সহকারী শিক্ষক
২৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ১১:১৮ অপরাহ্ণ
জিরো লেভেলের শিক্ষার্থী নিয়ে আমার ভাবনা
জিরো লেভেলের শিক্ষার্থী নিয়ে আমার ভাবনা!
সাধারণত আমরা শিক্ষার্থীদের নিয়ে ভাবতে গেলে প্রথমেই দেখি—সে কেমন ফলাফল করছে, কত নম্বর পাচ্ছে, কতটুকু পড়ছে, কোন পরিবার থেকে এসেছে, তার বাবা-মা কতটা সচেতন—ইত্যাদি। আমরা শিক্ষার্থীর সাফল্যকে অনেক সময় তার পারিবারিক পরিবেশ, মেধা এবং আমাদের শিক্ষকতার সাফল্যের সঙ্গে মিলিয়ে দেখি।
কিন্তু বাস্তবতা হলো, ভালো ফলাফল করা শিক্ষার্থী মানেই যে সে ধনী বা বিত্তবান পরিবারের সন্তান—তা নয়। বরং অনেক সময় দেখা যায়, সচেতন পরিবার থেকেই শিক্ষার্থীরা ভালো করছে। সেখানে শিক্ষার্থীর নিজের মেধা আছে, শিক্ষক নিয়মিত পড়াচ্ছেন, আর পরিবার থেকেও তাকে সহযোগিতা করা হচ্ছে। ফলে তার এগিয়ে যাওয়ার পথটা অনেকটাই তৈরি থাকে।
কিন্তু যে পরিবারগুলো শিক্ষা, সচেতনতা কিংবা অর্থনৈতিক সক্ষমতার দিক থেকে কিছুটা পিছিয়ে—সেসব পরিবারের শিশুরা সাধারণত শ্রেণিকক্ষেও পিছিয়ে থাকে। তারা পাঠদান কার্যক্রমে সক্রিয়ভাবে অংশ নিতে পারে না। অনেক সময় তারা প্রশ্ন করতে পারে না, উত্তর দিতে পারে না, বাড়ির কাজ করতে পারে না, প্রয়োজনীয় শিক্ষা-উপকরণও সবসময় পায় না।
আর এখানেই আমাদের সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা।
কারণ আমরা অজান্তেই তাদের আরও পিছিয়ে দিই।
যে শিক্ষার্থী আগে থেকেই পিছিয়ে আছে, তাকে সামনে আনার জন্য আমাদের আলাদা পরিকল্পনা থাকার কথা। কিন্তু বাস্তবে অনেক সময় আমরা তার প্রতি সেই অতিরিক্ত মনোযোগটুকুও দিতে পারি না। বরং যে শিক্ষার্থী আগে থেকেই ভালো, তার জন্য আমাদের থাকে নানা পরিকল্পনা, নানা আয়োজন, নানা সুযোগ। তাকে আরও ভালো করার জন্য আমরা অনেক কিছু করি।
তাহলে একজন শিক্ষক হিসেবে নিজের কাছে যদি আমি একটি প্রশ্ন করি—
“আমি কতজন ভালো শিক্ষার্থীকে আরও ভালো করতে পেরেছি?”
এর পাশাপাশি আরেকটি প্রশ্ন কি আমি নিজেকে করতে পারি?
“আমি কতজন দুর্বল শিক্ষার্থীকে সামনে নিয়ে আসতে পেরেছি?”
“যে শিক্ষার্থী প্রায় জিরো লেভেল থেকে শুরু করেছিল, তাকে আমি কতটা পথ এগিয়ে দিতে পেরেছি?”
আমার মনে হয়, এই প্রশ্নের উত্তরই একজন শিক্ষকের প্রকৃত সফলতার জায়গা।
আমি হয়তো বলতে পারি—আমার শিক্ষার্থী ভালো ফল করেছে। কেউ বৃত্তি পেয়েছে, কেউ প্রথম হয়েছে, কেউ বড় কোনো প্রতিষ্ঠানে পড়ছে। এসব অবশ্যই আনন্দের এবং গর্বের।
কিন্তু একজন শিক্ষক হিসেবে আমার সবচেয়ে বড় অর্জন হয়তো সেখানে নয়।
আমার সবচেয়ে বড় অর্জন তখন, যখন যে শিশুটি একসময় কিছুই পারত না, সে আজ নিজের নাম লিখতে পারে। যে শিশু বই পড়তে ভয় পেত, সে আজ সাবলীলভাবে পড়তে পারে। যে শিশু শ্রেণিকক্ষে কথা বলত না, সে আজ হাত তুলে উত্তর দেয়। যে শিশু একসময় অন্যদের পেছনে বসে থাকত, সে আজ আত্মবিশ্বাস নিয়ে সামনে আসে।
একজন ‘জিরো লেভেলের’ শিক্ষার্থীকে শূন্য থেকে একে নিয়ে আসার যে আনন্দ—তা হয়তো একজন ভালো শিক্ষার্থীকে নব্বই থেকে একশতে নিয়ে আসার আনন্দের চেয়েও গভীর।
আমরা অনেকেই ভালো শিক্ষার্থীকে পড়াতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করি। কারণ তারা দ্রুত বুঝতে পারে, প্রশ্নের উত্তর দিতে পারে, বাড়ির কাজ করে আসে, অভিভাবকরাও সহযোগিতা করেন। ফলে তাদের নিয়ে কাজ করলে শিক্ষক হিসেবে নিজের সাফল্যও সহজে দৃশ্যমান হয়।
কিন্তু একজন দুর্বল শিক্ষার্থীকে নিয়ে কাজ করা কঠিন। সেখানে ধৈর্য দরকার, সময় দরকার, নতুন কৌশল দরকার, বারবার চেষ্টা দরকার। সবচেয়ে বেশি দরকার—বিশ্বাস।
বিশ্বাস করতে হবে, কোনো শিশুই আসলে ‘খারাপ শিক্ষার্থী’ নয়।
কেউ হয়তো পিছিয়ে আছে। কেউ হয়তো একটু বেশি সময় নিয়ে শেখে। কেউ হয়তো বাড়িতে সহযোগিতা পায় না। কেউ হয়তো ভয় পায়। কেউ হয়তো নিজের সক্ষমতার ওপর বিশ্বাস হারিয়ে ফেলেছে।
আর একজন শিক্ষক যদি সেই শিশুটির পাশে দাঁড়িয়ে বলতে পারেন—
“তুমি পারবে। আমি তোমার সঙ্গে আছি।”
তাহলেই হয়তো তার শেখার গল্পটা বদলে যেতে পারে।
তাই আমি মনে করি, একজন শিক্ষক শুধু ভালো শিক্ষার্থীদের শিক্ষক নন। বরং যে শিক্ষার্থীকে অন্যরা ‘দুর্বল’, ‘অমনোযোগী’ কিংবা ‘পিছিয়ে পড়া’ বলে এড়িয়ে যায়—সেই শিক্ষার্থীকে সামনে নিয়ে আসার দায়িত্বও একজন শিক্ষকের।
দিন শেষে নিজের শিক্ষকতা মূল্যায়ন করার সময় তাই শুধু কতজন ভালো করেছে, সেটি নয়; বরং এটাও দেখতে চাই—
কতজন পিছিয়ে থাকা শিশুকে আমি সামনে আনতে পেরেছি?
কতজন শিশুর ‘আমি পারি না’কে ‘আমি পারি’-তে বদলে দিতে পেরেছি?
আর যদি এই প্রশ্নের উত্তর আমার কাছে না থাকে, তাহলে হয়তো আমার শিক্ষকতার সাফল্যের হিসাবটাও নতুন করে করতে হবে।
কারণ ভালো শিক্ষার্থী তৈরি করা শিক্ষকতার একটি অংশ।
কিন্তু একজন পিছিয়ে পড়া শিশুকে উঠে দাঁড়াতে শেখানো—হয়তো শিক্ষকতার সবচেয়ে বড় পরীক্ষা।
৭
৭ মন্তব্য