Loading..

ব্লগ

রিসেট

২৬ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ০৮:০৫ অপরাহ্ণ

প্রবন্ধ: শিখন-শেখানো কার্যক্রমে শিক্ষকের বিশ্বাস ও মূল্যবোধ: একবিংশ শতাব্দীর প্রেক্ষাপটে একটি তাত্ত্বিক ও ব্যক্তিগত পর্যালোচনা কলমে: মোস্তাফিজুর রহমান কবি ও শিক্ষক

প্রবন্ধ: শিখন-শেখানো কার্যক্রমে শিক্ষকের বিশ্বাস ও মূল্যবোধ: একবিংশ শতাব্দীর প্রেক্ষাপটে একটি তাত্ত্বিক ও ব্যক্তিগত পর্যালোচনা

কলমে: মোস্তাফিজুর রহমান 

কবি ও শিক্ষক 


​ভূমিকা

গ্রিক দার্শনিক প্লুটার্ক বলেছিলেন, “মন কোনো শূন্য পাত্র নয় যে এটিকে কেবল জ্ঞানে পূর্ণ করতে হবে, বরং এটি এমন একটি প্রদীপ যাকে প্রজ্বলিত করতে হয়।” এই প্রদীপ প্রজ্বলনের মহান কারিগর হলেন শিক্ষক। একটি কার্যকর শিখন-শেখানো পরিবেশ কেবল চক, ডাস্টার বা মাল্টিমিডিয়া প্রজেক্টরের ওপর নির্ভর করে না; বরং তা বহুলাংশে নির্ভর করে শিক্ষকের ব্যক্তিগত বিশ্বাস (Beliefs) ও মূল্যবোধের (Values) ওপর। শিক্ষকতা কেবল একটি পেশা নয়, এটি একটি ব্রত। এই ব্রত পালনে শিক্ষকের অন্তর্নিহিত বিশ্বাস ও নৈতিক মূল্যবোধ শ্রেণিকক্ষের পরিবেশকে কীভাবে প্রভাবিত করে, তা বর্তমান শিক্ষাক্রম ও একুশ শতকের প্রেক্ষাপটে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।

​শিখন-শেখানো বিশ্বাস ও মূল্যবোধের তাৎপর্য ও শ্রেণিকক্ষে এর প্রভাব

শিক্ষকের বিশ্বাস ও মূল্যবোধ হলো সেই অদৃশ্য চালিকাশক্তি, যা তাঁর প্রতিটি কথা, কাজ ও সিদ্ধান্তকে পরিচালিত করে। এর বহুমুখী প্রভাব নিচে তুলে ধরা হলো:

  • ​শিখন পদ্ধতির গুণগত রূপান্তর: শিক্ষক যদি বিশ্বাস করেন যে শিখন একটি গঠনমূলক বা 'Constructivist' প্রক্রিয়া, তবে তিনি শ্রেণিকক্ষে একনায়কতন্ত্রের বদলে গণতান্ত্রিক পরিবেশ তৈরি করবেন। সেখানে শিক্ষার্থীরা নিষ্ক্রিয় শ্রোতা না হয়ে সক্রিয় অংশগ্রহণকারী হয়ে উঠবে।

  • ​'পিগম্যালিয়ন ইফেক্ট' ও শিক্ষার্থীর আত্মবিশ্বাস: শিক্ষাবিজ্ঞানের সুপরিচিত ‘পিগম্যালিয়ন ইফেক্ট’ অনুযায়ী, শিক্ষকের ইতিবাচক উচ্চ প্রত্যাশা শিক্ষার্থীর শিখন ফলনে জাদুকরী প্রভাব ফেলে। শিক্ষক যখন আন্তরিকভাবে বিশ্বাস করেন যে প্রতিটি শিক্ষার্থীর নিজস্ব সক্ষমতা রয়েছে, তখন পিছিয়ে পড়া শিক্ষার্থীটিও নিজের ওপর বিশ্বাস রাখতে শুরু করে এবং অসম্ভবকে সম্ভব করে তোলে।

  • ​অন্তর্ভুক্তিমূলক ও সমতাভিত্তিক পরিবেশ নিশ্চিতকরণ: সমতা, নিরপেক্ষতা ও সহমর্মিতার মূল্যবোধ ধারণকারী শিক্ষক শ্রেণিকক্ষে মেধা, ধর্ম, বর্ণ বা জেন্ডারভিত্তিক কোনো বৈষম্য হতে দেন না। এটি সকল শিক্ষার্থীর জন্য একটি নিরাপদ, আনন্দদায়ক ও একীভূত (Inclusive) শিখন পরিবেশ তৈরি করে।

  • ​'পরোক্ষ পাঠ্যক্রম' (Hidden Curriculum) হিসেবে কাজ করা: শিক্ষকের সততা, সময়ানুবর্তিতা ও পরমতসহিষ্ণুতা শিক্ষার্থীদের জন্য সবচেয়ে শক্তিশালী পাঠ্যক্রম। শিক্ষার্থীরা বইয়ের চেয়ে শিক্ষকের আচরণ বেশি অনুকরণ করে। শিক্ষকের সুদৃঢ় মূল্যবোধ শিক্ষার্থীদের মানবিক গুণাবলি বিকাশে অনুঘটক হিসেবে কাজ করে।

​ব্যক্তিগত বিশ্বাস ও মূল্যবোধের পর্যালোচনা: একজন 'ফ্যাসিলিটেটর' হিসেবে আমার অবস্থান

একুশ শতকের পরিবর্তনশীল বিশ্বে এবং বাংলাদেশের নতুন শিক্ষাক্রমের আলোকে একজন সচেতন শিক্ষক হিসেবে আমার ব্যক্তিগত বিশ্বাস হলো— "শিক্ষক এখন আর কেবল জ্ঞানের ভাণ্ডার বা দাতা নন, তিনি একজন সুনিপুণ সহায়ক বা Facilitator।" আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, প্রতিটি শিশুর বুদ্ধিমত্তার ধরন আলাদা (Multiple Intelligences)। তাই আমার প্রধান দায়িত্ব হলো তাদের নিজস্ব গতিতে, আনন্দের সঙ্গে অভিজ্ঞতাভিত্তিক শিখনের (Experiential Learning) সুযোগ তৈরি করে দেওয়া।

​আমার পেশাগত মূল্যবোধের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে তিনটি স্তম্ভ: সহমর্মিতা (Empathy), পেশাগত সততা (Professional Integrity) এবং জবাবদিহি (Accountability)। আমি মনে করি, শ্রেণিকক্ষে শিক্ষার্থীর ভুলগুলো কোনো অপরাধ নয়, বরং তা শেখার একটি স্বাভাবিক ও আবশ্যকীয় ধাপ। এই 'গ্রোথ মাইন্ডসেট' (Growth Mindset) ধারণ করে আমি তাদের ভুলগুলোকে সংশোধনের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করি। শিক্ষার্থীদের কেবল পরীক্ষার খাতায় ভালো নম্বর পাওয়ার জন্য নয়, বরং তাদের মধ্যে সৃজনশীলতা, সমালোচনামূলক চিন্তন (Critical Thinking), এবং পারস্পরিক সহযোগিতামূলক মনোভাব গড়ে তোলাকে আমি আমার শিক্ষকতা জীবনের পরম ব্রত বলে মনে করি।

​উপসংহার

পরিশেষে বলা যায়, শিক্ষকের ইতিবাচক বিশ্বাস ও সুদৃঢ় মূল্যবোধ একটি সাধারণ শ্রেণিকক্ষকে প্রাণবন্ত, সৃজনশীল ও মানবিক পরীক্ষাগারে পরিণত করতে পারে। এটি শুধু শিখন-শেখানো প্রক্রিয়াকেই কার্যকর করে না, বরং শিক্ষার্থীদের বিশ্বস্ত ও মানবিক সুনাগরিক হিসেবে গড়ে তুলে একটি সমৃদ্ধ ভবিষ্যৎ বিনির্মাণের পথপ্রদর্শক হিসেবে কাজ করে। আসুন, শিক্ষক হিসেবে আমরা আমাদের বিশ্বাস ও মূল্যবোধের আলোয় শিক্ষার্থীদের হৃদয়কে আলোকিত করি।

​গ্রন্থপঞ্জি

১. ব্রুনার, জে. এস. (১৯৯৬)। দ্য কালচার অফ এডুকেশন। ক্যামব্রিজ: হার্ভার্ড ইউনিভার্সিটি প্রেস।

২. ডিউয়ি, জন। (১৯৩৮)। এক্সপেরিয়েন্স অ্যান্ড এডুকেশন। নিউইয়র্ক: ম্যাকমিলান পাবলিশিং।

৩. জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (NCTB)। (২০২৩)। জাতীয় শিক্ষাক্রম রূপরেখা ২০২১: শিক্ষক নির্দেশিকা। ঢাকা: এনসিটিবি।

৪. সেন, এ. কে. ও ইসলাম, এম. (২০১৮)। শিক্ষা মনোবিজ্ঞান ও ফলপ্রসূ শিখন প্রক্রিয়া। ঢাকা: আগামী প্রকাশনী।

৫. ব্যানডুরা, এ. (১৯৯৭)। সেলফ-এফিকেসি: দ্য এক্সারসাইজ অফ কন্ট্রোল। নিউইয়র্ক: ডব্লিউ এইচ ফ্রিম্যান।


মন্তব্য করুন