প্রভাষক
১৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ০৭:৫১ অপরাহ্ণ
সার্টিফিকেটের যাঁতাকলে শিক্ষাব্যবস্থা !
বর্তমান যুগে শিক্ষার মান ও উদ্দেশ্য নিয়ে আলোচনা করলে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে আসে — আমরা কি সত্যিকার অর্থে জ্ঞানার্জন করছি, নাকি কেবল সার্টিফিকেট অর্জন করে নিজেদের শিক্ষিত বলে দাবি করছি ? এই প্রশ্নটি বিশেষ করে প্রাসঙ্গিক আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটে, যেখানে শিক্ষাকে শুধু একটি প্রাতিষ্ঠানিক সার্টিফিকেট বা চাকরির যোগ্যতা হিসেবে দেখা হয়।
আজকের প্রজন্মকে আমরা গর্বের সঙ্গে “শিক্ষিত” বলি। কারণ তারা স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ের গণ্ডি পার হয়ে একের পর এক সার্টিফিকেট সংগ্রহ করছে। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, এই শিক্ষার আসল প্রভাব কতটুকু ?
কর্মক্ষেত্রে তারা প্রায়ই হিমশিম খাচ্ছে কারণ তাদের অর্জিত শিক্ষার সঙ্গে কাজের চাহিদার সামঞ্জস্য নেই। এমনকি সমসাময়িক সামাজিক ও নৈতিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার ক্ষেত্রে তাদের অবদান প্রায় শূন্য।
শিক্ষাকে বলা হয় জাতির মেরুদণ্ড। একটি দেশ, শিল্প, সাহিত্য, সংস্কৃতি, তথ্য-প্রযুক্তিতে উন্নত হওয়ার পেছনে মূল নিয়ামক হিসেবে কাজ করে শিক্ষা। শিক্ষার মাধ্যমে জ্ঞান অর্জন হয় এবং মানুষ ভালো-মন্দ বুঝতে শিখে। শিক্ষার আলো ছাড়া আলোকিত জাতি গঠন যেনো আকাশকুসুম কল্পনা। শিক্ষাকে পাশ কাটিয়ে উন্নত বিবেকসম্পন্ন সভ্য জাতি গঠন কোনো ভাবেই সম্ভব নয়। অন্যদিকে সচেতন অভিভাবকমহল শিক্ষিত প্রজন্ম বিনির্মানের অন্যতম অনুষঙ্গ। আবার এই উন্নত, সভ্য শিক্ষিত জাতি গঠনের পথপ্রদর্শক হিসেবে প্রধান ভূমিকা পালন করেন একজন শিক্ষক।
পৃথিবীকে এখন বলা হয় গ্লোবাল ভিলেজ। কারণ তথ্য প্রযুক্তির উৎকর্ষতা পৃথিবীকে আমাদের হাতের মুঠোয় নিয়ে এসেছে। জ্ঞানার্জনের জন্য আমাদের বর্তমান প্রজন্মের কাছে জ্ঞানের ভান্ডার অফুরন্ত। এটাকে তারা বিশাল এক সুযোগ হিসেবে কাজে লাগাতে পারে। দায়িত্বশীল সুশিক্ষিত সুনাগরিক হিসেবে নিজেকে তৈরি করতে হলে যথাযথ শিক্ষার কোনো বিকল্প নেই। কিন্তু আমাদের বর্তমান প্রজন্ম জ্ঞান অর্জনের এ বিশাল সুযোগকে কাজে না লাগিয়ে বরং উদাসীনতার সাগরে গা ভাসিয়ে দিচ্ছে। তারা তথ্য-প্রযুক্তিকে কাজে লাগিয়ে নিজের মেধাকে শানিত করে দেশের সম্পদে পরিনত হতে পারতো। একবিংশ শতাব্দীর এই যুগে এসে সঠিক জ্ঞান অর্জন ব্যতিত শুধু সার্টিফিকেট প্রাপ্তিতে আনন্দ উল্লাসে মেতে উঠা একটা প্রজন্মকে জীবনের মূল স্রোত থেকে ছিটকে ফেলবে। যার সুদূরপ্রসারী প্রভাব শিক্ষার্থীরা তাৎক্ষণিকভাবে উপলব্ধি করতে না পারলেও ভবিষ্যতে ভুক্তভোগী হবে।
অভিভাবকরা সন্তানদের পরীক্ষার ভালো ফল এবং সার্টিফিকেট অর্জন নিয়ে যতটা গর্বিত, ততটা গুরুত্ব তারা জ্ঞানের গভীরতা ও বাস্তব প্রয়োগে এবং নৈতিকতা শিক্ষায় দেন না। সন্তান কি শিখছে বা শেখা জ্ঞানটি কিভাবে তার জীবনে কার্যকর হবে, তা নিয়ে তাদের ভাবনা তুলনামূলকভাবে কম। তাদের মধ্যে এই উপলব্ধি জাগিয়ে তুলতে অন্যতম ভূমিকা পালন করতে পারতেন আমাদের অভিভাবকবৃন্দ। কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় যে, আমাদের অভিভাবকমহল সন্তানের সার্টিফিকেট প্রাপ্তিতে যতটা না আনন্দিত হোন, শিক্ষালয় থেকে সন্তান নীতি নৈতিকতা ও মানবিক মূল্যবোধ সম্পন্ন ভালো মানুষ হিসেবে নিজেকে যোগ্য করে গড়ে তুলতে পেরেছে কি না সে বিষয়ে খোঁজ নেয়ার প্রয়োজনীতা অনুভব করেন না। জিপিএ এর প্যারামিটারে তাঁদের গর্বিত হওয়া উঠানামা করে। অথচ সুশৃঙ্খল জ্ঞান ও মানবিক মূল্যবোধসম্পন্ন শিক্ষিত প্রজন্ম বিনির্মানে অভিভাবকমহল হতে পারতেন শাসন ক্ষমতাবিহীন শৃঙ্খলাবদ্ধ একজন শিক্ষকের সহযোগী। অথচ অভিভাবকবৃন্দের স্মরণ রাখা উচিত যে, দিনশেষে সন্তান তার বাবা-মায়ের ঘরেই ফিরে যায়। এই বোধ মনের মধ্যে জাগ্রত করতে শিক্ষার্থীদেরকে যেমন উদ্যমী হতে হবে ঠিক একইভাবে অভিভাবকমহলকে উদ্যোগী ও শিক্ষকদের সহযোগী হিসেবে ভূমিকা পালন করতে হবে। সর্বোপরি সরকারের উচিত হলো শিক্ষার্থীদেরকে শৃঙ্খলার ভিতর নিয়ে আসতে শুধু যুগোপযোগী নয় বরং সমাজ উপযোগী কিছু আইন প্রণয়ন করা। অন্যথায় নীতি নৈতিকতা বিবর্জিত সার্টিফিকেটধারি শিক্ষিত প্রজন্ম দিয়ে দেশের শিক্ষাখাতের পরিসংখ্যানে পরিবর্তন আসতে পারে কিন্তু নীতি নৈতিকতা ও মানবিক মূল্যবোধ সম্পন্ন সমাজ বিনীর্মানে কোনো পরিবর্তন আসবে বলে মনে করি না।
১৪
২৪ মন্তব্য