Loading..

ব্লগ

রিসেট

২৬ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ০৮:১১ অপরাহ্ণ

প্রবন্ধ:মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষকদের চাকুরি পূর্ব ও চাকরিকালীন প্রশিক্ষণ এবং ধারাবাহিক পেশাগত উন্নয়ন

মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষকদের চাকুরি পূর্ব ও চাকরিকালীন প্রশিক্ষণ এবং ধারাবাহিক পেশাগত উন্নয়ন

কলমে: মোস্তাফিজুর রহমান 

কবি ও শিক্ষক 

​শিক্ষাই জাতির মেরুদণ্ড এবং শিক্ষক হলেন সেই মেরুদণ্ডের রূপকার। মাধ্যমিক স্তর হলো শিক্ষার্থীদের উচ্চশিক্ষার এবং ভবিষ্যৎ জীবনের মজবুত ভিত গড়ার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়। একুশ শতকের পরিবর্তনশীল বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় এবং রূপকল্প ২০৪১ বাস্তবায়নে শিক্ষার্থীদের যোগ্য ও দক্ষ নাগরিক হিসেবে গড়ে তুলতে শিক্ষকদের পেশাগত দক্ষতার কোনো বিকল্প নেই। পরিবর্তনশীল শিক্ষাক্রম ও আধুনিক প্রযুক্তির সাথে তাল মেলাতে একজন আদর্শ শিক্ষককে আজীবন শিক্ষার্থী হতে হয়। এই দক্ষতা অর্জন ও বজায় রাখার মূল ভিত্তি হলো চাকুরি পূর্ব প্রশিক্ষণ, চাকরিকালীন প্রশিক্ষণ এবং ধারাবাহিক পেশাগত উন্নয়ন।

​চাকুরি পূর্ব প্রশিক্ষণ (Pre-service Training)

শিক্ষকতাকে পেশা হিসেবে গ্রহণ করার পূর্বে একজন হবু শিক্ষক যে তাত্ত্বিক, ব্যবহারিক ও মনস্তাত্ত্বিক জ্ঞান অর্জন করেন, তাকে চাকুরি পূর্ব প্রশিক্ষণ বলা হয়।

  • ​পেশাগত ভিত্তি নির্মাণ: ব্যাচেলর অব এডুকেশন (B.Ed) বা মাস্টার অব এডুকেশন (M.Ed) ডিগ্রির মাধ্যমে শিক্ষকরা শিক্ষাবিজ্ঞান, শিশু ও কিশোর মনস্তত্ত্ব, শিক্ষাক্রমের লক্ষ্য এবং আধুনিক শিখন-শেখানো কৌশল সম্পর্কে গভীর জ্ঞান লাভ করেন।

  • ​বাস্তবমুখী প্রস্তুতি: অনুশীলনমূলক পাঠদান (Practice Teaching) বা সিমুলেশনের মাধ্যমে তারা শ্রেণিকক্ষ ব্যবস্থাপনা এবং শিক্ষার্থীদের সাথে কার্যকর যোগাযোগের বাস্তব অভিজ্ঞতা অর্জন করেন, যা তাদের কর্মজীবনের শুরুতে আত্মবিশ্বাসী করে তোলে।

​চাকরিকালীন প্রশিক্ষণ (In-service Training)

সময়ের সাথে সাথে শিক্ষাক্রম, প্রযুক্তি এবং শিখন-মূল্যায়ন পদ্ধতিতে ব্যাপক পরিবর্তন আসে। এই নিয়ত পরিবর্তনের সাথে শিক্ষকদের জ্ঞান ও দক্ষতাকে হালনাগাদ রাখতেই চাকরিকালীন প্রশিক্ষণ অত্যন্ত জরুরি।

  • ​বিষয়ভিত্তিক ও শিক্ষাক্রম বিস্তরণ: নতুন শিক্ষাক্রমের রূপরেখা, শিখনকালীন মূল্যায়ন পদ্ধতি এবং বিষয়ভিত্তিক গভীর জ্ঞান অর্জনের ওপর প্রশিক্ষণ শিক্ষকদের শ্রেণিকক্ষে আরও কার্যকর ভূমিকা রাখতে সাহায্য করে।

  • ​প্রযুক্তিগত উৎকর্ষ: বর্তমান ডিজিটাল যুগে আইসিটি (ICT) প্রশিক্ষণ অপরিহার্য। এর মাধ্যমে শিক্ষকরা মাল্টিমিডিয়া ক্লাস পরিচালনা, ডিজিটাল কন্টেন্ট তৈরি এবং অনলাইন প্ল্যাটফর্মের যথাযথ ব্যবহার আয়ত্ত করেন।

​ধারাবাহিক পেশাগত উন্নয়ন (Continuous Professional Development - CPD)

শুধুমাত্র আনুষ্ঠানিক প্রশিক্ষণ গ্রহণ করলেই শিক্ষকের পেশাগত উন্নয়ন শেষ হয়ে যায় না; বরং এটি একটি নিরবচ্ছিন্ন ও স্ব-প্রণোদিত প্রক্রিয়া।

  • ​সহকর্মী শিখন ও পাঠ সমীক্ষা: 'লেসন স্টাডি' (Lesson Study) বা সহকর্মীদের ক্লাস পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে নিজেদের পাঠদান পদ্ধতির দুর্বলতা ও সবলতা চিহ্নিত করে পারস্পরিক শিখন নিশ্চিত করা যায়।

  • ​ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের ব্যবহার: 'শিক্ষক বাতায়ন'-এ নিজেদের তৈরি সেরা কন্টেন্ট শেয়ার করা, অন্যদের উদ্ভাবনী কন্টেন্ট থেকে ধারণা নেওয়া এবং 'মুক্তপাঠ' থেকে প্রাসঙ্গিক অনলাইন কোর্স সম্পন্ন করা ধারাবাহিক পেশাগত উন্নয়নের অন্যতম আধুনিক ও শক্তিশালী মাধ্যম।

  • ​আত্ম-প্রতিফলন ও গবেষণা: প্রতিদিনের পাঠদান শেষে আত্ম-মূল্যায়ন করা এবং শ্রেণিকক্ষের বাস্তব সমস্যা সমাধানে ক্ষুদ্র পরিসরে অ্যাকশন রিসার্চ (Action Research) পরিচালনা করা শিক্ষকদের পেশাগতভাবে চিন্তনশীল হতে উদ্বুদ্ধ করে।

​একজন শিক্ষক যখন স্বপ্রণোদিত হয়ে নিজেকে প্রতিনিয়ত সমৃদ্ধ করেন, কেবল তখনই তিনি শিক্ষার্থীদের মাঝে জ্ঞানের আলো ও সৃজনশীলতা সঠিকভাবে ছড়িয়ে দিতে পারেন। চাকুরি পূর্ব ও চাকরিকালীন প্রশিক্ষণ একজন শিক্ষকের পেশাগত দক্ষতা বৃদ্ধির আনুষ্ঠানিক সোপান মাত্র। আর ধারাবাহিক পেশাগত উন্নয়ন হলো সেই সোপান বেয়ে উৎকর্ষের শিখরে পৌঁছানোর এক অবিরাম আনন্দময় যাত্রা। আসুন, আমরা সকলে আধুনিক শিখন-শেখানো কৌশল আয়ত্ত করে আগামী প্রজন্মকে দক্ষ ও মানবিক মূল্যবোধ সম্পন্ন মানবসম্পদ হিসেবে গড়ে তুলি।

​গ্রন্থপুঞ্জি:

১. জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (NCTB)। (২০২১)। জাতীয় শিক্ষাক্রম রূপরেখা ২০২১। ঢাকা: এনসিটিবি।

২. বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়। (২০১৮)। শিখন-শেখানো দক্ষতা ও কৌশল (বি.এড মডিউল)। গাজীপুর: বাউবি প্রকাশনী।

৩. শিক্ষা মন্ত্রণালয়, গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার। (২০১০)। জাতীয় শিক্ষানীতি ২০১০। ঢাকা: শিক্ষা মন্ত্রণালয়।

৪. জাতীয় শিক্ষা ব্যবস্থাপনা একাডেমি (NAEM)। শিক্ষক প্রশিক্ষণ ম্যানুয়াল ও গাইডলাইন। ঢাকা: নায়েম।


মন্তব্য করুন

ব্লগ