সহকারী অধ্যাপক
১৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ০৭:৩৪ পূর্বাহ্ণ
খাদ্যের প্রতি দৃষ্টি ও কিয়ামতের মহাগাথা
|
|
খাদ্যের প্রতি দৃষ্টি ও কিয়ামতের মহাগাথা
(আল্লাহর নিয়ামতের স্মরণ, সৃষ্টির নিদর্শনে চিন্তা ও আখিরাতের প্রস্তুতি)
মোঃ মুজিবুর রহমান
সহকারী অধ্যাপক
মোজাদ্দেদীয়া ইসলামিয়া আলিম মাদ্রাসা, কালিয়াকৈর, গাজীপুর
কাজেই মানুষ খাদ্যের প্রতি
দিক একটু মনোযোগ,
কোথা থেকে আসে অন্নের দানা,
কার দানে জীবনভোগ?
কে দিল পানি, কে দিল শস্য,
কে দিল ফলের স্বাদ?
কে মাটির বুকে জীবন জাগান,
কে করেন সৃষ্টির সাধ?
যে অন্ন খেয়ে বেঁচে আছি আজ,
যে পানি মেটায় তৃষ্ণা,
সবই তো রবের অশেষ দয়া,
সবই তাঁরই করুণা।
তাই তো মানুষ থামুক ক্ষণিক,
চিনুক দয়াময় রব,
নিয়ামত পেয়ে ভুলে না যাক
সৃষ্টির মহান প্রভু।
আকাশজুড়ে মেঘের ভেলা,
বাতাস বয়ে যায়,
রহমতের সেই বৃষ্টিধারা
ধরার বুকে ঝরায়।
শুকনো মাটি সজীব হয়ে
জেগে ওঠে প্রাণে,
বৃষ্টির জলে সবুজ হাসি
ছড়িয়ে পড়ে গানে।
কে পাঠাল সেই মেঘের পানি,
কে দিল বৃষ্টিধারা?
মানুষ কি তা সৃষ্টি করতে
পারে আপন কারা?
আল্লাহ রব, তিনিই দাতা,
তিনিই রিজিকদাতা,
তাঁরই দানে পৃথিবীজুড়ে
জীবন পায় বারতা।
বৃষ্টির পরে মাটির বুকে
জাগে নতুন প্রাণ,
ক্ষুদ্র বীজে অঙ্কুর জাগে,
সবুজ হয় ধরণীস্থান।
মাটি যেন বিদীর্ণ হয়ে
উঁকি দেয় যে চারা,
দেখলে তারে বুঝতে পারি
কুদরত কত সারা!
ছোট্ট বীজের ভেতর লুকায়
গাছের কত রূপ,
কে দিল তাকে বেড়ে ওঠার
অদৃশ্য সেই ধূপ?
মানুষ শুধু বীজটি বোনে,
শ্রমে করে কাজ,
ফসল ফলার চূড়ান্ত ক্ষমতা
আল্লাহরই আজ।
ধানের শীষে সোনার হাসি,
গমের দানায় প্রাণ,
ভুট্টা, যব, ডাল ও শস্য—
সবই রবের দান।
ক্ষুধার্ত মুখে অন্ন জোগায়,
শক্তি জাগায় দেহে,
একটি দানাও আসে না তো
আল্লাহর অনুমতি ছাড়া কেহ।
কৃষক ঘামে ভিজিয়ে মাটি,
বপন করে বীজ,
তবু ফসল ফলার আশা
রাখে রবেরই কাছে।
তাই শ্রম করো, হালাল চলো,
রবের ওপর ভরসা রাখো,
চেষ্টার সাথে তাওয়াক্কুলে
জীবনপথকে সাজাও।
আঙ্গুর ঝোলে লতার বুকে,
শাক-সবজির সারি,
নানা রঙে নানা স্বাদে
সাজে ধরার বাড়ি।
কত রকম ফল ও ফসল,
কত রকম খাদ্য,
একই মাটিতে বৈচিত্র্যের
কী অপরূপ সাধ্য!
কে দিল ফলে মিষ্টি রস আর
কে দিল গন্ধ-রূপ?
মানুষ শুধু দেখে, কিন্তু
রহস্য কত সুদূর!
নিয়ামতের এই বিপুল ভাণ্ডার
দেখে যে মন ভরে,
সে তো রবের মহিমা স্মরণ
করবে অন্তরে।
যায়তূনের সবুজ ডালে
নীরব দোল খায়,
খেজুরবনে ফলের ভারে
শাখা নুয়ে যায়।
মরুর বুকে খেজুরগাছও
রিজিক জোগায় প্রাণে,
রবের কুদরত কত যে গভীর—
ভাবো আপন মনে।
ঘনবৃক্ষের বাগানজুড়ে
সবুজের সমারোহ,
ফল ও ফুলে ভরে ওঠে
ধরণীর প্রতিটি গৃহ।
এ সবকিছু কেবল ভোগের
বস্তু নয় যে ভাই,
এসব দেখে স্রষ্টার কথা
মনে রাখা চাই।
ফল-ফসল আর তৃণলতা
মাঠে মাঠে রয়,
মানুষ খায়, পশুও খায়—
জীবনধারা সয়।
গরু, ছাগল, উট ও ভেড়া
ঘাস খেয়ে বাঁচে,
আল্লাহ তাদের রিজিক রাখেন
সবুজ ঘাসের মাঝে।
মানুষ যেন পৃথিবীজুড়ে
দায়িত্ব ভুলে না যায়,
আল্লাহপ্রদত্ত আমানতকে
অন্যায়ভাবে নষ্ট না করায়।
গাছ লাগাও, পানি বাঁচাও,
মাটি রেখো ভালো,
সৃষ্টির মাঝে দায়িত্ব নিয়ে
চলো রবের আলো।
যে খাবার আজ সামনে আসে,
বলো—আলহামদুলিল্লাহ,
যে পানি আজ তৃষ্ণা মেটায়,
স্মরণ করো আল্লাহ।
অন্ন পেয়ে অহংকার নয়,
অপচয় নয় আর,
ক্ষুধার্তের মুখে অন্ন তুলে
হও দয়ার ভার।
প্রয়োজনমতো খাও ও পান করো,
অপচয় থেকে বাঁচো,
রবের দেওয়া নিয়ামত পেয়ে
কৃতজ্ঞতার পথে চলো।
নিয়ামতের প্রকৃত কৃতজ্ঞতা
শুধু কথাতে নয়,
আল্লাহ যেভাবে চান জীবন
সেভাবেই গড়ে হয়।
ধন-সম্পদ, ঘরবাড়ি আর
বাগান, ক্ষেত, খামার,
সবই থাকবে কিছুদিন পরে—
থাকবে না তো আর।
আজকে যারা আপনজন,
আজকে যারা সাথি,
একদিন সবাই চলে যাবে
নিজ নিজ পরপথে যাত্রী।
দুনিয়ার এই ক্ষণিক জীবন
স্থায়ী ঠিকানা নয়,
মৃত্যু এসে বলে দেবে—
এ জীবন আর নয়।
তাই দুনিয়ার কাজ করো, তবে
আখিরাতকে ভুলো না,
হালাল পথে জীবন গড়ো,
হারাম পথে চলো না।
হঠাৎ একদিন আসবে ক্ষণ,
বিকট হবে আওয়াজ,
কেঁপে উঠবে চারদিক তখন,
থামবে দুনিয়ার কাজ।
যে পৃথিবী আপন মনে হতো,
হবে সেদিন ভিন্ন,
মানুষ বুঝবে—শেষ হয়েছে
দুনিয়ার সেই দিন।
ধনীর ধন আর গরিবের কষ্ট,
রাজা-প্রজার ভেদ,
সবকিছুরই হিসাব হবে,
থাকবে না কোনো ছেদ।
সেদিন মানুষ পালাবে ভাইয়ের
থেকে বহুদূরে,
মা-বাবারও কাছে যাবে না
ভয়ের ভারে ঘুরে।
স্ত্রী ও সন্তান—প্রিয়তম যারা,
থাকবে না সে পাশে,
নিজের আমল, নিজের হিসাব
তাকে রাখবে ত্রাসে।
দুনিয়াতে যে মা সন্তানের
জন্য কাঁদে রাতে,
সেই সম্পর্কও সেদিন যেন
ব্যস্ত নিজের প্রভাতে।
ভাইয়ের প্রতি ভাইয়ের ভালোবাসা
থামবে না দুনিয়াতে,
কিন্তু কিয়ামতের ভয়াবহতা
বুঝায় এই আয়াতে।
সেদিন সবার নিজের চিন্তা,
নিজের আমল-খাতা,
কে কী করেছে জীবনে তার
হবে পূর্ণ বারতা।
কে সালাতের হক আদায় করেছে,
কে করেছে অবহেলা,
কে সত্য পথে জীবন চালায়,
কে করেছে ছলাকলা।
কে মানুষের হক মেরেছে,
কে করেছে ইনসাফ,
কে গোপনে পাপ করেছে,
কে রেখেছে আল্লাহর ভয়-আশ্রয়।
সবই হবে প্রকাশিত সেদিন,
থাকবে না কিছু গোপন,
মানুষ তখন বুঝবে এসে
আমল কত আপন।
সেদিন কিছু মুখ উজ্জ্বল হবে,
হাসবে আনন্দভরে,
দুনিয়ার কষ্ট ভুলে গিয়ে
রহমতের আশ্রয় ধরে।
ঈমান ছিল যাদের বুকে,
আমল ছিল ভালো,
আল্লাহর ভয় ও ভালোবাসায়
জীবন ছিল আলো।
সালাত ছিল জীবনের সাথি,
সত্য ছিল ভাষায়,
মানুষের হক রক্ষা করেছে
আল্লাহরই আশায়।
গুনাহ হলে তাওবা করেছে,
ফিরেছে রবের দ্বারে,
সৎকর্ম নিয়ে চলেছে যারা
দুনিয়ার অন্ধকারে।
আবার কিছু মুখ সেদিন হবে
মলিন, কালিমাময়,
দুনিয়ার মিথ্যা গর্ব তখন
থাকবে না কোনো জয়।
যারা সত্য অস্বীকার করেছে,
অবাধ্যতায় মেতেছে,
আল্লাহর দেওয়া জীবন পেয়ে
রবকে ভুলে গেছে।
পাপের পথে ছুটেছে যারা,
সত্য থেকে সরে,
সেদিন তাদের ভয়াবহ ফল
প্রকাশ পাবে পরে।
কুরআনের এই সতর্কবাণী
শুনে আজই জাগো,
ভুলের পথে আর না গিয়ে
তাওবার পথে লাগো।
মৃত্যু কখন আসবে কারও
জানা নেই তো ভাই,
তাই তাওবার সুযোগ পেলে
দেরি করা চাই?
আজ যে সুযোগ, কাল নাও থাকতে
পারে এই জীবন,
তাই তো এখনই ফিরতে হবে
দয়াময় আল্লাহর শরণ।
ভুল করেছি—স্বীকার করে
ক্ষমা চাইতে হবে,
অন্যায় ছেড়ে সত্যের পথে
ফিরে আসতে হবে।
মানুষের হক নষ্ট করলে
ফিরিয়ে দিতে হবে,
জুলুম করে থাকলে তবে
সংশোধন করতে হবে।
কুরআন হবে পথের আলো,
সুন্নাহ হবে দিশা,
ঈমান হবে অন্তরজুড়ে
সত্যের নির্মল নিশা।
তাওহীদের সেই দৃঢ় বিশ্বাস
রাখো হৃদয় মাঝে,
আল্লাহ ছাড়া কোনো উপাস্য
নেই—এই সত্য সাজে।
শিরক থেকে বাঁচো সবাই,
কুফর থেকে দূরে,
সুন্নাহ মেনে জীবন গড়ো
সত্যের পথ ধরে।
হালাল পথে উপার্জন করো,
হারাম থেকে বাঁচো,
ইনসাফ, দয়া, সত্য, আমানত—
জীবনজুড়ে রাখো।
মা-বাবাকে সম্মান করো,
সন্তানকে দাও শিক্ষা,
স্বামী-স্ত্রী পরস্পরের প্রতি
রাখো ভালোবাসা ও দীক্ষা।
পরিবার শুধু দুনিয়ার নয়,
আখিরাতের সাথি,
সত্য ও নেকির পথে চললে
হবে জীবনের গাঁথি।
সন্তানের হাতে সম্পদ দেওয়ার
আগে দাও ঈমান,
সততা, আদব, নৈতিকতা—
এসবই বড় দান।
নিজে যদি ভালো হও তুমি,
শিশু শিখবে দেখে,
পরিবারের চরিত্র গড়ে
প্রতিদিনের লেখে।
সময় চলে নদীর স্রোতের
মতো অবিরাম,
ফিরে আসে না হারানো ক্ষণ,
যতই করি কাম।
আজকের দিন আজই কাজে
লাগাও সুন্দর করে,
সৎকর্ম দিয়ে জীবন সাজাও
আল্লাহর ভয় ধরে।
যে সময় যায় গাফিলতিতে,
ফিরবে না সে কাল,
তাই তো মুমিন হিসাব রাখে—
কী করলাম সকাল-সন্ধ্যাকাল।
সফলতা শুধু ধন নয় ভাই,
শুধু নয় সম্মান,
সফলতা হলো রবের কাছে
গ্রহণযোগ্য প্রাণ।
দুনিয়াতে সম্মান পেলেও
আখিরাতে যদি হার,
সে তো আসলে সফল নয়—
জীবন হলো ভার।
যে ব্যক্তি ঈমান নিয়ে
সৎকর্ম করে যায়,
আল্লাহর সন্তুষ্টির পথে
নিজেকে গড়ে নেয়।
সেই তো সত্য সফল মানুষ,
সেই তো জয়ের পথ,
দুনিয়া পেরিয়ে আখিরাতে
পাবে রবের রহমত।
হে মানুষ, আজ খাদ্যের দিকে
একটু ফিরে তাকাও,
অন্ন-পানি, ফল ও শস্যে
রবের নিদর্শন দেখাও।
মাটির বুকে বীজের মাঝে
কুদরত চিনে নাও,
বৃষ্টিধারায় দয়ার সাগর
মনে জাগিয়ে নাও।
দুনিয়ার মোহে হারিয়ে গিয়ে
আখিরাতকে ভুলো না,
সম্পদ পেয়ে অহংকারে
নিজেকে হারিয়ো না।
কিয়ামতের সেই দিনের কথা
প্রতিদিন মনে রাখো,
নিজের আমল শুদ্ধ করে
সত্যের পথে থাকো।
আজ যে মুখে হাসি ফুটে
আছে দুনিয়ার আলো,
কাল সে মুখও উজ্জ্বল হবে
যদি আমল হয় ভালো।
হে আল্লাহ, তুমি রিজিকদাতা,
তুমিই দয়ার সাগর,
তোমার দানে বাঁচে পৃথিবী,
তোমার কুদরত আগর।
হালাল রিজিক দাও আমাদের,
কৃতজ্ঞ করো প্রাণ,
তোমার দেওয়া প্রতিটি দান
মানি যেন মহান।
অপচয় আর অহংকার থেকে
রক্ষা করো প্রভু,
গুনাহ থেকে ফিরিয়ে এনে
সত্যের পথে রাখো।
তাওহীদের বিশ্বাস দাও দৃঢ়,
শিরক থেকে বাঁচাও,
কুরআন-সুন্নাহর সরল পথে
জীবনভর চালাও।
মা-বাবার হক আদায় করি,
পরিবার রাখি ভালো,
মানুষের হক ফিরিয়ে দিয়ে
জীবন করি আলো।
কিয়ামতের সেই কঠিন দিনে
যখন হবে হিসাব,
আমাদের মুখ উজ্জ্বল করো—
এই আমাদের আকুল আবেদন।
মলিন মুখের দলে যেন
আমাদের রেখো না,
তোমার রহমত থেকে কোনোদিন
আমাদের বঞ্চিত কোরো না।
দুনিয়ার ক্ষণিক জীবন শেষে
যখন যাব চলে,
ঈমান নিয়ে ফিরতে দিও
তোমারই দরবারে।
সৎকর্ম দিয়ে জীবন ভরাও,
তাওবা কবুল করো,
আখিরাতে তোমার রহমতে
সফলতা দান করো।
হে আল্লাহ, তোমার নিয়ামত চিনে
তোমারই শুকরিয়া করি;
তোমার পথে জীবন গড়ে
তোমারই সন্তুষ্টি ধরি।
দুনিয়ার মোহ পেরিয়ে যেন
আখিরাতের পথে যাই,
উজ্জ্বল মুখে তোমার রহমত
পাওয়ার আশা চাই।
হে আল্লাহ, আমাদের ঈমান অটুট রাখো,
আমল কবুল করো,
সত্যের পথে অবিচল রেখে
তোমার সন্তুষ্টিতে
রাখো।
আমিন
(সূরা আবাসা২৪-৪২ এর আলোকে)
১৪
২৪ মন্তব্য