Loading..

ব্লগ

রিসেট

২৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ০৭:০৮ পূর্বাহ্ণ

জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম:

 বিদ্রোহী ও সাম্যের কবি

ভূমিকা

বাংলা সাহিত্য, সংস্কৃতি ও সঙ্গীতের আকাশে এক অনন্য দেদীপ্যমান নক্ষত্র হলেন জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম। তাঁকে বলা হয় বাংলা সাহিত্যের 'বিদ্রোহী কবি'। পরাধীনতার শৃঙ্খল ভাঙতে, সামাজিক বৈষম্য দূর করতে এবং মানুষের মনে মুক্তির আলোকবর্তিকা জ্বালাতে তাঁর কলম ছিল এক অমেয় শক্তির উৎস। বাংলা কাব্যে চিরকালীন তারুণ্যের প্রতীক এবং মানবমুক্তির অগ্রদূত হিসেবে তিনি চিরস্মরণীয় হয়ে আছেন।

জন্ম ও শৈশব

কাজী নজরুল ইসলাম ১৩০৬ বঙ্গাব্দের ১১ জ্যৈষ্ঠ (ইংরেজি ২৪ মে, ১৮৯৯ খ্রিস্টাব্দ) পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমান জেলার আসানসোল মহকুমার চুরুলিয়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতার নাম কাজী ফকির আহমেদ এবং মাতার নাম জাহেদা খাতুন। অত্যন্ত দরিদ্র পরিবারে জন্ম হওয়ায় তাঁর শৈশব কেটেছে নানা hardship ও সংগ্রামের মধ্য দিয়ে। শৈশবে তিনি ভালো করে পড়াশোনা করার সুযোগ পাননি। পরিবারের আর্থিক অনটনের কারণে তাঁকে ছোটোবেলায় মক্তবে শিক্ষকতা করতে হয়েছে, মসজিদে আজান দিতে হয়েছে এবং পরবর্তীতে জীবিকার তাগিদে লেটোর দলেও যোগ দিয়েছিলেন। এই লেটোর দলের মাধ্যমেই তাঁর সাহিত্যিক ও সুরকার প্রতিভার প্রাথমিক বিকাশ ঘটেছিল।

কর্মজীবন ও ব্যক্তিত্ব

নজরুলের জীবন ছিল অত্যন্ত বৈচিত্র্যময়। ১৯১৭ সালে তিনি বাঙালি পল্টনে সৈনিক হিসেবে যোগ দিয়ে করাচিতে যান। সেনাবাহিনীতে থাকা অবস্থাতেই তাঁর সাহিত্যচর্চা আরও বেগবান হয়। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় সৈনিক হিসেবে করাচিতে অবস্থানকালে তাঁর সাহিত্যিক জীবনের শুভসূচনা ঘটে। যুদ্ধ শেষে ১৯২০ সালে কলকাতায় ফিরে তিনি সাংবাদিকতা ও সাহিত্যচর্চাকে পেশা হিসেবে বেছে নেন। তিনি 'নবযুগ', 'ধূমকেতু', 'লাঙল'সহ বিভিন্ন পত্রিকার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। তাঁর লেখনি ও সাহসিকতার কারণে ব্রিটিশ সরকার বারবার তাঁর ওপর খড়্গহস্ত হয়েছে, তবুও তিনি কখনো অন্যায়ের কাছে মাথা নত করেননি।

সাহিত্যকর্ম এবং 'বিদ্রোহী' কবিতা

নজরুলের সাহিত্যকর্ম এক বিশাল সমুদ্র। তিনি একাধারে কবি, ঔপন্যাসিক, প্রাবন্ধিক, নাট্যকার এবং সাংবাদিক ছিলেন। তবে ১৯২১ সালে প্রকাশিত 'বিদ্রোহী' কবিতাটি তাঁকে রাতারাতি বাংলা সাহিত্যের সর্বকালের সেরা জনপ্রিয়তা এনে দেয়। এই কবিতার পংক্তিগুলো— "বল বীর— / বল উন্নত মম শির..." পরাধীন ভারতের যুবসমাজকে দারুণভাবে উদ্দীপ্ত করেছিল।

তাঁর বিখ্যাত কাব্যগ্রন্থগুলোর মধ্যে অগ্নিবীণা, বিষের বাঁশী, সাম্যবাদী, সর্বহারা, সিন্ধু-হিন্দোল, প্রলয়উল্লাস ইত্যাদি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। পাশাপাশি, তিনি বহু উপন্যাস (বাধালো বাঁধন, মৃত্যুক্ষুদা, কুহেলিকা) এবং নাটক রচনা করেছেন।

সাম্যবাদ ও মানবতাবাদ

নজরুল ছিলেন অসাম্প্রদায়িক চেতনার এক উজ্জ্বল প্রতীক। তিনি ধর্ম, বর্ণ, গোত্র ও জাতপাতের ঊর্ধ্বে উঠে সবসময় মানুষের জয়গান গেয়েছেন। তাঁর 'সাম্যবাদী' ও 'সর্বহারা' কবিতায় শোষিত ও বঞ্চিত মানুষের অধিকারের কথা জোরালোভাবে উচ্চারিত হয়েছে। তিনি হিন্দু ও মুসলিম সংস্কৃতির মেলবন্ধন ঘটিয়ে বহু গান ও কবিতা রচনা করেছেন। তাঁর লেখায় যেমন ইসলামী গজলের সুর বেজে উঠেছে, তেমনি শ্যামা সঙ্গীত ও কীর্তনের অপূর্ব মাধুর্যও ফুটে উঠেছে। নজরুল বিশ্বাস করতেন মানুষই শ্রেষ্ঠ সত্য, কোনো কৃত্রিম ভেদাভেদ মানুষের পরিচয় হতে পারে না।

নজরুল সঙ্গীত

নজরুলের অপরিসীম অবদানের আরেকটি ক্ষেত্র হলো সঙ্গীত। তিনি প্রায় চার হাজার গান রচনা ও তাতে সুরারোপ করেছেন, যা 'নজরুল সঙ্গীত' নামে পরিচিত। তাঁর গানে প্রেম, দ্রোহ, ভক্তি ও প্রকৃতির রূপ অপূর্বভাবে ফুটে উঠেছে। ক্ল্যাসিকাল রাগ-রাগিণীর ওপর ভিত্তি করে বাংলা গানে নতুন মাত্রা যোগ করেছিলেন তিনি। তাঁর গান বাঙালির প্রতিটি গণতান্ত্রিক আন্দোলন, স্বাধীনতা সংগ্রাম এবং মুক্তির লড়াইয়ে প্রেরণা জুগিয়েছে।

রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি ও জীবনাবসান

স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালের ২৪ মে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের উদ্যোগে কবিকে সপরিবারে স্বাধীন বাংলাদেশে নিয়ে আসা হয়। তাঁকে বাংলাদেশের জাতীয় কবি হিসেবে ঘোষণা করা হয় এবং তাঁকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় বসবাসের ব্যবস্থা করে দেওয়া হয়।

জীবনের শেষ দীর্ঘ দিন তিনি প্রথাবিরোধী ও বাকশক্তিহীন অবস্থায় কাটিয়েছিলেন। ১৯৭৬ সালের ২৯ আগস্ট (১২ ভাদ্র ১৩৮৩ বঙ্গাব্দ) ঢাকা পিজি হাসপাতালে (বর্তমানে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়) তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মসজিদের পাশে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় তাঁকে সমাহিত করা হয়।

উপসংহার

কাজী নজরুল ইসলাম শুধু একটি নাম নয়, তিনি একটি প্রতিষ্ঠান, একটি চেতনার নাম। তাঁর বিদ্রোহী বাণী এবং সাম্যবাদের আদর্শ আজও বৈষম্যমূলক ও হানাহানিতে পূর্ণ এই পৃথিবীতে মানবতাকে পথ দেখায়। যতো দিন বাংলা ভাষা ও সাহিত্য বেঁচে থাকবে, ততো দিন বাঙালির হৃদয়ে চির জাগরুক হয়ে থাকবেন আমাদের বিদ্রোহী ও জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম।

মন্তব্য করুন

ব্লগ