Loading..

ব্লগ

রিসেট

২৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ০৪:৫৯ পূর্বাহ্ণ

ভালোবাসা, বিশ্বাস ও শ্রদ্ধায় গড়ে উঠুক সুখী দাম্পত্য জীবন মোঃ মুজিবুর রহমান

                                            ভালোবাসা, বিশ্বাস ও শ্রদ্ধায় গড়ে উঠুক

সুখী দাম্পত্য জীবন

মোঃ মুজিবুর রহমান
সহকারী অধ্যাপক
মোজাদ্দেদীয়া ইসলামিয়া আলিম মাদ্রাসা, কালিয়াকৈর, গাজীপুর।

বিয়ে শুধু দুটি মানুষের সামাজিক বন্ধন নয়; এটি দুটি হৃদয়ের অঙ্গীকার, দুটি জীবনের পারস্পরিক দায়িত্ব এবং একটি পরিবারের সুন্দর ভবিষ্যৎ গড়ার পবিত্র পথ। স্বামী ও স্ত্রী একে অপরের জীবনসঙ্গী, সুখ-দুঃখের সহযাত্রী, পরস্পরের আশ্রয় ও সহযোগী। তাই একটি সুখী, শান্তিময় ও কল্যাণময় দাম্পত্য জীবন গড়ে তুলতে প্রয়োজন পারস্পরিক শ্রদ্ধা, আন্তরিকতা, বিশ্বাস, মায়া-মমতা, বন্ধুত্ব, ভালোবাসা, সহনশীলতা ও দায়িত্ববোধ। অন্যদিকে অহেতুক সন্দেহ, ভুল বোঝাবুঝি, অবিশ্বাস, কটু কথা, অবহেলা ও অহংকার দাম্পত্য জীবনের শান্তি নষ্ট করে দিতে পারে।

ইসলাম দাম্পত্য জীবনকে অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ সম্পর্ক হিসেবে দেখেছে। মহান আল্লাহ বলেন—

“আর তাঁর নিদর্শনাবলির মধ্যে রয়েছে—তিনি তোমাদের জন্য তোমাদের মধ্য থেকেই জীবনসঙ্গী সৃষ্টি করেছেন, যাতে তোমরা তাদের কাছে প্রশান্তি পাও; আর তিনি তোমাদের মধ্যে ভালোবাসা ও দয়া স্থাপন করেছেন।”
—
সূরা আর-রূম, ৩০:২১

এই আয়াত দাম্পত্য জীবনের গভীর উদ্দেশ্য তুলে ধরে। স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্কের ভিত্তি শুধু দায়িত্ব বা প্রয়োজন নয়; এর মধ্যে রয়েছে প্রশান্তি, ভালোবাসা ও দয়া। তাই সংসারে সুখ চাইলে দুজনকেই সম্পর্ককে যত্ন করতে হবে।

দাম্পত্য জীবনের প্রথম ভিত্তি—পারস্পরিক শ্রদ্ধা

ভালোবাসা থাকলেও শ্রদ্ধা না থাকলে সম্পর্ক ধীরে ধীরে দুর্বল হয়ে পড়ে। স্বামী যেমন স্ত্রীর সম্মান, মর্যাদা ও অনুভূতির প্রতি যত্নশীল হবে, স্ত্রীও তেমনি স্বামীর সম্মান ও মর্যাদা রক্ষা করবে। একে অপরকে ছোট করা, অপমান করা, অন্যের সামনে অসম্মান করা বা তুচ্ছতাচ্ছিল্য করা কোনোভাবেই সুস্থ দাম্পত্যের লক্ষণ নয়।

আল্লাহ বলেন—

“তোমরা তাদের সঙ্গে সদ্ভাবে জীবনযাপন করো।”
—
সূরা আন-নিসা, ৪:১৯

সুন্দর আচরণ শুধু বড় কোনো কাজের নাম নয়। কোমল ভাষায় কথা বলা, মনোযোগ দিয়ে শোনা, প্রয়োজনের সময় পাশে দাঁড়ানো, কষ্টের সময়ে সান্ত্বনা দেওয়া—এসবই উত্তম দাম্পত্য আচরণের অংশ।

আন্তরিকতা হোক সম্পর্কের প্রাণ

দাম্পত্য জীবনে কৃত্রিমতা নয়, চাই আন্তরিকতা। মনের কথা গোপন করে রাখা, প্রয়োজনীয় বিষয় নিয়ে কথা না বলা কিংবা একে অপরের কাছে নিজের অনুভূতি প্রকাশ করতে না পারলে দূরত্ব তৈরি হতে পারে।

তাই স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে এমন একটি পরিবেশ থাকা প্রয়োজন, যেখানে দুজনই নির্ভয়ে নিজের কথা বলতে পারে। আনন্দের কথা যেমন ভাগ করে নিতে হবে, তেমনি কষ্ট, দুশ্চিন্তা, অভাব, প্রত্যাশা ও হতাশার কথাও শান্তভাবে আলোচনা করতে হবে।

কথা বলার সময় শুধু নিজের বক্তব্য প্রকাশ করলেই হবে না; সঙ্গীর কথাও মন দিয়ে শুনতে হবে। অনেক সময় মানুষ সমাধানের চেয়ে আগে বোঝাপড়া ও সহানুভূতি চায়। তাই স্বামী স্ত্রীর কথা শুনবেন, স্ত্রীও স্বামীর কথা মনোযোগ দিয়ে শুনবেন। এতে হৃদয়ের দূরত্ব কমে এবং পারস্পরিক বোঝাপড়া বাড়ে।

বিশ্বাস—সুখী সংসারের মজবুত ভিত্তি

যেখানে বিশ্বাস থাকে, সেখানে সম্পর্ক স্বস্তিদায়ক হয়; আর যেখানে অকারণ অবিশ্বাস বাসা বাঁধে, সেখানে ভালোবাসার মধ্যেও অশান্তি জন্ম নিতে পারে।

কোনো ঘটনা পুরোপুরি না জেনে অনুমান করা, সামান্য বিষয়কে বড় করে দেখা, অন্যের কথায় সহজেই সঙ্গীকে সন্দেহ করা—এসব থেকে বিরত থাকা জরুরি। মহান আল্লাহ বলেন—

“হে মুমিনগণ! তোমরা অধিকাংশ অনুমান থেকে বেঁচে থাকো; নিশ্চয় কোনো কোনো অনুমান পাপ।”
—
সূরা আল-হুজুরাত, ৪৯:১২

অতএব কোনো বিষয়ে সন্দেহ বা ভুল বোঝাবুঝি তৈরি হলে মনে মনে সিদ্ধান্ত না নিয়ে শান্তভাবে সঙ্গীর সঙ্গে কথা বলা উচিত। প্রশ্ন থাকলে নম্রভাবে জানতে হবে, ব্যাখ্যা শুনতে হবে এবং সত্যতা যাচাই ছাড়া অভিযোগ করা থেকে বিরত থাকতে হবে।

ভালোবাসার সঙ্গে বন্ধুত্বও প্রয়োজন

স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক শুধু দায়িত্বের সম্পর্ক নয়; তারা পরস্পরের বন্ধু ও সহযাত্রীও। জীবনের হাসি-কান্না, আশা-হতাশা, সাফল্য-ব্যর্থতা—সবকিছুর অংশীদার হওয়া দাম্পত্যকে গভীর করে।

একসঙ্গে কিছু সময় কাটানো, গল্প করা, পরস্পরের পছন্দ-অপছন্দ জানা, ছোট ছোট আনন্দ ভাগ করে নেওয়া এবং কঠিন সময়ে একে অপরকে সাহস দেওয়া—এসব সম্পর্ককে প্রাণবন্ত করে।

সংসারে সব সময় বড় আয়োজন প্রয়োজন হয় না। একটি আন্তরিক কথা, একটি মিষ্টি হাসি, একটি কৃতজ্ঞতার বাক্য, ক্লান্ত সময়ে এক কাপ পানি এগিয়ে দেওয়া কিংবা নীরবে পাশে বসে থাকা—কখনো কখনো এসব ছোট কাজই ভালোবাসার বড় প্রকাশ হয়ে ওঠে।

মায়া-মমতা সংসারকে করে কোমল

মানুষ শুধু যুক্তি দিয়ে সংসার করে না; সংসার টিকে থাকে হৃদয়ের টান, মায়া-মমতা ও দয়ার মাধ্যমে। স্বামী অসুস্থ হলে স্ত্রী তার যত্ন নেবে, স্ত্রী ক্লান্ত হলে স্বামী তার পাশে দাঁড়াবে—এভাবেই পারস্পরিক সহমর্মিতা সংসারকে শান্তির আশ্রয়ে পরিণত করে।

দাম্পত্য জীবনে একজনের কষ্টকে অন্যজনের কষ্ট হিসেবে অনুভব করা দরকার। অর্থনৈতিক সংকট, কর্মব্যস্ততা, পারিবারিক চাপ, অসুস্থতা কিংবা মানসিক ক্লান্তির সময়ে দোষারোপ না করে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেওয়া উচিত।

সংসার হলো প্রতিযোগিতার স্থান নয়; এটি সহযোগিতার স্থান। কে বেশি করল, কে কম করল—এই হিসাবের চেয়ে কে কতটা আন্তরিকভাবে পাশে দাঁড়াল, সেটিই অধিক গুরুত্বপূর্ণ।

ভুল-ত্রুটি থাকবে, কিন্তু ক্ষমার দরজাও খোলা রাখতে হবে

মানুষ মাত্রই ভুল করে। স্বামী যেমন ভুল করতে পারেন, স্ত্রীও তেমনি ভুল করতে পারেন। একটি ভুলকে কেন্দ্র করে দিনের পর দিন অভিমান, অপমান বা পুরোনো ঘটনা টেনে আনা সম্পর্ককে দুর্বল করে।

মহান আল্লাহ মুমিনদের প্রশংসা করে বলেন—

“যারা রাগ সংবরণ করে এবং মানুষকে ক্ষমা করে; আর আল্লাহ সৎকর্মশীলদের ভালোবাসেন।”
—
সূরা আলে ইমরান, ৩:১৩৪

তাই ছোটখাটো ভুলে ক্ষমাশীল হওয়া, রাগের সময় নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করা এবং পরিস্থিতি শান্ত হলে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করা উত্তম। তবে ক্ষমা মানে অন্যায়কে সমর্থন করা নয়; বরং সংশোধনের সুযোগ দেওয়া এবং সম্পর্ককে অকারণে বিষিয়ে না তোলা।

ভুল বোঝাবুঝি দূর করার সবচেয়ে সুন্দর পথ—সুন্দর যোগাযোগ

দাম্পত্য জীবনে অনেক বিরোধের মূল কারণ বড় কোনো ঘটনা নয়; বরং ভুল বোঝাবুঝি। একজন একটি কথা একভাবে বললেন, অন্যজন সেটি অন্যভাবে বুঝলেন। এরপর কথা না বলে অভিমান জমল, অভিমান থেকে সন্দেহ তৈরি হলো, আর সন্দেহ থেকে দূরত্ব বাড়তে থাকল।

এই পরিস্থিতি এড়াতে প্রয়োজন সরাসরি ও শান্ত যোগাযোগ।

কোনো বিষয়ে কষ্ট পেলে বলা যেতে পারে—
“
তোমার এই কথায় আমি কষ্ট পেয়েছি; তুমি কি একটু বুঝিয়ে বলবে?”

কিন্তু বলা উচিত নয়—
“
তুমি সব সময় এমনই করো”, “তোমাকে কখনো বিশ্বাস করা যায় না”— এ ধরনের সাধারণীকরণমূলক ও আঘাতকারী কথা।

সমস্যাকে আক্রমণ করতে হবে, মানুষকে নয়। উদ্দেশ্য হবে সমাধান খোঁজা, পরাজিত করা নয়।

রাগের মুহূর্তে নীরবতা কখনো কখনো প্রজ্ঞা

রাগের সময় মানুষ অনেক কথা বলে ফেলে, যা পরে ফিরিয়ে নেওয়া কঠিন। একটি কঠিন বাক্য কখনো বছরের ভালোবাসাকেও আহত করতে পারে।

তাই উত্তেজনার মুহূর্তে কিছুটা বিরতি নেওয়া, নিজেকে শান্ত করা এবং পরে আলোচনা করা বুদ্ধিমানের কাজ। গালাগালি, অপমান, হুমকি, মারধর কিংবা বিচ্ছেদের ভয় দেখানো কোনোভাবেই সুস্থ দাম্পত্য আচরণ নয়।

ইসলাম উত্তম চরিত্র, সংযম ও সদাচরণকে গুরুত্ব দিয়েছে। রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেন—

“তোমাদের মধ্যে উত্তম সেই ব্যক্তি, যে তার পরিবারের কাছে উত্তম।”
—
জামে আত-তিরমিজি

অতএব মানুষের কাছে ভালো হওয়ার আগে নিজের ঘরের মানুষের কাছে ভালো হওয়া প্রয়োজন।

পুরোনো ভুলকে প্রতিদিনের অস্ত্র বানানো উচিত নয়

কেউ একবার ভুল করেছে এবং সংশোধনের চেষ্টা করেছে—তাহলে প্রতিটি ঝগড়ায় সেই পুরোনো ভুল তুলে এনে তাকে আঘাত করা সম্পর্কের জন্য ক্ষতিকর। অতীত থেকে শিক্ষা নিতে হবে, কিন্তু অতীতকে বর্তমানের প্রতিটি কথার অস্ত্র বানানো যাবে না।

স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে এমন একটি সংস্কৃতি গড়ে উঠুক—
ভুল হলে সংশোধন, কষ্ট হলে আলোচনা, অপরাধ হলে ক্ষমা ও প্রয়োজন হলে ন্যায়সংগত সমাধান।

এতে সম্পর্ক ধীরে ধীরে পরিণত ও দৃঢ় হয়।

দাম্পত্য জীবনে ব্যক্তিগত মর্যাদা ও সীমারেখাও গুরুত্বপূর্ণ

ভালোবাসা মানে একে অপরের ওপর অযথা নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা নয়। স্বামী-স্ত্রী পরস্পরের অধিকার, ব্যক্তিগত সময়, পারিবারিক সম্পর্ক ও প্রয়োজনকে সম্মান করবেন। তবে স্বাধীনতার নামে এমন কিছু করা যাবে না, যা ইসলামী নৈতিকতা, দাম্পত্য দায়িত্ব বা পারস্পরিক বিশ্বাসের পরিপন্থী।

বিশ্বাসের সঙ্গে দায়িত্ববোধ এবং ভালোবাসার সঙ্গে শালীন সীমারেখা—দুটিই প্রয়োজন।

অর্থনৈতিক বিষয়েও চাই বোঝাপড়া

সংসারের অনেক অশান্তির পেছনে অর্থনৈতিক চাপ থাকে। তাই স্বামী-স্ত্রীর উচিত নিজেদের সামর্থ্য, আয়, প্রয়োজন ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে বাস্তবসম্মত আলোচনা করা।

সামর্থ্য সীমিত হলে চাহিদাকে সংযত করতে হবে। অপচয় যেমন পরিহার করতে হবে, তেমনি কৃপণতাও নয়। পরস্পরের আর্থিক অবস্থাকে বুঝে সহযোগিতা করতে হবে।

একজনের আয়কে অন্যজন অবজ্ঞা করবেন না; আবার সংসারের দায়িত্বকে একতরফাভাবে চাপিয়ে দেওয়াও উচিত নয়। যার যে দায়িত্ব, তা আন্তরিকতার সঙ্গে পালন করা এবং প্রয়োজনের সময়ে একে অপরকে সহযোগিতা করা দাম্পত্য জীবনের সৌন্দর্য বাড়ায়।

শ্বশুরবাড়ি ও আত্মীয়তার সম্পর্কেও চাই ভারসাম্য

বিয়ের পর স্বামী-স্ত্রী শুধু দুজন নন; তারা দুটি পরিবারেরও গুরুত্বপূর্ণ সদস্য হয়ে ওঠেন। তাই উভয়ের বাবা-মা ও আত্মীয়দের সম্মান করা প্রয়োজন। তবে কোনো পক্ষের আত্মীয়ের কারণে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে অযথা বিরোধ সৃষ্টি করা উচিত নয়।

পারিবারিক কোনো বিষয়ে সমস্যা হলে উত্তেজিত না হয়ে, ন্যায় ও প্রজ্ঞার সঙ্গে সমাধান খুঁজতে হবে। প্রয়োজন হলে বিশ্বস্ত, বিচক্ষণ ও ন্যায়পরায়ণ অভিভাবক বা আলেমের পরামর্শ নেওয়া যেতে পারে।

সন্তানদের সামনে দাম্পত্য আচরণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ

সন্তানরা শুধু বই থেকে শিক্ষা নেয় না; তারা বাবা-মায়ের আচরণ দেখেও শিক্ষা নেয়। বাবা যদি মাকে সম্মান করেন এবং মা যদি বাবার মর্যাদা রক্ষা করেন, তাহলে সন্তানরা শ্রদ্ধা, ভালোবাসা ও পারিবারিক দায়িত্বের বাস্তব শিক্ষা পায়।

অন্যদিকে সন্তানদের সামনে পরস্পরকে অপমান করা, চিৎকার করা বা হেয় করা তাদের মনে গভীর প্রভাব ফেলতে পারে। তাই সন্তানের সুন্দর ভবিষ্যতের জন্যও স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ককে সুন্দর রাখা প্রয়োজন।

ইবাদত ও তাকওয়া দাম্পত্য জীবনে বরকত আনে

একটি সুখী মুসলিম পরিবার শুধু পার্থিব সুখের জন্য নয়; আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্যও গড়ে ওঠে। স্বামী-স্ত্রী একে অপরকে নামাজ, তাকওয়া, হালাল-হারাম, সত্যবাদিতা ও নেক আমলের পথে সহযোগিতা করবেন।

আল্লাহ বলেন—

“হে মুমিনগণ! তোমরা নিজেদের এবং তোমাদের পরিবার-পরিজনকে আগুন থেকে রক্ষা করো।”
—
সূরা আত-তাহরীম, ৬৬:৬

অতএব ভালো জীবনসঙ্গী সে-ই, যে শুধু দুনিয়ার সুখের সঙ্গী নয়; বরং আখিরাতের কল্যাণের পথেও সহযোগী।

দাম্পত্য জীবনে ‘আমি’ নয়, ‘আমরা’ প্রয়োজন

সংসারে যখন দুজনেই শুধু নিজের অধিকার নিয়ে ভাবেন, তখন বিরোধ বাড়ে। কিন্তু যখন দুজনেই ভাবেন—“আমরা কীভাবে ভালো থাকব?”, তখন সমাধানের পথ সহজ হয়।

স্বামী ভাববেন—কীভাবে স্ত্রীকে সম্মান ও নিরাপত্তা দেওয়া যায়। স্ত্রী ভাববেন—কীভাবে স্বামীর ক্লান্তি ও দায়িত্বের প্রতি সহমর্মী হওয়া যায়। দুজনেই ভাববেন—কীভাবে সন্তানদের সুন্দরভাবে মানুষ করা যায়, কীভাবে পরিবারে শান্তি রাখা যায় এবং কীভাবে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন করা যায়।

এই ‘আমরা’ ভাবনাই দাম্পত্যকে গভীর ও স্থায়ী করে।

সুখী দাম্পত্যের জন্য কয়েকটি সহজ অঙ্গীকার

স্বামী-স্ত্রী চাইলে নিজেদের জীবনে কয়েকটি সুন্দর অভ্যাস গড়ে তুলতে পারেন—

প্রথমত— পরস্পরের সঙ্গে সম্মানজনক ভাষায় কথা বলা।
দ্বিতীয়ত— কোনো কথা শুনেই সিদ্ধান্ত না নিয়ে সত্যতা যাচাই করা।
তৃতীয়ত— সন্দেহ হলে অনুমান না করে শান্তভাবে প্রশ্ন করা।
চতুর্থত— প্রতিদিন অন্তত কিছু সময় মন খুলে কথা বলা।
পঞ্চমত— সঙ্গীর ভালো কাজের প্রশংসা ও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা।
ষষ্ঠত— রাগের সময় অপমানজনক কথা না বলা।
সপ্তমত— পুরোনো ভুলকে বারবার টেনে না আনা।
অষ্টমত— অর্থনৈতিক বিষয় স্বচ্ছতা ও বোঝাপড়ার সঙ্গে পরিচালনা করা।
নবমত— একে অপরের পরিবার ও মর্যাদাকে সম্মান করা।
দশমত— নামাজ, দোয়া, তাকওয়া ও নেক আমলের মাধ্যমে পরিবারকে আল্লাহমুখী করা।

উপসংহার

সুখী দাম্পত্য জীবন ভাগ্যের ওপর ছেড়ে দিলে গড়ে ওঠে না; এটি গড়ে তুলতে হয় ভালোবাসা, বিশ্বাস, শ্রদ্ধা, দায়িত্ববোধ, ধৈর্য, ক্ষমা, আন্তরিকতা ও পারস্পরিক সহযোগিতার মাধ্যমে। স্বামী যদি স্ত্রীর প্রতি মমতাশীল হন, স্ত্রী যদি স্বামীর প্রতি শ্রদ্ধাশীল ও সহযোগী হন; দুজন যদি পরস্পরের বন্ধু ও বিশ্বস্ত সঙ্গী হয়ে ওঠেন, তাহলে সংসার হয়ে উঠতে পারে শান্তি, ভালোবাসা ও প্রশান্তির নীড়।

ভুল বোঝাবুঝি আসতেই পারে, কিন্তু তা যেন স্থায়ী দেয়াল না হয়। অভিমান হতে পারে, কিন্তু তা যেন ভালোবাসাকে হত্যা না করে। মতের অমিল হতে পারে, কিন্তু তা যেন হৃদয়ের বিচ্ছেদ না ঘটায়। সন্দেহের পরিবর্তে যাচাই, অভিযোগের পরিবর্তে আলোচনা, রাগের পরিবর্তে সংযম, অবহেলার পরিবর্তে যত্ন এবং দূরত্বের পরিবর্তে আন্তরিকতা—এই হোক দাম্পত্য জীবনের পথ।

মনে রাখতে হবে, একটি সুন্দর সংসার নিখুঁত মানুষ দিয়ে তৈরি হয় না; বরং পরস্পরের অসম্পূর্ণতাকে বুঝে, ভুলকে সংশোধন করে, অধিকার ও দায়িত্ব আদায় করে এবং ভালোবাসা ও দয়ার সঙ্গে একসঙ্গে পথ চলা মানুষদের দিয়েই সুন্দর সংসার গড়ে ওঠে।

আল্লাহ তাআলা স্বামী-স্ত্রীর হৃদয়ে পারস্পরিক ভালোবাসা, শ্রদ্ধা, বিশ্বস্ততা ও দয়া দান করুন; ভুল বোঝাবুঝি, অহেতুক সন্দেহ, অহংকার ও অশান্তি থেকে পরিবারগুলোকে হেফাজত করুন; প্রত্যেক দাম্পত্য জীবনকে শান্তি, বরকত ও নেক সন্তানের সৌভাগ্যে সমৃদ্ধ করুন এবং দুনিয়ার জীবনের পাশাপাশি আখিরাতের কল্যাণের পথেও একে অপরের সহায়ক হওয়ার তাওফিক দান করুন।

আমিন।

 

মন্তব্য করুন