সহকারী অধ্যাপক
১৮ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ০৪:৪০ পূর্বাহ্ণ
আশার আলোয় আল্লাহর অনুগ্রহ
|
|
আশার আলোয় আল্লাহর অনুগ্রহ
(সূরা আদ-দুহার আলোকে হতাশা থেকে আশার পথে, দুঃখ থেকে সান্ত্বনার পথে)
মোঃ মুজিবুর রহমান
সহকারী অধ্যাপক
মোজাদ্দেদীয়া ইসলামিয়া আলিম মাদ্রাসা, কালিয়াকৈর, গাজীপুর
মানুষের জীবন কখনো আলোয় ভরে ওঠে, আবার কখনো নেমে আসে দুঃখ, কষ্ট, অনিশ্চয়তা ও নিঃসঙ্গতার অন্ধকার। কখনো মনে হয়—কেউ বুঝি পাশে নেই, দোয়া কবুল হচ্ছে না, জীবনের পথ যেন থমকে গেছে। দীর্ঘ প্রতীক্ষা, বিপদ কিংবা মানসিক কষ্টের সময় মানুষ সহজেই হতাশ হয়ে পড়তে পারে। কিন্তু একজন মুমিনের জন্য হতাশা শেষ কথা নয়। কারণ সে জানে—আল্লাহ তাঁর বান্দাকে কখনো অযত্নে ছেড়ে দেন না।
এই গভীর সত্যকে হৃদয়ে প্রতিষ্ঠিত করে পবিত্র কুরআনের ৯৩তম সূরা—সূরা আদ-দুহা। মাত্র এগারো আয়াতের এই সূরায় রয়েছে সান্ত্বনা, আশ্বাস, কৃতজ্ঞতা, মানবিকতা ও দায়িত্ববোধের অসাধারণ শিক্ষা। সূরার শুরুতে আল্লাহ তাআলা পূর্বাহ্নের উজ্জ্বল আলো এবং রাতের নিস্তব্ধতার শপথ করে তাঁর প্রিয় নবী মুহাম্মদ ﷺ-কে আশ্বস্ত করেছেন যে, তাঁর রব তাঁকে পরিত্যাগ করেননি এবং তাঁর প্রতি অসন্তুষ্ট নন। এরপর আখিরাতের শ্রেষ্ঠত্ব, আল্লাহর অতীত অনুগ্রহ এবং সেই অনুগ্রহের বাস্তব কৃতজ্ঞতা প্রকাশের পথ দেখানো হয়েছে।
১. আলো ও রাতের শপথে আশার বার্তা
وَالضُّحَىٰ
وَاللَّيْلِ إِذَا سَجَىٰ
অর্থাৎ, “পূর্বাহ্নের শপথ; এবং রাতের শপথ, যখন তা নিস্তব্ধ হয়।”
দিবসের আলো এবং রাতের নীরবতা—প্রকৃতির দুটি ভিন্ন অবস্থা। কখনো জীবন আলোকিত, কখনো তা অন্ধকারাচ্ছন্ন। কখনো কর্মব্যস্ততা, কখনো নীরব অপেক্ষা। কিন্তু দিন যেমন রাতের পর আসে, তেমনি দুঃখের পর স্বস্তি আসতে পারে।
মুমিনের জীবনে তাই দুঃসময় এলেই ভেঙে পড়া উচিত নয়। রাত যত দীর্ঘই হোক, আল্লাহর ইচ্ছায় তার পরেও আলো আসে। পরীক্ষার সময় যত কঠিনই হোক, আল্লাহর রহমতের দরজা কখনো বন্ধ হয় না।
২. আল্লাহ তাঁর বান্দাকে পরিত্যাগ করেন না
আল্লাহ তাআলা বলেন—
مَا وَدَّعَكَ رَبُّكَ وَمَا قَلَىٰ
অর্থাৎ, “আপনার রব আপনাকে পরিত্যাগ করেননি এবং আপনার প্রতি অসন্তুষ্টও হননি।”
এটি অত্যন্ত সান্ত্বনাময় ঘোষণা। নবী ﷺ-এর জীবনে ওহির বিরতির একটি সময় এসেছিল। সেই সময়ে মুশরিকদের কটূক্তি ও বিদ্রূপের বিপরীতে আল্লাহ তাআলা তাঁকে সান্ত্বনা দেন এবং জানান—তাঁর রব তাঁকে ত্যাগ করেননি।
এখানে আমাদের জন্যও গভীর শিক্ষা রয়েছে। জীবনে কোনো দুঃখ, বিলম্ব বা পরীক্ষা এলেই এমন ধারণা করা ঠিক নয় যে, “আল্লাহ আমাকে ছেড়ে দিয়েছেন।”
বরং মুমিনের বিশ্বাস হবে—
আল্লাহ দেখছেন, আল্লাহ জানেন, আল্লাহ শুনছেন এবং আল্লাহর সিদ্ধান্তই সর্বাধিক প্রজ্ঞাময়।
দোয়ার উত্তর কখনো দ্রুত আসে, কখনো বিলম্বিত হয়, আবার কখনো আল্লাহ বান্দার জন্য অন্য কোনো কল্যাণ নির্ধারণ করেন। তাই বিপদের মুহূর্তে ঈমানদারের অস্ত্র হলো—সবর, সালাত, দোয়া, তাওয়াক্কুল ও আল্লাহর ওপর দৃঢ় আস্থা।
৩. আখিরাতই প্রকৃত শ্রেষ্ঠ গন্তব্য
আল্লাহ তাআলা বলেন—
وَلَلْآخِرَةُ خَيْرٌ لَّكَ مِنَ الْأُولَىٰ
অর্থাৎ, “নিশ্চয়ই পরবর্তী জীবন আপনার জন্য প্রথম জীবনের চেয়ে উত্তম।”
দুনিয়া মানুষের জন্য পরীক্ষার স্থান। এখানে আনন্দ আছে, দুঃখ আছে; সাফল্য আছে, ব্যর্থতা আছে; সম্পদ আছে, অভাব আছে; সুস্থতা আছে, অসুস্থতা আছে। কোনো কিছুই স্থায়ী নয়।
অন্যদিকে আখিরাত হলো স্থায়ী জীবনের স্থান। তাই একজন মুমিন দুনিয়াকে উপেক্ষা করবে না, কিন্তু দুনিয়াকেই জীবনের চূড়ান্ত লক্ষ্য বানাবে না।
সে দুনিয়ায় হালাল উপার্জন করবে, পরিবারকে দেখবে, জ্ঞান অর্জন করবে, মানুষের কল্যাণে কাজ করবে; কিন্তু সবকিছুর সঙ্গে আখিরাতের সফলতার কথা মনে রাখবে।
দুনিয়ার সাময়িক অর্জনের চেয়ে আল্লাহর সন্তুষ্টি ও আখিরাতের সফলতাই হবে তার প্রধান লক্ষ্য।
৪. আল্লাহর দান একদিন বান্দাকে সন্তুষ্ট করবে
আল্লাহ বলেন—
وَلَسَوْفَ يُعْطِيكَ رَبُّكَ فَتَرْضَىٰ
অর্থাৎ, “অচিরেই আপনার রব আপনাকে দান করবেন, ফলে আপনি সন্তুষ্ট হবেন।”
এই আয়াত মুমিনের অন্তরে আশার আলো জ্বালায়।
আজ যা কষ্ট, তা হয়তো আগামী দিনের শিক্ষার কারণ। আজ যে দরজা বন্ধ মনে হচ্ছে, আল্লাহ চাইলে তার চেয়েও উত্তম দরজা খুলে দিতে পারেন। আজ যে দুঃখ চোখে পানি আনে, আল্লাহ চাইলে সেই দুঃখই আগামী দিনের আনন্দের কারণ হতে পারে।
তাই দুঃসময়ে মুমিন বলবে না—“আমার আর কোনো পথ নেই।”
বরং বলবে—
“আমার রব আছেন; তাঁর রহমত আছে; তাঁর সিদ্ধান্তে হিকমত আছে।”
৫. অতীতের অনুগ্রহ স্মরণ করলে ভবিষ্যতের আশা জাগে
এরপর আল্লাহ তাআলা তাঁর নবী ﷺ-কে অতীতের কয়েকটি বিশেষ অনুগ্রহ স্মরণ করিয়ে দেন—
أَلَمْ يَجِدْكَ يَتِيمًا فَآوَىٰ
“তিনি কি আপনাকে এতিম অবস্থায় পাননি? অতঃপর আশ্রয় দিয়েছেন।”
নবী মুহাম্মদ ﷺ শৈশবেই পিতাকে হারিয়েছিলেন এবং পরে মাতাকেও হারান। আল্লাহ তাঁর জন্য আশ্রয় ও প্রতিপালনের ব্যবস্থা করেছেন। কুরআন এভাবে অতীতের অনুগ্রহ স্মরণ করিয়ে ভবিষ্যতের প্রতিশ্রুতির ওপর আস্থা দৃঢ় করে।
এখানে আমাদের জন্য অসাধারণ শিক্ষা আছে।
আমরা যখন বিপদে পড়ি, তখন শুধু বর্তমান কষ্টের দিকে তাকাই। কিন্তু যদি একটু পেছনে ফিরে তাকাই, দেখতে পাব—আমাদের জীবনেও কত বিপদ আল্লাহ পার করে দিয়েছেন!
কত রোগ থেকে সুস্থ হয়েছি, কত বিপদ থেকে রক্ষা পেয়েছি, কত দরজা বন্ধ হওয়ার পর অন্য দরজা খুলেছে, কতবার অসম্ভব মনে হওয়া পরিস্থিতি আল্লাহ সহজ করে দিয়েছেন!
তাই অতীতের রহমত স্মরণ করা ভবিষ্যতের জন্য আশাবাদী হতে শেখায়।
৬. হিদায়াত আল্লাহর সর্বশ্রেষ্ঠ অনুগ্রহ
আল্লাহ বলেন—
وَوَجَدَكَ ضَالًّا فَهَدَىٰ
অর্থাৎ, “তিনি আপনাকে পথের বিস্তারিত জ্ঞান সম্পর্কে অনবগত অবস্থায় পেয়েছেন, অতঃপর পথনির্দেশ দিয়েছেন।”
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় মনে রাখা জরুরি। এই আয়াতের অর্থ নবী মুহাম্মদ ﷺ কোনো গুনাহের পথভ্রষ্টতায় ছিলেন—এমন নয়। তাফসিরে এটিকে ওহি ও শরিয়তের জ্ঞান লাভের পূর্বাবস্থা এবং আল্লাহর পক্ষ থেকে হিদায়াত লাভের সঙ্গে ব্যাখ্যা করা হয়েছে।
হিদায়াত মানুষের জীবনের সর্বশ্রেষ্ঠ সম্পদ। অর্থ, বাড়ি, জমি, পদ, সম্মান—সবকিছু হারিয়ে গেলেও ঈমান ও হিদায়াত থাকলে মানুষ প্রকৃত অর্থে নিঃস্ব নয়।
আবার পৃথিবীর সব সম্পদ হাতে থাকলেও যদি ঈমান ও সঠিক পথের জ্ঞান না থাকে, তাহলে মানুষের প্রকৃত কল্যাণ অসম্পূর্ণ থেকে যায়।
তাই আমাদের প্রতিদিনের দোয়া হওয়া উচিত—
“হে আল্লাহ! আমাকে সরল পথে পরিচালিত করুন এবং সেই পথে অবিচল রাখুন।”
৭. অভাব থেকে স্বচ্ছলতা—সবই আল্লাহর দান
আল্লাহ তাআলা বলেন—
وَوَجَدَكَ عَائِلًا فَأَغْنَىٰ
অর্থাৎ, “তিনি আপনাকে অভাবগ্রস্ত পেয়েছেন, অতঃপর অভাবমুক্ত করেছেন।”
এখানে কুরআনের শব্দটি عَائِلًا, যার অর্থ অভাবগ্রস্ত বা প্রয়োজনময়। আপনার দেওয়া “عَالِيًا” শব্দটি সঠিক কুরআনিক পাঠ নয়।
এই আয়াত আমাদের শেখায়—মানুষের জীবনে যে স্বচ্ছলতা আসে, তার পেছনে আল্লাহর অনুগ্রহ রয়েছে।
তাই সম্পদ পেলে অহংকার নয়, শুকরিয়া করতে হবে।
স্বচ্ছলতা পেলে দুর্বলকে ভুলে যাওয়া যাবে না। নিজের খাবারের কথা মনে রেখে ক্ষুধার্তের কথা ভাবতে হবে; নিজের সন্তানের ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তা করার পাশাপাশি এতিম শিশুর ভবিষ্যতের কথাও ভাবতে হবে।
কারণ সম্পদ শুধু ভোগের জন্য নয়; এটি আল্লাহর পক্ষ থেকে একটি আমানত ও পরীক্ষা।
৮. এতিমের প্রতি কঠোর হওয়া যাবে না
আল্লাহ বলেন—
فَأَمَّا الْيَتِيمَ فَلَا تَقْهَرْ
অর্থাৎ, “অতএব এতিমের প্রতি কঠোর হয়ো না।”
যে মানুষ নিজে এতিম অবস্থার কষ্ট দেখেছে, তাকে এতিমের কষ্ট বোঝার শিক্ষা দেওয়া হয়েছে। তাই ইসলামে এতিমের অধিকার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
এতিমকে অপমান করা যাবে না, তার সম্পদ আত্মসাৎ করা যাবে না, তার দুর্বলতার সুযোগ নেওয়া যাবে না। বরং তাকে সম্মান, ভালোবাসা, নিরাপত্তা ও স্নেহ দিতে হবে।
একজন এতিম শিশুর প্রয়োজন শুধু খাবার নয়; তার প্রয়োজন ভালোবাসা, নিরাপত্তা, শিক্ষা, সম্মান ও সুন্দর ভবিষ্যৎ।
আমাদের সমাজে যদি প্রত্যেক সামর্থ্যবান ব্যক্তি অন্তত একজন অসহায় শিশুর পাশে দাঁড়ায়, তাহলে অনেক অন্ধকার জীবন আলোর মুখ দেখতে পারে।
৯. সাহায্যপ্রার্থীর সঙ্গে সুন্দর আচরণ
আল্লাহ বলেন—
وَأَمَّا السَّائِلَ فَلَا تَنْهَرْ
অর্থাৎ, “আর সাহায্যপ্রার্থীকে ধমক দিও না।”
কেউ সাহায্য চাইলে তার প্রয়োজন সত্য নাকি মিথ্যা—সব সময় আমরা জানি না। তাই কাউকে অপমানজনক ভাষায় প্রত্যাখ্যান করা উচিত নয়।
সাহায্য করার সামর্থ্য থাকলে সাহায্য করা উত্তম। আর সামর্থ্য না থাকলে অন্তত ভদ্রভাবে কথা বলা উচিত।
কারণ একটি সুন্দর কথা কখনো কখনো একজন ভেঙে পড়া মানুষের হৃদয়ে নতুন সাহস সৃষ্টি করতে পারে।
ইসলাম শুধু দান করতে শেখায় না; দান করার সৌন্দর্যও শেখায়।
১০. আল্লাহর নেয়ামতের কৃতজ্ঞতা
সূরার শেষ আয়াত—
وَأَمَّا بِنِعْمَةِ رَبِّكَ فَحَدِّثْ
অর্থাৎ, “আর তোমার রবের অনুগ্রহের কথা প্রকাশ করো।”
এখানে নেয়ামতের কথা বলা মানে আত্মপ্রচার, অহংকার বা লোকদেখানো নয়। বরং আল্লাহর নেয়ামত স্বীকার করা, তাঁর শুকরিয়া আদায় করা এবং নেয়ামতকে সঠিক কাজে ব্যবহার করা।
আমাদের চোখ আছে—এটি নেয়ামত।
কান আছে—এটি নেয়ামত।
সুস্থ শরীর—এটি নেয়ামত।
ঈমান—এটি সর্বশ্রেষ্ঠ নেয়ামত।
পরিবার—নেয়ামত।
জ্ঞান—নেয়ামত।
সময়—নেয়ামত।
রিজিক—নেয়ামত।
কিন্তু নেয়ামতের প্রকৃত শুকরিয়া শুধু মুখে “আলহামদুলিল্লাহ” বলা নয়; বরং সেই নেয়ামতকে আল্লাহর পছন্দনীয় কাজে ব্যবহার করাও শুকরিয়ার অংশ।
জ্ঞান পেলে মানুষকে শেখাতে হবে, অর্থ পেলে অসহায়ের পাশে দাঁড়াতে হবে, ক্ষমতা পেলে ন্যায় করতে হবে, সময় পেলে ইবাদত ও কল্যাণকর কাজে ব্যয় করতে হবে।
১১. সূরা আদ-দুহা ও আমাদের জীবন
সূরা আদ-দুহা শুধু একটি ঐতিহাসিক ঘটনা স্মরণ করায় না; এটি মানুষের জীবনের জন্য একটি সুন্দর জীবনদর্শন উপস্থাপন করে।
প্রথম শিক্ষা—হতাশ হওয়া যাবে না
দুঃখ আসবে, পরীক্ষা আসবে, অপেক্ষা করতে হবে; কিন্তু আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হওয়া যাবে না।
দ্বিতীয় শিক্ষা—আল্লাহর ওপর আস্থা রাখতে হবে
মানুষের সাহায্য সীমিত, কিন্তু আল্লাহর ক্ষমতা অসীম। তাই বৈধ উপায় অবলম্বন করে আল্লাহর ওপর তাওয়াক্কুল করতে হবে।
তৃতীয় শিক্ষা—আখিরাতকে অগ্রাধিকার দিতে হবে
দুনিয়ার সাফল্য গুরুত্বপূর্ণ হলেও আখিরাতের সফলতাই চূড়ান্ত সফলতা।
চতুর্থ শিক্ষা—অতীতের নেয়ামত স্মরণ করতে হবে
অতীতের আল্লাহপ্রদত্ত অনুগ্রহ স্মরণ করলে বর্তমানের কষ্ট সহ্য করার শক্তি বাড়ে।
পঞ্চম শিক্ষা—এতিম ও দুর্বলদের পাশে দাঁড়াতে হবে
নিজে আল্লাহর অনুগ্রহ পেলে অন্যের প্রতি দয়া দেখাতে হবে।
ষষ্ঠ শিক্ষা—অসহায়কে অপমান করা যাবে না
সাহায্য করতে না পারলেও সুন্দর ভাষায় কথা বলতে হবে।
সপ্তম শিক্ষা—নেয়ামতের শুকরিয়া করতে হবে
আল্লাহর দেওয়া প্রতিটি নেয়ামতকে তাঁর সন্তুষ্টির পথে ব্যবহার করতে হবে।
১২. পরিবার ও সমাজে সূরা আদ-দুহার শিক্ষা
সূরা আদ-দুহার শিক্ষা শুধু ব্যক্তিগত জীবনের জন্য নয়; পরিবার ও সমাজের জন্যও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
একজন বাবা যদি সন্তানের প্রতি কোমল হন, একজন মা যদি সন্তানের হৃদয়ের কথা বোঝেন, একজন শিক্ষক যদি দুর্বল শিক্ষার্থীকে অবহেলা না করেন, একজন ধনী যদি দরিদ্রকে অপমান না করেন, একজন ক্ষমতাবান যদি দুর্বলকে নির্যাতন না করেন—তাহলে সমাজে মমতা ও ন্যায় প্রতিষ্ঠিত হবে।
একটি কঠিন কথা যেমন মানুষের হৃদয় ভেঙে দিতে পারে, তেমনি একটি কোমল কথা তাকে নতুন জীবনযুদ্ধের সাহস দিতে পারে।
তাই আমাদের কথায় থাকতে হবে সত্য, সৌজন্য ও মমতা।
১৩. দুঃসময়ে মুমিনের করণীয়
জীবনে বিপদ এলে মুমিনের করণীয় কী?
প্রথমত, সালাত কায়েম করতে হবে।
দ্বিতীয়ত, দোয়া করতে হবে।
তৃতীয়ত, সবর করতে হবে।
চতুর্থত, বৈধ উপায়ে চেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে।
পঞ্চমত, আল্লাহর প্রতি সুধারণা রাখতে হবে।
ষষ্ঠত, অতীতের নেয়ামত স্মরণ করতে হবে।
সপ্তমত, অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়াতে হবে।
কারণ নিজের কষ্টের মধ্যেও অন্যের কষ্ট বোঝা মানুষের হৃদয়কে পরিশুদ্ধ করে।
১৪. হতাশার অন্ধকারে আশার আলো
আজ অনেক মানুষ অর্থনৈতিক সংকট, পারিবারিক অশান্তি, চাকরির অনিশ্চয়তা, ব্যর্থতা, অসুস্থতা কিংবা সম্পর্কের কষ্টে ভুগছে। কেউ হয়তো মনে মনে বলছে—“আমার জীবন আর বদলাবে না।”
সূরা আদ-দুহা তাকে শেখায়—
আজকের অবস্থা চিরস্থায়ী নয়।
রাতের পরে দিন আসে।
অন্ধকারের পরে আলো আসে।
কষ্টের পরে স্বস্তি আসে।
পরীক্ষার পরে ফল আসে।
আর মুমিনের জন্য দুনিয়ার সব কিছুর ওপরে রয়েছে আখিরাতের স্থায়ী জীবন।
তাই আজ যদি পথ কঠিন হয়, থেমে যেও না।
আজ যদি চোখে পানি থাকে, আল্লাহর কাছে কাঁদো।
আজ যদি মানুষ না বোঝে, আল্লাহ বোঝেন—এই বিশ্বাস রাখো।
আজ যদি দরজা বন্ধ থাকে, বৈধ পথে চেষ্টা চালিয়ে যাও এবং আল্লাহর ওপর ভরসা রাখো।
উপসংহার
সূরা আদ-দুহা যেন এক কোমল সান্ত্বনার বার্তা—“তোমার রব তোমাকে পরিত্যাগ করেননি।”
এই সূরা আমাদের শেখায়, জীবনের অন্ধকারকে শেষ সত্য মনে করা যাবে না। আল্লাহর রহমত বিস্তৃত, তাঁর জ্ঞান পরিপূর্ণ, তাঁর পরিকল্পনা প্রজ্ঞাময়। তাই দুঃসময়ে হতাশ না হয়ে তাঁর দিকে ফিরে যেতে হবে।
আল্লাহ তাঁর নবী ﷺ-কে অতীতের অনুগ্রহ স্মরণ করিয়ে ভবিষ্যতের আশ্বাস দিয়েছেন। তারপর সেই অনুগ্রহের বাস্তব প্রকাশ হিসেবে এতিমের প্রতি দয়া, সাহায্যপ্রার্থীর প্রতি কোমলতা এবং আল্লাহর নেয়ামতের কৃতজ্ঞতা প্রকাশের নির্দেশ দিয়েছেন। এ থেকেই বোঝা যায়—আল্লাহর নেয়ামতের প্রকৃত শুকরিয়া শুধু মুখের কথায় নয়; মানুষের প্রতি দয়া, ন্যায়, সহমর্মিতা ও কল্যাণকর কাজে তার প্রতিফলন ঘটাতে হয়।
তাই আসুন—
হতাশার বদলে আশা রাখি,
অভিযোগের বদলে শুকরিয়া করি,
অহংকারের বদলে বিনয় ধারণ করি,
অসহায়কে অবহেলা না করে পাশে দাঁড়াই,
এতিমের মাথায় স্নেহের হাত রাখি,
সাহায্যপ্রার্থীকে অপমান না করি,
এবং আল্লাহর দেওয়া প্রতিটি নেয়ামত তাঁর সন্তুষ্টির পথে ব্যবহার করি।
মনে রাখি—
দুনিয়ার রাত যত দীর্ঘই হোক, আল্লাহর রহমতের আলো তার চেয়েও বিস্তৃত।
আল্লাহ আমাদের ঈমানকে দৃঢ় করুন, হতাশা থেকে রক্ষা করুন, তাঁর নেয়ামতের শুকরিয়া আদায় করার তাওফিক দিন, এতিম-অসহায় মানুষের হক আদায় করার তাওফিক দিন এবং দুনিয়া ও আখিরাতের কল্যাণ দান করুন।
আমিন।
১৪
২৪ মন্তব্য