সহকারী শিক্ষক
২৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ১০:৪৪ পূর্বাহ্ণ
সহকারী শিক্ষক
একটি পাবলিক পরীক্ষায় ৫৬ হাজার খাতার ফল যদি পরিবর্তন করতে হয়, তাহলে সেটি অবশই প্রশ্নবিদ্ধ! আমরা যত কিছুই করি না কেন, এর গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে মারাত্মক প্রশ্ন থেকে যাচ্ছে। আমি প্রথম ঢাকা বোর্ডের পরীক্ষক হই ১৯৯১ খ্রিষ্টাব্দে, সেই থেকে দেখে আসছি প্রতি বছর একই ধরনের ভুল হচ্ছে। এ সংখ্যা ও ধরন প্রতি বছর বেড়েই চলছে। বোর্ড পরীক্ষক থাকাকালীন প্রতি মিটিংয়ে অংশগ্রহণ করতাম, দেখতাম মিটিংয়ে অর্ধেকের বেশি শিক্ষক উপস্থিত থাকতেন না অর্থাৎ সম্মিলিত আলোচনা এবং সিদ্ধান্তের অনেক কিছুই ইউনিফরমলি হতো না। লিখে দেওয়া নিয়ম-কানুনও অনেকে পড়ে দেখেন না।
বোর্ড পরীক্ষক আর বোর্ডের প্রশ্ন প্রণেতা হিসেবে যত সমস্যা দেখে এসেছি, তার সবই বহুবার বহু ফোরামে আলোচনা করেছি, বহুবার লিখেছি; কিন্তু দেখছি সমাধানের চেয়ে সমস্যা যেন বেড়েই চলছে। এটি এমন ধরনের সমস্যা যে, হুট করে বিরাট এক বক্তব্য দিলাম আর কিছু শিক্ষককে ভয় দেখালাম, তাতেই সব হয়ে যাবে। বিষয়টি তা নয়। বিশাল গবেষণা, বিশাল পরিকল্পনা, বিশাল বিশাল কাজ এবং নতুনত্বের ধারণা এখানে প্রয়োজন। কে এসব নিয়ে চিন্তা করবে? সবাই হঠাৎ কিছু করা, বড় বড় পরিকল্পনা, বিশ্বের বড় বড় দেশ কি করছে সেগুলো দেখা আর সেরকম অনেক কিছু করার কথা আমরা সব সময় শুনি; কিন্তু আসল সমস্যায় হাত দেওয়া হয় না।
শিক্ষক, বোর্ড, মূল্যায়ন ব্যবস্থাপনা তথা পুরো শিক্ষা ব্যবস্থাপনার গলদগুলো দিন দিন বেড়ে যাচ্ছে আর আমরা কথা বলি কিছু ইউটোপিয়ান আইডিয়া নিয়ে। ১৯৯১ খ্রিষ্টাব্দ থেকে দেখে এসেছি এক শিক্ষার্থী গণিতে পেয়েছে ৮২, গোল্লা পূরণ করা হয়েছিল ২৮। ওই সময়ের ৮২ পাওয়া বর্তমান যুগের তথাকথিত উদার নম্বর দিয়ে ৮২ করা এক কথা নয়। অতএব, শিক্ষার্থী, অভিভাবক কারুরই ঘুম নেই। তারা বোর্ডের বিরুদ্ধে কেস করেছেন, বহু পরে দেখা গেছে যে, ছেলেটি পেয়েছিল ৮২। শিক্ষার্থীদের এই যে, মানসিক অশান্তি আর ট্রমার মধ্যে দিয়ে যেতে হয়, সেই দায় দায়িত্ব কে নেবে? ওই সময়ে দেখা যেত এক বোর্ডে এক-দুটি ঘটনা এ রকম ঘটতো; কিন্তু বর্তমানে কি হচ্ছে শত শত, এবার দেখা গেছে হাজার হাজার। তাহলে এই মূল্যায়নের বিশ্বস্ততা আর গ্রহণযোগ্যতা কোথায় গিয়ে ঠেকে?
মাছুম বিল্লাহ। ছবি : দৈনিক শিক্ষাডটকম
প্রকাশিত ফল অনুযায়ী সারা দেশে মোট ৪ লাখ ২ হাজার ৫২ জন শিক্ষার্থী ফল পুনর্মূল্যায়নের জন্য আবেদন করেছিলেন। তাদের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ১০ লাখ ৫৬ হাজার খাতা পুনর্মূল্যায়ন করা হয়েছে। এতে ২৭ হাজার ৮৩৬ শিক্ষার্থীর গ্রেড পরিবর্তন হয়েছে। আর ৫৬ হাজার ২৫১টি খাতায় নম্বর পরিবর্তন করা হয়েছে। প্রতি বছরই লিখি তাড়াহুড়ো করে শিক্ষকদের খাতা দেখানো ঠিক নয়। পূর্ববর্তী সরকারের মন্ত্রীরা ঢালাওভাবে উল্লাস প্রকাশ করতেন যে, পাবলিক পরীক্ষার ফল তিন মাসের অধিককাল থেকে দুই মাসের কম সময়ে প্রকাশ করা হয়েছে। বহুবার বলেছি, এটি কোনো অর্জন নয়, কে শোনে কার কথা। এ সরকারও তাই করল তাড়াহুড়ো করে ফল প্রকাশ। এখন এত পরীক্ষার্থীর ফল পরিবর্তন, এটি কোনো গ্রহণযোগ্য পাবলিক পরীক্ষার ফল প্রকাশ নয়! দিন যত যাচ্ছে আমরা তত মেশিননির্ভর হয়ে পড়ছি; কিন্তু মানবিকতা কমেই যাচ্ছে! আমাদের সময়ে শিক্ষকরা খাতা দেখতেন নিজে, ফল বানাতেন হাতে। আর এখন এত সব কম্পিউটার আর ডিভাইস দিয়ে ফল তৈরি করা হয়, তার উপস্থাপন এ রকম, এটি গ্রহণযোগ্য নয়। এবারের পরীক্ষার খাতা পুনর্ম্যূলায়নে সর্বোচ্চসংখ্যক শিক্ষার্থীর নতুন করে জিপিএ-৫, ফেল থেকে পাস, গ্রেড পরিবর্তন ও সর্বোচ্চসংখ্যক খাতার নম্বর পরিবর্তনের ঘটনা ঘটেছে। ফলে গত ১০ আগস্ট ফল প্রকাশের পর থেকে টানা এক মাস ধরে চলা মানসিক ট্রমা থেকে মুক্তি পেয়েছেন হাজার হাজার শিক্ষার্থী; কিন্তু এটি কি কাম্য?
দেশের নামকরা প্রতিষ্ঠানের অনেক শিক্ষক বোর্ডের খাতা দেখতে চান না। প্রধান কারণ তারা প্রাইভেট পড়ান তাতে অনেক উপার্জন, বোর্ডের খাতা দেখে কয় টাকা পাবেন; কিন্তু বোর্ডের খাতা দেখা মানে শুধু কিছু উপার্জন নয়। এটি পুরো শিক্ষাদান পদ্ধতির মূল্যবান অংশ যার সঙ্গে সরাসারি জড়িত না থাকলে, এ নিয়ে বছরের পর বছর কাজ না করলে পুরো শিক্ষকতা বিষয়টি আয়ত্তে আসে না, একজন প্রকৃত শিক্ষক হওয়া যায় না। এখানে সরকার কি করবে? সরকার কি জোর করে তাদের দ্বারা খাতা পরীক্ষণ করাবেন? তাতে কি লাভ হবে? ভালো প্রতিষ্ঠানের ভালো শিক্ষকদেরই এগিয়ে আসতে হবে।
বোর্ড বাধ্য হয়ে অনেক অনভিজ্ঞ শিক্ষক, একেবারে নতুন শিক্ষক, ডিমোটিভেটেড শিক্ষকদের দ্বারা খাতা মূল্যায়ন করিয়ে থাকে। এ ধরনের বহু শিক্ষক আমি দেখেছি, যারা বোর্ডের খাতা দেখার একেবারেই উপযুক্ত নয় অথচ বোর্ড থেকে খাতা নিয়ে এসে তাদের স্ত্রী, পুত্র, শিক্ষার্থীদের দ্বারা খাতা পরীক্ষণ করিয়ে থাকেন। বোর্ডকে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে ফল তৈরি করতে হবে, পিছিয়ে থাকা যাবে না। আমার মনে আছে, আমি কুমিল্লা ক্যাডেট কলেজে থাকাকালে কুমিল্লা বোর্ডের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক খাতা জমা দিয়ে আসার পর আবার খাতা নেওয়ার অনুরোধ করতেন, কলেজে ফোন করতেন (তখন মোবাইল ছিল না)। দুটি কারণে, একটি তাদের বিশ্বাস ছিল যে, ক্যাডেট কলেজের শিক্ষকরা ভালো করে খাতা মূল্যায়ন করেন। দ্বিতীয়ত, এত খাতা কাদের দ্বারা নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে দেখাবেন। তাই অনেকে তিন চারবার করেও বোর্ডের খাতা আনতেন, এখনো অনেক তাই করেন, যা ঠিকমতো দেখা হয় না। আমি নিজে কখনই তাই একবারের বেশি খাতা আনতাম না। আবার কিছু অনুপযুক্ত শিক্ষক বোর্ডের সঙ্গে লিয়াজোঁ করে বিশেষ করে কন্ট্রোলারের পিএ-এর সঙ্গে লাইন ঘাট করে বার বার খাতা আনেন। গত সরকারের আমলে যেহেতু ফেলের নজির তেমন নেই, তাই এসব শিক্ষক বেশি বেশি নম্বর দিয়ে পাস করানোর কাতারে শামিল হতেন। যার ফলে, কোনো সমস্যা ধরা পড়তো না।
এর সঙ্গে ডিজিটাল যুগে বহু ডিজিটাল সমস্যা এসে হাজির হয়েছে। দেশে শিক্ষার একমাত্র পোর্টাল দৈনিক শিক্ষাডটকম ও প্রিন্ট পত্রিকা দৈনিক আমাদের বার্তা বোর্ডের কম্পিউটার সেকশনের যে দুর্নীতি, গাফিলতি এবং অনভিজ্ঞতার চিত্র তুলে ধরেছে, সরকার যদি এ বিষয়টিতে জোর দেয় তাহলেও সমস্যা অনেকটা কমে য়াবে। আমি বহুবার বলেছি, সব ধরনের শিক্ষকদের খাতা পরীক্ষণের দায়িত্বে দেওয়া যাবে না। খাতা দিতে হবে অল্পসংখ্যক, পরীক্ষকদের পারিশ্রমিক একটু বেশি দিতে হবে। তারপরও খাতা দ্বিতীয় পরীক্ষক দিয়ে দেখাতেই হবে। এ বিষয়গুলো ইস্টাবলিশ করতে বোর্ডের চেয়ারম্যান ও কন্ট্রোলারই যথেষ্ট, যেহেতু বোর্ডগুলা স্বায়ত্তশাসিত; কিন্তু আমাদের এসব পজিশনে যারা আছেন তারা তো মন্ত্রণালয়ের নির্দেশ ছাড়া কিছু করেন না, করতে চান না, করতে পারেনও না। কারণ তাদের নিয়োগ প্রক্রিয়া তো পুরোপুরি স্বচ্ছতার মধ্য দিয়ে হয় না, প্রফেশনালি হয় না। নিয়োগ হয় কে কার আত্মীয়, কে কার বন্ধু, কে কোন পার্টিতে কতটা অবদান রেখেছেন, তার ওপর। ফলে, এসব বোর্ড কন্ট্রোলার বা চেয়ারম্যানরা কিছুই করতে পারেন না। দেখা যায়, অখ্যাত এক কলেজের অধ্যক্ষ সারাজীবন হয়তো শিক্ষাবিষয়ক কোনোকিছুর সঙ্গে জড়িত ছিলেন না, কিন্তু উপরোক্ত কোনো কিছুরই বদৌলতে বোর্ডের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক কিংবা চেয়ারম্যান হয়েছেন। তার পক্ষে বৈপ্লবিক কোনো পরিবর্তন আনা সম্ভব হয় না। এখানে নৈতিক সাহস থাকতে হয়, পড়াশোনা জানতে হয়, করতে হয়, নেতৃত্ব দিতে হয়, শিক্ষার মূল সমস্যাগুলোর ভেতরে ঢোকার জন্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে প্রধান অতিথি হিসেবে নয় শিক্ষক হিসেবে দেখতে যেতে হয়। নিজে দায়িত্ব নিয়ে অনেক কিছু করতে হয়।
যারা শিক্ষা প্রশাসনের পদগুলোতে আসেন তারা ভালো শিক্ষকও না, ভালো প্রশাসকও নন। ভালো ও প্রকৃত শিক্ষক হলে তারা এসব কাজে যেতে চাবেন না, অথচ মারাত্মক লবিং করে এসব পদ দখল করেন একদল শিক্ষক। শ্রেণিকক্ষে শিক্ষাদান এখন অনেক চ্যালেঞ্জিং দেশের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড আর নৈতিকতা হারানোর যুগে, তাই কিছু শিক্ষক শ্রেণিকক্ষ ছেড়ে বাঁচতে চান। এটি আরেকটি বাস্তবতা। যখন তারা শিক্ষা প্রশাসনের কোনো পদে আসেন, তখন তারা ভালো প্রশাসকও নন, কারণ সে ধরনের কোনো অভিজ্ঞতা তাদের থাকে না। কারণ তারা কলেজের অধ্যক্ষ থাকাকালে সরকারি সংগঠনের তথাকথিত ছাত্র নেতাদের সঙ্গে মানিয়ে চলে এসেছেন, যার দ্বারা শিক্ষা প্রশাসন শেখা যায় না। বোর্ডে এসে নতুনভাবে তারা কি করবেন? তাদের একার পক্ষে অনেক কিছু করা সম্ভবও নয়। তবে, শুরুটা তাদের করতেই হবে, কারণ রাজনীতিবিদ কিংবা সরকারে যারা থাকেন, তারা এসব সমস্যা পুরোটা বুঝতে চাবেন না। সমাধানও তারা হয়তো সেভাবে দিতে যাবেন না। এগিয়ে আসতে হবে শিক্ষকদেরই। আপনি চেয়ারম্যান হোন আর কন্ট্রোলার হোন, মনে রাখতে হবে আপনি একজন শিক্ষক, আপনি পুরো শিক্ষকসমাজের প্রতিনিধিত্ব করছেন। কয় বছর আগে এনসিটিবিতে দেশের সব বোর্ডের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রকদের ডাকা হয়েছিল, ভাগ্যক্রমে আমাকেও দাওয়াত করা হলো কিছু কথা বলার জন্য। সেদিন বিভিন্ন বোর্ডের প্রশ্নের অনেক সমস্যা নিয়ে কথা বলেছিলাম। কয়েকজন পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক বলেছিলেন, বোর্ডের প্রশ্নও করেন শিক্ষকরা, প্রশ্ন মডারেটও করেন তারা, এসব সমস্যা থাকলে আমরা কি করবো। এ কথার মধ্য দিয়েই বোর্ডের অনেক কিছু উঠে আসে। পরীক্ষা নিয়ন্ত্রকরা মনেই করেন না যে, তারা শিক্ষক। তারা প্রশাসকের ভূমিকায় থাকতে চান। যার ফলে কোনটিই হচ্ছে না।
লেখক: ক্যাডেট কলেজের সাবেক শিক্ষক।
১
১ মন্তব্য