প্রধান শিক্ষক
১৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ১০:৪৪ অপরাহ্ণ
প্রধান শিক্ষক
রুচি, ব্যক্তিত্ব ও দায়িত্ববোধে অনন্য এক শিক্ষক
জনাব মোঃ মহবুবর রহমান স্যার
কিছু মানুষকে মনে পড়ে তাঁদের বলা কথার জন্য। কিছু মানুষকে মনে পড়ে তাঁদের কাজের জন্য। আবার এমন কিছু বিরল মানুষ আছেন, যাঁদের কথা, কাজ, চলন, পোশাক, ব্যক্তিত্ব এবং মানুষের প্রতি দায়িত্ববোধ—সবকিছু মিলেই হয়ে ওঠে একটি সময়ের উজ্জ্বল স্মারক।
কালীগঞ্জ করিম উদ্দিন পাবলিক পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়ের অত্যন্ত জনপ্রিয় ইংরেজি শিক্ষক জনাব মোঃ মহবুবর রহমান স্যার ছিলেন তেমনই একজন মানুষ। তিনি শ্রেণিকক্ষে প্রবেশ করলে শিক্ষার্থীরা শুধু একজন শিক্ষককে দেখত না; তারা দেখত পরিপাটি, আধুনিক, আত্মবিশ্বাসী ও অনুকরণীয় এক ব্যক্তিত্বকে। পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন পোশাক, সুন্দরভাবে শার্ট ইন করা, পায়ে চকচকে জুতা, শরীরে মৃদু সুগন্ধি আর গুছিয়ে কথা বলার অসাধারণ ক্ষমতা—সব মিলিয়ে তিনি ছিলেন তাঁর সময়ের কালীগঞ্জের শিক্ষকসমাজে এক স্বতন্ত্র নাম।
শিক্ষার্থীরা তাঁর কাছে ইংরেজি শিখত। পাশাপাশি শিখত কীভাবে পরিচ্ছন্ন থাকতে হয়, মার্জিতভাবে কথা বলতে হয়, আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে চলতে হয় এবং একজন আধুনিক ও দায়িত্বশীল মানুষ হিসেবে নিজেকে গড়ে তুলতে হয়। তাই মাহবুব স্যার শুধু ইংরেজি বিষয়ের শিক্ষক ছিলেন না—তিনি ছিলেন একটি প্রজন্মের রুচি, আধুনিকতা ও সামাজিক দায়িত্ববোধের শিক্ষক।
১৯৪১ সালের ২৩ অক্টোবর লালমনিরহাট জেলার কালীগঞ্জ উপজেলার ভোটমারী ইউনিয়নের শ্রুতিধর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন জনাব মোঃ মহবুবর রহমান। তাঁর পিতা মোঃ শাহ আলম এবং মাতা মোছাঃ সৈয়দা খাতুন। গ্রামের সহজ-সরল পরিবেশে বেড়ে উঠলেও তাঁর দৃষ্টি ছিল শিক্ষার বিস্তৃত জগতের দিকে। তিনি বুঝেছিলেন—শিক্ষা শুধু ব্যক্তিগত উন্নতির মাধ্যম নয়; শিক্ষা মানুষকে আত্মমর্যাদাশীল করে, সমাজকে আলোকিত করে এবং একটি জাতিকে এগিয়ে নিয়ে যায়।
সেই সময় গ্রামাঞ্চলে উচ্চশিক্ষার সুযোগ ছিল অত্যন্ত সীমিত। যোগাযোগব্যবস্থা অনুন্নত, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান অপ্রতুল এবং সাধারণ পরিবারের সন্তানদের জন্য পড়াশোনার পথ ছিল নানা প্রতিবন্ধকতায় পরিপূর্ণ। এমন বাস্তবতার মধ্যেও তিনি শিক্ষার পথ থেকে সরে যাননি। ১৯৫৮ সালে ম্যাট্রিক পাস করেন তিনি। ১৯৬০ সালে সম্পন্ন করেন আইএ এবং ১৯৬৬ সালে অর্জন করেন বিএ ডিগ্রি।
আজকের সময়ে এই শিক্ষাগত অর্জনগুলো সাধারণ মনে হতে পারে। কিন্তু সেই সময়ের গ্রামীণ সমাজের বাস্তবতায় এটি ছিল গভীর অধ্যবসায়, প্রবল ইচ্ছাশক্তি এবং শিক্ষার প্রতি অটুট নিষ্ঠার এক গৌরবময় দৃষ্টান্ত। নিজে শিক্ষার আলোয় আলোকিত হয়ে তিনি সেই আলো ছড়িয়ে দেওয়ার জন্য বেছে নেন শিক্ষকতার মহান পেশা।
১৯৬৯ সালের ১ ফেব্রুয়ারি জনাব মোঃ মহবুবর রহমান স্যার সহকারী শিক্ষক হিসেবে যোগদান করেন কালীগঞ্জ করিম উদ্দিন পাবলিক পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়ে। তখন তাঁর নির্ধারিত মাসিক বেতন ছিল মাত্র ২৩০ টাকা।
কিন্তু একজন শিক্ষকের মূল্য কি কখনো তাঁর বেতনের অঙ্ক দিয়ে নির্ধারণ করা যায়? মাহবুব স্যারের প্রকৃত অর্জন ছিল তাঁর শিক্ষার্থীদের ভালোবাসা, সহকর্মীদের সম্মান এবং সমাজের মানুষের নিঃশর্ত আস্থা। তাঁর শ্রেণিকক্ষ ছিল শুধু পাঠদানের স্থান নয়; সেটি ছিল ভাষা, আত্মবিশ্বাস, শৃঙ্খলা, রুচি ও ব্যক্তিত্ব গঠনের এক জীবন্ত কর্মশালা।
তিনি এমন এক সময়ে ইংরেজি শিক্ষা দিতেন, যখন গ্রামাঞ্চলের অধিকাংশ শিক্ষার্থীর কাছে ইংরেজি ছিল ভীতি ও সংকোচের বিষয়। অনেক শিক্ষার্থী মনে করত, ইংরেজি বুঝি শুধু শহরের মানুষ কিংবা বিশেষ সুবিধাপ্রাপ্ত শিক্ষার্থীদের ভাষা। মাহবুব স্যার সেই ভয় দূর করার চেষ্টা করেছিলেন। তাঁর গুছিয়ে বলা কথা, সুন্দর উচ্চারণ, আত্মবিশ্বাসী উপস্থাপন এবং মার্জিত আচরণ শিক্ষার্থীদের মনে ইংরেজি শেখার আগ্রহ সৃষ্টি করত। তিনি তাঁর ব্যক্তিত্ব দিয়েই বুঝিয়ে দিতেন—গ্রামে জন্মগ্রহণ করেও আধুনিক, শিক্ষিত, পরিশীলিত ও আত্মবিশ্বাসী মানুষ হওয়া সম্ভব।
তাঁকে দেখে অনেক শিক্ষার্থী স্বপ্ন দেখত—
“একদিন আমিও মাহবুব স্যারের মতো আধুনিক, স্মার্ট ও সুন্দর ব্যক্তিত্বের মানুষ হব।” একজন শিক্ষকের জীবনে এর চেয়ে বড় সাফল্য আর কী হতে পারে—যখন শিক্ষার্থীরা শুধু তাঁর পাঠ নয়, তাঁর আদর্শ ও ব্যক্তিত্বকেও অনুসরণ করতে চায়?
তৎকালীন কালীগঞ্জে মাহবুব স্যার সবচেয়ে স্মার্ট ইংরেজি শিক্ষকদের একজন হিসেবে পরিচিত ছিলেন। তাঁর এই স্মার্টনেস কেবল বাহ্যিক পোশাক কিংবা চলাফেরার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। এর গভীরে ছিল জ্ঞান, আত্মবিশ্বাস, শৃঙ্খলা, পরিমিতিবোধ এবং অন্যের প্রতি সম্মান। তাঁর পোশাক থাকত পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন। শার্ট সবসময় সুন্দরভাবে ইন করা থাকত। পায়ের জুতা থাকত চকচকে ও পরিপাটি। শরীরে ব্যবহার করতেন সুগন্ধি বা সেন্ট। তাঁর উপস্থিতির মধ্যেই ছিল একধরনের সজীবতা ও আভিজাত্য। কিন্তু বাহ্যিক পরিপাট্যের চেয়েও বেশি আকর্ষণীয় ছিল তাঁর কথা বলার ধরন। তিনি কথা বলতেন ধীরে, স্পষ্টভাবে এবং অত্যন্ত গুছিয়ে। অপ্রয়োজনীয় শব্দ কিংবা অসংলগ্ন বক্তব্য তাঁর কথায় খুব কমই পাওয়া যেত। তাঁর বক্তব্যে থাকত যুক্তি, সৌজন্য এবং আত্মবিশ্বাসের অপূর্ব সমন্বয়। তিনি যেন নিজের জীবন দিয়েই শিক্ষার্থীদের শিখিয়েছিলেন—পরিচ্ছন্ন পোশাক অহংকার নয়; এটি আত্মসম্মান ও শৃঙ্খলার প্রকাশ। মার্জিত ভাষা দুর্বলতা নয়; এটি শিক্ষিত মানসিকতার পরিচয়। আর আধুনিকতা মানে নিজস্ব সংস্কৃতি ও মূল্যবোধ ভুলে যাওয়া নয়; আধুনিকতা মানে জ্ঞান, রুচি ও মানবিকতায় নিজেকে উন্নত করা।
ইংরেজি ভাষা শেখানোর পাশাপাশি মাহবুব স্যার শিক্ষার্থীদের মধ্যে আত্মবিশ্বাস সৃষ্টি করতেন। তিনি জানতেন, একটি নতুন ভাষা আয়ত্ত করতে হলে আগে ভয় ও সংকোচ দূর করতে হয়। তাঁর সামনে কোনো শিক্ষার্থী ভুল ইংরেজি বললে তিনি হয়তো সংশোধন করতেন, কিন্তু তাকে অপমান করে শেখার আগ্রহ নষ্ট করতেন না। তিনি চাইতেন শিক্ষার্থীরা চেষ্টা করুক, ভুল থেকে শিখুক এবং ধীরে ধীরে নিজের জড়তা কাটিয়ে উঠুক।
তাঁর পাঠদানের প্রভাবে অনেক শিক্ষার্থী উচ্চশিক্ষা, চাকরি এবং বৃহত্তর কর্মজীবনের জন্য প্রস্তুত হয়েছে। ইংরেজি ভাষার পাশাপাশি তাঁর কাছ থেকে পাওয়া আত্মবিশ্বাস তাঁদের জীবনের নানা কঠিন মুহূর্তে সাহস জুগিয়েছে।
একজন শিক্ষক কতটি বাক্য শিখিয়েছেন, তার হিসাব হয়তো পাঠ্যসূচিতে পাওয়া যায়। কিন্তু তিনি কতজন শিক্ষার্থীর ভয় দূর করেছেন, কতজনের মনে স্বপ্ন জাগিয়েছেন এবং কতজনকে আত্মবিশ্বাসী মানুষ হিসেবে গড়ে তুলেছেন—তার হিসাব কোনো নথিতে লেখা থাকে না। সেই হিসাব লেখা থাকে শিক্ষার্থীদের জীবনে।
মাহবুব স্যারের কর্মক্ষেত্র শুধু বিদ্যালয়ের শ্রেণিকক্ষের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। সমাজের সর্বস্তরের মানুষের কাছে তাঁর গ্রহণযোগ্যতা ছিল ব্যাপক। গ্রামের সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে শিক্ষিত সমাজ, অভিভাবক, জনপ্রতিনিধি এবং বিভিন্ন পেশার মানুষ—সবার কাছেই তিনি ছিলেন বিশ্বাসযোগ্য ও সম্মানিত ব্যক্তি। সমাজে কোনো সমস্যা দেখা দিলে তিনি পাশ কাটিয়ে চলে যেতেন না। অন্য কেউ উদ্যোগ নেবে—এই অপেক্ষায়ও বসে থাকতেন না। সবার আগে এগিয়ে যেতেন। মানুষের কথা শুনতেন, সমস্যার প্রকৃত কারণ বোঝার চেষ্টা করতেন এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে কথা বলে সমাধানের পথ তৈরি করতেন। শুধু উপস্থিত হয়ে দায়িত্ব শেষ করতেন না। সমস্যার একটি গ্রহণযোগ্য সমাধান না হওয়া পর্যন্ত তিনি বাড়ি ফিরতেন না। এই একটি বৈশিষ্ট্যই তাঁর সামাজিক দায়িত্ববোধের গভীরতা প্রকাশ করে। তিনি বিশ্বাস করতেন, শিক্ষিত মানুষের দায়িত্ব শুধু নিজের পরিবার কিংবা পেশার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। সমাজের অন্যায়, বিরোধ, সংকট ও দুর্ভোগের সময় তাঁকে সামনে দাঁড়াতে হবে। আজকের সমাজের জন্য মাহবুব স্যারের জীবন এখানেই একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা রেখে যায়। আমরা অনেকেই সমস্যার কথা বলি, অভিযোগ করি কিংবা দূরে দাঁড়িয়ে সমালোচনা করি। কিন্তু সমাধানের জন্য এগিয়ে আসতে চাই না। মাহবুব স্যার দেখিয়েছিলেন—সামাজিক নেতৃত্ব মানে পদ-পদবি নয়; মানুষের সমস্যাকে নিজের সমস্যা মনে করে সমাধানের দায়িত্ব গ্রহণ করাই প্রকৃত নেতৃত্ব।
সমাজের নানা স্তরের মানুষের কাছে তাঁর গ্রহণযোগ্যতা তৈরি হয়েছিল শুধু তাঁর শিক্ষাগত যোগ্যতা কিংবা চমৎকার ব্যক্তিত্বের কারণে নয়। এর পেছনে ছিল সততা, নিরপেক্ষতা এবং মানুষের কল্যাণে কাজ করার মানসিকতা। তিনি কারও সমস্যাকে ছোট করে দেখতেন না। সামাজিক মর্যাদা কিংবা আর্থিক অবস্থার ভিত্তিতে মানুষকে বিচার করতেন না। তাঁর কাছে গুরুত্বপূর্ণ ছিল সত্য, ন্যায় এবং সমস্যার স্থায়ী সমাধান। তাঁর কথার ওজন ছিল, কারণ মানুষ জানত—মাহবুব স্যার ব্যক্তিগত স্বার্থে কথা বলেন না। তিনি যে মত দেন, তা বিবেক ও ন্যায়বোধ থেকেই দেন। সমাজে গ্রহণযোগ্যতা কখনো দাবি করে পাওয়া যায় না। দীর্ঘদিনের সৎ আচরণ, দায়িত্বশীল ভূমিকা এবং মানুষের পাশে থাকার মধ্য দিয়েই তা অর্জন করতে হয়। মাহবুব স্যার নিজের জীবন ও কর্ম দিয়ে সেই গ্রহণযোগ্যতা অর্জন করেছিলেন।
১৯৬৯ সালের ১ ফেব্রুয়ারি থেকে ২০০১ সালের ২২ অক্টোবর পর্যন্ত—দীর্ঘ বত্রিশ বছরেরও বেশি সময় তিনি কালীগঞ্জ করিম উদ্দিন পাবলিক পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করেছেন।
এই দীর্ঘ সময়ে তাঁর সামনে দিয়ে অগণিত শিক্ষার্থী বিদ্যালয় অতিক্রম করেছে। ছোট্ট কিশোরেরা তাঁর শ্রেণিকক্ষে ইংরেজি শিখেছে, বড় হওয়ার স্বপ্ন দেখেছে এবং একসময় দেশ-বিদেশের নানা কর্মক্ষেত্রে ছড়িয়ে পড়েছে। কেউ হয়তো সরকারি কর্মকর্তা হয়েছেন, কেউ শিক্ষক, কেউ চিকিৎসক, কেউ ব্যবসায়ী, কেউ সমাজকর্মী কিংবা অন্য কোনো পেশায় প্রতিষ্ঠিত হয়েছেন। কিন্তু তাঁদের ব্যক্তিত্ব, শৃঙ্খলা এবং আত্মবিশ্বাসের কোনো একটি অংশে হয়তো আজও মাহবুব স্যারের প্রভাব রয়ে গেছে।
২০০১ সালের ২২ অক্টোবর তিনি শিক্ষকতা থেকে অবসর গ্রহণ করেন—নিজের ষাটতম জন্মদিনের ঠিক এক দিন আগে। সেদিন বিদ্যালয়ের চাকরির আনুষ্ঠানিক অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটেছিল। কিন্তু একজন আদর্শ শিক্ষক কি সত্যিই অবসর গ্রহণ করেন? বিদ্যালয়ের হাজিরা খাতা থেকে তাঁর নিয়মিত স্বাক্ষর বন্ধ হয়েছিল, কিন্তু শিক্ষার্থীদের স্মৃতি থেকে তাঁর উপস্থিতি মুছে যায়নি। শ্রেণিকক্ষে তাঁর কণ্ঠ আর শোনা যেত না, কিন্তু তাঁর শেখানো ইংরেজি, শৃঙ্খলা, পরিচ্ছন্নতা ও সামাজিক দায়িত্ববোধের পাঠ শিক্ষার্থীদের জীবনে রয়ে গেছে।
মাহবুব স্যারের সহধর্মিণী মোছাঃ হামিদা বেগম। তাঁদের তিন সন্তান—সুলতানা মাহবুবা, শাহ সুফি মোঃ শাহজাহান এবং শাহ সুফি মোঃ হুমায়ুন কবির। পরিবারের কাছে তিনি ছিলেন স্নেহশীল অভিভাবক। শিক্ষার্থীদের কাছে ছিলেন অনুকরণীয় শিক্ষক। সহকর্মীদের কাছে ছিলেন ব্যক্তিত্বসম্পন্ন সহযোদ্ধা। আর সমাজের মানুষের কাছে ছিলেন সমস্যা সমাধানে এগিয়ে আসা নির্ভরযোগ্য অভিভাবক। একজন মানুষের জীবনের সার্থকতা শুধু তাঁর ব্যক্তিগত অর্জনে নয়; তিনি পরিবার, শিক্ষার্থী এবং সমাজের জন্য কী রেখে গেছেন, তার ওপর নির্ভর করে।
মাহবুব স্যার রেখে গেছেন সম্মানজনক একটি নাম, অনুকরণীয় জীবনধারা এবং মানুষের কল্যাণে কাজ করার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।
২০১৩ সালের ১ ফেব্রুয়ারি জনাব মোঃ মহবুবর রহমান স্যার পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করেন। যে তারিখে তিনি ১৯৬৯ সালে বিদ্যালয়ে যোগদান করেছিলেন, ঠিক সেই ১ ফেব্রুয়ারি তারিখেই—৪৪ বছর পর—শেষ হয় তাঁর পার্থিব জীবনযাত্রা। এই তারিখের মিল যেন এক গভীর প্রতীক বহন করে। একটি ১ ফেব্রুয়ারিতে তিনি বিদ্যালয়ে এসেছিলেন শিক্ষার আলো হাতে নিয়ে। আর আরেকটি ১ ফেব্রুয়ারিতে তিনি পৃথিবী ছেড়ে চলে গেলেন অসংখ্য শিক্ষার্থীর হৃদয়ে সেই আলো রেখে।
তাঁর মৃত্যুতে একটি পরিবার হারিয়েছিল প্রিয় অভিভাবককে। বিদ্যালয় হারিয়েছিল তার গৌরবময় ইতিহাসের এক উজ্জ্বল শিক্ষককে। আর কালীগঞ্জের মানুষ হারিয়েছিল এমন একজন সমাজসচেতন ব্যক্তিকে, যিনি সমস্যা দেখলে মুখ ফিরিয়ে নিতেন না। কিন্তু মৃত্যুই কি একজন আদর্শ শিক্ষকের শেষ পরিচয়?
না।
একজন শিক্ষক তখনই বেঁচে থাকেন, যখন তাঁর কোনো শিক্ষার্থী পরিচ্ছন্ন ও পরিপাটি হয়ে কর্মক্ষেত্রে যায়; আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে ইংরেজিতে কথা বলে; মার্জিত আচরণে মানুষের সম্মান অর্জন করে কিংবা সমাজের কোনো সমস্যা সমাধানে নিঃস্বার্থভাবে এগিয়ে আসে। সেই প্রতিটি কাজের মধ্যে মাহবুব স্যারের শিক্ষার আলো আজও জ্বলছে।
মাহবুব স্যারের জীবন শুধু স্মৃতিচারণের বিষয় নয়; তাঁর জীবন থেকে বর্তমান প্রজন্মের অনেক কিছু শেখার আছে।
তিনি শিখিয়েছেন—শিক্ষকের ব্যক্তিত্বও একটি নীরব পাঠ্যপুস্তক। শিক্ষার্থীরা শিক্ষকের মুখের কথা যতটা শেখে, তাঁর জীবনাচরণ থেকেও ততটাই শেখে। তিনি শিখিয়েছেন—পরিচ্ছন্নতা, সময়ানুবর্তিতা ও মার্জিত আচরণ মানুষের মর্যাদা বাড়ায়। তিনি শিখিয়েছেন—ইংরেজি কিংবা আধুনিক শিক্ষা নিজের শিকড় থেকে বিচ্ছিন্ন করে না; বরং মানুষকে বৃহত্তর পৃথিবীর সঙ্গে সংযুক্ত করে। তিনি শিখিয়েছেন—শিক্ষিত হওয়ার প্রকৃত অর্থ শুধু সনদ অর্জন নয়; মানুষের বিপদে এগিয়ে আসা এবং সমাজের সমস্যার সমাধানে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করা।
তিনি আরও শিখিয়েছেন—জনপ্রিয়তা কথার জোরে অর্জিত হয় না; মানুষের আস্থা অর্জন করতে হয় সততা, কাজ ও দায়িত্ববোধ দিয়ে। আজ যখন ব্যক্তিস্বার্থ অনেক ক্ষেত্রে সামাজিক দায়িত্বকে পেছনে ফেলে দিচ্ছে, তখন মাহবুব স্যারের জীবন আমাদের নতুন করে ভাবতে শেখায়। সমাজের সমস্যা শুধু প্রশাসন কিংবা জনপ্রতিনিধিদের নয়; শিক্ষক, শিক্ষার্থী এবং প্রতিটি সচেতন নাগরিকেরও দায়িত্ব রয়েছে।
সময়ের ব্যবধানে বিদ্যালয়ের অনেক কিছু বদলে গেছে। পুরোনো ভবনের জায়গায় নতুন ভবন উঠেছে। ব্ল্যাকবোর্ডের পাশে এসেছে ডিজিটাল পর্দা। ইংরেজি শেখার উপকরণ ও পদ্ধতিও পরিবর্তিত হয়েছে। কিন্তু প্রাক্তন শিক্ষার্থীদের স্মৃতিতে মাহবুব স্যার আজও সেই আগের মতোই উপস্থিত— পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন পোশাকে, শার্ট সুন্দরভাবে ইন করা, পায়ে চকচকে জুতা, গায়ে মৃদু সুগন্ধি, চোখে আত্মবিশ্বাস, আর মুখে গুছিয়ে বলা কথার সৌন্দর্য। তিনি ছিলেন এমন একজন শিক্ষক, যাঁকে দেখে শিক্ষার্থীরা আধুনিক হওয়ার স্বপ্ন দেখত। তিনি ছিলেন এমন একজন মানুষ, যাঁর কাছে সমাজের মানুষ সমস্যার সমাধান খুঁজত। তিনি ছিলেন এমন একজন ব্যক্তিত্ব, যাঁর প্রতি শ্রদ্ধা সময়ের সঙ্গে কমেনি—বরং আরও গভীর হয়েছে।
প্রিয় মাহবুব স্যার—
আপনি আজ আমাদের মাঝে নেই। কিন্তু আপনার পরিপাটি উপস্থিতি, মার্জিত আচরণ, ইংরেজি শিক্ষায় দক্ষতা, মানুষের প্রতি ভালোবাসা এবং সমাজের সমস্যা সমাধানে নিরলস ভূমিকা আজও আমাদের অনুপ্রাণিত করে। আপনি ২০০১ সালে বিদ্যালয় থেকে অবসর নিয়েছিলেন— কিন্তু শিক্ষার্থীদের হৃদয় থেকে নয়। আপনি ২০১৩ সালে পৃথিবী থেকে বিদায় নিয়েছেন— কিন্তু আপনার ব্যক্তিত্ব, আদর্শ ও কর্মের আলো আজও নিভে যায়নি।
কালীগঞ্জ করিম উদ্দিন পাবলিক পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়ের ইতিহাসে এবং আপনার অগণিত শিক্ষার্থীর স্মৃতিতে আপনি বেঁচে থাকবেন—একজন স্মার্ট ইংরেজি শিক্ষক, একজন রুচিশীল মানুষ এবং একজন দায়িত্বশীল সমাজ-অভিভাবক হিসেবে।
শ্রদ্ধা ও ভালোবাসায় আপনি চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবেন, প্রিয় মাহবুব স্যার।
১
২ মন্তব্য