সহকারী শিক্ষক
১৮ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ০৭:৫০ পূর্বাহ্ণ
দেবী ও একজন মমতাময় শিক্ষক
দেবী ও একজন মমতাময় শিক্ষক
দেবী চতুর্থ শ্রেণিতে পড়ে। লেখাপড়ায় সে মধ্যম মানের হলেও ভীষণ মেধাবী ও মমতাময়ী একটি শিশু। হাতের লেখাটা একটু খারাপ হলেও অঙ্কন, নৃত্য, আবৃত্তি—প্রায় সব ক্ষেত্রেই তার ছিল দারুণ দক্ষতা। নিজের মতো করে সে সবকিছু করতে ভালোবাসত। হাসি-খুশি আর প্রাণচঞ্চলতায় ভরা ছিল তার ছোট্ট পৃথিবী।
দেবীর বাসায় প্রতিদিন সন্ধ্যায় একজন শিক্ষক পড়াতে আসতেন। দেবী হিন্দু, আর শিক্ষক মুসলমান। ধর্মের এই ভিন্নতা কখনোই তাঁদের সম্পর্কের মাঝে দেয়াল হয়ে দাঁড়ায়নি। বরং শিক্ষক ধীরে ধীরে দেবীদের পরিবারের একজন আপন মানুষ হয়ে উঠেছিলেন। শুধু পড়ানো নয়, প্রতিদিন তিনি দেবীর পড়াশোনার খোঁজ নিতেন, তার পরিবারের সবার খোঁজখবর রাখতেন। দেবীও শিক্ষককে খুব আপন করে নিয়েছিল।
একদিন হঠাৎ দেবী খুব অসুস্থ হয়ে পড়ল।
খবরটি শুনে শিক্ষক যেন ভেতর থেকে ভেঙে পড়লেন। দেবীর অসুস্থতার খবর তাঁকে ভীষণ চিন্তিত করে তুলল। বারবার তাঁর মনে হতে লাগল—দেবী কবে সুস্থ হবে? কবে আবার হাসবে? কবে মাঠে গিয়ে খেলবে? কবে বই-খাতা নিয়ে পড়তে বসবে?
দেবীকে তিনি শুধু একজন শিক্ষার্থী হিসেবে দেখতেন না। নিজের মেয়ের মতোই মনে করতেন। তাই দেবীর কষ্ট যেন তাঁর নিজের কষ্ট হয়ে উঠেছিল।
প্রতিদিন তিনি দেবীর পরিবারের কাছে খোঁজ নিতেন। দেবী কেমন আছে, জ্বর কমেছে কি না, খেতে পারছে কি না—সবকিছু জানার চেষ্টা করতেন। তাঁর মুখে একটাই কথা—
“দেবীকে ভালো হয়ে উঠতেই হবে। ও আবার আগের মতো হাসবে, খেলবে, পড়বে।”
অদ্ভুত এক মায়ার সম্পর্ক তৈরি হয়েছিল শিক্ষক আর শিক্ষার্থীর মধ্যে। সেখানে হিন্দু-মুসলমানের কোনো ভেদাভেদ ছিল না, ছিল শুধু একজন শিক্ষকের ভালোবাসা আর একটি শিশুর প্রতি গভীর মমতা।
দেবীর অসুস্থতা শিক্ষককে ভেতর থেকে এমনভাবে নাড়া দিয়েছিল যে, তিনিও যেন অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন। আর সেই ভালোবাসা, সেই আন্তরিকতা, সেই অকৃত্রিম চিন্তা দেবীর কাছেও পৌঁছে গিয়েছিল।
হয়তো ওষুধ শরীরকে সুস্থ করে, কিন্তু মানুষের ভালোবাসা অনেক সময় মনকে সুস্থ করে তোলে। দেবীর ক্ষেত্রেও যেন তাই হলো। শিক্ষকের ভালোবাসা, পরিবারের মমতা আর সবার আন্তরিক প্রার্থনায় ধীরে ধীরে দেবী সুস্থ হয়ে উঠল।
আবার তার মুখে হাসি ফুটল। আবার বই-খাতা হাতে নিল, আবার নাচল, আবৃত্তি করল, খেলাধুলা করল।
একজন শিক্ষক তখন বুঝতে পারলেন—তিনি শুধু একজন শিশুকে পড়াননি; তিনি অজান্তেই একটি শিশুর জীবনের সঙ্গে নিজের হৃদয়ের একটি অংশ জড়িয়ে ফেলেছেন।
আর দেবীও হয়তো সেদিন বুঝেছিল—শিক্ষক শুধু বইয়ের পাঠ শেখান না, কখনো কখনো তাঁরা ভালোবাসতে শেখান, পাশে দাঁড়াতে শেখান, মানুষ হয়ে উঠতে শেখান।
১
২ মন্তব্য