Loading..

ব্লগ

রিসেট

২৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ০৮:১৯ অপরাহ্ণ

শিক্ষায় সমতা প্রতিষ্ঠায় প্রয়োজন অগ্রাধিকারভিত্তিক জাতীয়করণ

শিক্ষায় সমতা প্রতিষ্ঠায় প্রয়োজন অগ্রাধিকারভিত্তিক জাতীয়করণ
শিক্ষা কেবল একটি সেবা নয়—এটি নাগরিকের মৌলিক অধিকার, রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ নির্মাণের প্রধান হাতিয়ার। একটি রাষ্ট্র কতটা ন্যায়ভিত্তিক, তার অন্যতম মাপকাঠি হলো—তার প্রত্যন্ত জনপদের শিশুটি আর রাজধানী বা শহরের শিশুটির মতো সমান শিক্ষার সুযোগ পাচ্ছে কি না।
বাংলাদেশের সংবিধান রাষ্ট্রকে মানুষের জন্য সমান সুযোগ সৃষ্টি এবং শিক্ষার প্রসারে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালনের নির্দেশনা দিয়েছে। কিন্তু বাস্তবতার চিত্র এখনো সম্পূর্ণ সমতাভিত্তিক নয়। দেশের কোনো কোনো অঞ্চলে বিদ্যালয় আছে, কিন্তু পর্যাপ্ত শিক্ষক নেই; কোথাও শিক্ষক আছেন, কিন্তু যোগাযোগব্যবস্থা দুর্বল; কোথাও বিদ্যালয় আছে, কিন্তু দারিদ্র্য, দুর্গমতা ও সামাজিক পশ্চাৎপদতার কারণে শিক্ষার্থীদের সামনে এগিয়ে যাওয়ার পথ সংকীর্ণ।
তাই এমপিওভুক্ত মাধ্যমিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান জাতীয়করণের ক্ষেত্রে শুধু প্রতিষ্ঠানের বয়স, শিক্ষার্থীসংখ্যা, অবকাঠামো কিংবা পরীক্ষার ফলাফলকে একমাত্র মানদণ্ড করা যথেষ্ট নয়। জাতীয়করণের নীতিতে সামাজিক ও ভৌগোলিক বৈষম্যকে বিশেষ গুরুত্ব দিতে হবে।
রাষ্ট্রের দায়িত্ব কেবল যেখানে সুবিধা আগে থেকেই আছে, সেখানে আরও সুবিধা পৌঁছে দেওয়া নয়; বরং যেখানে বঞ্চনা বেশি, সেখানে রাষ্ট্রের হাত আরও শক্ত করে পৌঁছে দেওয়া।

প্রস্তাবিত অগ্রাধিকার সূচক
জাতীয়করণের জন্য একটি স্বচ্ছ, পরিমাপযোগ্য ও অগ্রাধিকারভিত্তিক স্কোরিং পদ্ধতি প্রণয়ন করা যেতে পারে। সম্ভাব্য সূচকগুলো হতে পারে—
১. অবহেলিত ও পশ্চাৎপদ এলাকার প্রতিষ্ঠান
যেসব অঞ্চলে দীর্ঘদিন ধরে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, যোগাযোগ ও অন্যান্য নাগরিক সুবিধা তুলনামূলকভাবে কম—সেসব এলাকার প্রতিষ্ঠানকে অগ্রাধিকার দেওয়া।
২. সুবিধাবঞ্চিত জনগোষ্ঠীর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান
দরিদ্র, প্রান্তিক ও সামাজিকভাবে পিছিয়ে থাকা জনগোষ্ঠীর শিক্ষার সুযোগ নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া।
৩. দুর্গম ও দুর্বল যোগাযোগব্যবস্থার অঞ্চল
পাহাড়ি, চরাঞ্চল, দ্বীপাঞ্চল, সীমান্তবর্তী কিংবা এমন প্রত্যন্ত এলাকা—যেখানে শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের নিয়মিত যাতায়াত কঠিন—সেসব প্রতিষ্ঠানকে অগ্রাধিকার দেওয়া।
৪. নিকটবর্তী সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের স্বল্পতা
যে এলাকায় পর্যাপ্ত সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয় নেই এবং একটি এমপিওভুক্ত প্রতিষ্ঠানই বৃহৎ জনগোষ্ঠীর মাধ্যমিক শিক্ষার প্রধান আশ্রয়, সেই প্রতিষ্ঠানকে বিশেষ বিবেচনায় নেওয়া।
৫. দরিদ্র ও নিম্নআয়ের শিক্ষার্থীর উচ্চ অনুপাত
প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের আর্থসামাজিক অবস্থা জাতীয়করণের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সূচক হওয়া উচিত।
৬. দীর্ঘদিনের শিক্ষাসেবা ও প্রাতিষ্ঠানিক ধারাবাহিকতা
যেসব প্রতিষ্ঠান দীর্ঘদিন ধরে এমপিওভুক্ত থেকে নিয়মিতভাবে স্থানীয় জনগোষ্ঠীকে শিক্ষাসেবা দিয়ে আসছে, তাদের অবদান মূল্যায়ন করা।
৭. শিক্ষার মান ও ধারাবাহিকতায় ইতিবাচক ভূমিকা
এসএসসি ফলাফল, শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি, ঝরে পড়া রোধ, উচ্চশিক্ষায় অগ্রসর হওয়ার হার এবং সামগ্রিক শিক্ষার পরিবেশ বিবেচনায় নেওয়া যেতে পারে।
৮. নারীশিক্ষা ও প্রান্তিক শিক্ষার্থীদের অগ্রগতিতে অবদান
যেসব প্রতিষ্ঠান নারীশিক্ষার প্রসার, বাল্যবিবাহ প্রতিরোধ, ঝরে পড়া কমানো এবং প্রান্তিক শিক্ষার্থীদের শিক্ষায় ধরে রাখতে কার্যকর ভূমিকা রাখছে, তাদের অতিরিক্ত অগ্রাধিকার দেওয়া যেতে পারে।
৯. দুর্যোগপ্রবণ ও সীমান্তবর্তী অঞ্চল
ঘূর্ণিঝড়, বন্যা, নদীভাঙন, পাহাড়ধস কিংবা অন্যান্য প্রাকৃতিক দুর্যোগে নিয়মিত ক্ষতিগ্রস্ত এবং সীমান্তবর্তী জনপদের প্রতিষ্ঠানগুলোকে বিশেষ ক্যাটাগরিতে বিবেচনা করা প্রয়োজন।
১০. স্থানীয় জনগণের শিক্ষা চাহিদা পূরণে ভূমিকা
কোনো প্রতিষ্ঠানের ওপর একটি বিস্তীর্ণ এলাকার মানুষের মাধ্যমিক শিক্ষার নির্ভরতা কতটা—সেটিও জাতীয়করণের গুরুত্বপূর্ণ সূচক হতে পারে।

শুধু অবকাঠামো নয়, দেখতে হবে বঞ্চনার মানচিত্র
জাতীয়করণের ক্ষেত্রে একটি বিষয় বিশেষভাবে মনে রাখা প্রয়োজন—শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অবকাঠামো অনেক সময় তার প্রয়োজনীয়তার প্রকৃত চিত্র তুলে ধরে না।
একটি শহরের বিদ্যালয় হয়তো উন্নত ভবন, ভালো রাস্তা ও নানা নাগরিক সুবিধায় সমৃদ্ধ। অন্যদিকে পাহাড়ের পাদদেশে কিংবা প্রত্যন্ত গ্রামে একটি প্রতিষ্ঠান হয়তো সীমিত অবকাঠামো নিয়েও বছরের পর বছর হাজারো শিক্ষার্থীর শিক্ষার আলো জ্বালিয়ে যাচ্ছে।
তাই শুধু ভবনের সৌন্দর্য দিয়ে প্রয়োজনের গভীরতা পরিমাপ করা যাবে না।
জাতীয়করণের আগে দেখতে হবে—কোন প্রতিষ্ঠান কতটা সুবিধাপ্রাপ্ত নয়, বরং কোন প্রতিষ্ঠান কতটা বঞ্চিত জনগোষ্ঠীর পাশে দাঁড়িয়ে আছে।

কেন প্রয়োজন এই নীতি?
জাতীয়করণকে কেবল শিক্ষকদের চাকরির নিশ্চয়তা বা প্রতিষ্ঠানের প্রশাসনিক পরিবর্তন হিসেবে দেখলে এর বৃহত্তর উদ্দেশ্যটি আড়ালে পড়ে যায়। জাতীয়করণ মূলত রাষ্ট্রের শিক্ষা সেবা সম্প্রসারণের একটি কৌশলগত উদ্যোগ।
যেখানে রাষ্ট্রীয় শিক্ষা অবকাঠামোর উপস্থিতি দুর্বল, যেখানে একটি এমপিওভুক্ত বিদ্যালয়ই একটি বিশাল জনগোষ্ঠীর শিক্ষার প্রধান অবলম্বন—সেখানে জাতীয়করণের মাধ্যমে রাষ্ট্রের প্রত্যক্ষ উপস্থিতি তৈরি করা যেতে পারে।
এই নীতি বাস্তবায়িত হলে—
শহর ও গ্রামের শিক্ষাবৈষম্য কমবে;
প্রত্যন্ত ও প্রান্তিক শিক্ষার্থীরা অধিকতর সমান সুযোগ পাবে;
দুর্গম অঞ্চলে দক্ষ শিক্ষক ধরে রাখা সহজ হবে;
শিক্ষার্থী ঝরে পড়ার হার কমতে পারে;
নারীশিক্ষা ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর অংশগ্রহণ বাড়বে;
শিক্ষার মানোন্নয়নে রাষ্ট্রীয় তদারকি শক্তিশালী হবে;
শিক্ষা সেবার ভৌগোলিক ভারসাম্য প্রতিষ্ঠিত হবে;
এবং সর্বোপরি, রাষ্ট্রের সামাজিক ন্যায় ও সমতার অঙ্গীকার আরও বাস্তব রূপ পাবে।

জাতীয়করণের দর্শন হোক ‘সমতার মাধ্যমে ন্যায়’
সমতা মানে সবাইকে একই জিনিস দেওয়া নয়; বরং যার প্রয়োজন বেশি, তাকে প্রয়োজন অনুযায়ী বেশি সহায়তা দেওয়া।
একজন শহুরে শিক্ষার্থী যেখানে কয়েকটি বিদ্যালয়ের বিকল্প পায়, সেখানে প্রত্যন্ত গ্রামের একজন শিক্ষার্থীর সামনে হয়তো একটি মাত্র মাধ্যমিক বিদ্যালয়। শহরের শিক্ষার্থী যেখানে সহজেই কোচিং, পরিবহন, প্রযুক্তি ও নানা শিক্ষাসুবিধা পায়, সেখানে দুর্গম অঞ্চলের শিক্ষার্থীকে কখনো কখনো কয়েক কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে বিদ্যালয়ে যেতে হয়।
এই বাস্তবতার মধ্যে দুই প্রতিষ্ঠানকে কেবল একই মাপকাঠিতে বিচার করলে সমতা প্রতিষ্ঠিত হবে না; বরং বৈষম্যই স্থায়ী হবে।
সুতরাং জাতীয়করণের নীতি হতে হবে ‘সমতার মাধ্যমে ন্যায়’ প্রতিষ্ঠার নীতি।

শেষ কথা
জাতীয়করণ এমন কোনো পুরস্কার হওয়া উচিত নয়, যা কেবল অপেক্ষাকৃত শক্তিশালী ও সুবিধাপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠান অর্জন করবে। এটি হওয়া উচিত রাষ্ট্রের সামাজিক দায়বদ্ধতার একটি গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার।
যে অঞ্চলে শিক্ষার আলো সবচেয়ে ক্ষীণ,
যে জনপদে বিদ্যালয়ই রাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় আশ্রয়,
যে শিশুর সামনে শিক্ষার পথ সবচেয়ে দুর্গম—
জাতীয়করণের অগ্রাধিকার তালিকায় সেই শিশুটির কথাই সবার আগে আসা উচিত।
কারণ রাষ্ট্রের প্রকৃত শক্তি বোঝা যায় তার রাজধানীর আলোকিত ভবনে নয়; বোঝা যায় তার প্রত্যন্ত জনপদের একটি শিশুর হাতে বই পৌঁছেছে কি না, একটি দরিদ্র পরিবারের সন্তান বিদ্যালয়ে টিকে থাকতে পেরেছে কি না, কিংবা পাহাড়-চর-দ্বীপের কোনো কিশোরী নিজের স্বপ্নকে শিক্ষার মাধ্যমে বাস্তবে রূপ দেওয়ার সুযোগ পেয়েছে কি না।
তাই এমপিওভুক্ত মাধ্যমিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান জাতীয়করণের নীতি হোক—
সুবিধাপ্রাপ্তকে আরও সুবিধা দেওয়ার নীতি নয়,
বরং সুবিধাবঞ্চিতের পাশে রাষ্ট্রের শক্ত হাত বাড়িয়ে দেওয়ার নীতি।
শিক্ষার অধিকার সবার—
সুযোগও হোক সবার সমান।
আর যে জনপদ সবচেয়ে বেশি বঞ্চিত,
রাষ্ট্রীয় অগ্রাধিকারে সেই জনপদই পাক সবার আগে স্থান।

মুফিদুল আলম
রামু,কক্সবাজার।

মন্তব্য করুন