর বিধান লঙ্ঘন করা যাবে না।
ক্ষমতা থাকবে—কিন্তু জুলুম করা যাবে না।
অর্থাৎ ইসলাম মানুষের প্রবৃত্তিকে অস্বীকার করে না; বরং তাকে সঠিক পথে পরিচালিত করে।
প্রকৃত আত্মসংযম হলো—মানুষ যখন গুনাহ করার সুযোগ পেয়েও আল্লাহর ভয়ে তা ছেড়ে দেয়। কেউ না দেখলেও আল্লাহ দেখছেন—এই বিশ্বাস যখন অন্তরে দৃঢ় হয়, তখন মানুষ গোপনেও নিজেকে পাপ থেকে রক্ষা করতে পারে।
আল্লাহর সামনে দাঁড়ানোর ভয়
মুমিনের হৃদয়ে আল্লাহর ভয় এবং তাঁর রহমতের আশা—দুটিই থাকতে হয়। আল্লাহর সামনে দাঁড়ানোর ভয় মানুষকে অন্যায় থেকে বিরত রাখে। সে জানে, পৃথিবীতে মানুষকে ফাঁকি দেওয়া গেলেও আল্লাহকে ফাঁকি দেওয়া যায় না।
মানুষের সামনে আমরা নিজের ভুল লুকাতে পারি; কিন্তু আল্লাহর কাছে কোনো কিছুই গোপন নয়।
এই বিশ্বাস মানুষের চরিত্রে গভীর পরিবর্তন আনে। তখন সে একা থাকলেও সতর্ক থাকে। অন্ধকার ঘরে থাকলেও হারাম থেকে বেঁচে থাকে। অন্য কেউ না দেখলেও আমানত রক্ষা করে। সুযোগ পেলেও অন্যের সম্পদ আত্মসাৎ করে না।
কারণ তার অন্তরে জাগ্রত থাকে—একদিন আমাকে আমার রবের সামনে দাঁড়াতে হবে।
তাকওয়া মানুষের ঢাল
তাকওয়া হলো আল্লাহকে ভয় ও ভালোবাসার সঙ্গে তাঁর নির্দেশ মেনে চলা এবং তাঁর অসন্তুষ্টির কারণ থেকে নিজেকে রক্ষা করা। তাকওয়া শুধু মুখের কথা নয়; এটি মানুষের বিশ্বাস, চিন্তা, চরিত্র ও কর্মের মধ্যে প্রকাশ পায়।
তাকওয়াবান ব্যক্তি নামাজ আদায় করে, সত্য কথা বলে, আমানত রক্ষা করে, পিতা-মাতার সঙ্গে সদাচরণ করে, মানুষের অধিকার দেয়, অন্যায় থেকে বিরত থাকে এবং গোপনেও আল্লাহকে ভয় করে।
তাকওয়া মানুষকে দুনিয়ার মোহের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে সাহায্য করে। সে জানে—সবকিছু আমার নয়; আমি যা পেয়েছি, তা আল্লাহর দেওয়া আমানত।
জান্নাত—মুমিনের চূড়ান্ত সফলতা
যে ব্যক্তি আল্লাহকে ভয় করে, তাঁর আনুগত্য করে, নফসের কুপ্রবৃত্তি নিয়ন্ত্রণ করে এবং ঈমান ও সৎকর্মের পথে জীবন পরিচালনা করে, তার জন্য রয়েছে জান্নাতের সুসংবাদ।
জান্নাত কোনো সাময়িক পুরস্কার নয়। এটি চিরস্থায়ী আবাস। সেখানে নেই মৃত্যু, নেই বার্ধক্য, নেই রোগ, নেই দুঃখ, নেই ভয় এবং নেই বিচ্ছেদ।
কুরআন ও সহিহ সুন্নাহ জান্নাতের অসংখ্য নেয়ামতের কথা বর্ণনা করেছে। কিন্তু জান্নাতের সর্বশ্রেষ্ঠ নেয়ামত হলো আল্লাহর সন্তুষ্টি।
তাই মুমিনের জীবনের সবচেয়ে বড় আকাঙ্ক্ষা হওয়া উচিত—আল্লাহ যেন তার ওপর সন্তুষ্ট হন এবং তাকে জান্নাতের অধিবাসী করেন।
জাহান্নাম—অবাধ্যতার ভয়াবহ পরিণতি
অন্যদিকে যে ব্যক্তি সত্য জেনেও অহংকার করে, সীমালঙ্ঘন করে, দুনিয়াকে আখিরাতের ওপর প্রাধান্য দেয় এবং আল্লাহর অবাধ্যতায় জীবন কাটায়, তার জন্য রয়েছে কঠিন পরিণতির সতর্কবার্তা।
জাহান্নাম ইসলামী আকিদার একটি সত্য বিষয়। এটি কেবল ভীতিকর কোনো কল্পকাহিনি নয়; বরং আল্লাহ তাআলা তাঁর বান্দাদের সতর্ক করার জন্য এর সংবাদ দিয়েছেন।
তাই জাহান্নামের ভয় মুমিনের হৃদয়ে গুনাহের প্রতি ঘৃণা সৃষ্টি করবে এবং তাওবা ও সংশোধনের দিকে নিয়ে যাবে।
তবে কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তিকে নিজের পক্ষ থেকে জাহান্নামী ঘোষণা করা মুমিনের কাজ নয়। চূড়ান্ত বিচার আল্লাহর হাতে। আমাদের দায়িত্ব হলো নিজের ঈমান ও আমল সংশোধন করা এবং অন্যদের সত্য ও কল্যাণের পথে আহ্বান করা।
তাওবার দরজা খোলা
মানুষ ভুল করবে—এটাই মানুষের স্বভাব। কিন্তু মুমিনের বৈশিষ্ট্য হলো, সে ভুলের ওপর অটল থাকে না। ভুল হলে সে ফিরে আসে।
তাওবা মানে শুধু মুখে ‘আস্তাগফিরুল্লাহ’ বলা নয়; বরং গুনাহ ছেড়ে দেওয়া, অনুতপ্ত হওয়া, ভবিষ্যতে ফিরে না যাওয়ার দৃঢ় সংকল্প করা এবং মানুষের অধিকার নষ্ট করলে তা যথাসম্ভব ফিরিয়ে দেওয়া।
তাই জীবনে যত ভুলই হয়ে থাকুক, হতাশ হওয়া যাবে না। আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হওয়া মুমিনের বৈশিষ্ট্য নয়। আন্তরিকভাবে আল্লাহর দিকে ফিরে আসতে হবে।
আজই হতে পারে পরিবর্তনের দিন।
হিসাবের আগে আত্মহিসাব
বুদ্ধিমান মানুষ অন্যের হিসাব নেওয়ার আগে নিজের হিসাব নেয়। সে নিজেকে প্রশ্ন করে—
আমি কি নিয়মিত নামাজ আদায় করছি?
আমার উপার্জন কি হালাল?
আমি কি পিতা-মাতার হক আদায় করছি?
আমি কি স্ত্রী, সন্তান, আত্মীয় ও প্রতিবেশীর অধিকার রক্ষা করছি?
আমি কি কারও ওপর জুলুম করেছি?
আমার জিহ্বা কি মিথ্যা, গিবত ও অপবাদ থেকে নিরাপদ?
আমার চোখ কি হারাম থেকে নিরাপদ?
আমার অন্তর কি অহংকার, হিংসা ও বিদ্বেষ থেকে মুক্ত?
আমি কি কুরআন ও সুন্নাহ অনুযায়ী জীবন পরিচালনার চেষ্টা করছি?
এ ধরনের আত্মজিজ্ঞাসা মানুষকে নিজের দুর্বলতা বুঝতে সাহায্য করে।
পরিবার ও সমাজে এই শিক্ষার প্রয়োগ
আখিরাতের চিন্তা মানুষকে দায়িত্বহীন করে না; বরং আরও দায়িত্বশীল করে।
একজন বাবা যখন মনে করেন, সন্তানদের ব্যাপারে একদিন তাকে আল্লাহর কাছে জবাবদিহি করতে হবে, তখন তিনি তাদের শুধু ভৌত চাহিদা পূরণ করেন না; বরং ঈমান, নৈতিকতা ও সৎ চরিত্র শেখানোর চেষ্টা করেন।
একজন শিক্ষক যখন মনে করেন, তার কাছে অর্পিত শিক্ষার্থীদের ব্যাপারে আল্লাহর কাছে জবাব দিতে হবে, তখন তিনি দায়িত্বকে আমানত হিসেবে গ্রহণ করেন।
একজন ব্যবসায়ী যখন আখিরাতের হিসাব স্মরণ করেন, তখন তিনি ওজনে কম দেন না, প্রতারণা করেন না এবং হারাম উপার্জন থেকে বেঁচে থাকেন।
একজন শাসক যখন আল্লাহর সামনে দাঁড়ানোর কথা স্মরণ করেন, তখন সে ক্ষমতাকে ভোগের উপকরণ না বানিয়ে মানুষের কল্যাণে ব্যবহার করার চেষ্টা করে।
এভাবেই আখিরাতের বিশ্বাস ব্যক্তি, পরিবার ও সমাজকে সুন্দর করে।
প্রকৃত সফলতা কোথায়?
আজকের পৃথিবীতে সফলতার মাপকাঠি অনেক সময় অর্থ, পদ, খ্যাতি, বাড়ি, গাড়ি ও সামাজিক মর্যাদাকে কেন্দ্র করে নির্ধারিত হয়। কিন্তু ইসলামের দৃষ্টিতে এগুলো সফলতার চূড়ান্ত মাপকাঠি নয়।
কেউ দরিদ্র হয়েও আল্লাহর কাছে সম্মানিত হতে পারে। আবার কেউ প্রচুর সম্পদের মালিক হয়েও আখিরাতে ব্যর্থ হতে পারে।
প্রকৃত সফলতা হলো ঈমানের সঙ্গে জীবন শেষ করা, আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন করা এবং জান্নাতে প্রবেশ করা।
দুনিয়ার সাফল্য যদি আখিরাতের সফলতার সহায়ক হয়, তবে তা কল্যাণকর। কিন্তু দুনিয়ার সাফল্য যদি মানুষকে আল্লাহ থেকে দূরে সরিয়ে দেয়, তবে তা প্রকৃত সফলতা নয়।
সময় থাকতে প্রস্তুতি
কিয়ামতের দিন ফিরে গিয়ে নতুন করে আমল করার সুযোগ থাকবে না। তাই সুযোগ থাকতে প্রস্তুতি নিতে হবে।
যে নামাজ আজ পড়া সম্ভব, তা কাল পর্যন্ত ফেলে রাখা উচিত নয়।
যার কাছে ক্ষমা চাওয়া প্রয়োজন, আজই ক্ষমা চাওয়া উচিত।
যার অধিকার ফিরিয়ে দেওয়া প্রয়োজন, আজই ফিরিয়ে দেওয়া উচিত।
যে গুনাহ ছাড়তে হবে, আজই ছাড়ার চেষ্টা করা উচিত।
যে ভালো কাজ শুরু করা প্রয়োজন, আজই শুরু করা উচিত।
কারণ আমরা জানি না, আমাদের জীবনের কতটুকু সময় অবশিষ্ট আছে।
উপসংহার
কিয়ামতের ভয়াবহ দিন অবশ্যই আসবে। সেদিন মানুষ তার জীবনের চেষ্টা ও কর্ম স্মরণ করবে। দুনিয়ার মোহ, সম্পদ, ক্ষমতা ও অহংকার তখন তাকে রক্ষা করতে পারবে না। যে ব্যক্তি সীমালঙ্ঘন করেছে এবং আখিরাতকে ভুলে দুনিয়াকে জীবনের চূড়ান্ত লক্ষ্য বানিয়েছে, তার জন্য রয়েছে কঠিন পরিণতির সতর্কবার্তা। আর যে ব্যক্তি আল্লাহর সামনে দাঁড়ানোর ভয় হৃদয়ে ধারণ করেছে, নিজের নফসের কুপ্রবৃত্তিকে সংযত করেছে, ঈমান ও সৎকর্মের পথে চলেছে—তার জন্য রয়েছে জান্নাতের সুসংবাদ।
অতএব, আমাদের উচিত দুনিয়াকে ত্যাগ করা নয়; বরং দুনিয়াকে আখিরাতের পাথেয় বানানো। সম্পদ থাকবে হাতে, কিন্তু হৃদয়ের মালিক হবে না। ক্ষমতা থাকবে, কিন্তু অহংকার থাকবে না। জ্ঞান থাকবে, কিন্তু অবাধ্যতা থাকবে না। ইচ্ছা থাকবে, কিন্তু শরিয়তের সীমা অতিক্রম করা হবে না।
আজকের জীবনই আগামী দিনের ফলাফল নির্ধারণের সুযোগ। তাই সময় থাকতে নিজেকে সংশোধন করতে হবে, গুনাহ থেকে তাওবা করতে হবে, ফরজ ইবাদত প্রতিষ্ঠা করতে হবে, হালাল-হারামের সীমা মানতে হবে, মানুষের অধিকার আদায় করতে হবে এবং কুরআন-সুন্নাহর আলোকে জীবন গড়ে তুলতে হবে।
মনে রাখতে হবে—
দুনিয়া ক্ষণস্থায়ী, আখিরাত চিরস্থায়ী;
দুনিয়ার ভোগ সীমিত, জান্নাতের নেয়ামত অফুরন্ত;
দুনিয়ার প্রশংসা সাময়িক, আল্লাহর সন্তুষ্টিই প্রকৃত সাফল্য।
হে আল্লাহ! আমাদের অন্তরকে দুনিয়ার মোহে অন্ধ করে দিও না। আমাদের ঈমানকে দৃঢ় করো, গুনাহ থেকে বাঁচার তাওফিক দাও, নফসের কুপ্রবৃত্তি দমন করার শক্তি দাও, তাওবা ও ইস্তিগফারের মাধ্যমে আমাদের জীবনকে পবিত্র করো। আমাদের আমলনামা নেক আমলে সমৃদ্ধ করো এবং কিয়ামতের দিন আমাদের প্রতি দয়া করো। আমাদেরকে জাহান্নাম থেকে রক্ষা করে তোমার সন্তুষ্টি ও জান্নাত লাভের তাওফিক দাও।
আমিন।
১৪
২৪ মন্তব্য