Loading..

ব্লগ

রিসেট

২৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ০৮:৪৯ অপরাহ্ণ

হামের টিকা: কোন বয়সে দিতে হয়, কোথায় পাবেন ও পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া | নতুন হামের টিকা ক্যাম্পেইন

শিশুর ৯ মাস বয়স হলেই মায়েদের মনে একটা প্রশ্ন ঘুরতে থাকে — হামের টিকা কবে দেব, কোথায় দেব, টিকা দিলে জ্বর আসবে কিনা। আবার অনেকের মনে ভয়ও কাজ করে। টিকা না দিলে কী হবে, দিলে আবার হাম হবে কিনা — এমন নানা প্রশ্ন।

এই একটি পোস্টে হামের টিকা নিয়ে আপনার সব প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার চেষ্টা করেছি। টিকার বয়স, কোথায় পাবেন, দাম, পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া, টিকা না দিলে কী হয় — সবকিছু এক জায়গায় পাবেন। মনোযোগ দিয়ে পড়ুন, তারপর নিশ্চিন্তে সিদ্ধান্ত নিন।

হামের টিকা কী?

হামের টিকা হলো হাম (Measles) রোগ প্রতিরোধের টিকা। বাংলাদেশে সরকারি টিকাদান কর্মসূচিতে (EPI) যে টিকা দেওয়া হয়, তার নাম এমআর টিকা (MR Vaccine)। এই একটি টিকাতেই দুটি রোগের সুরক্ষা মেলে — হাম (Measles) ও রুবেলা (Rubella)।

অনেকে এমএমআর (MMR) টিকার নাম শুনে থাকেন। MMR টিকায় হাম, মামস ও রুবেলা — তিনটি রোগের সুরক্ষা থাকে। বাংলাদেশের সরকারি কর্মসূচিতে MR টিকা দেওয়া হয়, MMR নয়। তবে বেসরকারি হাসপাতালে চাইলে MMR টিকাও নেওয়া যায়। দুটোই নিরাপদ ও কার্যকর।

এই টিকা তৈরি হয় দুর্বল করা জীবন্ত ভাইরাস দিয়ে। ভয় পাবেন না — এই দুর্বল ভাইরাস শরীরে রোগ সৃষ্টি করতে পারে না। বরং শরীরের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থাকে চিনিয়ে দেয়, যাতে ভবিষ্যতে আসল ভাইরাস এলে শরীর লড়তে পারে।

হামের টিকা কত বছর বয়সে দিতে হয়?

বাংলাদেশের সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচি (EPI) অনুযায়ী হামের টিকার সময়সূচি নিচে দেওয়া হলো:

ডোজ

কখন দিতে হয়

টিকার নাম

প্রথম ডোজ

৯ মাস বয়স পূর্ণ হলে

MR টিকা

দ্বিতীয় ডোজ

১৫ মাস বয়সে

MR টিকা

 

দুটি ডোজই সম্পূর্ণ করা জরুরি। প্রথম ডোজে শরীরে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি হতে শুরু করে, দ্বিতীয় ডোজ সেই সুরক্ষাকে পাকাপোক্ত করে।

অনেক বাবা-মা জানতে চান, ৯ মাসের আগে কি টিকা দেওয়া যায়? সাধারণত দেওয়া হয় না। কারণ জন্মের পর মায়ের শরীর থেকে পাওয়া অ্যান্টিবডি শিশুর শরীরে থাকে, যা টিকার কার্যকারিতা কমিয়ে দেয়। তবে এলাকায় হামের প্রাদুর্ভাব দেখা দিলে বিশেষ পরিস্থিতিতে ৬ মাস বয়সেও টিকা দেওয়া হয়। সেক্ষেত্রে ৯ মাস বয়সে আবার টিকা দিতে হয়।

হামের টিকা কোথায় দেওয়া হয়?

ভালো খবর হলো, হামের টিকার জন্য আপনাকে টাকা খরচ করতে হবে না, দূরেও যেতে হবে না। সরকারি ব্যবস্থায় সম্পূর্ণ বিনামূল্যে এই টিকা পাওয়া যায়।

টিকা পাবেন যেসব জায়গায়:

·       ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্র

·       কমিউনিটি ক্লিনিক

·       উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স

·       জেলা সদর হাসপাতাল

·       সিটি কর্পোরেশন এলাকায় নগর স্বাস্থ্যকেন্দ্র ও টিকাদান কেন্দ্র

·       EPI আউটরিচ সেশন (গ্রামে গ্রামে ঘুরে টিকা দেওয়ার কর্মসূচি)

টিকা নিতে যাওয়ার সময় শিশুর টিকা কার্ড সঙ্গে নিয়ে যাবেন। টিকাদান সাধারণত সপ্তাহের নির্দিষ্ট দিনে হয়, এলাকাভেদে দিন আলাদা হতে পারে। তাই যাওয়ার আগে স্থানীয় স্বাস্থ্যকর্মীর কাছ থেকে দিনক্ষণ জেনে নিন।

একটা তথ্য অনেকেই জানেন না — যেসব বেসরকারি হাসপাতাল টিকাদান সেবা দেয়, সেখানেও EPI-এর টিকা বিনামূল্যে পাওয়া যায়। অর্থাৎ সরকারি কেন্দ্রে ভিড় এড়াতে চাইলে নিকটস্থ বেসরকারি হাসপাতালেও খোঁজ নিতে পারেন।

হামের টিকা কি কিনতে পাওয়া যায়?

সরকারি কেন্দ্রে বিনামূল্যে পাওয়া যায় বলে হামের টিকা কেনার সাধারণত কোনো প্রয়োজন হয় না। তবে কেউ চাইলে বেসরকারি হাসপাতাল বা ক্লিনিক থেকে আমদানি করা MMR টিকা টাকা দিয়ে নিতে পারেন।

দাম হাসপাতালভেদে ভিন্ন হয়। টিকা নেওয়ার আগে হাসপাতালে ফোন করে দাম জেনে নেওয়াই ভালো।

একটা সতর্কতা: ফার্মেসি থেকে টিকা কিনে নিজে বা অপ্রশিক্ষিত কারও দিয়ে শিশুকে দেওয়াবেন না। টিকা সংরক্ষণে নির্দিষ্ট তাপমাত্রা (কোল্ড চেইন) বজায় রাখতে হয় এবং সঠিক পদ্ধতিতে প্রয়োগ করতে হয়। ভুলভাবে সংরক্ষিত বা প্রয়োগ করা টিকা কাজ নাও করতে পারে। সবসময় প্রশিক্ষিত স্বাস্থ্যকর্মীর মাধ্যমে টিকা দিন।

হামের টিকা দিলে কি জ্বর আসে?

হ্যাঁ, আসতে পারে। এবং এটা নিয়ে ভয় পাওয়ার কিছু নেই।

টিকা দেওয়ার ৭ থেকে ১২ দিন পর অনেক শিশুর হালকা জ্বর আসে। কারও কারও গায়ে হালকা লালচে দানাও বেরোতে পারে। এগুলো টিকার স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া। এর মানে হলো শিশুর শরীরে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি হচ্ছে — টিকা কাজ করছে।

যেসব পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া দেখা যেতে পারে:

·       ইনজেকশনের জায়গায় হালকা ব্যথা, লালচে ভাব বা ফোলা

·       হালকা জ্বর (টিকার ৭-১২ দিন পর)

·       গায়ে সামান্য র‍্যাশ

·       সাময়িক খিটখিটে ভাব বা ক্ষুধামন্দা

এই লক্ষণগুলো সাধারণত ২-৩ দিনের মধ্যে নিজে নিজেই সেরে যায়। জ্বর এলে ডাক্তারের পরামর্শে সঠিক মাত্রায় প্যারাসিটামল সিরাপ দিতে পারেন। শিশুকে প্রচুর পানি ও তরল খাবার দিন।

তবে নিচের লক্ষণগুলো দেখা দিলে দেরি না করে ডাক্তারের কাছে যান:

·       ৩ দিনের বেশি জ্বর থাকলে

·       জ্বর ১০৩ ডিগ্রি ফারেনহাইটের বেশি হলে

·       সারা শরীরে ছড়িয়ে পড়া তীব্র র‍্যাশ

·       শ্বাসকষ্ট বা খিঁচুনি হলে

·       শিশু অস্বাভাবিক নিস্তেজ হয়ে পড়লে

মনে রাখবেন, গুরুতর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া অত্যন্ত বিরল। লাখে একজনেও হয় কিনা সন্দেহ। টিকার এই সামান্য ঝুঁকি হাম রোগের ভয়াবহ জটিলতার তুলনায় কিছুই না।

টিকা দেওয়ার আগে ও পরে করণীয়

টিকার দিন একটু প্রস্তুতি নিয়ে গেলে শিশুর কষ্ট কম হয়, আপনার দুশ্চিন্তাও কমে।

টিকা দেওয়ার আগে:

·       শিশু সুস্থ আছে কিনা দেখে নিন। জ্বর, সর্দি-কাশি বা ডায়রিয়া থাকলে স্বাস্থ্যকর্মীকে জানান

·       শিশুকে হালকা খাবার খাইয়ে নিয়ে যান, খালি পেটে টিকা দেবেন না

·       টিকা কার্ড সঙ্গে নিন

·       শিশুর কোনো ওষুধে বা খাবারে তীব্র অ্যালার্জির ইতিহাস থাকলে আগেই জানিয়ে দিন

·       ঢিলেঢালা পোশাক পরান, যাতে বাহুতে সহজে ইনজেকশন দেওয়া যায়

টিকা দেওয়ার পর:

·       টিকাকেন্দ্রে অন্তত ৩০ মিনিট অপেক্ষা করুন। কোনো তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া হলে স্বাস্থ্যকর্মী ব্যবস্থা নিতে পারবেন

·       ইনজেকশনের জায়গায় শিশুকে হাত দিতে দেবেন না, চাপ দেবেন না

·       হালকা জ্বর এলে ভেজা কাপড় দিয়ে গা মুছিয়ে দিন

·       বুকের দুধ খাওয়া শিশুকে স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি বার দুধ খাওয়ান

·       টিকার পর গোসল করানো যায়, এতে কোনো সমস্যা নেই

·       টিকা কার্ডে তারিখ লিখিয়ে নিতে ভুলবেন না

হামের টিকা কত বছর বয়স পর্যন্ত দেওয়া যায়?

এই প্রশ্নটা অনেক বাবা-মা করেন — "আমার বাচ্চার বয়স তো ৩ বছর হয়ে গেছে, এখন কি আর টিকা দেওয়া যাবে?"

উত্তর হলো: হ্যাঁ, যাবে। নির্ধারিত সময় পেরিয়ে গেলেও টিকা দেওয়া যায় এবং দেওয়া উচিত। "দেরি হয়ে গেছে" ভেবে টিকা না দেওয়াটাই বড় ভুল।

যাদের শৈশবে টিকা নেওয়া হয়নি, তারা বড় হয়েও টিকা নিতে পারেন। সেক্ষেত্রে অন্তত ২৮ দিনের ব্যবধানে দুটি ডোজ নিতে হয়। বিশেষ করে যারা শিশুদের সংস্পর্শে বেশি থাকেন — শিক্ষক, স্বাস্থ্যকর্মী, নতুন মা — তাদের টিকার অবস্থা যাচাই করে নেওয়া ভালো।

তবে একটা ব্যতিক্রম আছে। গর্ভবতী মায়েরা হামের টিকা নিতে পারবেন না, কারণ এটি জীবন্ত ভাইরাসের টিকা। গর্ভধারণের পরিকল্পনা থাকলে টিকা নেওয়ার অন্তত এক মাস পর গর্ভধারণ করা উচিত। প্রজননক্ষম নারীদের জন্য এই টিকা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ, কারণ রুবেলা গর্ভের শিশুর জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর হতে পারে।

হামের টিকা না দিলে কি হয়?

অনেকে ভাবেন, হাম তো ছোটবেলার সাধারণ রোগ — হয়েই যায়, সেরেও যায়। এই ধারণাটা ভুল এবং ক্ষেত্রবিশেষে প্রাণঘাতী।

টিকা না নেওয়া শিশু হামে আক্রান্ত হলে যেসব জটিলতা হতে পারে:

·       নিউমোনিয়া: হামের সবচেয়ে সাধারণ মারাত্মক জটিলতা। হামে মৃত্যুর প্রধান কারণ এটাই। প্রতি ২০ জন আক্রান্তের মধ্যে ১ জনের নিউমোনিয়া হয়

·       ডায়রিয়া ও পানিশূন্যতা: বিশেষ করে অপুষ্ট শিশুদের জন্য বিপজ্জনক

·       কানের সংক্রমণ: প্রতি ১০ জনে ১ জনের হয়। চিকিৎসা না হলে শ্রবণশক্তি নষ্ট হতে পারে

·       এনসেফালাইটিস (মস্তিষ্কের প্রদাহ): প্রতি ১,০০০ জনে ১ জনের হয়। স্থায়ী মস্তিষ্কের ক্ষতি বা মৃত্যু হতে পারে

·       চোখের ক্ষতি: কর্নিয়ায় ঘা হয়ে দৃষ্টিশক্তি কমে যেতে পারে, এমনকি অন্ধত্বও হতে পারে

·       রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতার দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতি: হাম শরীরের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থার স্মৃতি মুছে দেয়। ফলে শিশু পরবর্তীতে অন্য রোগেও সহজে আক্রান্ত হয়

আরেকটা দিক আছে, যেটা নিয়ে কেউ ভাবে না — খরচ। হামে আক্রান্ত শিশুর চিকিৎসায় অনেক পরিবার লাখ টাকা খরচ করে ফেলে। হাসপাতালে ভর্তি, ওষুধ, পরীক্ষা — সব মিলিয়ে একটা মধ্যবিত্ত পরিবারের সঞ্চয় শেষ হয়ে যেতে পারে। অথচ বিনামূল্যের দুটি টিকাই এই বিপদ থেকে বাঁচাতে পারত।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, শুধু ২০২২ সালেই বিশ্বে হামে প্রায় ১ লাখ ৩৬ হাজার মানুষ মারা গেছে, যাদের বেশিরভাগই ৫ বছরের কম বয়সী শিশু। অথচ এই মৃত্যুগুলো প্রতিরোধযোগ্য ছিল।

হামের টিকা দিলে কি আবার হাম হয়?

সংক্ষিপ্ত উত্তর: প্রায় না।

দুটি ডোজ সম্পূর্ণ করলে হামের বিরুদ্ধে সুরক্ষা প্রায় ৯৭ শতাংশ। অর্থাৎ ১০০ জন টিকা নেওয়া শিশুর মধ্যে ৯৭ জন সম্পূর্ণ সুরক্ষিত থাকে। এক ডোজে ৯ মাস বয়সে ৮৫ শতাংশ এবং ১২ মাসের বেশি বয়সে ৯৫ শতাংশ শিশুর রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি হয়। যাদের এক ডোজে হয় না, দ্বিতীয় ডোজে তাদেরও সুরক্ষা তৈরি হয়।

খুব বিরল ক্ষেত্রে টিকা নেওয়ার পরও হাম হতে পারে। তবে সেক্ষেত্রে রোগ সাধারণত অনেক হালকা হয় এবং জটিলতার ঝুঁকি থাকে না বললেই চলে।

এখানে আরেকটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় আছে — গোষ্ঠী সুরক্ষা (Herd Immunity)। কোনো এলাকার অন্তত ৯৫ শতাংশ শিশু টিকার আওতায় থাকলে হামের প্রাদুর্ভাব ঠেকানো যায়। আপনার শিশুকে টিকা দিলে শুধু সে-ই নয়, টিকা নিতে না পারা নবজাতক ও অসুস্থ শিশুরাও সুরক্ষা পায়।

২০২৬ সালের বিশেষ টিকাদান কর্মসূচি

২০২৬ সালে দেশে হামের প্রকোপ বেড়ে যাওয়ায় সরকার বিশেষ টিকাদান কর্মসূচি হাতে নিয়েছে। এই তথ্যটা জেনে রাখা জরুরি, কারণ আপনার শিশু এই কর্মসূচির আওতায় পড়তে পারে।

·       এপ্রিল মাসে দেশের ১৮ জেলার ৩০টি উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ উপজেলায় জরুরি হাম-রুবেলা টিকাদান ক্যাম্পেইন শুরু হয়

·       ২০ এপ্রিল থেকে সারাদেশে একযোগে ৬ মাস থেকে ৫৯ মাস (৫ বছরের কম) বয়সী শিশুদের টিকাদান কর্মসূচি চালু হয়

·       ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬ থেকে সারাদেশে আরও একটি নিবিড় ক্যাচ-আপ টিকাদান ক্যাম্পেইন শুরু হচ্ছে। যেসব শিশু (৬ মাস থেকে ৫ বছরের কম বয়সী) আগে টিকা নিতে পারেনি, তাদের এই কর্মসূচির আওতায় আনা হবে

·       আগে টিকা নিয়ে থাকলেও এই ক্যাম্পেইনে আবার টিকা নেওয়া যাবে, এতে কোনো ক্ষতি নেই

আপনার শিশুর টিকা বাদ পড়ে থাকলে নিকটস্থ স্বাস্থ্যকেন্দ্রে যোগাযোগ করুন। ক্যাম্পেইনের তারিখ ও কেন্দ্রের তালিকা স্থানীয় স্বাস্থ্যকর্মীর কাছে পাবেন।

টিকা কার্ড হারিয়ে গেলে কী করবেন?

টিকা কার্ড হারিয়ে যাওয়া খুবই সাধারণ ঘটনা। ঘাবড়াবেন না।

প্রতিটি টিকাদান কেন্দ্রে রেজিস্টার খাতায় শিশুর টিকার রেকর্ড সংরক্ষিত থাকে। নিকটস্থ EPI কেন্দ্র বা যেখান থেকে টিকা নিয়েছিলেন সেখানে গিয়ে শিশুর নাম ও আনুমানিক তারিখ বললে রেকর্ড খুঁজে পাওয়া যায়। সেখান থেকে নতুন কার্ড সংগ্রহ করে নিন।

ভবিষ্যতের জন্য কার্ডের ছবি তুলে মোবাইলে রেখে দিন। তাহলে হারালেও তথ্য হাতের কাছে থাকবে।

হামের টিকা নিয়ে প্রচলিত ভুল ধারণা

টিকা নিয়ে সমাজে অনেক ভুল ধারণা ছড়িয়ে আছে। সঠিক তথ্য জানা থাকলে সিদ্ধান্ত নেওয়া সহজ হয়।

ভুল ধারণা ১: হামের টিকায় অটিজম হয়

এটা সম্পূর্ণ ভুল। লাখ লাখ শিশুর ওপর বড় বড় গবেষণায় টিকা ও অটিজমের মধ্যে কোনো সম্পর্ক পাওয়া যায়নি। এই দাবির পক্ষে কোনো বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই।

ভুল ধারণা ২: টিকা দিলেই হাম হয়

টিকায় থাকে দুর্বল করা ভাইরাস, যা রোগ সৃষ্টি করতে পারে না। টিকার কয়েকদিন পর হালকা জ্বর বা র‍্যাশ হলে সেটা হাম নয়, শরীরে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরির স্বাভাবিক লক্ষণ।

ভুল ধারণা ৩: গরমে বা বর্ষাকালে টিকা দেওয়া যায় না

ঋতুর সঙ্গে টিকার কার্যকারিতার কোনো সম্পর্ক নেই। যেকোনো সময় টিকা দেওয়া যায়, শুধু শিশু সুস্থ থাকতে হবে।

ভুল ধারণা ৪: হাম হলে শিশুকে গোসল করানো যায় না, পানি খাওয়ানো যায় না

এগুলো কুসংস্কার। হালকা গরম পানিতে গোসল করালে জ্বর কমে, শিশু আরাম পায়। আর প্রচুর পানি পান করানো হামের পরিচর্যার অন্যতম প্রধান অংশ।

ভুল ধারণা ৫: একবার হাম হলে আর টিকার দরকার নেই

এটা আংশিক সত্যি — একবার হাম হলে সাধারণত আজীবন রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি হয়। কিন্তু টিকা না নিয়ে হামে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি নেওয়ার কোনো মানে হয় না, কারণ হামে মৃত্যু পর্যন্ত হতে পারে।

সচরাচর জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন (FAQ)

হামের টিকা কত বছর বয়সে দিতে হয়?

৯ মাস বয়স পূর্ণ হলে প্রথম ডোজ এবং ১৫ মাস বয়সে দ্বিতীয় ডোজ দিতে হয়। দুটি ডোজই নেওয়া জরুরি।

হামের টিকা দিলে কি জ্বর আসে?

হ্যাঁ, টিকার ৭ থেকে ১২ দিন পর হালকা জ্বর আসতে পারে। এটা স্বাভাবিক এবং ২-৩ দিনের মধ্যে সেরে যায়। এতে ভয় পাওয়ার কিছু নেই।

হামের টিকা কোথায় দেওয়া হয়?

ইউনিয়ন স্বাস্থ্যকেন্দ্র, কমিউনিটি ক্লিনিক, উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স, জেলা সদর হাসপাতাল ও সিটি কর্পোরেশনের টিকাদান কেন্দ্রে সম্পূর্ণ বিনামূল্যে দেওয়া হয়।

হামের টিকা কত বছর বয়স পর্যন্ত দেওয়া যায়?

নির্ধারিত বয়স পেরিয়ে গেলেও টিকা দেওয়া যায়। শৈশবে না নিলে বড় হয়েও ২৮ দিনের ব্যবধানে দুটি ডোজ নেওয়া যায়।

হামের টিকা না দিলে কি হয়?

টিকা না নেওয়া শিশু হামে আক্রান্ত হলে নিউমোনিয়া, মস্তিষ্কের প্রদাহ, চোখের ক্ষতি এমনকি মৃত্যুর ঝুঁকি থাকে।

হামের টিকা দিলে কি আবার হাম হয়?

দুটি ডোজ নিলে ৯৭ শতাংশ সুরক্ষা মেলে। খুব বিরল ক্ষেত্রে হলেও রোগ হালকা হয়, জটিলতা হয় না।

হামের টিকা কি কিনতে পাওয়া যায়?

সরকারি কেন্দ্রে বিনামূল্যে পাওয়া যায় বলে কেনার দরকার হয় না। তবে বেসরকারি হাসপাতাল থেকে আমদানি করা MMR টিকা টাকা দিয়ে নেওয়া যায়।

গর্ভাবস্থায় কি হামের টিকা দেওয়া যায়?

না। গর্ভবতী মায়েরা এই টিকা নিতে পারবেন না। গর্ভধারণের পরিকল্পনা থাকলে টিকার অন্তত এক মাস পর গর্ভধারণ করা উচিত।

৯ মাসের আগে কি হামের টিকা দেওয়া যায়?

সাধারণত না। তবে হামের প্রাদুর্ভাব চলাকালীন বিশেষ পরিস্থিতিতে ৬ মাস বয়সে দেওয়া হয়, তখন ৯ মাসে আবার দিতে হয়।

টিকার পর শিশুকে গোসল করানো যাবে?

হ্যাঁ, যাবে। হালকা গরম পানিতে গোসল করালে জ্বর কমতে সাহায্য হয়।

শেষ কথা

হাম থেকে শিশুকে বাঁচানোর সবচেয়ে সহজ, নিরাপদ ও নিশ্চিত উপায় হলো সময়মতো টিকা দেওয়া। দুটি ডোজ, সম্পূর্ণ বিনামূল্যে, হাতের কাছের স্বাস্থ্যকেন্দ্রেই পাওয়া যায়।

আপনার শিশুর বয়স ৯ মাস পেরিয়ে গেছে কিন্তু টিকা দেওয়া হয়নি? আজই নিকটস্থ স্বাস্থ্যকেন্দ্রে যান। টিকা কার্ড হারিয়ে গেছে? কেন্দ্রে গিয়ে রেকর্ড দেখে নতুন কার্ড নিন। ২৬ সেপ্টেম্বরের ক্যাচ-আপ ক্যাম্পেইনের সুযোগটাও কাজে লাগাতে পারেন।

মনে রাখবেন, একটা টিকা আপনার সন্তানকে শুধু হাম থেকেই বাঁচায় না — বাঁচায় হাসপাতালের বিছানা, লাখ টাকার চিকিৎসা খরচ আর সারাজীবনের আফসোস থেকে।

দ্রষ্টব্য: এই পোস্টটি শুধুমাত্র স্বাস্থ্য সচেতনতার উদ্দেশ্যে লেখা। এটি চিকিৎসকের পরামর্শের বিকল্প নয়। শিশুর টিকা বা যেকোনো স্বাস্থ্য সমস্যায় নিকটস্থ স্বাস্থ্যকেন্দ্র বা শিশু বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিন।

মন্তব্য করুন

ব্লগ