প্রভাষক
১৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ০৭:৪৫ অপরাহ্ণ
“মানসিক দীনতা শোষনমুক্ত ও বৈষম্যহীন সভ্য সমাজ বিনির্মাণের অন্তরায়”
প্রায় ২০০ বছর ব্রিটিশরা ভারতীয় উপমহাদেশ শাসন করেছে। এই দীর্ঘ সময়ের শাসনকালে তারা আমাদের মধ্যে খুব ভালো করে উঁচু নিচু ভেদাভেদ তৈরি করে দিয়েছে। শুধু প্রভু ভৃত্যের সম্পর্ক তৈরি করে দেয় নাই বরং কিভাবে গোলাম বানিয়ে রাখতে হয় এবং গোলাম হয়ে থাকতে হয় কৌশলে সেই ট্রেনিংটাও দিয়ে গেছে। কিন্তু সকল যুগে ও সকল সমাজে মুক্তি পাগল কিছু মানুষ থাকে যারা অন্যায়-অবিচারের বিরুদ্ধে মাথা তুলে দাঁড়ায়। যার ফলশ্রুতিতে ব্রিটিশ শাসনের যাঁতাকল থেকে মুক্ত হয়ে যখন পাকিস্তান ও ভারত নামক দুটি আলাদা জাতিসত্বার জন্ম হলো এবং আমরা পাকিস্তানের অংশ হলাম তখনও আমাদের মধ্যে সেই চর্চা অব্যাহত রইল। তবে পৃথিবীতে সভ্যতার ক্রমবিবর্তনে মানুষ যখন উন্নতির দিকে ক্রমশ ধাবিত হওয়া শুরু করলো সেই ছোঁয়া এই অঞ্চলেও লাগলো। কিন্তু শাসন ও শোষণের প্রকৃতি ও ধরণ ঐ আগের প্রভু ভৃত্যের সম্পর্কের মতোই রয়ে গেলো। পশ্চিম পাকিস্তানিরা নিজেদেরকে সম্ভ্রান্ত ও এলিট শ্রেণি মনে করে পূর্বপাকিস্তানিদের উপর শোষণ, নির্যাতন এবং সকল ক্ষেত্রে বৈষম্য অব্যাহত রাখলো। তবে পার্থক্য হলো তখন পুঁজিবাদী সমাজ ব্যবস্থার কারণে সাধারণ মানুষের অনেকেই স্ট্রাগল করে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করে শাসক শ্রেণি কিংবা এলিট শ্রেণী পর্যায়ে নিয়ে গেলেও গন্তব্যে পৌঁছার পর নিজেই একজন শোষকে পরিণত হয়ে গেলো। চলমান শোষণ ও বৈষম্য থেকে মুক্তি পাওয়ার লক্ষ্যে রক্তক্ষয়ী স্বাধীনতা সংগ্রামের মাধ্যমে পাকিস্তান নামক রাষ্ট্র ভেঙ্গে স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের জন্ম হলো। বাঙালী জাতি এবার একেবারে ভিন্ন আঙ্গিকে নতুন করে রঙিন স্বপ্ন দেখা শুরু করলো কারণ এখন আর উড়ে এসে জুড়ে বসা ভিন্ন কোনো জাতি নয় কিংবা স্বজাতির নামে শোষণ চালিয়ে যাওয়া ধান্ধাবাজ কোনো শাসকশ্রেণি নয় বরং সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক ন্যয়বিচার এই তিন মূলনীতির উপর ভিত্তি করে স্বাধীনতা সংগ্রামের মাধ্যমে অর্জিত সদ্য স্বাধীন দেশকে সত্যিকার স্ব-জাতির ভাইয়েরা শাসন করবে। কিন্তু আবারও আশায় গুড়ে বালি তবে এবার অভাগা এ জাতি বলিষ্ঠ নেতৃত্ব ও জান বাজি রাখা মুক্তি পাগল লড়াকু সৈনিকদের কারণে বহুল আকাঙ্খিত একটি স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র পেলো বটে কিন্তু শোষণ আর বৈষম্য থেকে মুক্তি পেলো না এবং ইনসাফভিত্তিক সমাজও কায়েম হলো না। এ যেনো “যেই যায় লঙ্কায়, সেই হয় রাবণ” অবস্থা।
ব্রিটিশ শাসনামল থেকে নিয়ে শুরু করে বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রাম ও তৎপরবর্তী সবকটি শ্রেণি বৈষম্যহীন ইনসাফভিত্তিক মানবিক সমাজ বিনির্মাণের আন্দোলনে বুকের তাজা রক্তের প্রায় ৯৫% ঢেলে দেয় সমাজের সাধারণ মানুষ। অন্যদিকে ধরি মাছ না ছুঁই পানি অবস্থায় থাকা ৫% আন্দোলনকারী ও সমাজের সুবিধাবাদী এলিট শ্রেণি বরাবরের মতোই সফলতার প্রধান ঠিকাদার হয়ে যান। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হলো, সাধারণ মানুষের প্রতিনিধিত্বকারী যারা আন্দোলন সংগ্রাম ব্যর্থ হলে ফাঁসির দড়ি গলায় পরতে হতো কিংবা নির্যাতনের স্টিমরোলার বয়ে যেতো তারাই আন্দোলন সফল হওয়ার পর সুবিধাবাদী আন্দোলনকারী ও এলিট শ্রেণির সাথে মিলেমিশে একাকার হয়ে যান এবং শাসকশ্রেণী হয়ে নিজেরাই শোষক ও নিপীড়কের ভূমিকায় অবতীর্ণ হোন। ইতিহাসের ধারাবাহিকতায় বরাবরই আন্দোলন সংগ্রামে রক্তদানকারী সাধারণ মানুষ শেষ পর্যন্ত ধোঁকার শিকার হোন। শুধু তাই নয় বরং আন্দোলন সংগ্রামের লিখিত ইতিহাসে প্রকৃত নেতৃত্ব প্রদানকারী ও লড়াকু সৈনিকরা কিঞ্চিৎ ঠাঁই পেলেও অধিকাংশই ঐ সুবিধাবাদী আন্দোলনকারীরা দখল করে নেয়ার চেষ্টা অব্যাহত-ই রাখে না বরং নিজেদেরকে হিরো হিসেবে সমাজে প্রতিষ্ঠিত করতে বিভিন্ন ন্যারেটিভ দাঁড় করায়। আবারও তারা সেই বৈষম্যহীন ইনসাফভিত্তিক সভ্য সমাজ তৈরির কথা বলে শোষণই করে যায়। অভাগা এ জাতির কপালে শ্রেণি বৈষ্যহীন ইনসাফভিত্তিক মানবিক সমাজ বিনির্মাণের স্বপ্ন তখন অলীক স্বপ্নই থেকে যায়।
তবে মুদ্রার ওপিঠ বলেও একটা কথা আছে। জাতি হিসেবে আমরা বরাবরই হুজুগে, ভুলো মনা এবং বড়ই অকৃতজ্ঞ। কারণ প্রকৃতার্থে যাদের আত্মত্যাগের বিনিময়ে আমরা বহুল আকাঙ্খিত সফলতা লাভ করি তা সামান্য মিথ্যা প্রচার প্রোপাগান্ডার কাছে হার মেনে যায়। আন্দোলন সংগ্রাম ব্যর্থ হলে সাধারণ মানুষের যে সকল প্রতিনিধিত্বকারীদের ফাঁসি হতো কিংবা তাঁদের উপর নির্যাতনের স্টিমরোলার বয়ে যেতো, আন্দোলন সফল হলে মানুষ হিসেবে তাদের সামান্য চুল পরিমাণ ভুলও যেনো আমরা মেনে নিতে পারি না। তাদেরকে পরিশুদ্ধ করার নিমিত্তে সমালোচনা না করে হাসির পাত্র হিসেবে সমাজে প্রতিষ্ঠিত করতে ট্রল অব্যাহত রাখি। রাষ্ট্রের শুধু বৃহত্তর পরিসরে নয় বরং আমাদের সামাজিক জীবনের ক্ষুদ্রতর পরিসরেও এই নীতি অনুসরণ করে থাকি। যেমন- সামাজিক বৈষম্য দূরীকরণে ও আত্মমর্যাদাবোধ সম্পন্ন স্বনির্ভর জাতি গঠনের লক্ষ্যে ব্যক্তিগত কিংবা প্রাতিষ্ঠানিক পর্যায়ে কেউ উদ্যোগ নিলে অসহযোগিতা কিংবা ভ্যাটো প্রদান আমাদের চরিত্রের সাথে মিশে গেছে। ঐ যে ব্রিটিশরা আমাদেরকে প্রভু ভৃত্যের সম্পর্ক তৈরির প্রশিক্ষণ দিয়ে গেছে কিংবা পশ্চিম পাকিস্তানীরা নিজেদেরকে এলিট শ্রেণী ভেবে পূর্ব পাকিস্তানের বাঙালিদের শোষণ করে গেছে তারই ধারাবাহিকতায় ১৯৭১ সালে স্বাধীনতা অর্জনের পর আমরা বাঙালিরা প্রো ব্রিটিশ ও প্রো পাকিস্তানি রূপে নিজেদের আবির্ভুত করেছি। কারণ প্রথমে শাসক বা এলিট শ্রেণি চায় না কেউ সমাজে তাদের মতো প্রতিষ্ঠিত হোক এ জন্য তারা যতপ্রকারে বাঁধা দেয়া সম্ভব তা দেয়। তারপরও নাছোড়বান্দা কেউ যখন সামনে এগিয়ে যেতে থাকে তখন মৌন সমর্থন দিলেও চোখকান খোলা রাখে যেনো তাদের সমপর্যায়ে ওঠে না আসে। সর্বশেষ পর্যায়ে যখন কারো সাফল্যকে আর আটকে রাখা সম্ভব হয় না তখন তাকে শুধু নিজেদের দলে-ই ভিড়ায় না বরং শাসক ও এলিট শ্রেণি সবাই যৌথভাবে সর্বশক্তি দিয়ে চেষ্টা করে যেনো মনমস্তিষ্কে নূতন প্রতিষ্ঠিত ব্যক্তিকে নিজেদের মতো করে শোষক হিসেবে গড়ে তুলতে পারে। অত্যন্ত আশ্চর্যের বিষয় হলো নূতন ভাবে সভ্য সমাজ বিনির্মাণের প্রতিনিধিত্বকারীরা অধিকাংশই তখন সর্বশেষ প্রো ভার্সনে আবির্ভুত হয়ে যান। এভাবেই মানসিক বিকারগ্রস্ত জাতির এক অদ্ভুত সমাজব্যবস্থা আমরা নির্মাণ করেছি এবং তার অগ্রগতি চলমান রয়েছে। অথচ আমরা সমাজে শান্তি চাই, বৈষম্যহীন ও শোষণমুক্ত ইনসাফভিত্তিক সমাজ চাই, স্বনির্ভর জাতি হতে চাই, সর্বোপরি সভ্য সমাজ বিনির্মাণ করতে চাই কিন্তু তার জন্য সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিতে রাজি নয়, বিশাল হৃদয়ের অধিকারী হতে রাজি নয়। জাতি হিসেবে আমাদের এ কেমন মানসিক দৈন্য ? তবে কি যুগের পর যুগ এভাবেই নিজেদের তৈরি করা শাসক ও গুটিকয়েক এলিট শ্রেণীর হাতে নিজেরাই জিম্মি হয়ে থাকবো। জাতিগতভাবে গোলামীর জিঞ্জির শৃঙ্খলমুক্ত করতে হলে মানবিক মূল্যবোধ সম্পন্ন উদার মনের অধিকারী হয়ে ব্যক্তিগত ও পারিবারিক পর্যায় থেকেই তা শুরু করতে হবে। কেননা আজকের শিশুই জাতির আগামী দিনের কান্ডারী। অন্যথায় এ জাতির ভাগ্যে অনাদিকাল পর্যন্ত গোলামীর জিঞ্জির পরে থাকতে হবে এবং সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক ন্যায়বিচার সম্পন্ন ইনসাফভিত্তিক সভ্য সমাজ বিনির্মাণ ও রাষ্ট্রগঠন আকাশকুসুম কল্পনা হয়েই রয়ে যাবে।
১৪
২৪ মন্তব্য