প্রভাষক
২৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ০১:০৩ অপরাহ্ণ
TC বিড়ম্বনা, প্রতিষ্ঠান হোক শিক্ষার্থীর গর্ব
TC বিড়ম্বনা, প্রতিষ্ঠান হোক শিক্ষার্থীর গর্ব
লেখক:
মাওলানা সাইফুল ইসলাম
প্রভাষক, গজারিয়া, মুন্সিগঞ্জ।
একজন শিক্ষার্থীর শিক্ষাজীবনে তার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একটি প্রতিষ্ঠান শুধু পাঠ্যবইয়ের জ্ঞান দেয় না; বরং শিক্ষার্থীর চিন্তা, মূল্যবোধ, আচরণ, নৈতিকতা ও ভবিষ্যৎ গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। তাই শিক্ষার্থী ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মধ্যে একটি সুন্দর, শ্রদ্ধাপূর্ণ ও ইতিবাচক সম্পর্ক থাকা প্রয়োজন।
বিশেষ করে এসএসসি বা দাখিল পাস করার পর কোনো শিক্ষার্থী যদি আরও ভালো সুযোগ, উন্নত শিক্ষার পরিবেশ বা নির্দিষ্ট কোনো বিষয়ের জন্য অন্য প্রতিষ্ঠানে পড়তে চায়, তাহলে তাকে সেই সুযোগ দেওয়া উচিত। কোনো শিক্ষার্থীকে শুধু টিসি না দেওয়া বা বিভিন্নভাবে বাধা সৃষ্টি করে একটি প্রতিষ্ঠানে আটকে রাখা শিক্ষাবান্ধব দৃষ্টিভঙ্গির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
তবে শিক্ষার্থীকে অন্যত্র যাওয়ার আগে তার সিদ্ধান্তের ভালো-মন্দ দিকগুলো বুঝিয়ে বলা যেতে পারে। প্রতিষ্ঠানের সুযোগ-সুবিধা, শিক্ষার পরিবেশ, শিক্ষক-শিক্ষার্থীর সম্পর্ক এবং ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা সম্পর্কে তাকে অবহিত করা যেতে পারে। শিক্ষার্থী যদি যুক্তিসংগত কারণে থেকে যায়, সেটিই হবে প্রতিষ্ঠানের জন্য ইতিবাচক অর্জন।
একটি প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থী ধরে রাখার সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো শিক্ষার মান ও পরিবেশের উন্নয়ন। প্রতিষ্ঠান এমন একটি মান তৈরি করবে, যেখানে নিজের প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা এখানে পড়তে আগ্রহী থাকবে এবং পার্শ্ববর্তী প্রতিষ্ঠানগুলোর শিক্ষার্থীরাও এখানে ভর্তি হওয়ার জন্য আগ্রহ প্রকাশ করবে। তখন শিক্ষার্থীকে ধরে রাখার জন্য চাপ প্রয়োগের প্রয়োজন হবে না; প্রতিষ্ঠানের মানই শিক্ষার্থীকে ধরে রাখবে।
একই সঙ্গে কোনো শিক্ষার্থী প্রতিষ্ঠান পরিবর্তন করে চলে গেলেও তার সঙ্গে খারাপ বা রূঢ় আচরণ করা উচিত নয়। একজন শিক্ষার্থী একটি প্রতিষ্ঠানে কয়েক বছর কাটায়। এ সময়ের শিক্ষক, সহপাঠী ও প্রতিষ্ঠানের স্মৃতি তার মনে দীর্ঘদিন থেকে যায়। কোনো একটি খারাপ আচরণ তার মনে প্রতিষ্ঠানের প্রতি থাকা সম্মান ও ভালোবাসাকে নষ্ট করে দিতে পারে। এমনকি সংশ্লিষ্ট শিক্ষকদের প্রতিও তার মধ্যে নেতিবাচক ধারণা তৈরি হতে পারে।
মানুষ সারাজীবন একই প্রতিষ্ঠানে পড়বে—এমনটি স্বাভাবিক নয়। জীবনের বিভিন্ন পর্যায়ে প্রয়োজন ও পরিস্থিতি অনুযায়ী প্রতিষ্ঠান পরিবর্তন করতেই হতে পারে। তাই একজন শিক্ষার্থী চলে গেলেও তার সঙ্গে সম্পর্কটা সুন্দর রাখা উচিত। বরং এমন পরিবেশ তৈরি করা উচিত, যাতে সে অন্য প্রতিষ্ঠানে পড়াশোনা করলেও তার পুরোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও শিক্ষকদের প্রতি আজীবন শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতা অনুভব করে।
তবে শিক্ষার্থীদেরও দায়িত্বশীল হতে হবে। একান্ত প্রয়োজন ছাড়া বারবার প্রতিষ্ঠান পরিবর্তন করা উচিত নয়। নতুন প্রতিষ্ঠানে নতুন পরিবেশ, নতুন শিক্ষক, নতুন সহপাঠী ও নতুন নিয়মকানুনের সঙ্গে মানিয়ে নিতে সময় লাগে। অনেক সময় প্রত্যাশার সঙ্গে বাস্তবতার মিল নাও থাকতে পারে। নতুন পরিবেশে মানিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে নানা ধরনের মানসিক, সামাজিক ও শিক্ষাগত সমস্যারও সৃষ্টি হতে পারে। একটি প্রতিষ্ঠানে দীর্ঘদিনের পরিচিত পরিবেশ, শিক্ষক ও সহপাঠীদের সঙ্গে যে সম্পর্ক তৈরি হয়, প্রতিষ্ঠান পরিবর্তনের ফলে তা অনেকটাই হারিয়ে যেতে পারে।
তাই প্রতিষ্ঠান পরিবর্তনের আগে শিক্ষার্থীর উচিত নিজের প্রয়োজন, ভবিষ্যৎ লক্ষ্য, শিক্ষার মান, পরিবেশ ও সুযোগ-সুবিধা সম্পর্কে ভালোভাবে চিন্তা করা। শুধু বন্ধু, সাময়িক কোনো অসুবিধা কিংবা অন্যের কথায় প্রভাবিত হয়ে প্রতিষ্ঠান পরিবর্তন করা সমীচীন নয়। আবার যেখানে শিক্ষার্থীর প্রকৃত প্রয়োজন পূরণ হচ্ছে না বা ভালো শিক্ষার জন্য পরিবর্তন করা জরুরি, সেখানে যথাযথ বিবেচনার মাধ্যমে প্রতিষ্ঠান পরিবর্তনের সুযোগও থাকা উচিত।
সবশেষে বলা যায়, শিক্ষার্থীকে আটকে রেখে নয়, শিক্ষার মান ও ভালোবাসার মাধ্যমে ধরে রাখতে হবে। আর শিক্ষার্থীকেও প্রয়োজন ছাড়া প্রতিষ্ঠান পরিবর্তন না করে নিজের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে আপন করে নিয়ে সেখানে সর্বোচ্চ উপকার নেওয়ার চেষ্টা করতে হবে।
একটি আদর্শ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এমন হওয়া উচিত, যেখানে শিক্ষার্থীরা শুধু শিক্ষা গ্রহণ করবে না; বরং প্রতিষ্ঠানটির প্রতি ভালোবাসা, শিক্ষক-শিক্ষিকাদের প্রতি শ্রদ্ধা এবং আজীবন কৃতজ্ঞতাবোধ নিয়ে বেরিয়ে যাবে। শিক্ষার্থী যেখানে থাকুক, তার মনে যেন একটি কথা থেকে যায়—“এই প্রতিষ্ঠান আমার গর্ব, এই প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকরা আমার পথপ্রদর্শক।”
৪
৪ মন্তব্য