সহকারী অধ্যাপক
২৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ০৫:২৪ পূর্বাহ্ণ
রিজিক ও নিরাপত্তার দাতা -(সূরা কুরাইশের আলোকে কৃতজ্ঞতা, রিজিক, নিরাপত্তা ও একনিষ্ঠ ইবাদতের কাব্য) মোঃ মুজিবুর রহমান
|
|
রিজিক ও নিরাপত্তার দাতা
(সূরা কুরাইশের আলোকে কৃতজ্ঞতা, রিজিক, নিরাপত্তা ও একনিষ্ঠ ইবাদতের কাব্য)
মোঃ মুজিবুর রহমান
সহকারী অধ্যাপক
মোজাদ্দেদীয়া ইসলামিয়া আলিম মাদ্রাসা, কালিয়াকৈর, গাজীপুর।
যাঁর দানে প্রাণের মাঝে জাগে নতুন প্রাণ,
যাঁর রহমতে ভরে ওঠে ধরণীর সব দান;
ক্ষুধার মাঝে অন্ন দেন, ভয়ের মাঝে শান্তি,
তাঁরই দানে জীবনজুড়ে সুখের নির্মল কান্তি।
মরুর বুকে পথের ধারে, উত্তপ্ত বালুর দেশে,
রহমতেরই ছায়া নামে তাঁরই দয়া এসে;
শূন্য পথে পথিক চলে, রিজিক থাকে সাথে,
সকল দানের মালিক তিনি—দিনের শেষে রাতে।
কুরাইশদের স্মরণ করো, ইতিহাসের পাতা,
কাবাঘরের পবিত্র ছায়া, সম্মানেরই কথা;
শীত-গ্রীষ্মে বাণিজ্যযাত্রা চলত আপন মনে,
রিজিকেরই দ্বার খুলে দিত দয়াময় যে ক্ষণে।
শীতের দিনে দূর সফরে যেত বণিকদল,
গ্রীষ্মকালে পথ ধরত তারা, চলত অবিরল;
দূর মরুতে পথের মাঝে ছিল কত ভয়,
তবু আল্লাহর হেফাজতে চলত তাদের জয়।
পথের ধুলা, রৌদ্রতাপ আর মরুর কঠিন বেলা,
তবু ছিল জীবিকারই ব্যস্ত বাণিজ্যমেলা;
যিনি দিলেন পথের সুযোগ, দিলেন নিরাপত্তা,
তাঁরই দানে চলত তাদের জীবন ও সমৃদ্ধতা।
তাই তো রবের নির্দেশ আসে হৃদয় জাগাতে—
“এই ঘরের রবের ইবাদত করো একনিষ্ঠতাতে।”
কাবা ঘরটি সম্মানিত, রব তার মহান,
ইবাদতের যোগ্য কেবল তিনি—পরম দয়াবান।
যিনি ক্ষুধায় অন্ন দেন, তিনি মহান রব,
তাঁরই দানে শস্য ফলে, ভরে ওঠে সব;
ধানের শীষে, ফলের ঘ্রাণে, ফুলের মধুর হাসি,
তাঁরই কুদরত ছড়িয়ে আছে—দেখো চারপাশে আসি।
ক্ষুধার্ত মুখে অন্ন যখন শান্তির হাসি আনে,
মুমিন তখন রবকে স্মরণ করে কৃতজ্ঞ প্রাণে;
এক মুঠো ভাত, এক পেয়ালা পানি—তাঁরই দান,
নিয়ামতের এ মূল্য বুঝে নত হোক প্রাণ।
যিনি ভয়কে দূরে রাখেন, দেন নিরাপদ ঘর,
তাঁরই দানে শান্তি পায় ক্লান্ত পথিকের পর;
নিরাপত্তা বড় নিয়ামত—বুঝুক মানবসমাজ,
শান্তির মাঝে গড়ে ওঠে শিক্ষা, সভ্যতা, কাজ।
ঘুমের রাতে নিশ্চিন্ত থাকা, ভোরে জাগা প্রাণ,
নির্ভয়ে যে পথ চলা—সবই তাঁরই দান;
মা যে শিশুকে বুকে রাখে নিশ্চিন্ত ভালোবেসে,
সেই নিরাপদ ঘরও তো তাঁর রহমতে আসে।
তাই নিয়ামত পেলে মানুষ অহংকারে নয়,
কৃতজ্ঞতার ফুল ফুটাবে হৃদয়েরই রয়;
“আলহামদুলিল্লাহ”—বলে নত হবে শির,
রবের দানে রবের পথে হবে জীবন স্থির।
শুধু মুখে শুকরিয়া নয়, কাজে তার প্রমাণ,
হালাল পথে চলাই হবে কৃতজ্ঞতার গান;
চোখ পেয়েছি—হারাম থেকে রাখব চোখটি দূর,
কান পেয়েছি—শুনব না আর মিথ্যা কথার সুর।
জিহ্বা পেয়েছি—সত্য বলব, মিথ্যা দেব না স্থান,
কারও নামে অপবাদ দিয়ে করব না অপমান;
হাত পেয়েছি—অন্যায়ের হাত বাড়াব না আর,
ক্ষমতা পেলে দুর্বলকে দেব না কোনো ভার।
সম্পদ যদি বেশি মেলে, গর্ব করব না মনে,
অসহায়ের পাশে দাঁড়াব মানবতার টানে;
রবের দেওয়া ধন-সম্পদ আমানত ভেবে নেব,
হক আদায় করে তবে জীবনের পথ রচব।
রিজিক মানে শুধু ধন নয়, শুধু স্বর্ণ-রাশি নয়,
সুস্থ দেহ, শান্ত পরিবার—এসবও নিয়ামত হয়;
জ্ঞান যদি মেলে, সে জ্ঞানও রবের দান,
সৎকাজে তা ব্যয় করাই কৃতজ্ঞতার প্রমাণ।
হালাল পথে ব্যবসা করো, সততারই সাথে,
মিথ্যা দিয়ে লাভ খুঁজো না জীবনেরই পথে;
মাপে কম আর ওজনে কম—এসব থেকে দূর,
আমানতের মর্যাদা রাখো, সত্য হোক সুর।
পরিশ্রম করো, চেষ্টা করো, বসে থেকো না,
তাওয়াক্কুলের নামে কখনো কর্ম ছেড়ো না;
চেষ্টা হবে বান্দার কাজ, ফল রবের হাতে,
এই বিশ্বাস রাখো তুমি প্রতিটি দিন-রাতে।
কৃষক বীজ বুনে মাঠে, অপেক্ষাতে রয়,
বৃষ্টি দেওয়া, ফসল ফলানো—রবেরই অনুগ্রহ হয়;
ব্যবসায়ী পণ্য নিয়ে বাজারে যায় দূর,
লাভ-ক্ষতির শেষ সিদ্ধান্ত রবেরই বিধানসুর।
শিক্ষার্থী বই হাতে নিয়ে অধ্যয়নে মগ্ন,
জ্ঞান দেওয়ার তাওফিক দেন সেই মহান সর্বজ্ঞ;
শ্রমিক তার শ্রম দেয়, কর্মে থাকে স্থির,
রিজিকের দরজা খুলে দেন পরম দয়াবীর।
তাই বলে হাল ছেড়ে দিয়ে বসে থাকা নয়,
“রব দেবেন”—বলে কর্মহীন থাকা মুমিনের নয়;
উপায় নেব, চেষ্টা করব, রবের ওপর ভরসা,
এই পথেই মুমিন পাবে জীবনের সঠিক দিশা।
কুরাইশদের বাণিজ্যে ছিল দুনিয়ারই প্রয়াস,
তবু তাদের মনে রাখতে হলো রবের বিশেষ দান;
জীবিকার সব আয়োজন মানুষের হাতে নয়,
আল্লাহর ইচ্ছা ছাড়া কোনো কাজই পূর্ণ নয়।
আজও মানুষ ব্যস্ত কত সম্পদেরই নেশায়,
সুখ খোঁজে প্রাসাদ গড়ে, দৌড়ায় মায়ার আশায়;
কিন্তু যদি অন্তর ভরে কৃতজ্ঞতা না থাকে,
অঢেল ধনও শান্তি দিতে পারে না হৃদয়কে।
অল্পেতে যে শুকরিয়া দেয়, তার মন থাকে ধনী,
অহংকারে ভরা মানুষ পায় না শান্তি খানি;
রবের দানে সন্তুষ্ট থাকা মুমিনেরই গুণ,
শুকরিয়াতে হৃদয় জাগে, দূর হয় মনের ঋণ।
পরিবারে কৃতজ্ঞতা থাক, থাক ভালোবাসা,
পারস্পরিক সম্মানেই মুছে যাক হতাশা;
স্বামী-স্ত্রী একে অন্যের মর্যাদা দেবে মনে,
সন্তান শিখবে মা-বাবার ঋণ হৃদয়েরই কোণে।
সমাজজুড়ে শান্তি চাইলে অন্যায় করো না,
অন্যের জান-মাল-সম্মানে আঘাত হেনো না;
ভয় নয়, নিরাপত্তা দাও—এ হোক মুমিনের কাজ,
সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে গড়ো শান্তির সমাজ।
যে মানুষ ভয় দেখিয়ে সুখ খুঁজে নেয় প্রাণে,
সে ভুলে যায় জবাবদিহি রয়েছে শেষ বিচারে;
জুলুম করে কেউ কখনো প্রকৃত জয় পায় না,
অন্যের অশ্রু দিয়ে কেউ শান্তির ঘর গড়তে পারে না।
তাই হিংসা নয়, বিদ্বেষ নয়, নয় প্রতারণা,
সত্য, ন্যায়, আমানত হোক জীবনেরই সাধনা;
মানুষ যেন মানুষ থাকে, থাকে বিবেক জাগ্রত,
রবের ভয়েই পবিত্র হোক জীবন ও চরিত্র।
কাবার দিকে ফিরে মানুষ এক কাতারে দাঁড়ায়,
ধনী-গরিব পাশাপাশি রবের সামনে যায়;
সকল মানুষ বান্দা তাঁর, নেই কারও বড়াই,
তাকওয়ার পথেই মর্যাদা—এ শিক্ষাই সত্য ভাই।
কাবাঘরের রব যিনি, তিনিই সবার রব,
পূজা-ইবাদত তাঁরই হবে—এ বিশ্বাস অটল হোক;
কোনো সৃষ্টি উপাস্য নয়, নেই তার সে অধিকার,
তাওহিদের এই বিশ্বাসই মুমিনের অহংকার।
দোয়া হবে তাঁরই কাছে, ভরসা তাঁরই ওপর,
সাহায্য চাইব তাঁর কাছেই—তিনি পরম করুণাময়;
সকল শক্তির উৎস তিনি, সকল ক্ষমতার ধারা,
তাঁরই হুকুমে জগত চলে—দিন-রাত ধারা।
যে রব ক্ষুধার মাঝে দেন অন্নের আয়োজন,
যে রব ভয়ের মাঝে দেন নিরাপদ আশ্রয়,
যে রব মরুর পথে খুলে দেন জীবিকার দ্বার,
তাঁরই প্রতি নিবেদিত হোক জীবন বারবার।
নিয়ামত যেন গাফেল করে না দেয় কোনো দিন,
সম্পদ যেন ভুলিয়ে না দেয় পরকালের ঋণ;
দুনিয়ার কাজ করব আমরা, আখিরাতও স্মরণে,
রবের সন্তুষ্টি হবে জীবনেরই কামনায়।
আজ যে আছে, কাল তা নাও থাকতে পারে হাতে,
যে সুস্থতা আছে আজ, তা বদলাতে পারে রাতে;
তাই নিয়ামত থাকতেই তার কদর করতে শিখি,
রবের দেওয়া প্রতিটি দান শুকরিয়াতে লিখি।
খাদ্য নষ্ট করব না আর, করব না অপচয়,
অহংকারে সম্পদ উড়াব—এমন যেন না হয়;
অভাবীর মুখে হাসি ফোটে আমাদেরই দানে,
তবেই সম্পদের সৌন্দর্য ফুটবে মানুষের প্রাণে।
জীবন যদি শান্তিতে যায়, বলব—রবের দান,
সফলতা যদি আসে, বলব—রবেরই অবদান;
বিপদ এলে ধৈর্য ধরব, চাইব তাঁরই সাহায্য,
চেষ্টা করে তাঁর ওপর রাখব পূর্ণ নির্ভরতা।
কুরাইশের সেই স্মরণ আজ আমাদেরও ডাক,
নিয়ামতের মালিককে ভুলে থেকো না আর একটাক;
ক্ষুধার অন্ন, ভয়ের নিরাপদ আশ্রয়—
সবকিছুর পেছনে আছে দয়াময়েরই জয়।
শীত-গ্রীষ্মের সফর যেমন চলত আপন গতিতে,
আজও মানুষ ছুটছে জীবিকারই তাগিদে;
তবু যেন রিজিকের নেশায় রবকে না ভুলি,
দুনিয়ার পথ পেরিয়ে যেন আখিরাতের পথে চলি।
ধন চাই—তবে হালাল ধন,
সুখ চাই—তবে শান্তি;
জীবন চাই—তবে সৎ জীবন,
হৃদয়জুড়ে কান্তি।
ব্যবসা হোক আমানতদার,
কথা হোক সত্য;
সম্পদ হোক কল্যাণময়,
কর্ম হোক পবিত্র।
ক্ষুধার্তের মুখে অন্ন দিই,
ভীতকে দিই আশ্বাস;
অসহায়ের পাশে দাঁড়াই,
দূর করি তার হতাশ।
নিজে খেয়ে অন্যকে ভুলে—
এ জীবন যেন না হয়;
রবের দানে রবের বান্দার
অধিকার যেন রয়।
নিয়ামতের প্রতিটি কণা
রবের দেওয়া দান,
তাঁরই পথে ব্যয় করলে তবেই
সার্থক হবে প্রাণ।
হে পরম দয়াময় আল্লাহ,
তুমি রিজিকদাতা,
ক্ষুধার মাঝে অন্নদাতা,
ভয়ের মাঝে ত্রাতা।
তোমার দানে ভোরের আলো,
তোমার দানে রাত,
তোমার দানে জীবন জাগে,
তোমার দানে প্রভাত।
তোমার দেওয়া খাদ্য খেয়ে
তোমায় যেন না ভুলি,
তোমার দেওয়া নিরাপত্তায়
অন্যায় যেন না করি।
তোমার দেওয়া জ্ঞান ও শক্তি
সৎকাজে যেন দিই,
তোমার দেওয়া সম্পদ দিয়ে
অসহায়ের পাশে দাঁড়াই।
হালাল পথে জীবিকা চাই,
চাই না হারাম ধন,
সত্য পথে চলার তাওফিক
দাও হে পরম করুণাময়।
তাওহিদের দৃঢ় বিশ্বাস
রাখো অন্তরজুড়ে,
শিরকমুক্ত ঈমান দাও
জীবন-মরণভরে।
তোমারই ইবাদত করি,
তোমারই হুকুম মানি,
তোমার সন্তুষ্টিই হোক
জীবনের শ্রেষ্ঠ বাণী।
সূরা কুরাইশের শিক্ষা তাই—নিয়ামত চিনে নাও,
রিজিকদাতার শুকরিয়া করো, তাঁরই পথে চলো;
ক্ষুধার্তকে অন্ন দাও, ভীতকে দাও শান্তি,
এক আল্লাহর ইবাদতেই খুঁজে নাও জীবনের কান্তি।
রিজিক তাঁর, নিরাপত্তা তাঁর, তাঁরই সব দান,
তাঁরই পথে জীবন গড়ুক—সার্থক হোক প্রাণ।
দুনিয়ার পথে কর্ম হোক, আখিরাত থাক মনে,
আল্লাহর সন্তুষ্টি হোক জীবনের শেষ কামনায়।
হে আল্লাহ, তোমার অগণিত নিয়ামতের শুকরিয়া আদায় করার,
হালাল রিজিক অর্জন করার, মানুষের হক আদায় করার,
শান্তি নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠায় ভূমিকা রাখার ও
একনিষ্ঠভাবে তোমার ইবাদত করার তাওফিক দাও।
আমিন।
৭
৭ মন্তব্য