সহযোগী অধ্যাপক
২৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ০৯:৫৯ অপরাহ্ণ
জিপিএফ ব্যালেন্স চেক ২০২৬: মোবাইলে জিপিএফ হিসাব দেখার নিয়ম (GPF Balance Check)
সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন থেকে প্রতি মাসে যে টাকা কেটে রাখা হয় ভবিষ্যতের জন্য — সেটাই জিপিএফ, অর্থাৎ সাধারণ ভবিষ্য তহবিল (General Provident Fund)। বছরের পর বছর এই টাকা জমতে থাকে, তার ওপর সুদও যোগ হয়। কিন্তু অনেকেই জানেন না, এই হিসাবটা এখন ঘরে বসেই মোবাইল দিয়ে দেখা যায়। কোনো অফিসে যাওয়া লাগে না, লাইনে দাঁড়ানো লাগে না।
এই পোস্টে দেখে নিন মোবাইলে জিপিএফ ব্যালেন্স চেক করার পুরো নিয়ম, জিপিএফ স্লিপের প্রতিটা ঘরের অর্থ, আর সমস্যা হলে কী করবেন — সব এক জায়গায়।
জিপিএফ ব্যালেন্স চেক করার আগে যা যা লাগবে
অনলাইনে হিসাব দেখতে হাতে এই তিনটা জিনিস রাখুন:
· আপনার জাতীয় পরিচয়পত্র (NID) নম্বর বা স্মার্ট কার্ড নম্বর
· ibas++ এ EFT-এর জন্য নিবন্ধিত মোবাইল নম্বর (বেতন যে নম্বরে আসে, সেই নম্বর)
· যে অর্থবছরের হিসাব দেখতে চান, সেটা জানা থাকা (যেমন ২০২৫-২৬)
মোবাইল নম্বরটা অবশ্যই ibas++ সিস্টেমে আপনার নামে রেজিস্টার্ড হতে হবে। অন্য কারো নম্বর বা নতুন নম্বর দিলে OTP আসবে না।
অনলাইনে জিপিএফ ব্যালেন্স চেক করার নিয়ম (ধাপে ধাপে)
পুরো কাজটা cafopfm.gov.bd ওয়েবসাইট থেকে করা যায়। CAFO PFM মানে চিফ অ্যাকাউন্টস অফিসার, পেনশন ও ফান্ড ম্যানেজমেন্ট — এই দপ্তরই জিপিএফের হিসাব রাখে।
1. মোবাইল বা কম্পিউটারের ব্রাউজারে যান www.cafopfm.gov.bd ঠিকানায়
2. হোমপেজে নিচের দিকে স্ক্রল করলে GPF Information বা জিপিএফ তথ্য অপশন পাবেন — এটাতে ক্লিক করুন
3. একটা ফরম আসবে। সেখানে আপনার NID নম্বর লিখুন
4. ibas++ এ দেওয়া মোবাইল নম্বর লিখুন
5. Fiscal Year বা অর্থবছর সিলেক্ট করুন (যে বছরের হিসাব দেখতে চান)
6. Submit বাটনে ক্লিক করুন
7. আপনার মোবাইলে একটা OTP (ওয়ান টাইম পাসওয়ার্ড) আসবে SMS-এ
8. OTP-টা বসিয়ে আবার Submit করুন
9. ব্যস — আপনার জিপিএফ স্টেটমেন্ট স্ক্রিনে চলে আসবে
এখানে দেখতে পাবেন মোট জমা, এ পর্যন্ত কত সুদ যোগ হয়েছে, কোনো টাকা তুলেছেন কিনা, আর বর্তমান ব্যালেন্স কত।
GPF Information ফরমে কী কী তথ্য দিতে হয়
অনেকে ফরম দেখে ঘাবড়ে যান। আসলে মাত্র তিনটা ঘর পূরণ করতে হয়:
ঘরের নাম | কী লিখবেন |
NID | আপনার ১০ বা ১৭ সংখ্যার জাতীয় পরিচয়পত্র নম্বর |
Mobile Number | ibas++ এ রেজিস্টার্ড মোবাইল নম্বর (EFT নম্বর) |
Fiscal Year | যে অর্থবছরের স্লিপ চান, যেমন ২০২৫-২৬ |
কোনো পাসওয়ার্ড বা লগইন আইডি লাগে না। OTP-ই আপনার পরিচয় যাচাই করে। তাই অন্য কেউ আপনার NID জানলেও মোবাইল হাতে না থাকলে হিসাব দেখতে পারবে না।
জিপিএফ স্লিপের প্রতিটি ঘরের অর্থ
স্লিপ হাতে পেয়ে অনেকেই বুঝতে পারেন না কোন ঘরে কী লেখা। নিচের টেবিলটা দেখুন:
স্লিপের ঘর | অর্থ |
Opening Balance | অর্থবছরের শুরুতে আপনার জমা ছিল কত |
Subscription | প্রতি মাসে বেতন থেকে কেটে জমা হওয়া টাকা |
Refund | আগে নেওয়া অগ্রিমের কিস্তি বাবদ ফেরত দেওয়া টাকা |
Interest / Profit | জমার ওপর সরকারি সুদ |
Withdrawal | অফেরতযোগ্য অগ্রিম হিসেবে তোলা টাকা |
Closing Balance | অর্থবছর শেষে মোট স্থিতি |
সহজ হিসাবে: Closing Balance = Opening Balance + Subscription + Refund + Interest − Withdrawal
জিপিএফ স্লিপ ডাউনলোড ও প্রিন্ট করার নিয়ম
স্টেটমেন্ট স্ক্রিনে আসার পর:
· ব্রাউজারের প্রিন্ট অপশন থেকে PDF হিসেবে সেভ করে রাখুন
· ব্যাংক লোন, আয়কর রিটার্ন বা যেকোনো অফিসিয়াল কাজে এই স্লিপই প্রমাণ হিসেবে চলে
· অনলাইন স্লিপে আলাদা সিল-স্বাক্ষরের দরকার হয় না
প্রতি অর্থবছর শেষ হলে নতুন স্লিপ তৈরি হয়। তাই জুলাই-আগস্টের দিকে একবার চেক করে নেওয়া ভালো অভ্যাস।
Fiscal Year কোনটা সিলেক্ট করবেন
এটা নিয়ে সবচেয়ে বেশি ভুল হয়। বাংলাদেশে অর্থবছর চলে জুলাই থেকে জুন।
· ২০২৫-২৬ অর্থবছর মানে জুলাই ২০২৫ থেকে জুন ২০২৬
· বর্তমান জমার সর্বশেষ অবস্থা দেখতে সবসময় সর্বশেষ সমাপ্ত অর্থবছর সিলেক্ট করুন
· পুরনো কোনো বছরের হিসাব দরকার হলে সেই বছরেরটা আলাদা করে দেখতে পারবেন
OTP আসছে না বা তথ্য মিলছে না? সমাধান
OTP আসছে না:
প্রথমে দেখুন মোবাইলে নেটওয়ার্ক আছে কিনা। কয়েক মিনিট অপেক্ষা করে আবার চেষ্টা করুন। তাও না এলে নিশ্চিত হোন নম্বরটা ibas++ এ আপনার নামে রেজিস্টার্ড আছে কিনা — অফিসের হিসাব শাখায় খোঁজ নিন।
"তথ্য পাওয়া যায়নি" দেখাচ্ছে:
NID নম্বর ঠিকভাবে লিখেছেন কিনা দেখুন। ১০ ডিজিটের পুরনো NID হলে জন্মসালসহ ১৭ ডিজিট ব্যবহার করে দেখতে পারেন।
ব্যালেন্স বেতনের স্লিপের সঙ্গে মিলছে না:
মাসের কাটা টাকা জমা হতে কিছুদিন সময় লাগতে পারে। ১-২ মাসের গরমিল স্বাভাবিক। বড় গরমিল দেখলে সংশ্লিষ্ট হিসাবরক্ষণ অফিসে যোগাযোগ করুন।
ওয়েবসাইট খুলছে না:
মাস শেষের দিকে বা বেতনের সময় সার্ভারে চাপ বেশি থাকে। সকালের দিকে বা অন্য সময়ে চেষ্টা করুন।
জিপিএফ অগ্রিম (লোন) ও চূড়ান্ত হিসাব
জিপিএফ থেকে প্রয়োজনে অগ্রিম টাকা নেওয়া যায়। সাধারণত দুই ধরনের:
· ফেরতযোগ্য অগ্রিম: কিস্তিতে কিস্তিতে বেতন থেকে কেটে পরিশোধ করতে হয়
· অফেরতযোগ্য অগ্রিম: চাকরির নির্দিষ্ট মেয়াদ পূর্ণ হলে, যেমন বাড়ি করা বা মেয়ের বিয়ের জন্য — এটা ফেরত দিতে হয় না
চাকরি শেষে বা অবসরে গেলে পুরো টাকা একসঙ্গে তোলার জন্য বাংলাদেশ ফরম নং ৬৬৩-এ আবেদন করতে হয়। এটাই জিপিএফের চূড়ান্ত হিসাবের ফরম।
জিপিএফ নিয়ে সাধারণ প্রশ্নোত্তর
জিপিএফ ব্যালেন্স কি মোবাইল অ্যাপ দিয়ে চেক করা যায়?
সরকারি কোনো আলাদা অ্যাপ নেই। মোবাইলের ব্রাউজার দিয়েই cafopfm.gov.bd থেকে চেক করতে হয়।
জিপিএফের টাকায় কি সুদ পাওয়া যায়?
হ্যাঁ। জমা টাকার ওপর সরকার নির্ধারিত হারে বার্ষিক সুদ দেওয়া হয়। সুদের হার অর্থ মন্ত্রণালয় প্রতি অর্থবছরে বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে জানায়।
প্রতি মাসে বেতন থেকে কত টাকা কাটে?
সাধারণত মূল বেতনের ৫% থেকে ১০% পর্যন্ত। চাইলে সর্বোচ্চ সীমার মধ্যে বাড়িয়েও কাটাতে পারেন।
অন্য কেউ কি আমার জিপিএফ হিসাব দেখতে পারবে?
না। NID জানা থাকলেও OTP আপনার রেজিস্টার্ড মোবাইলে আসে। মোবাইল হাতে না থাকলে কেউ ঢুকতে পারবে না।
অবসরের পর টাকা তুলতে কতদিন লাগে?
সব কাগজ ঠিক থাকলে সংশ্লিষ্ট অফিস থেকে চূড়ান্ত পরিশোধের প্রক্রিয়া শুরু হয়। আগেভাগে ফরম ৬৬৩ জমা দিলে দেরি কম হয়।
শেষ কথা
জিপিএফ আপনার নিজের টাকা — ভবিষ্যতের নিরাপত্তা। বছরে অন্তত একবার হিসাবটা মিলিয়ে দেখুন। মাসের কাটা টাকা ঠিকমতো জমা হচ্ছে কিনা, সুদ যোগ হয়েছে কিনা — এই দুটো জিনিস খেয়াল রাখলেই যথেষ্ট।
১
১ মন্তব্য