প্রধান শিক্ষক
২৬ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ০৯:১৩ পূর্বাহ্ণ
হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী: গণতন্ত্রের মানসপুত্র
হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী: গণতন্ত্রের মানসপুত্র
গণতন্ত্রের মানসপুত্র হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী ছিলেন একাধারে প্রখ্যাত ব্যারিস্টার, দক্ষ বক্তা, রাজনীতিবিদ ও খ্যাতনামা পার্লামেন্টারিয়ান।
তিনি জন্মেছিলেন অসাধারণ প্রতিভাবানদের সমাবেশে উজ্জ্বল এক অভিজাত মুসলিম পরিবারে সোনার চামচ মুখে করে। বিলেত থেকে ব্যারিস্টারি পাস করে এসে পেশাগত দক্ষতা প্রমাণের পাশাপাশি জড়িয়ে পড়েন রাজনীতিতে এবং পরিণত হন বিভাগপূর্ব বাংলার অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বে। অবিভক্ত বাংলার মুখ্যমন্ত্রী, পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী এমনি নানা রাজনৈতিক শীর্ষপদে যেমন অধিষ্ঠিত হয়েছিলেন তিনি, তেমনি পাকিস্তানি কারাগারের ভেতরে নিপীড়ন সইতে হয়েছিল তাঁকে। তাঁর অনেক রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত বিতর্কের ঊর্ধ্বে নয়, তেমনি তাঁর ব্যক্তিজীবন নিয়েও প্রচলিত নানা গল্পকথা। দুহাতে যেমন উপার্জন করেছেন, ব্যয়ে করেছেন দুহাতে। অভিজাত জীবনরীতিতে যেমন অভ্যস্ত, তেমনি স্বচ্ছন্দ ছিলেন সাধারণ জনজীবনের ধারাতেও। পাকিস্তানের ন্যূনতম মৌলিক মানবাধিকার-বিরোধী রাজনীতির পট-পরিসরে মৃত্যুর আগে পর্যন্ত গণতন্ত্রের জন্য তাঁর নিবেদিতপ্রাণ প্রয়াস দেশবাসীর চিত্তে চির জাগরুক থাকবে । সোহরাওয়ার্দীর জন্ম ৮ সেপ্টেম্বর ১৮৯২ খ্রিষ্টাব্দে বর্তমান পশ্চিমবঙ্গের মেদিনীপুরে। তিনি ছিলেন বিচারপতি স্যার জাহিদ সোহরাওয়ার্দীর কনিষ্ঠ সন্তান। জাহিদ সোহরাওয়ার্দী কলকাতা হাইকোর্টের একজন খ্যাতনামা বিচারক ছিলেন। মা ছিলেন নামকরা উর্দু সাহিত্যিক খুজাস্তা আখতার বানু, স্যার হাসান সোহরাওয়ার্দী ছিলেন তার মাতুল। তার পরিবারের সদস্যবর্গ তৎকালীন ভারতবর্ষের সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারের প্রথা অনুসারে উর্দু ভাষা ব্যবহার করতেন। কিন্তু সোহরাওয়ার্দী নিজ উদ্যোগে বাংলা ভাষা শিখেন এবং বাংলার চর্চা করেন। কলকাতা আলিয়া মাদরাসায় শিক্ষাজীবন শুরু করার পর যোগ দেন সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজে। ১৯৬৩ খ্রিষ্টাব্দের ৫ ডিসেম্বর লেবাননের বৈরুতে মারা যান হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী। ১৯৪৭-পূর্ব যেসব ঘটনাপ্রবাহের ভিত্তিতে দুটি পৃথক রাষ্ট্রের জন্ম হয়েছিল, সেখানে গুরুত্বপূর্ণ একটি ভূমিকায় ছিলেন হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী। ১৯৪৭ খ্রিষ্টাব্দে ভারতবর্ষ ভাগ হয়ে ভারত ও পাকিস্তান নামে যে দুটি রাষ্ট্রের জন্ম হয়েছে তার পেছনে শুধু জওহরলাল নেহেরু এবং মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর মতো রাজনীতিবিদের নাম সবসময় আলোচনায় থাকলেও যে নামটি খুব একটা আলোচনায় থাকে না তিনি হচ্ছেন হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী।১৯৪৭ খ্রিষ্টাব্দের ২৭ এপ্রিল, হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী তখন বাংলার প্রধানমন্ত্রী। দিল্লীতে এক সংবাদ সম্মেলনে আচমকা একটি প্রস্তাব তুলে ধরলেন। ব্রিটিশরা তখন ভারতবর্ষ বিভক্ত করে ভারত ও পাকিস্তান নামে দুটি আলাদা রাষ্ট্রের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তরের প্রস্তুতি নিচ্ছে। লর্ড মাউন্টব্যাটেন ভাইসরয় হিসাবে ভারতে এসে উপমহাদেশ ভাগ করার পরিকল্পনা পেশ করেন। মি. সোহরাওয়ার্দীর প্রস্তাবটি ছিল, অবিভক্ত এবং স্বাধীন বাংলার ধারণা। ভারতবর্ষ ভাগ হয়ে যখন ভারত ও পাকিস্তান নামে দুটি আলাদা রাষ্ট্রের জন্ম হতে যাচ্ছে তখন তিনি অবিভক্ত বাংলাকে নিয়ে আলাদা একটি রাষ্ট্রের ধারণা তুলে ধরেন। সোহরাওয়ার্দির সেই প্রস্তাব যদি বাস্তবায়ন হতো তাহলে ভারতবর্ষ ভাগ হয়ে তিনটি রাষ্ট্রের জন্ম হতো। বাংলা, আসাম এবং বিহার অঞ্চলের কয়েকটি জেলা নিয়ে বৃহৎ বাংলা নামে একটি স্বাধীন রাষ্ট্র গঠনের আকাঙ্ক্ষা ছিল হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর। ভারত-ভাগের নাটকীয় ঘটনাবলী, শেখ মুজিবের বয়ানে--সোহরাওয়ার্দীর নানা চেষ্টা মুসলিম লীগের অন্য নেতাদের চেয়ে হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দির চিন্তা ভাবনা ছিল ভিন্ন ধরনের। সোহরাওয়ার্দী প্রথমে একটি কোয়ালিশন মন্ত্রিসভার কথা বলেছিলেন। কারণ তিনি ভাবছিলেন, একটি কোয়ালিশন মন্ত্রিসভা হলে অবিভক্ত বাংলায় মুসলিমদের আধিপত্য থাকবে। কিন্তু হিন্দু মহাসভা এর তীব্র বিরোধিতা করে। ফলে সোহরাওয়ার্দির সামনে একমাত্র বিকল্প ছিল কেন্দ্র থেকে আলাদা হয়ে অবিভক্ত স্বাধীন বাংলা গঠন করা। তার এই অখণ্ড স্বাধীন বাংলার ধারণাকে মুসলিম লীগ এবং কংগ্রেসের কয়েকজন নেতা প্রথম দিকে সমর্থন দিয়েছিলেন।কংগ্রেসের মূল নেতৃত্ব এই চিন্তাকে কখনোই আমলে নেননি। আমেরিকার কলম্বিয়া ইউনিভার্সিটির ইতিহাসবিদ আয়েশা জালাল লিখেছেন, "জিন্নাহর কৌশল অনুযায়ী অবিভক্ত বাংলার বিষটি ছিল গুরুত্বপূর্ণ।
লর্ড মাউন্টব্যাটেনকে জিন্নাহ বলেন, বাংলা যদি অবিভক্ত থেকে আলাদা রাষ্ট্র হয় তাতে তিনি আনন্দিত হবেন। লর্ড মাউন্টব্যাটেনকে জিন্নাহ বলেছিলেন, কলকাতা ছাড়া বাংলা কোন কাজে আসবে না। এর চেয়ে ভালো তারা অবিভক্ত এবং স্বাধীন থাকুক। আমি নিশ্চিত যে তাদের সাথে আমাদের ভালো সম্পর্ক থাকবে " । জিন্নাহর মনোভাব বুঝতে পেরে সোহরাওয়ার্দী মনে করলেন বাংলাকে বিভক্তির হাত থেকে রক্ষা করার এটাই মোক্ষম সুযোগ। ভাইসরয় লর্ড মাউন্টব্যাটেনকে মি. সোহরাওয়ার্দী বলেন, ১৯৪৭ খ্রিষ্টাব্দের নভেম্বর পর্যন্ত ভারতবর্ষ বিভক্ত করার বিষয়টি স্থগিত রাখতে।১৯৪৭ এর ২৩ মে ভারত বিভক্তির পরিকল্পনা নিয়ে নিয়ে বৈঠকে বসেন মাউন্টাব্যাটেন। সে বৈঠকে জওহরলাল নেহেরু বলেন, অবিভক্ত বাংলার প্রস্তাব তিনি মেনে নেবেন যদি তারা ভারত ইউনিয়নের মধ্যে থাকে। ৩১ মে মাউন্টব্যাটেনের সাথে দেখা করেন সোহরাওয়ার্দী। তিনি মাউন্টব্যাটেনকে জানান, অবিভক্ত বাংলা স্বাধীন করার বিষয়ে ভোটাভুটি করতে কংগ্রেস রাজি হবে না। এছাড়া বাংলার মুসলিম লীগ নেতারাও সোহরাওয়ার্দীর প্রস্তাব মেনে নিতে পারছেন না। এমন অবস্থায় দেশ বিভাগের সময় সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা এড়াতে একটি মাত্র উপায় খোলা আছে। সেজন্য কলকাতাকে 'ফ্রি সিটি' বা 'মুক্ত শহর' হিসেবে ঘোষণা করার প্রস্তাব দেন সোহরাওয়ার্দী। ভারত বিভক্ত হয়ে পাকিস্তান এবং ভারত নামে আলাদা দুটি রাষ্ট্রের চূড়ান্ত ঘোষণার সময় লর্ড মাউন্টম্যাটেনের পাশে জওহরলাল নেহেরু এবং মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ। কলকাতাকে ছয়মাসের জন্য 'ফ্রি সিটি' ঘোষণা করার একটি প্রস্তাব লর্ড মাউন্টব্যাটেন পাঠিয়েছিলেন কংগ্রেস নেতা সর্দার প্যাটেলের কাছে। সর্দার প্যাটেল সাফ জানিয়ে দেন যে ছয় মাস তো দূরের কথা, ছয় ঘণ্টার জন্যও এটা সম্ভব নয়। অখণ্ড স্বাধীন বাংলা প্রতিষ্ঠার জন্য গণভোটের প্রস্তাবও করেছিলেন মি. সোহরাওয়ার্দী। শেখ মুজিবুর রহমান লিখেছেন, বাংলাদেশ একটা স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র হবে। জনসাধারণের ভোটে একটা গণপরিষদ হবে। সেই গণপরিষদ ঠিক করবে বাংলাদেশ হিন্দুস্তান না পাকিস্তানে যোগদান করবে, নাকি স্বাধীন থাকবে। কিন্তু কংগ্রেস নেতারা এ প্রস্তাব সরাসরি খারিজ করে দেন। অবিভক্ত ও স্বাধীন বাংলার আশা তখন ক্ষীণ হয়ে আসে। কারণ কংগ্রেস এবং মুসলিম লীগ একমত না হলে স্বাধীন বাংলা নিয়ে নতুন কোন প্রস্তাব আলোচনা করতে চায়নি লর্ড মাউন্টব্যাটেন। লর্ড মাউন্টব্যাটেন কংগ্রেস এবং মুসলিম লীগ নেতাদের জানিয়ে দেন যে দ্রুত ব্রিটিশ পার্লামেন্টে ইন্ডিয়া বিল পাস হবে এবং দুটো আলাদা রাষ্ট্রের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করা হবে। ১৯৪৭ এর ১৫ আগস্ট ক্ষমতা হস্তান্তরের চূড়ান্ত দিন ধার্য করে ব্রিটিশরা। পাকিস্তান এর একদিন আগে অর্থাৎ ১৪ আগস্ট স্বাধীনতা পায় এবং ক্ষমতা বুঝে নেয়। ভারত ও পাকিস্তান রাষ্ট্রের সৃষ্টি হলেও মি. সোহরাওয়ার্দী তাৎক্ষণিকভাবে পূর্ব পাকিস্তানে আসেন নি। তিনি কোলকাতায় অবস্থান করতে থাকেন। ১৯৪৮ খ্রিষ্টাব্দে মি. সোহরাওয়ার্দী পূর্ব পাকিস্তানে এলে তার অভিজ্ঞতা সুখকর হয়নি। পূর্ব পাকিস্তানে খাজা নাজিম উদ্দিনের নেতৃত্বে মুসলিম লীগ সরকার তাকে আবারো ভারতে পাঠিয়ে দেয়। শুধু একজন রাজনৈতিক নেতাই নন, তিনি ছিলেন একজন দূরদর্শী রাষ্ট্রনায়কও। তাঁর প্রচেষ্টায় ১৯৫৬ খ্রিষ্টাব্দে পাকিস্তানের প্রথম সংবিধান প্রণীত হয়। ১৯৫২ এর ভাষা আন্দোলনের পর বাঙালির যে জাতীয়তাবাদী চেতনার উন্মেষ ঘটেছিল, তার নেতৃত্ব দিয়েছিলেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী। তাঁর রাজনৈতিক দূরদর্শিতার ফল ১৯৫৪ এর যুক্তফ্রন্টের অবিস্মরণীয় বিজয়। গণতান্ত্রিক রীতি ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকায় সুধীসমাজ তাঁকে ‘গণতন্ত্রের মানসপুত্র’ বলে আখ্যায়িত করে।
৪
৪ মন্তব্য