Loading..

ব্লগ

রিসেট

২৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ০৫:১২ পূর্বাহ্ণ

সময়ের শপথে সফলতার পথ (সূরা আল-আসরের আলোকে মানুষের জীবন, ঈমান, সৎকর্ম, সত্য ও ধৈর্যের শিক্ষা)- মোঃ মুজিবুর রহমান

সময়ের শপথে সফলতার পথ

(সূরা আল-আসরের আলোকে মানুষের জীবন, ঈমান, সৎকর্ম, সত্য ও ধৈর্যের শিক্ষা)

মোঃ মুজিবুর রহমান
সহকারী অধ্যাপক
মোজাদ্দেদীয়া ইসলামিয়া আলিম মাদ্রাসা, কালিয়াকৈর, গাজীপুর।

সময় মানুষের জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ। হারানো অর্থ কখনো ফিরে পাওয়া যায়, হারানো সম্পদ আবার অর্জন করা যায়, কিন্তু চলে যাওয়া সময় কোনোভাবেই ফিরিয়ে আনা যায় না। মানুষের জীবন মূলত সময়েরই সমষ্টি। একটি একটি মুহূর্ত মিলেই গড়ে ওঠে দিন, দিন থেকে মাস, মাস থেকে বছর, আর বছরগুলো মিলেই একদিন শেষ হয়ে যায় জীবনের পথচলা। তাই সময়কে সঠিকভাবে কাজে লাগানো মানে জীবনকে সার্থক করা; আর সময়কে অবহেলায় নষ্ট করা মানে জীবনের একটি অংশকে নষ্ট করে ফেলা।

পবিত্র কুরআনের ১০৩ নম্বর সূরা আল-আসর অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত হলেও এর শিক্ষা অত্যন্ত গভীর ও ব্যাপক। মাত্র তিনটি আয়াতে মহান আল্লাহ মানুষের সফলতা ও ব্যর্থতার একটি পূর্ণাঙ্গ নীতিমালা তুলে ধরেছেন। আল্লাহ তাআলা বলেন—

وَالْعَصْرِ ۝ إِنَّ الْإِنسَانَ لَفِي خُسْرٍ ۝ إِلَّا الَّذِينَ آمَنُوا وَعَمِلُوا الصَّالِحَاتِ وَتَوَاصَوْا بِالْحَقِّ وَتَوَاصَوْا بِالصَّبْرِ

অর্থ: “সময়ের শপথ। নিশ্চয়ই মানুষ ক্ষতির মধ্যে রয়েছে। তবে তারা নয়, যারা ঈমান এনেছে, সৎকর্ম করেছে এবং পরস্পরকে সত্যের উপদেশ দিয়েছে ও পরস্পরকে ধৈর্যের উপদেশ দিয়েছে।”
—
সূরা আল-আসর: ১–৩

এই সংক্ষিপ্ত সূরায় মানুষের জীবনের সফলতার জন্য চারটি মৌলিক গুণের কথা বলা হয়েছে—ঈমান, সৎকর্ম, সত্যের উপদেশ এবং ধৈর্যের উপদেশ। এগুলো ছাড়া মানুষ বাহ্যিকভাবে যতই সফল মনে হোক, প্রকৃত ও চূড়ান্ত সফলতা অর্জন করতে পারে না।

সময়ের শপথ—সময়ের অসীম মূল্য

আল্লাহ তাআলা সূরাটির শুরুতেই বলেছেন, “সময়ের শপথ।” কুরআনে কোনো বিষয়ের শপথ করা হলে তার গুরুত্ব বিশেষভাবে প্রকাশ পায়। সময় মানুষের জীবনের এমন এক সম্পদ, যা প্রতিনিয়ত চলে যাচ্ছে এবং যার প্রতিটি মুহূর্ত মানুষের আমলনামায় যুক্ত হচ্ছে।

সকাল আসে, দুপুর হয়, সন্ধ্যা নামে, রাত পেরিয়ে আবার নতুন সকাল আসে। এভাবেই জীবনের দিনগুলো নিঃশব্দে চলে যায়। শিশুকাল পেরিয়ে কৈশোর আসে, কৈশোর পেরিয়ে যৌবন, যৌবনের পর বার্ধক্য। একসময় মানুষকে এই দুনিয়ার জীবন ছেড়ে আল্লাহর কাছে ফিরে যেতে হয়।

তাই সময় শুধু ঘড়ির কাঁটার চলাচল নয়; সময় হলো মানুষের জীবন থেকে একটি একটি অংশের বিদায়। যে মুহূর্ত চলে গেল, সেটি আর ফিরে আসবে না। এজন্য বুদ্ধিমান মানুষ সময়কে অবহেলা করে না। সে জানে, আজকের একটি ভালো কাজ আগামী দিনের সফলতার ভিত্তি হতে পারে, আবার আজকের একটি গুনাহ ভবিষ্যতের অনুতাপের কারণ হতে পারে।

মানুষ কেন ক্ষতির মধ্যে?

আল্লাহ তাআলা ঘোষণা করেছেন—

“নিশ্চয়ই মানুষ ক্ষতির মধ্যে রয়েছে।”

এটি অত্যন্ত গভীর সতর্কবাণী। সাধারণভাবে মানুষ দুনিয়ার লাভ-ক্ষতির হিসাব করে অর্থ, সম্পদ, ব্যবসা, চাকরি, বাড়ি, জমি কিংবা সামাজিক মর্যাদার ভিত্তিতে। কিন্তু কুরআন মানুষকে ক্ষতির একটি বৃহত্তর ও চূড়ান্ত হিসাবের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়।

মানুষের জীবন প্রতিদিন কমে যাচ্ছে। তার হাতে থাকা সময় ক্রমাগত শেষ হয়ে যাচ্ছে। অথচ সে যদি সেই সময়কে আল্লাহর সন্তুষ্টির কাজে ব্যবহার না করে, তবে তার জীবনের মূল পুঁজি নষ্ট হয়ে যাচ্ছে।

একজন ব্যবসায়ী যদি নিজের মূলধন ক্রমাগত হারাতে থাকে, তাহলে তার ব্যবসাকে লাভজনক বলা যায় না। তেমনি মানুষের জীবনও এক ধরনের মূলধন। এই মূলধন হলো সময় ও জীবন। যে ব্যক্তি এই মূলধনকে ঈমান ও সৎকর্মের মাধ্যমে আখিরাতের সফলতার জন্য বিনিয়োগ করতে পারে, সে প্রকৃত লাভবান। আর যে ব্যক্তি তা অবহেলায় নষ্ট করে, সে প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্ত।

ঈমান—সফলতার প্রথম ভিত্তি

আল্লাহ তাআলা ক্ষতি থেকে মুক্ত মানুষের প্রথম বৈশিষ্ট্য হিসেবে বলেছেন—

“যারা ঈমান এনেছে।”

ইসলামে ঈমান হলো জীবনের মূল ভিত্তি। আল্লাহর প্রতি ঈমান, তাঁর ফেরেশতাগণ, তাঁর কিতাবসমূহ, তাঁর রাসুলগণ, আখিরাত এবং তাকদিরের প্রতি ঈমান মানুষের চিন্তা, কর্ম ও জীবনদর্শনকে সঠিক পথে পরিচালিত করে।

সত্যিকারের ঈমান মানুষকে মনে করিয়ে দেয়—আমি স্বাধীনভাবে যা ইচ্ছা তাই করার জন্য সৃষ্টি হইনি; আমার একজন স্রষ্টা আছেন, যাঁর কাছে আমাকে ফিরে যেতে হবে এবং আমার কাজের হিসাব দিতে হবে।

ঈমান মানুষের অন্তরে আল্লাহভীতি, আল্লাহর ভালোবাসা, আশা, বিনয় ও জবাবদিহির অনুভূতি সৃষ্টি করে। ফলে সে অন্যায় থেকে দূরে থাকতে চেষ্টা করে এবং কল্যাণকর কাজে নিজেকে নিয়োজিত করে।

ঈমান শুধু মুখের দাবি নয়; বরং তা মানুষের চিন্তা, চরিত্র ও কর্মে প্রভাব ফেলে। তাই সূরা আল-আসর ঈমানের পরপরই সৎকর্মের কথা উল্লেখ করেছে।

সৎকর্ম—ঈমানের বাস্তব প্রকাশ

আল্লাহ বলেছেন—

“এবং সৎকর্ম করেছে।”

সৎকর্ম বা নেক আমল হলো ঈমানের বাস্তব প্রকাশ। নামাজ, রোজা, যাকাত, হজ, কুরআন তিলাওয়াত, দোয়া, জিকির ইত্যাদি ইবাদতের পাশাপাশি মানুষের প্রতি ন্যায়বিচার করা, আমানত রক্ষা করা, সত্য কথা বলা, পিতা-মাতার সেবা করা, আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখা, অসহায়কে সাহায্য করা এবং মানুষের অধিকার আদায় করাও ইসলামের গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা।

একজন মানুষ শুধু নিজের ইবাদত নিয়ে ব্যস্ত থাকবে, কিন্তু অন্যের অধিকার নষ্ট করবে—এটি ইসলামের পূর্ণাঙ্গ শিক্ষা নয়। আবার মানুষের সেবা করবে, কিন্তু আল্লাহর প্রতি ঈমান ও তাঁর বিধানের প্রতি আনুগত্যকে উপেক্ষা করবে—এটিও পূর্ণাঙ্গ সফলতার পথ নয়।

সুতরাং ঈমান ও সৎকর্ম একে অপরের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত। ঈমান মানুষকে সঠিক বিশ্বাস দেয়, আর সৎকর্ম সেই বিশ্বাসের বাস্তব প্রমাণ প্রকাশ করে।

সত্যের উপদেশ—সমাজ গঠনের শক্তি

এরপর আল্লাহ তাআলা বলেছেন—

“এবং পরস্পরকে সত্যের উপদেশ দিয়েছে।”

ইসলাম শুধু ব্যক্তিগত সংশোধনের শিক্ষা দেয় না; বরং সমাজের মানুষকে পরস্পরের কল্যাণে এগিয়ে আসতে শেখায়। সত্য জানা যেমন জরুরি, তেমনি সত্যের পথে অন্যকে উৎসাহিত করাও গুরুত্বপূর্ণ।

সত্য হলো ন্যায়, নৈতিকতা, আল্লাহর বিধান ও সঠিক পথের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কথা ও কাজ। সত্যের উপদেশ দেওয়া মানে কাউকে অপমান করা নয়; বরং ভালোবাসা, প্রজ্ঞা ও সুন্দর আচরণের মাধ্যমে কল্যাণের পথে আহ্বান করা।

পরিবারে সত্যের শিক্ষা থাকলে সন্তান সৎভাবে বেড়ে ওঠে। শিক্ষাঙ্গনে সত্যের চর্চা থাকলে জ্ঞান ও চরিত্রের উন্নতি হয়। ব্যবসায় সত্য ও আমানতদারি থাকলে মানুষের মধ্যে বিশ্বাস সৃষ্টি হয়। সমাজে সত্য ও ন্যায় প্রতিষ্ঠিত হলে অন্যায়, প্রতারণা ও জুলুম কমে আসে।

তাই সত্যের উপদেশ কেবল একটি ব্যক্তিগত গুণ নয়; এটি একটি সুন্দর সমাজ নির্মাণের অন্যতম ভিত্তি।

ধৈর্যের উপদেশ—সত্যের পথে অবিচল থাকার শক্তি

সত্যের পথে চলা সব সময় সহজ নয়। ভালো কাজ করতে গেলে বাধা আসতে পারে, অন্যায় থেকে বিরত থাকতে গেলে চাপ সৃষ্টি হতে পারে, মানুষের হক আদায় করতে গেলে নানা পরীক্ষা আসতে পারে। তাই সত্যের উপদেশের সঙ্গে আল্লাহ তাআলা বলেছেন—

“এবং পরস্পরকে ধৈর্যের উপদেশ দিয়েছে।”

ধৈর্য বা সবর ইসলামী জীবনের অপরিহার্য গুণ। ইবাদতে ধৈর্য দরকার, গুনাহ থেকে বেঁচে থাকতেও ধৈর্য দরকার, বিপদ-মুসিবতে আল্লাহর ওপর ভরসা রেখে সঠিক পথে থাকতেও ধৈর্য দরকার।

ধৈর্য মানে নিষ্ক্রিয় হয়ে বসে থাকা নয়। বরং আল্লাহর ওপর ভরসা রেখে সঠিক উপায় অবলম্বন করা, ন্যায়ের পথে অবিচল থাকা এবং কঠিন পরিস্থিতিতেও হারাম ও অন্যায়ের পথ গ্রহণ না করাই ধৈর্যের অন্যতম প্রকাশ।

কোনো মানুষ বিপদে পড়লে তাকে হতাশ না করে ধৈর্য ও আল্লাহর ওপর ভরসার শিক্ষা দেওয়া দরকার। কোনো ব্যক্তি ভালো কাজ শুরু করলে তাকে উৎসাহ দেওয়া দরকার। কেউ ভুল থেকে ফিরে আসতে চাইলে তাকে নিরাশ না করে সংশোধনের পথে সহযোগিতা করা দরকার।

চারটি গুণ—সফল জীবনের পূর্ণাঙ্গ ভিত্তি

সূরা আল-আসর আমাদের সামনে মানুষের সফলতার চারটি মৌলিক স্তম্ভ তুলে ধরে—

প্রথমত—ঈমান: সঠিক বিশ্বাস ও আল্লাহর প্রতি আনুগত্য।
দ্বিতীয়ত—সৎকর্ম: ঈমানের আলোকে নেক আমল ও কল্যাণকর কাজ।
তৃতীয়ত—সত্যের উপদেশ: নিজে সত্যের পথে চলা এবং অন্যকে কল্যাণের পথে আহ্বান করা।
চতুর্থত—ধৈর্যের উপদেশ: সত্য ও ন্যায়ের পথে অবিচল থাকা এবং অন্যকেও ধৈর্য ধারণে উৎসাহিত করা।

এই চারটি গুণ ব্যক্তিজীবন ও সমাজজীবনকে সুন্দর ও ভারসাম্যপূর্ণ করে। ঈমান মানুষকে আল্লাহর সঙ্গে সম্পর্কিত করে, সৎকর্ম তার জীবনকে পবিত্র করে, সত্যের উপদেশ সমাজকে সংশোধনের পথে নিয়ে যায় এবং ধৈর্য মানুষকে প্রতিকূলতার মধ্যেও সঠিক পথে অটল রাখে।

সময় নষ্টের বিপদ

বর্তমান যুগে সময় নষ্ট করার সুযোগ অনেক বেড়েছে। অপ্রয়োজনীয় আলাপ, অতিরিক্ত বিনোদন, উদ্দেশ্যহীন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার, অলসতা, পরনিন্দা, অর্থহীন বিতর্ক এবং অযথা ঘোরাফেরা মানুষের মূল্যবান সময় গ্রাস করতে পারে।

সময়ের অপচয় প্রথমে ছোট মনে হলেও দীর্ঘদিন পরে এর ক্ষতি স্পষ্ট হয়। একজন শিক্ষার্থী যদি প্রতিদিন অল্প অল্প করে পড়াশোনার সময় নষ্ট করে, একসময় তার জ্ঞানের ঘাটতি তৈরি হয়। একজন কর্মজীবী যদি দায়িত্বে অবহেলা করে, তার কর্মদক্ষতা ও বিশ্বাসযোগ্যতা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। একজন মানুষ যদি ইবাদত ও আত্মশুদ্ধির সময়কে অবহেলা করে, তার আধ্যাত্মিক জীবন দুর্বল হয়ে পড়তে পারে।

তাই সময় ব্যবহারে সচেতন হওয়া প্রত্যেক মানুষের দায়িত্ব।

শিক্ষার্থীদের জন্য সূরা আল-আসরের শিক্ষা

শিক্ষার্থীদের জীবনে সূরা আল-আসরের শিক্ষা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ছাত্রজীবন হলো জ্ঞান, দক্ষতা ও চরিত্র গঠনের গুরুত্বপূর্ণ সময়। এই সময়কে সঠিকভাবে কাজে লাগাতে হলে নিয়মিত পড়াশোনা, নামাজ, নৈতিক শিক্ষা, শিক্ষক ও পিতা-মাতার প্রতি সম্মান এবং সৎ বন্ধু নির্বাচন জরুরি।

শিক্ষার্থীকে মনে রাখতে হবে—শুধু পরীক্ষায় ভালো ফল করাই জীবনের চূড়ান্ত সফলতা নয়। জ্ঞান অর্জনের পাশাপাশি সৎ, ন্যায়পরায়ণ, দায়িত্বশীল ও চরিত্রবান মানুষ হওয়াও জরুরি।

আজকের একজন সচেতন শিক্ষার্থী আগামী দিনের পরিবার, সমাজ ও দেশের গুরুত্বপূর্ণ সদস্য। তাই তার সময়ের প্রতিটি মুহূর্ত মূল্যবান।

পরিবারে সূরা আল-আসরের শিক্ষা

পরিবার হলো মানুষের প্রথম শিক্ষালয়। পরিবারে যদি ঈমান, সৎকর্ম, সত্যবাদিতা ও ধৈর্যের চর্চা থাকে, তাহলে সন্তানদের চরিত্র সুন্দরভাবে গড়ে ওঠে।

পিতা-মাতা সন্তানকে শুধু ভালো ফলাফল বা ভালো চাকরির জন্য প্রস্তুত করবেন না; বরং তাকে সত্যবাদী, আমানতদার, দয়ালু, বিনয়ী ও দায়িত্বশীল মানুষ হিসেবে গড়ে তুলবেন।

স্বামী-স্ত্রী পরস্পরের সঙ্গে সত্য ও সুন্দর আচরণ করবেন, একে অপরের অধিকার রক্ষা করবেন এবং মতভেদ দেখা দিলে ধৈর্য ও প্রজ্ঞার সঙ্গে সমাধানের চেষ্টা করবেন। পরিবারের প্রত্যেকে যদি অন্যের ভুল ধরার আগে নিজের সংশোধনের চেষ্টা করে, তাহলে পারিবারিক শান্তি বৃদ্ধি পাবে।

সমাজজীবনে সত্য ও ধৈর্যের প্রয়োজন

একটি সুন্দর সমাজ শুধু আইন দিয়ে গড়ে ওঠে না; বরং মানুষের চরিত্র ও নৈতিকতার ওপরও সমাজের শান্তি নির্ভর করে।

যেখানে মিথ্যা, প্রতারণা, দুর্নীতি, জুলুম, হিংসা ও অধিকার হরণ ব্যাপক হয়, সেখানে মানুষের পারস্পরিক বিশ্বাস দুর্বল হয়ে যায়। আর যেখানে সত্যবাদিতা, আমানতদারি, ন্যায়বিচার, সহমর্মিতা ও ধৈর্যের চর্চা থাকে, সেখানে মানুষের মধ্যে আস্থা ও শান্তি বৃদ্ধি পায়।

তাই সূরা আল-আসর ব্যক্তি থেকে পরিবার, পরিবার থেকে সমাজ—সব স্তরেই নৈতিক উন্নতির একটি সুন্দর দিকনির্দেশনা দেয়।

দুনিয়ার সাফল্য ও আখিরাতের সফলতা

মানুষ দুনিয়ায় শিক্ষা, কর্ম, ব্যবসা, সম্পদ, সম্মান ও বিভিন্ন অর্জনের মাধ্যমে সফল হতে চায়। ইসলাম দুনিয়ার বৈধ উন্নতিকে নিষিদ্ধ করে না। বরং মানুষকে হালাল উপায়ে পরিশ্রম, দায়িত্ব পালন ও কল্যাণকর কাজে উৎসাহিত করে।

তবে দুনিয়ার সাফল্য যেন আখিরাতের সফলতাকে ভুলিয়ে না দেয়। কারণ মানুষের চূড়ান্ত প্রত্যাবর্তন আল্লাহর কাছেই। তাই দুনিয়ার জীবনকে আখিরাতের প্রস্তুতির ক্ষেত্র হিসেবে গ্রহণ করতে হবে।

সময়ের যথাযথ ব্যবহার, হালাল উপার্জন, ন্যায়পরায়ণতা, ইবাদত, মানুষের হক আদায় এবং সৎ চরিত্র—এসবের মাধ্যমে একজন মানুষ দুনিয়ার জীবনকে অর্থবহ করার পাশাপাশি আখিরাতের জন্যও প্রস্তুতি নিতে পারে।

প্রতিটি মুহূর্তের হিসাব

মানুষের জীবন সীমিত। আমরা জানি না আমাদের জীবনের কত দিন, কত রাত, কত সকাল ও কত সন্ধ্যা অবশিষ্ট আছে। তাই ভবিষ্যতে ভালো কিছু করব—এই আশায় বর্তমানের সুযোগ নষ্ট করা বুদ্ধিমানের কাজ নয়।

আজকের নামাজ আজই আদায় করতে হবে, আজকের ভালো কাজ আজই করতে হবে, কারও হক নষ্ট হয়ে থাকলে তা যথাসম্ভব ফিরিয়ে দিতে হবে, ভুল হয়ে গেলে তাওবা করতে হবে এবং সত্যের পথে চলার সিদ্ধান্ত এখনই নিতে হবে।

মৃত্যু কখন আসবে, তা মানুষ জানে না। তাই একজন মুমিনের উচিত প্রতিটি দিনকে আল্লাহর সন্তুষ্টির পথে ব্যয় করার চেষ্টা করা।

সূরা আল-আসরের সার্বিক শিক্ষা

সূরা আল-আসর আমাদের শেখায় যে মানুষের প্রকৃত সফলতা শুধু দুনিয়ার অর্জনে নয়। মানুষের সফলতার জন্য দরকার সঠিক ঈমান, নেক আমল, সত্যের প্রতি অটলতা এবং ধৈর্য।

এই সূরা আমাদের অলসতা থেকে কর্মমুখী হতে শেখায়, সময়ের মূল্য বুঝতে শেখায়, নিজের সংশোধনের পাশাপাশি অন্যের কল্যাণ কামনা করতে শেখায় এবং বিপদের সময় হতাশ না হয়ে আল্লাহর ওপর ভরসা রেখে সঠিক পথে অবিচল থাকতে শেখায়।

এখানে ব্যক্তিজীবন ও সমাজজীবনের মধ্যে একটি সুন্দর ভারসাম্যও দেখা যায়। মানুষ নিজে ঈমানদার ও সৎ হবে, আবার অন্যকেও সত্য ও কল্যাণের পথে উৎসাহিত করবে। নিজে ধৈর্য ধারণ করবে, আবার অন্যকেও ধৈর্যের শিক্ষা দেবে। এভাবেই একটি ঈমানদার ও নৈতিক সমাজ গড়ে উঠতে পারে।

উপসংহার

সূরা আল-আসর আকারে ছোট হলেও শিক্ষায় অত্যন্ত গভীর। এটি যেন মানুষের সামনে জীবনের একটি সংক্ষিপ্ত কিন্তু পূর্ণাঙ্গ মানচিত্র তুলে ধরে। সময় চলে যাচ্ছে, জীবন কমে যাচ্ছে, আর মানুষ তার কর্মের মাধ্যমে নিজের ভবিষ্যৎ গড়ে তুলছে।

তাই আমাদের উচিত সময়কে অবহেলা না করা; ঈমানকে দৃঢ় করা; সৎকর্মে জীবন সাজানো; সত্য ও ন্যায়ের পথে চলা; অন্যকে সুন্দরভাবে কল্যাণের উপদেশ দেওয়া এবং সব অবস্থায় ধৈর্য ধারণ করা।

জীবনের প্রতিটি সকাল যেন নতুন সুযোগের বার্তা নিয়ে আসে, প্রতিটি দিন যেন সৎকর্মে সমৃদ্ধ হয় এবং প্রতিটি রাত যেন আত্মসমালোচনা ও আল্লাহর স্মরণে অতিবাহিত হয়। আমরা যেন এমন জীবন গড়ে তুলতে পারি, যার প্রতিটি মুহূর্ত আল্লাহর সন্তুষ্টির পথে ব্যয়িত হয় এবং যার পরিণতি হয় আখিরাতের সফলতা।

হে আল্লাহ! আমাদের ঈমানকে দৃঢ় করুন, সৎকর্ম করার তাওফিক দিন, সত্যকে গ্রহণ ও প্রচারের তাওফিক দিন, বিপদে-আপদে ধৈর্য ধারণের শক্তি দিন এবং আমাদের মূল্যবান সময়কে আপনার সন্তুষ্টির পথে কাজে লাগানোর তাওফিক দান করুন। আমাদের জীবনকে কল্যাণময় করুন এবং আখিরাতে সফলদের অন্তর্ভুক্ত করুন। আমিন।

 

মন্তব্য করুন

ব্লগ