সিনিয়র শিক্ষক
২৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ০৭:১৭ অপরাহ্ণ
বেসরকারী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান জাতীয়করণ
জাতীয়করণ হলেই কি শিক্ষার মান বাড়বে?
এমপিওভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান জাতীয়করণ করা হলেই শিক্ষার মান বাড়বে—এ ধারণা পুরোপুরি সত্য নয়। একইভাবে, জাতীয়করণ হলে শিক্ষকেরাই সবচেয়ে বেশি উপকৃত হবেন—এ কথাও সর্বাংশে সঠিক নয়। কারণ শিক্ষার মান কেবল প্রতিষ্ঠানের মালিকানা, অর্থায়ন কিংবা চাকরির নিরাপত্তার ওপর নির্ভর করে না। শিক্ষার মান নির্ধারিত হয় আরও বিস্তৃত কিছু উপাদানের সমন্বয়ে—দক্ষ ও নিবেদিত শিক্ষক, দূরদর্শী নেতৃত্ব, জবাবদিহি, শ্রেণিকক্ষের পরিবেশ, শিক্ষার্থী-অভিভাবকের সম্পৃক্ততা, আধুনিক শিক্ষাদান পদ্ধতি, অবকাঠামো, মূল্যায়নব্যবস্থা এবং সর্বোপরি শিক্ষার প্রতি সংশ্লিষ্ট সবার দায়বদ্ধতার মাধ্যমে।
জাতীয়করণ একটি প্রতিষ্ঠানের প্রশাসনিক ও অর্থনৈতিক কাঠামো পরিবর্তন করতে পারে; কিন্তু সেই পরিবর্তন নিজে থেকে শ্রেণিকক্ষের শিক্ষাদানকে উন্নত করে না। একটি বিদ্যালয় সরকারি ব্যবস্থার অধীনে চলে গেলেই শিক্ষক স্বয়ংক্রিয়ভাবে আরও দক্ষ, প্রতিষ্ঠানপ্রধান আরও যোগ্য, শিক্ষার্থী আরও মনোযোগী কিংবা পাঠদান আরও কার্যকর হয়ে যাবে—এমন কোনো সরল সমীকরণ নেই।
অতীতের জাতীয়করণকৃত বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অভিজ্ঞতাও একরৈখিক নয়। কোথাও সরকারি অর্থায়ন, অবকাঠামো ও প্রশাসনিক তদারকির কারণে প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বেড়েছে; আবার কোথাও চাকরির নিরাপত্তার সঙ্গে জবাবদিহির দুর্বলতা তৈরি হয়েছে। অর্থাৎ জাতীয়করণের ফলাফল মূলত নির্ভর করে কীভাবে জাতীয়করণ করা হলো এবং তার পর প্রতিষ্ঠানটি কীভাবে পরিচালিত হলো—তার ওপর।
জাতীয়করণ মানেই শিক্ষকের মানোন্নয়ন নয়
জাতীয়করণের ফলে শিক্ষকরা চাকরিগত নিরাপত্তা, বেতন-ভাতা ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধার ক্ষেত্রে উপকৃত হতে পারেন। এটি শিক্ষকদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ অর্জন। কিন্তু চাকরির নিরাপত্তা একজন শিক্ষককে স্বয়ংক্রিয়ভাবে অধিক দক্ষ, সৃজনশীল কিংবা দায়িত্বশীল করে তোলে না।
শিক্ষকের পেশাগত উন্নয়নের জন্য প্রয়োজন নিয়মিত প্রশিক্ষণ, বিষয়ভিত্তিক দক্ষতা উন্নয়ন, প্রযুক্তির ব্যবহার, শ্রেণিকক্ষ ব্যবস্থাপনা, নতুন শিক্ষাদান কৌশল, পেশাগত মর্যাদা এবং ন্যায্য কিন্তু কার্যকর জবাবদিহি।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—শিক্ষকের দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন।
একজন শিক্ষক যদি শিক্ষকতাকে শুধু একটি চাকরি হিসেবে দেখেন, তাহলে প্রতিষ্ঠান সরকারি হোক বা বেসরকারি—শিক্ষার কাঙ্ক্ষিত মান অর্জন কঠিন। পক্ষান্তরে একজন শিক্ষক যদি শিক্ষকতাকে মানুষ গড়ার দায়িত্ব হিসেবে গ্রহণ করেন, তাহলে সীমিত সুযোগ-সুবিধার মধ্যেও তিনি শিক্ষার্থীর জীবনে বড় পরিবর্তন আনতে পারেন।
তাই শিক্ষার মানোন্নয়নের প্রথম শর্ত শুধু প্রতিষ্ঠান জাতীয়করণ নয়; বরং শিক্ষকের পেশাগত চেতনা, দায়িত্ববোধ ও শিক্ষাদর্শের উন্নয়ন।
জাতীয়করণের সবচেয়ে বড় সুফল কার?
জাতীয়করণের সুফল নিয়ে আলোচনায় সাধারণত দুটি পক্ষ সামনে আসে—শিক্ষক ও সরকার। কিন্তু এর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পক্ষ হলো শিক্ষার্থী ও অভিভাবক।
একটি এমপিওভুক্ত বা বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীর পরিবারকে বিভিন্ন ধরনের শিক্ষা-সংক্রান্ত ব্যয় বহন করতে হয়। জাতীয়করণের ফলে যদি শিক্ষার্থীর ওপর আরোপিত বৈধ ও অনুমোদিত ব্যয়ের কিছু অংশ কমে আসে, তাহলে পরিবারে শিক্ষা-ব্যয়ের চাপও কমতে পারে। বিশেষ করে দরিদ্র ও নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারের জন্য এই আর্থিক স্বস্তি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
তাই জাতীয়করণের সাফল্য বিচার করার সময় শুধু প্রশ্ন হওয়া উচিত নয়—
শিক্ষক কী পেলেন?
সরকার কত টাকা ব্যয় করল?
বরং আরও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হওয়া উচিত—
শিক্ষার্থী কী পেল?
অভিভাবকের ব্যয় কতটা কমল?
শিক্ষার মান কতটা বাড়ল?
শ্রেণিকক্ষে শিক্ষাদানের মান কতটা উন্নত হলো?
রাষ্ট্র যে অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় করল, তার বিনিময়ে জনগণ কতটা মানসম্মত শিক্ষা পেল?
আমার উপজেলার একটি বাস্তব অভিজ্ঞতা
আমার উপজেলার অর্থনৈতিকভাবে সমৃদ্ধ একটি বিদ্যালয় জাতীয়করণ করা হয়েছে। কিন্তু জাতীয়করণের পরও অদ্যাবধি প্রতিষ্ঠানটির শিক্ষার মানে প্রত্যাশিত পরিবর্তন আসেনি। শিক্ষাদান পদ্ধতিতেও দৃশ্যমান আধুনিকায়ন ঘটেনি; প্রযুক্তিনির্ভর ও শিক্ষার্থী-কেন্দ্রিক পাঠদানের পরিবর্তে এখনো বহুলাংশে প্রচলিত চক-ডাস্টারনির্ভর পদ্ধতিই ব্যবহৃত হচ্ছে।
এর পাশাপাশি শিক্ষক-কোন্দলও বহাল তবিয়তে রয়েছে। অর্থাৎ প্রতিষ্ঠানটি জাতীয়করণ হয়েছে, কিন্তু প্রতিষ্ঠানের ভেতরের মানবিক সম্পর্ক, পেশাগত সংস্কৃতি ও নেতৃত্বের কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন ঘটেনি।
এই অভিজ্ঞতা অন্তত একটি বিষয় আমাদের ভাবতে বাধ্য করে—
প্রতিষ্ঠানের মালিকানা পরিবর্তন করা তুলনামূলকভাবে সহজ; কিন্তু প্রতিষ্ঠানের সংস্কৃতি পরিবর্তন করা অনেক কঠিন।
জাতীয়করণ যদি কেবল প্রশাসনিক কাঠামোর পরিবর্তনে সীমাবদ্ধ থাকে, অথচ শিক্ষকতার মান, নেতৃত্ব, জবাবদিহি, পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও শ্রেণিকক্ষের শিক্ষাদানে পরিবর্তন না আসে, তাহলে কাঙ্ক্ষিত শিক্ষার মান অর্জন করা কঠিন।
প্রতিষ্ঠানপ্রধানই হতে পারেন পরিবর্তনের কেন্দ্রবিন্দু
একটি বিদ্যালয়ের উন্নয়নে দক্ষ প্রতিষ্ঠানপ্রধানের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তিনি শুধু প্রশাসনিক কর্মকর্তা নন; তিনি প্রতিষ্ঠানের নেতৃত্বদাতা, সমন্বয়কারী এবং শিক্ষার পরিবেশ নির্মাণের প্রধান ব্যক্তি।
একজন দক্ষ প্রতিষ্ঠানপ্রধান—
- শিক্ষকদের মধ্যে দলগত কাজের সংস্কৃতি গড়ে তুলবেন;
- শিক্ষক-কোন্দলকে সংঘাতে পরিণত হতে দেবেন না;
- শিক্ষকের মর্যাদা রক্ষা করবেন, আবার দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রেও জবাবদিহি নিশ্চিত করবেন;
- শ্রেণিকক্ষের পাঠদান নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করবেন;
- দুর্বল শিক্ষার্থীদের জন্য সহায়ক ব্যবস্থা গড়ে তুলবেন;
- অভিভাবকদের সঙ্গে কার্যকর যোগাযোগ তৈরি করবেন;
- প্রযুক্তিনির্ভর ও শিক্ষার্থী-কেন্দ্রিক শিক্ষাদান উৎসাহিত করবেন;
- এবং প্রতিষ্ঠানের প্রতিটি সিদ্ধান্তে স্বচ্ছতা, ন্যায়সংগততা ও পেশাদারিত্ব বজায় রাখবেন।
একজন যোগ্য প্রতিষ্ঠানপ্রধান সীমিত সম্পদেও একটি বিদ্যালয়কে এগিয়ে নিতে পারেন। আবার দুর্বল নেতৃত্বের হাতে পর্যাপ্ত অর্থ, অবকাঠামো ও সরকারি সুযোগ-সুবিধা থাকলেও কাঙ্ক্ষিত ফল নাও আসতে পারে।
সুতরাং জাতীয়করণের পাশাপাশি প্রতিষ্ঠানপ্রধান নির্বাচন ও নেতৃত্বের মানোন্নয়নকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।
জাতীয়করণ কোনো জাদুর কাঠি নয়
জাতীয়করণকে শিক্ষার সব সমস্যার সমাধান হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এটি মূলত একটি প্রশাসনিক ও অর্থনৈতিক কাঠামোগত পরিবর্তন। এর সুফল নির্ভর করবে সেই কাঠামোর ভেতরে দক্ষ নেতৃত্ব, পেশাগত শিক্ষকতা, আধুনিক শিক্ষাদান, ন্যায্য জবাবদিহি এবং শিক্ষার্থী-কেন্দ্রিক ব্যবস্থাপনা কতটা প্রতিষ্ঠিত করা যায় তার ওপর।
অতএব, জাতীয়করণের সাফল্য শুধু কতটি প্রতিষ্ঠান জাতীয়করণ করা হলো—তা দিয়ে মাপা উচিত নয়। মাপতে হবে জাতীয়করণের পর—
শিক্ষার্থীর শেখার ফলাফল কতটা উন্নত হলো,
শিক্ষকের পেশাগত দক্ষতা কতটা বাড়ল,
অভিভাবকের আর্থিক চাপ কতটা কমল,
প্রতিষ্ঠানের পরিবেশ কতটা উন্নত হলো,
এবং জনগণের অর্থের বিনিময়ে রাষ্ট্র কতটা মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করতে পারল।
শেষ পর্যন্ত মনে রাখতে হবে—
জাতীয়করণ প্রতিষ্ঠানের মালিকানা বদলাতে পারে; কিন্তু শিক্ষার মান বদলাতে হলে বদলাতে হবে নেতৃত্ব, শিক্ষকতা ও জবাবদিহির সংস্কৃতি।
শিক্ষার প্রকৃত উন্নয়ন তখনই সম্ভব, যখন শিক্ষক পাবেন মর্যাদা ও পেশাগত বিকাশের সুযোগ, শিক্ষার্থী পাবে মানসম্মত ও আধুনিক শিক্ষা, অভিভাবক পাবেন অপ্রয়োজনীয় আর্থিক চাপ থেকে স্বস্তি, আর প্রতিষ্ঠান পাবে একজন দক্ষ, ন্যায়নিষ্ঠ ও প্রতিশ্রুতিবদ্ধ প্রতিষ্ঠানপ্রধান।
জাতীয়করণের চূড়ান্ত সাফল্য তাই সরকারি খাতের বিস্তারে নয়—শ্রেণিকক্ষে তার প্রতিফলনে।
—মুফিদুল আলম
রামু, কক্সবাজার
১৬
২৬ মন্তব্য