Loading..

ব্লগ

রিসেট

২৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ০৫:১৫ পূর্বাহ্ণ

বিনয়, জ্ঞান ও চরিত্রে গড়ে উঠুক আদর্শ শিক্ষার্থী - মোঃ মুজিবুর রহমান

বিনয়, জ্ঞান ও চরিত্রে গড়ে উঠুক

আদর্শ শিক্ষার্থী

মোঃ মুজিবুর রহমান

সহকারী অধ্যাপক
মোজাদ্দেদীয়া ইসলামিয়া আলিম মাদ্রাসা, কালিয়াকৈর, গাজীপুর।

শিক্ষার্থী একটি জাতির ভবিষ্যতের প্রতিচ্ছবি। আজকের শিক্ষার্থীরাই আগামী দিনের শিক্ষক, আলেম, চিকিৎসক, প্রকৌশলী, গবেষক, প্রশাসক, উদ্যোক্তা ও সমাজের নেতৃত্বদানকারী মানুষ। তাই শিক্ষার্থীর শিক্ষা শুধু পাঠ্যবইয়ের কয়েকটি বিষয় মুখস্থ করা কিংবা পরীক্ষায় ভালো নম্বর পাওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; প্রকৃত শিক্ষা মানুষের জ্ঞানকে আলোকিত করে, চরিত্রকে সুন্দর করে, আচরণকে মার্জিত করে এবং দায়িত্ববোধকে জাগ্রত করে।

ইসলামের দৃষ্টিতে জ্ঞান অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ। মহান আল্লাহ বলেন, “যারা জানে এবং যারা জানে না, তারা কি সমান?” (সূরা আয-যুমার, ৩৯:৯)। আবার প্রথম ওহির সূচনাতেই এসেছে—“পড়ো তোমার রবের নামে।” (সূরা আলাক, ৯৬:১)। এতে বোঝা যায়, জ্ঞানার্জন ইসলামী জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তবে জ্ঞান যদি চরিত্র, বিনয় ও আল্লাহভীতির সঙ্গে যুক্ত না হয়, তাহলে তা মানুষের প্রকৃত কল্যাণ নিশ্চিত করে না।

একজন আদর্শ শিক্ষার্থী তাই শুধু মেধাবী নয়; সে বিনয়ী, আদর্শবান, চরিত্রবান, সত্যবাদী, দায়িত্বশীল, নিয়মিত, সময়নিষ্ঠ, পরিশ্রমী ও মানবিক। সে শিক্ষক ও গুরুজনকে সম্মান করে, পিতা-মাতার প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকে, শ্রেণিকক্ষে মনোযোগ দিয়ে পাঠ শোনে, নিয়মিত পড়াশোনা করে এবং অর্জিত জ্ঞানকে সৎ ও কল্যাণকর কাজে ব্যবহার করার চেষ্টা করে।

শিক্ষার্থী কাকে বলে?

যে ব্যক্তি জ্ঞান, দক্ষতা, নৈতিকতা ও জীবনবোধ অর্জনের উদ্দেশ্যে শিক্ষা গ্রহণ করে, তাকে শিক্ষার্থী বলা হয়। তবে প্রকৃত শিক্ষার্থী শুধু বিদ্যালয় বা মাদ্রাসায় উপস্থিত থাকে না; সে প্রতিদিন নতুন কিছু শেখার চেষ্টা করে, নিজের ভুল সংশোধন করে এবং জ্ঞানকে জীবনের সঙ্গে মিলিয়ে চলতে শেখে।

শিক্ষার্থীর হাতে থাকে ভবিষ্যতের সম্ভাবনা। তাই শিক্ষাজীবন হলো নিজেকে গড়ে তোলার শ্রেষ্ঠ সময়। এই সময়ে অর্জিত অভ্যাস, মূল্যবোধ ও চরিত্রের প্রভাব পরবর্তী জীবনে দীর্ঘদিন থাকে।

আদর্শ শিক্ষার্থীর প্রধান বৈশিষ্ট্য

১. বিনয় ও ভদ্রতা

আদর্শ শিক্ষার্থীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ গুণ হলো বিনয়। সে জ্ঞান অর্জন করেও অহংকারী হয় না। নিজের জ্ঞান, মেধা বা সাফল্য নিয়ে গর্ব না করে অন্যের প্রতি সম্মান দেখায়।

মহান আল্লাহ অহংকার পছন্দ করেন না। কুরআনে মানুষকে পৃথিবীতে নম্রভাবে চলার শিক্ষা দেওয়া হয়েছে (সূরা আল-ফুরকান, ২৫:৬৩)। তাই শিক্ষার্থীর কথাবার্তা, চলাফেরা ও আচরণে ভদ্রতা ও নম্রতা থাকা উচিত।

জ্ঞান মানুষকে আলোকিত করে, আর বিনয় সেই জ্ঞানের সৌন্দর্য প্রকাশ করে।

২. পিতা-মাতার প্রতি শ্রদ্ধাশীলতা

পিতা-মাতা সন্তানের জীবনের অন্যতম প্রধান অভিভাবক ও কল্যাণকামী মানুষ। তাঁদের প্রতি সম্মান, সদাচরণ ও কৃতজ্ঞতা একজন মুসলিম শিক্ষার্থীর গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব।

মহান আল্লাহ বলেন, “পিতা-মাতার সঙ্গে সদাচরণ করো।” (সূরা আল-ইসরা, ১৭:২৩)

তাই আদর্শ শিক্ষার্থী পিতা-মাতার সঙ্গে নম্রভাবে কথা বলে, তাঁদের কষ্ট দেয় না, যথাসাধ্য সহযোগিতা করে এবং তাঁদের দোয়া ও সন্তুষ্টি অর্জনের চেষ্টা করে।

৩. শিক্ষকের প্রতি সম্মান ও শ্রদ্ধা

শিক্ষক শিক্ষার্থীর জ্ঞান ও চরিত্র গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। তাই শিক্ষকের প্রতি শ্রদ্ধা, ভদ্রতা ও মনোযোগ একজন আদর্শ শিক্ষার্থীর পরিচয়।

শিক্ষক যখন পাঠদান করেন, তখন মনোযোগ দিয়ে শোনা, প্রয়োজনীয় প্রশ্ন করা, নির্দেশনা অনুসরণ করা এবং শিক্ষকের সময় ও মর্যাদার প্রতি সম্মান দেখানো উচিত।

তবে শিক্ষকের প্রতি সম্মান মানে প্রশ্নহীনভাবে সবকিছু গ্রহণ করা নয়; বরং ভদ্রতা, শিষ্টাচার ও যুক্তির সঙ্গে শেখার আগ্রহ প্রকাশ করাও শিক্ষার অংশ।

৪. পাঠ ও শিক্ষার প্রতি গভীর মনোযোগ

আদর্শ শিক্ষার্থী পড়াশোনাকে বোঝা মনে করে না; বরং জ্ঞান অর্জনের সুযোগ হিসেবে গ্রহণ করে। সে শ্রেণিকক্ষে মনোযোগ দিয়ে শিক্ষকের বক্তব্য শোনে, পাঠ বুঝে নেওয়ার চেষ্টা করে এবং না বুঝলে বিনয়ের সঙ্গে প্রশ্ন করে।

শুধু পরীক্ষার আগের কয়েক দিন পড়াশোনা না করে প্রতিদিন অল্প অল্প করে নিয়মিত পড়া উচিত। নিয়মিত অধ্যয়ন জ্ঞানকে সুদৃঢ় করে এবং আত্মবিশ্বাস বাড়ায়।

৫. নিয়মিত শ্রেণিতে উপস্থিতি

নিয়মিত ক্লাস করা একজন শিক্ষার্থীর দায়িত্বশীলতার পরিচয়। শ্রেণিকক্ষে উপস্থিত থাকলে শিক্ষক সরাসরি পাঠ ব্যাখ্যা করতে পারেন, প্রশ্নের উত্তর দিতে পারেন এবং শিক্ষার্থীর ভুল সংশোধন করতে পারেন।

অকারণে ক্লাসে অনুপস্থিত থাকা শিক্ষার ধারাবাহিকতায় বাধা সৃষ্টি করে। তাই আদর্শ শিক্ষার্থী সময়মতো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে উপস্থিত হয় এবং যথাসম্ভব নিয়মিত শ্রেণিকক্ষে অংশগ্রহণ করে।

৬. সময়ানুবর্তিতা ও শৃঙ্খলা

সময় অত্যন্ত মূল্যবান। চলে যাওয়া সময় ফিরে আসে না। তাই একজন শিক্ষার্থীকে সময়ের যথাযথ ব্যবহার শিখতে হবে।

সময়মতো ঘুম থেকে ওঠা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যাওয়া, নামাজ ও অন্যান্য দায়িত্ব পালন, পড়াশোনা, বিশ্রাম ও খেলাধুলার জন্য উপযুক্ত সময় নির্ধারণ করা—এসব শৃঙ্খলাবদ্ধ জীবনের অংশ।

আদর্শ শিক্ষার্থী স্বাধীনতার নামে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে না; বরং নিয়ম মেনে নিজের জীবনকে সুন্দরভাবে পরিচালনা করে।

৭. সততা ও সত্যবাদিতা

সততা একজন শিক্ষার্থীর চরিত্রের ভিত্তি। সে মিথ্যা বলে না, প্রতারণা করে না এবং অন্যের কাজ নিজের বলে চালিয়ে দেয় না। পরীক্ষায় নকল করা, অন্যের খাতা দেখে লেখা, মিথ্যা অজুহাত দেওয়া কিংবা শিক্ষকের কাছে সত্য গোপন করা আদর্শ শিক্ষার্থীর আচরণ হতে পারে না।

রাসুলুল্লাহ ﷺ সত্যবাদিতার প্রতি বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছেন। তাই একজন মুসলিম শিক্ষার্থীর কথা ও কাজে সত্য, আমানতদারি ও ন্যায়পরায়ণতা থাকা উচিত।

ভালো ফলের চেয়ে সৎভাবে অর্জিত ফলের মর্যাদা অনেক বেশি।

৮. পরিশ্রম ও অধ্যবসায়

মেধা গুরুত্বপূর্ণ হলেও শুধু মেধার ওপর নির্ভর করে সফল হওয়া যায় না। নিয়মিত পরিশ্রম, ধৈর্য ও অধ্যবসায় প্রয়োজন।

কোনো বিষয় কঠিন মনে হলে হতাশ না হয়ে বারবার চেষ্টা করতে হবে। একটি ভুল উত্তর শিক্ষার্থীর ব্যর্থতার চূড়ান্ত প্রমাণ নয়; বরং সেটি নতুন করে শেখার সুযোগ।

আদর্শ শিক্ষার্থী ব্যর্থতায় ভেঙে পড়ে না এবং সামান্য সাফল্যে আত্মতুষ্টও হয় না।

৯. সুন্দর চরিত্র ও উত্তম আচরণ

ইসলামে উত্তম চরিত্রের বিশেষ মর্যাদা রয়েছে। তাই একজন শিক্ষার্থীর প্রকৃত সৌন্দর্য শুধু পোশাক বা বাহ্যিক আচরণে নয়; তার কথাবার্তা, ব্যবহার, সততা, ধৈর্য, ক্ষমাশীলতা ও মানুষের প্রতি আচরণে প্রকাশ পায়।

সে সহপাঠীকে অপমান করে না, দুর্বলকে নিয়ে হাসাহাসি করে না, কাউকে অন্যায়ভাবে কষ্ট দেয় না এবং ঝগড়া-বিবাদ থেকে দূরে থাকার চেষ্টা করে।

চরিত্রবান শিক্ষার্থী যেখানে যায়, সেখানে নিজের আচরণ দিয়ে শিক্ষার সৌন্দর্য প্রকাশ করে।

১০. সহপাঠীদের প্রতি সহমর্মিতা

শ্রেণিকক্ষের সব শিক্ষার্থী সমান মেধাবী বা সমান সক্ষম নয়। কেউ দ্রুত শেখে, কেউ ধীরে শেখে। আদর্শ শিক্ষার্থী দুর্বল সহপাঠীকে অবহেলা না করে তাকে সাহায্য করে।

বন্ধুর সাফল্যে আনন্দিত হওয়া, বিপদে পাশে দাঁড়ানো, প্রয়োজনীয় সহযোগিতা করা এবং কাউকে হেয় না করা মানবিক শিক্ষার্থীর পরিচয়।

১১. দায়িত্ববোধ

একজন শিক্ষার্থীকে নিজের পড়াশোনা, বই-খাতা, পোশাক, শ্রেণিকক্ষ ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রতি দায়িত্বশীল হতে হবে।

বাড়ির কাজ সময়মতো করা, শিক্ষকের দেওয়া দায়িত্ব পালন করা, বিদ্যালয়ের সম্পদ নষ্ট না করা এবং নিজের ভুলের দায়িত্ব গ্রহণ করা দায়িত্ববোধের পরিচয়।

১২. আত্মসংযম ও আত্মনিয়ন্ত্রণ

শিক্ষাজীবনে অনেক আকর্ষণ শিক্ষার্থীর মনোযোগ নষ্ট করতে পারে। অতিরিক্ত মোবাইল ব্যবহার, গেম, অপ্রয়োজনীয় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, অযথা আড্ডা কিংবা বিনোদনে অতিরিক্ত সময় ব্যয় পড়াশোনা ও চরিত্র গঠনে বাধা দিতে পারে।

তাই আদর্শ শিক্ষার্থী নিজের সময় ও ইচ্ছাকে নিয়ন্ত্রণ করতে শেখে। প্রযুক্তি ব্যবহার করবে, কিন্তু প্রযুক্তির দাস হবে না।

১৩. প্রশ্ন করার ও জানার আগ্রহ

ভালো শিক্ষার্থী শুধু মুখস্থ করে না; সে বোঝার চেষ্টা করে। কোনো বিষয় না বুঝলে বিনয়ের সঙ্গে প্রশ্ন করে।

“কেন?”, “কীভাবে?”, “এর কারণ কী?”—এ ধরনের প্রশ্ন জ্ঞানকে গভীর করে। তবে প্রশ্ন করার সময় শিক্ষক ও সহপাঠীদের প্রতি শিষ্টাচার বজায় রাখতে হবে।

১৪. ইবাদত, তাকওয়া ও নৈতিক জীবন

একজন মুসলিম শিক্ষার্থীর জীবনে ঈমান, তাকওয়া ও ইবাদতের গুরুত্ব অপরিসীম। নামাজ প্রতিষ্ঠা, আল্লাহকে স্মরণ করা, কুরআন পড়া, সত্য কথা বলা, হারাম থেকে বেঁচে থাকা এবং নেক কাজে আগ্রহী হওয়া তার চরিত্রকে সুন্দর করতে সাহায্য করে।

মহান আল্লাহ বলেন, “নিশ্চয়ই আল্লাহ মুত্তাকিদের সঙ্গে আছেন।” (সূরা আন-নাহল, ১৬:১২৮)

তাকওয়া শিক্ষার্থীকে এমন এক অন্তর্চেতনা দেয়, যার কারণে সে একা থাকলেও অন্যায় থেকে বেঁচে থাকার চেষ্টা করে।

১৫. আমানতদারি ও বিশ্বস্ততা

শিক্ষার্থীর কাছে বই, দায়িত্ব, বন্ধুর গোপন কথা, শিক্ষকের নির্দেশ কিংবা প্রতিষ্ঠানের সম্পদ—সবকিছুই এক ধরনের আমানত। তাই সে আমানতের খেয়ানত করে না।

অন্যের জিনিস অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করা, বন্ধুর ব্যক্তিগত কথা ছড়িয়ে দেওয়া কিংবা দায়িত্বে অবহেলা করা বিশ্বস্ততার পরিপন্থী।

১৬. পরিচ্ছন্নতা ও স্বাস্থ্যসচেতনতা

পরিচ্ছন্নতা মানুষের ব্যক্তিত্বের অংশ। শিক্ষার্থীর পোশাক, শরীর, বই-খাতা, শ্রেণিকক্ষ ও আশপাশ পরিষ্কার রাখা উচিত।

পর্যাপ্ত ঘুম, পরিমিত ও পুষ্টিকর খাবার, নিয়মিত শরীরচর্চা এবং পরিচ্ছন্ন জীবনযাপন পড়াশোনায় মনোযোগ ধরে রাখতে সহায়ক।

১৭. দেশ, সমাজ ও মানুষের প্রতি দায়িত্ববোধ

আদর্শ শিক্ষার্থী নিজের ভবিষ্যৎ নিয়ে যেমন চিন্তা করে, তেমনি সমাজ ও দেশের কল্যাণ নিয়েও সচেতন থাকে। সে আইন মেনে চলে, পরিবেশ রক্ষা করে, জনসম্পদ নষ্ট করে না এবং মানুষের প্রতি সহানুভূতিশীল হয়।

দেশপ্রেম শুধু মুখের কথা নয়; নিজের দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করা, সৎ ও যোগ্য মানুষ হিসেবে গড়ে ওঠা এবং মানুষের কল্যাণে জ্ঞান ব্যবহার করাও দেশ ও সমাজের প্রতি দায়িত্বের অংশ।

একজন আদর্শ শিক্ষার্থীর দৈনন্দিন জীবন

একজন শিক্ষার্থীর জীবন হওয়া উচিত পরিমিত, নিয়মতান্ত্রিক ও দায়িত্বশীল। দিনের শুরুতে আল্লাহর স্মরণ ও প্রয়োজনীয় ইবাদত, এরপর পরিচ্ছন্নতা ও দিনের প্রস্তুতি; শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সময়মতো উপস্থিতি; শ্রেণিকক্ষে মনোযোগ; অবসরে খেলাধুলা ও শরীরচর্চা; নির্ধারিত সময়ে পুনরাবৃত্তি ও বাড়ির কাজ—এসব অভ্যাস শিক্ষাজীবনকে সুন্দর করে।

রাতে ঘুমানোর আগে সে দিনের কাজগুলো পর্যালোচনা করতে পারে—আজ কী শিখলাম, কোথায় ভুল করেছি, আগামীকাল কীভাবে আরও ভালো করব? এই আত্মমূল্যায়ন একজন শিক্ষার্থীকে ধীরে ধীরে উন্নতির পথে এগিয়ে দেয়।

যেসব অভ্যাস আদর্শ শিক্ষার্থীর পরিহার করা উচিত

আদর্শ শিক্ষার্থীকে কিছু ক্ষতিকর অভ্যাস থেকে অবশ্যই দূরে থাকতে হবে। যেমন—

  • মিথ্যা বলা ও প্রতারণা করা;

  • পরীক্ষায় নকল করা;

  • শিক্ষক ও পিতা-মাতার সঙ্গে অসৌজন্যমূলক আচরণ;

  • অকারণে ক্লাসে অনুপস্থিত থাকা;

  • পড়াশোনায় অলসতা ও অনিয়ম;

  • অতিরিক্ত মোবাইল ও বিনোদনে সময় নষ্ট করা;

  • সহপাঠীকে অপমান বা হয়রানি করা;

  • অহংকার ও হিংসা;

  • অশ্লীলতা ও অশোভন আচরণ;

  • মাদক ও ক্ষতিকর অভ্যাস;

  • অন্যের সম্পদ বা অধিকার নষ্ট করা;

  • ব্যর্থ হয়ে চেষ্টা ছেড়ে দেওয়া।

শিক্ষার্থী গঠনে শিক্ষক ও অভিভাবকের ভূমিকা

একজন আদর্শ শিক্ষার্থী গড়ে ওঠে পরিবার, শিক্ষক ও সমাজের সম্মিলিত প্রচেষ্টায়। শুধু শিক্ষার্থীকে উপদেশ দিলেই যথেষ্ট নয়; তাকে সুন্দর পরিবেশও দিতে হয়।

শিক্ষকের উচিত শিক্ষার্থীর ভুল সংশোধন করা, তার প্রশ্নকে গুরুত্ব দেওয়া, দুর্বল শিক্ষার্থীকে সহযোগিতা করা এবং জ্ঞান ও নৈতিকতার সমন্বিত শিক্ষা দেওয়া।

অভিভাবকের উচিত সন্তানের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক রাখা, তার কথা মনোযোগ দিয়ে শোনা, শুধু পরীক্ষার ফল নয়—তার চরিত্র ও আচরণের প্রতিও নজর দেওয়া এবং ভালো কাজে উৎসাহিত করা।

শিক্ষার্থীকে ভয় দেখিয়ে নয়, বরং ভালোবাসা, আদর্শ ও সঠিক দিকনির্দেশনার মাধ্যমে গড়ে তুললে তার মধ্যে দায়িত্ববোধ ও আত্মনিয়ন্ত্রণ বেশি দৃঢ় হতে পারে।

আদর্শ শিক্ষার্থী—শুধু ভালো ফল নয়, ভালো মানুষ

একজন শিক্ষার্থী পরীক্ষায় ভালো ফল করলেই তার শিক্ষা সম্পূর্ণ হয়েছে—এ কথা বলা যায় না। যদি সে মিথ্যা বলে, অন্যকে অপমান করে, পিতা-মাতাকে কষ্ট দেয়, শিক্ষককে অসম্মান করে কিংবা অসদুপায়ে ফল অর্জন করে, তাহলে তার শিক্ষাজীবনের বড় একটি দিক অপূর্ণ থেকে যায়।

অন্যদিকে যে শিক্ষার্থী জ্ঞান অর্জনের পাশাপাশি বিনয়ী, সত্যবাদী, চরিত্রবান, দায়িত্বশীল, পরিশ্রমী, নিয়মিত ও মানবিক হয়—সে নিজের জীবনকে সুন্দর করার পাশাপাশি পরিবার, প্রতিষ্ঠান ও সমাজের জন্যও কল্যাণের কারণ হতে পারে।

তাই শিক্ষার লক্ষ্য হওয়া উচিত জ্ঞান ও চরিত্রের সমন্বয়। জ্ঞান মানুষকে পথ চিনতে সাহায্য করে, আর নৈতিকতা তাকে সঠিক পথে চলতে সাহায্য করে।

উপসংহার

শিক্ষার্থী জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ হলো নিজেকে গড়ে তোলা। আজকের ছোট ছোট অভ্যাসই আগামী দিনের বড় চরিত্র নির্মাণ করে। তাই প্রত্যেক শিক্ষার্থীর উচিত জ্ঞান অর্জনে মনোযোগী হওয়া, নিয়মিত শ্রেণিতে উপস্থিত থাকা, পাঠ ও শিক্ষককে গুরুত্ব দেওয়া, পিতা-মাতা ও গুরুজনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকা, সত্য ও সততার পথে চলা, সময়ের মূল্য বোঝা এবং সুন্দর চরিত্র গঠনে সচেষ্ট থাকা।

ইসলামী আদর্শে একজন শিক্ষার্থী হবে ঈমানদার, বিনয়ী, জ্ঞানপিপাসু, চরিত্রবান, পরিশ্রমী, নিয়মশৃঙ্খলাপরায়ণ, আমানতদার, দায়িত্বশীল ও মানবিক। তার জ্ঞান হবে কল্যাণের জন্য, তার চরিত্র হবে মানুষের জন্য নিরাপদ, আর তার জীবন হবে আল্লাহর সন্তুষ্টি ও মানুষের কল্যাণের পথে নিবেদিত।

আজকের বিনয়ী ও আদর্শ শিক্ষার্থীই আগামী দিনের জ্ঞানী, সৎ, দায়িত্বশীল ও কল্যাণমুখী মানুষ।

এক কথায়

আদর্শ শিক্ষার্থী হলো—যে বিনয় ও চরিত্রে সুন্দর, জ্ঞান ও পাঠে মনোযোগী, নিয়মে শৃঙ্খলিত, শিক্ষক-পিতা-মাতার প্রতি শ্রদ্ধাশীল, সত্য ও সততায় অটল এবং জ্ঞানকে কল্যাণের পথে কাজে লাগায়।

হে আল্লাহ! আমাদের শিক্ষার্থীদের উপকারী জ্ঞান, উত্তম চরিত্র, বিনয়, তাকওয়া, আমানতদারি ও সৎকর্মের তৌফিক দাও। তাদের জ্ঞান ও চরিত্রকে পরিবার, সমাজ ও মানবতার কল্যাণের মাধ্যম করো। আমিন।

 

মন্তব্য করুন

ব্লগ