চীফ ইন্সট্রাক্টর
২৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ১২:৪২ অপরাহ্ণ
হযরত ওমর ফারুক (রা.)-এর খেলাফতকালে ঘটে যাওয়া এই ঐতিহাসিক ও হৃদয়স্পর্শী ঘটনাটি ইসলামী ইতিহাসের ন্যায়বিচার, ওয়াদা রক্ষা এবং মহানুভবতার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।
হযরত ওমর ফারুক (রা.)-এর খেলাফতকালে ঘটে যাওয়া এই ঐতিহাসিক ও হৃদয়স্পর্শী ঘটনাটি ইসলামী ইতিহাসের ন্যায়বিচার, ওয়াদা রক্ষা এবং মহানুভবতার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। নিচে ঘটনাটি বিস্তারিত বর্ণনা করা হলো:
১. ওমরের (রা.) দরবারে নালিশ একদিন হযরত ওমর (রা.)-এর দরবারে দুই যুবক এক বৃদ্ধকে টেনে-হেঁচড়ে নিয়ে এলো। যুবকরা অভিযোগ করলো, "হে আমীরুল মুমিনীন! এই বৃদ্ধ আমাদের বৃদ্ধ পিতাকে হত্যা করেছে। আমরা এর উপযুক্ত বিচার ও কেসাস (মৃত্যুদণ্ড) চাই।"
ওমর (রা.) বৃদ্ধকে জিজ্ঞেস করলেন, "তুমি কি সত্যি এদের পিতাকে হত্যা করেছ?" বৃদ্ধ অত্যন্ত সততার সাথে স্বীকার করে বললেন, "হে আমীরুল মুমিনীন! ঘটনাটি সত্য, তবে ইচ্ছা করে নয়। আমি আমার উট নিয়ে যাচ্ছিলাম। হঠাৎ একটি উট খেতের ভেতরে ঢুকে পড়ে এবং গাছের পাতা খেতে থাকে। এ দেখে যুবকদের পিতা রাগান্বিত হয়ে একটি পাথর ছুড়ে মারে, যা উটের মাথায় লেগে উটটি মারা যায়। আমার প্রিয় উটটিকে চোখের সামনে মরতে দেখে আমি নিজেকে ধরে রাখতে পারিনি। আমি পাশ থেকে একটি পাথর তুলে তাকে লক্ষ্য করে মারি, আর সেটি তার মাথায় লেগে সেও মারা যায়।"
২. শরিয়তের রায় ও বৃদ্ধের আকুতি স্বীকারোক্তির পর শরিয়তের বিধান অনুযায়ী হযরত ওমর (রা.) বৃদ্ধের মৃত্যুদণ্ডের আদেশ দিলেন। বৃদ্ধ আদেশ মেনে নিয়ে বললেন, "হে আমীরুল মুমিনীন! আপনার বিচার শিরোধার্য। তবে আমার একটি নিবেদন আছে। আমার ছোট একটি এতিম ভাই আছে। আমাদের প্রয়াত পিতা তার জন্য কিছু সম্পদ রেখে গেছেন, যা আমি এক জায়গায় লুকিয়ে রেখেছি। আমি ছাড়া আর কেউ তা জানে না। আমি মারা গেলে শিশুটির হক নষ্ট হয়ে যাবে। আমাকে ৩ দিনের সময় দিন, আমি সম্পত্তিটি তার কাছে বুঝিয়ে দিয়ে ফিরে আসবো।"
ওমর (রা.) বললেন, "তুমি কোনো সাক্ষী বা জামিনদার ছাড়া যেতে পারবে না। এমন কেউ কি দরবারে আছে যে তোমার জায়গায় নিজের জীবন বাজি রেখে জামিনদার হবে?"
বৃদ্ধ অপরিচিত ছিলেন, দরবারের কেউ তাকে চিনতো না। ফলে পুরো দরবার নীরব হয়ে গেল।
৩. হযরত আবু জর আল-গিফারী (রা.)-এর জিম্মাদারি দরবারের নীরবতা ভেঙে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর প্রিয় সাহাবি হযরত আবু জর গিফারী (রা.) উঠে দাঁড়ালেন এবং বললেন, "হে আমীরুল মুমিনীন! আমি এই বৃদ্ধের জামিনদার হচ্ছি।" ওমর (রা.) বিস্মিত হয়ে বললেন, "আবু জর! তুমি কি তাকে চেনো? সে যদি তিন দিনের মধ্যে না ফেরে, তবে কিন্তু তোমার ওপর কেসাস জারি হবে!" আবু জর (রা.) দৃঢ়তার সাথে বললেন, "আমি তাকে চিনি না, তবে একজন মুসলিম ভাই বিপদে পড়ে আকুতি জানাচ্ছে, আমি তা উপেক্ষা করতে পারি না। আমি মহান আল্লাহর ওপর ভরসা করে জামিন হলাম।"
বৃদ্ধকে ৩ দিনের সময় দিয়ে মুক্ত করে দেওয়া হলো।
৪. তৃতীয় দিনের উৎকণ্ঠা ও ফেরত আসা তিন দিন কেটে গেল। নির্ধারিত দিনের সূর্য ডোবার মুহূর্ত ঘনিয়ে আসছে, কিন্তু বৃদ্ধের কোনো দেখা নেই। দরবারের সবার মধ্যে প্রচণ্ড উৎকণ্ঠা—তবে কি আজ রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর মহান সাহাবি হযরত আবু জর (রা.)-এর মৃত্যুদণ্ড হতে চলেছে? যুবকরাও বিচার কার্যকর করার জন্য প্রস্তুত।
ঠিক এমন সময়, সবাই দেখলো দূর থেকে ধূলোবালি উড়িয়ে হাঁপাতে হাঁপাতে সেই বৃদ্ধ ছুটে আসছেন! দরবারে পৌঁছে ক্লান্ত-শ্রান্ত বৃদ্ধ পড়ে গেলেন এবং বললেন, "আমি আমার ভাইয়ের আমানত সঠিক জায়গায় পৌঁছে দিয়েছি। এবার আমাকে শাস্তি দিন।"
সবাই তাজ্জব হয়ে গেল! ওমর (রা.) জিজ্ঞেস করলেন, "তুমি তো মুক্ত ছিলে, পালিয়ে যেতে পারতে! ফিরে এলে কেন?" বৃদ্ধ জবাব দিলেন, "আমি চাইনি মানুষ বলুক, 'পৃথিবী থেকে ওয়াদা রক্ষার সংস্কৃতি উঠে গেছে'।"
৫. ক্ষমা ও মহানুভবতা বৃদ্ধের এই সততা ও ওয়াদাপালন দেখে দরবারের সবাই কেঁদে ফেললেন।
অভিযোগকারী দুই যুবক তা দেখে অভিভূত হয়ে পড়ে। তারা সামনে এগিয়ে এসে বলল, "হে আমীরুল মুমিনীন! আমরা এই বৃদ্ধকে ক্ষমা করে দিলাম। আমরা কেসাস চাই না।"
ওমর (রা.) যুবকদের জিজ্ঞেস করলেন, "তোমরা কেন ক্ষমা করলে?" যুবকরা উত্তর দিল, "আমরা চাই না মানুষ বলুক, 'পৃথিবী থেকে ক্ষমা ও মহানুভবতা উঠে গেছে'।"
হযরত আবু জর (রা.)-কে জিজ্ঞেস করা হলো, "আপনি না চিনে কেন অপরিচিত বৃদ্ধের জামিন হয়েছিলেন?" তিনি বললেন, "আমি চাইনি মানুষ বলুক, 'পৃথিবী থেকে মানবিকতা ও পারস্পরিক সহযোগিতা উঠে গেছে'।"
এভাবে ন্যায়বিচার, আমানতদারি, ওয়াদাপালন এবং মহৎ ক্ষমার এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপিত হয়েছিল সেই দিন।
· মাওলানা মুহাম্মদ ইউসুফ কান্ধলভী (রহ.) রচিত ‘হায়াতুস সাহাবা’ (রা.) কিতাবে এই ঘটনাটির কোনো ভিত্তি বা মূল অস্তিত্ব পাওয়া যায় না।
ইসলামী গবেষক ও মুহাদ্দিসগণের মতে, হযরত ওমর (রা.), হযরত আবু জর গিফারী (রা.) এবং দুই যুবকের ক্ষমা সংক্রান্ত এই বহুল প্রচলিত ঘটনাটি কোনো নির্ভরযোগ্য হাদিস বা বিশুদ্ধ ইতিহাস গ্রন্থে নেই। এটি মূলত লোকমুখে প্রচলিত একটি কেচ্ছা বা ভিত্তিহীন গল্প।
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম বা বিভিন্ন আলোচনায় অনেক সময় ভুলবশত এটিকে ‘হায়াতুস সাহাবা’ বইয়ের রেফারেন্স দিয়ে প্রচার করা হলেও, মূল কিতাবে (বাংলা বা আরবি কোনো সংস্করণেই) এই ঘটনাটি সংকলিত হয়নি।
১৫
২৫ মন্তব্য