সহকারী অধ্যাপক
২৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ০৩:২৯ পূর্বাহ্ণ
সার্বভৌম কর্তৃত্বের মহিমা ও জীবনের পরীক্ষার শিক্ষা -মোঃ মুজিবুর রহমান
সার্বভৌম কর্তৃত্বের মহিমা ও জীবনের পরীক্ষার শিক্ষা
(সূরা আল-মুলকের আলোকে ঈমান, আমল, সৃষ্টি-সৌন্দর্য, তাকওয়া, কৃতজ্ঞতা, রিযিক, তাওয়াক্কুল ও আখিরাতের চেতনা)
মোঃ মুজিবুর রহমান
সহকারী অধ্যাপক
মোজাদ্দেদীয়া ইসলামিয়া আলিম মাদ্রাসা, কালিয়াকৈর, গাজীপুর।
মানুষ পৃথিবীতে এসেছে উদ্দেশ্যহীনভাবে নয়। তার জীবন, মৃত্যু, শক্তি, সামর্থ্য, জ্ঞান, বিবেক, শ্রবণশক্তি, দৃষ্টিশক্তি—সবই মহান আল্লাহর দেওয়া আমানত। এই পৃথিবীও মানুষের চূড়ান্ত আবাস নয়; এটি পরীক্ষা ও দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্র। সূরা আল-মুলক মানুষের সামনে এই গভীর সত্যকে অত্যন্ত শক্তিশালী ও হৃদয়গ্রাহী ভাষায় তুলে ধরে।
সূরা আল-মুলক পবিত্র কুরআনের ৬৭তম সূরা। এটি মাক্কী সূরা এবং এর আয়াত সংখ্যা ৩০; ‘আল-মুলক’ অর্থ সার্বভৌম কর্তৃত্ব বা সর্বময় রাজত্ব। সূরার শুরুতেই ঘোষণা করা হয়েছে—সমস্ত কর্তৃত্ব মহান আল্লাহর হাতে এবং তিনি সবকিছুর ওপর ক্ষমতাবান। এরপর মানুষের জীবন ও মৃত্যুকে পরীক্ষার সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে।
এই সূরা মানুষকে শুধু ভয় দেখায় না; বরং চিন্তা করতে শেখায়, সৃষ্টি দেখতে শেখায়, নিজের অন্তর পরীক্ষা করতে শেখায়, আল্লাহর নিয়ামতের কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতে শেখায় এবং আখিরাতের জন্য প্রস্তুত হতে আহ্বান জানায়।
আল্লাহই সর্বময় কর্তৃত্বের অধিকারী
সূরা আল-মুলকের প্রথম শিক্ষা হলো—এই বিশ্বজগতের প্রকৃত মালিক, শাসক ও সর্বময় কর্তৃত্বের অধিকারী একমাত্র মহান আল্লাহ। মানুষ পৃথিবীতে যত ক্ষমতা, সম্পদ, পদমর্যাদা বা কর্তৃত্বই অর্জন করুক না কেন, তার সবই সীমিত ও সাময়িক। প্রকৃত সার্বভৌমত্ব আল্লাহর।
মানুষ কখনো রাষ্ট্র পরিচালনা করে, কখনো প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করে, কখনো পরিবারে দায়িত্ব পালন করে, আবার কখনো জ্ঞান, সম্পদ বা সামাজিক মর্যাদার কারণে প্রভাবশালী হয়ে ওঠে। কিন্তু এসব ক্ষমতা মানুষের নিজস্ব ও চিরস্থায়ী নয়। আজ যার হাতে ক্ষমতা, কাল তা অন্যের হাতে চলে যেতে পারে। আজ যে ধনী, কাল সে দরিদ্র হতে পারে; আজ যে সম্মানিত, কাল সে সম্মান হারাতে পারে।
তাই একজন মুমিনের হৃদয়ে অহংকারের স্থান নেই। ক্ষমতা পেলে সে বিনয়ী হবে, সম্পদ পেলে কৃতজ্ঞ হবে, দায়িত্ব পেলে আমানতদার হবে এবং নেতৃত্ব পেলে ন্যায়পরায়ণ হবে। কারণ সে জানে—সব কর্তৃত্বের মূল উৎস মহান আল্লাহ।
জীবন ও মৃত্যু—এক মহাপরীক্ষা
সূরা আল-মুলকের দ্বিতীয় আয়াত মানুষের জীবনের উদ্দেশ্যকে গভীরভাবে তুলে ধরে। আল্লাহ জীবন ও মৃত্যু সৃষ্টি করেছেন মানুষকে পরীক্ষা করার জন্য—কে আমলের দিক থেকে উত্তম।
এখানে শুধু বেশি আমলের কথা বলা হয়নি; বরং উত্তম আমল করার কথা বলা হয়েছে। অর্থাৎ আমলের মধ্যে ঈমান, ইখলাস, সঠিক নিয়ত, সুন্নাহসম্মত পদ্ধতি এবং নৈতিক সৌন্দর্য থাকা প্রয়োজন।
মানুষের জীবন তাই শুধু খাওয়া, ঘুমানো, অর্থ উপার্জন, বাড়ি-গাড়ি তৈরি কিংবা পার্থিব সাফল্য অর্জনের নাম নয়। জীবন হলো দায়িত্ব। প্রতিটি দিন একটি পরীক্ষা, প্রতিটি সুযোগ একটি আমানত এবং প্রতিটি কাজ ভবিষ্যৎ জীবনের জন্য একটি পাথেয়।
যে ব্যক্তি নিজের জীবনকে আল্লাহর সন্তুষ্টির পথে পরিচালিত করে, মানুষের হক আদায় করে, অন্যায় থেকে বেঁচে থাকে, ভালো কাজ করে এবং ভুল হলে তাওবা করে—সে জীবনের পরীক্ষাকে সঠিকভাবে গ্রহণ করার চেষ্টা করে।
নিখুঁত সৃষ্টির দিকে তাকিয়ে স্রষ্টাকে চেনা
সূরা আল-মুলক আকাশমণ্ডল ও আল্লাহর সৃষ্টির নিখুঁততার দিকে মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। স্তরে স্তরে আসমান সৃষ্টি করা হয়েছে; আল্লাহর সৃষ্টিতে অসামঞ্জস্য ও ত্রুটি খুঁজতে বারবার তাকাতে বলা হয়েছে।
এ শিক্ষা মানুষের চিন্তাশক্তিকে জাগ্রত করে। আকাশের বিশালতা, পৃথিবীর বৈচিত্র্য, সূর্য-চন্দ্রের নিয়ম, রাত-দিনের পরিবর্তন, ঋতুর আবর্তন, জীবজগতের বিস্ময়—সবই মানুষকে সৃষ্টিকর্তার মহাশক্তির কথা স্মরণ করিয়ে দেয়।
কুরআনের এই শিক্ষা আমাদের অন্ধ অনুকরণ নয়, বরং পর্যবেক্ষণ, চিন্তা ও উপলব্ধির দিকে আহ্বান জানায়। মানুষ যত বেশি সৃষ্টিজগত নিয়ে চিন্তা করবে, তত বেশি নিজের সীমাবদ্ধতা বুঝবে এবং মহান স্রষ্টার মহিমা উপলব্ধি করবে।
আকাশের সৌন্দর্য ও আল্লাহর কুদরত
আল্লাহ নিকটবর্তী আসমানকে প্রদীপমালা দ্বারা সুশোভিত করেছেন। নক্ষত্ররাজির সৌন্দর্য মানুষের চোখকে মুগ্ধ করে এবং সৃষ্টির মহিমার দিকে মনোযোগী করে।
রাতের আকাশে অসংখ্য নক্ষত্রের দিকে তাকালে মানুষের মনে বিস্ময় জাগে। এত বিশাল সৃষ্টি, অথচ মানুষ নিজেকে কত বড় মনে করে! এই বৈপরীত্য মানুষকে বিনয়ের শিক্ষা দেয়।
প্রকৃত জ্ঞানী মানুষ সৃষ্টির সৌন্দর্য দেখে শুধু মুগ্ধ হয় না; সে সৃষ্টির মাধ্যমে স্রষ্টার নিদর্শন চিনতে চেষ্টা করে। তার চোখে প্রকৃতি কেবল দৃশ্য নয়—এটি শিক্ষা, স্মরণ ও চিন্তার একটি বিশাল ক্ষেত্র।
জাহান্নামের সতর্কতা ও অবিশ্বাসের পরিণতি
সূরার পরবর্তী আয়াতগুলোতে জাহান্নামের ভয়াবহ পরিণতির কথা উল্লেখ করা হয়েছে। যারা তাদের রবকে অস্বীকার করে, তাদের জন্য জাহান্নামের শাস্তির কথা বলা হয়েছে। সেখানে নিক্ষিপ্ত ব্যক্তিদের সামনে তাদের অতীতের অস্বীকার ও সতর্কবাণী প্রত্যাখ্যানের বিষয়টি স্মরণ করিয়ে দেওয়া হবে।
জাহান্নাম সম্পর্কে এই বর্ণনা মানুষের অন্তরে ভয় সৃষ্টি করার জন্য, যাতে সে গুনাহ ও অবাধ্যতার পথ থেকে ফিরে আসে। কিন্তু ইসলামের শিক্ষা শুধু ভয়ভিত্তিক নয়। একই সূরায় আল্লাহর ক্ষমা ও মহাপুরস্কারের আশাও রয়েছে।
অতএব একজন মুমিনের জীবনে ভয় ও আশা—উভয়ই থাকবে। সে আল্লাহর শাস্তিকে ভয় করবে, আবার তাঁর রহমতের আশাও রাখবে। এই ভারসাম্য মানুষকে দায়িত্বশীল ও সংযমী করে।
শুনতে শেখা ও বিবেক-বুদ্ধি ব্যবহার করা
জাহান্নামবাসীদের একটি বড় আফসোস হবে—তারা যদি শুনত অথবা বিবেক-বুদ্ধি প্রয়োগ করত, তাহলে তারা জাহান্নামবাসীদের অন্তর্ভুক্ত হতো না।
এই শিক্ষা বর্তমান জীবনের জন্যও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সত্য কথা কানে আসা যথেষ্ট নয়; সত্যকে গ্রহণ করার জন্য প্রয়োজন মনোযোগ, বিবেক ও চিন্তাশক্তি।
মানুষ যদি সত্যের কথা শুনেও অহংকার, পক্ষপাত, অন্ধ অনুকরণ কিংবা প্রবৃত্তির কারণে তা প্রত্যাখ্যান করে, তাহলে জ্ঞান তার জন্য কল্যাণকর হয় না।
তাই ইসলামী জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো—সত্য কথা মনোযোগ দিয়ে শোনা, বুঝে নেওয়া, চিন্তা করা এবং সত্য প্রমাণিত হলে তা গ্রহণ করা।
গোপন ও প্রকাশ্য—সবই আল্লাহ জানেন
মানুষ যা প্রকাশ করে, আল্লাহ তা জানেন; আবার সে যা গোপন করে, তার অন্তরের কথাও আল্লাহর অজানা নয়। সূরা আল-মুলকে মানুষের অন্তরের গোপন বিষয় সম্পর্কে আল্লাহর পূর্ণ জ্ঞানের কথা বলা হয়েছে।
এই বিশ্বাস মানুষের চরিত্রকে শুদ্ধ করে। কারণ মানুষ যদি মনে রাখে যে মানুষের চোখ এড়িয়ে গেলেও আল্লাহর জ্ঞান থেকে কিছুই গোপন থাকে না, তাহলে সে একাকীত্বেও সতর্ক থাকবে।
লোক দেখানোর জন্য ভালো কাজ করা সহজ; কিন্তু আল্লাহর জন্য গোপনে ভালো কাজ করা ইখলাসের পরিচয়। আবার মানুষের সামনে অন্যায় থেকে বেঁচে থেকেও গোপনে অন্যায় করা একজন মুমিনের জন্য ভয়াবহ আত্মপ্রবঞ্চনা।
সুতরাং প্রকৃত তাকওয়া হলো—মানুষের সামনে যেমন, একাকীত্বেও তেমন আল্লাহসচেতন থাকা।
তাকওয়া ও অদৃশ্য আল্লাহর ভয়
সূরা আল-মুলক মুমিনের একটি গুরুত্বপূর্ণ গুণ তুলে ধরে—যারা না দেখেও তাদের রবকে ভয় করে, তাদের জন্য রয়েছে ক্ষমা ও মহাপুরস্কার।
এখানে তাকওয়ার গভীর শিক্ষা রয়েছে। আল্লাহকে চোখে না দেখেও তাঁর অস্তিত্ব, মহত্ত্ব, ক্ষমতা ও জ্ঞানের ওপর ঈমান রাখা এবং তাঁর অবাধ্যতা থেকে নিজেকে রক্ষা করা হলো ঈমানের গুরুত্বপূর্ণ প্রকাশ।
তাকওয়া শুধু মসজিদে সীমাবদ্ধ কোনো বিষয় নয়। বাজারে তাকওয়া আছে, কর্মক্ষেত্রে তাকওয়া আছে, পরিবারে তাকওয়া আছে, ব্যবসায় তাকওয়া আছে, শিক্ষায় তাকওয়া আছে এবং একাকীত্বেও তাকওয়া আছে।
যে ব্যক্তি মানুষের অনুপস্থিতিতেও অন্যের হক নষ্ট করে না, হারাম থেকে বেঁচে থাকে এবং আল্লাহকে ভয় করে—তার অন্তরে তাকওয়ার আলো রয়েছে।
পৃথিবী মানুষের জন্য সুগম—তাই দায়িত্বশীলভাবে কাজ করতে হবে
আল্লাহ পৃথিবীকে মানুষের জন্য সুগম করেছেন এবং তাঁর দেওয়া রিযিক থেকে আহার করার জন্য পৃথিবীর পথে-প্রান্তরে বিচরণ করতে বলেছেন। একই সঙ্গে মনে করিয়ে দিয়েছেন—পুনরুত্থান তাঁর কাছেই।
এই আয়াত আমাদের শেখায় যে ইসলাম কর্মবিমুখতা শেখায় না। মানুষ বৈধ উপায়ে জীবিকা অর্জনের চেষ্টা করবে, পৃথিবীতে চলাফেরা করবে, জ্ঞান অর্জন করবে, শ্রম দেবে, ব্যবসা-বাণিজ্য করবে এবং নিজের ও পরিবারের দায়িত্ব পালন করবে।
তবে উপার্জনের সময় আল্লাহকে ভুলে গেলে চলবে না। রিযিকের সন্ধানে চেষ্টা করতে হবে, কিন্তু রিযিকদাতাকে ভুলে যাওয়া যাবে না।
চেষ্টা মানুষের দায়িত্ব; ফলাফলের চূড়ান্ত কর্তৃত্ব আল্লাহর হাতে।
বিপদের সময় আল্লাহর ক্ষমতা স্মরণ
সূরা আল-মুলক মানুষকে সতর্ক করে যে, যে পৃথিবীকে সে নিরাপদ ও স্থির মনে করে, আল্লাহ চাইলে তাতেও বিপর্যয় ঘটতে পারে।
এ শিক্ষা মানুষের অহংকার ভেঙে দেয়। মানুষ যত প্রযুক্তি, বিজ্ঞান ও শক্তির অধিকারী হোক, সে প্রকৃতপক্ষে আল্লাহর মুখাপেক্ষী।
তাই নিরাপত্তা পেলে অহংকার নয়, কৃতজ্ঞতা; বিপদ এলে হতাশা নয়, তাওবা ও দোয়া; সামর্থ্য পেলে অবাধ্যতা নয়, দায়িত্বশীলতা—এটাই মুমিনের পথ।
পাখির উড্ডয়নেও আল্লাহর নিদর্শন
সূরা আল-মুলক মানুষের দৃষ্টি আকাশে উড়ন্ত পাখির দিকে ফেরায়। পাখি ডানা মেলে, আবার ডানা গুটিয়ে নেয়; তবু আল্লাহর ইচ্ছায় তারা আকাশে অবস্থান করে।
এই দৃশ্য সাধারণ হলেও এর শিক্ষা গভীর। পৃথিবীর প্রতিটি প্রাণী আল্লাহর সৃষ্টিনিয়মের অধীন। পাখি তার স্বভাবজাত ক্ষমতা ব্যবহার করে উড়ে, মানুষও তার সামর্থ্য ও উপায় ব্যবহার করে জীবনের দায়িত্ব পালন করে।
এখানে একটি সুন্দর শিক্ষা পাওয়া যায়—আল্লাহর ওপর ভরসা মানে উপায় ছেড়ে বসে থাকা নয়; বরং বৈধ উপায় অবলম্বন করে আল্লাহর ওপর নির্ভর করা।
রিযিকের প্রকৃত মালিক কে?
মানুষ যতই সম্পদশালী হোক, তার খাদ্য, পানি, বাতাস, জমি, ফসল, শ্রমের সুযোগ—সবই আল্লাহর দেওয়া। আল্লাহ যদি রিযিক বন্ধ করে দেন, তাহলে পৃথিবীর কোনো শক্তিই তাঁর ইচ্ছার বাইরে মানুষের জন্য রিযিক নিশ্চিত করতে পারে না।
এই শিক্ষা মানুষকে হালাল উপার্জনে উৎসাহিত করে এবং হারাম পথে সম্পদ অর্জনের প্রবণতা থেকে সতর্ক করে।
রিযিকের জন্য চেষ্টা করতে হবে, কিন্তু রিযিকের কারণে অহংকার করা যাবে না। অল্প রিযিক পেলে হতাশ হওয়া যাবে না এবং বেশি রিযিক পেলে আল্লাহকে ভুলে যাওয়া যাবে না।
রিযিক হলো পরীক্ষা—কেউ অল্প পেয়ে পরীক্ষা দেয়, কেউ বেশি পেয়ে পরীক্ষা দেয়। আসল সফলতা হলো, যার যতটুকু আছে তা হালাল পথে অর্জন করা এবং আল্লাহর সন্তুষ্টির কাজে ব্যবহার করা।
সরল পথ ও বক্র পথ
সূরা আল-মুলকে এমন একজনের সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে, যে মুখে ভর দিয়ে চলে, আর এমন একজনের সঙ্গে, যে সোজা হয়ে সরল পথে চলে।
এটি মানুষের জীবনপথের একটি শক্তিশালী উপমা। যে ব্যক্তি আল্লাহর নির্দেশনা ছাড়া জীবন পরিচালনা করে, তার পথ অন্ধকার, অনিশ্চিত ও বিপদসংকুল। আর যে ব্যক্তি আল্লাহর হিদায়াত অনুসরণ করে, তার সামনে থাকে সঠিক পথের দিশা।
সরল পথ মানে শুধু কথায় ঈমানের দাবি নয়; বরং ঈমানকে জীবনের আচরণে প্রকাশ করা। সত্য বলা, আমানত রক্ষা করা, সালাত আদায় করা, হালাল-হারাম মেনে চলা, মানুষের অধিকার রক্ষা করা এবং অন্যায় থেকে দূরে থাকা—এসবই সরল পথের বাস্তব প্রকাশ।
শ্রবণ, দৃষ্টি ও অন্তর—মহান নিয়ামত
আল্লাহ মানুষকে সৃষ্টি করে তাকে শ্রবণশক্তি, দৃষ্টিশক্তি ও অন্তঃকরণ দিয়েছেন। অথচ মানুষ খুব অল্পই কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে।
আমাদের চোখ আছে—কিন্তু আমরা কি তা সত্য দেখার কাজে ব্যবহার করি?
আমাদের কান আছে—কিন্তু আমরা কি তা সত্য ও কল্যাণের কথা শোনার কাজে ব্যবহার করি?
আমাদের অন্তর আছে—কিন্তু আমরা কি তা চিন্তা, উপলব্ধি ও আল্লাহর স্মরণে ব্যবহার করি?
নিয়ামতের প্রকৃত কৃতজ্ঞতা শুধু মুখে ‘আলহামদুলিল্লাহ’ বলা নয়; বরং নিয়ামতকে যে উদ্দেশ্যে দেওয়া হয়েছে, সে উদ্দেশ্যে ব্যবহার করাও কৃতজ্ঞতার অংশ।
চোখ দিয়ে হারাম না দেখা, কান দিয়ে অশ্লীলতা না শোনা, জিহ্বা দিয়ে মিথ্যা না বলা এবং অন্তরকে হিংসা-বিদ্বেষ থেকে পরিশুদ্ধ করা—এগুলো নিয়ামতের বাস্তব কৃতজ্ঞতার পথ।
পুনরুত্থান ও আখিরাতের অবশ্যম্ভাবিতা
সূরা আল-মুলক মানুষকে বারবার স্মরণ করিয়ে দেয় যে, দুনিয়ার জীবনই শেষ নয়। পৃথিবীতে চলাফেরা ও রিযিক ভোগের পর একদিন আল্লাহর কাছেই পুনরুত্থিত হতে হবে।
আখিরাতের বিশ্বাস মানুষের জীবনকে দায়িত্বশীল করে। যে জানে একদিন তাকে নিজের কাজের হিসাব দিতে হবে, সে অন্যের অধিকার হরণ করতে ভয় পায়, জুলুম থেকে বাঁচে, আমানত রক্ষা করে এবং নিজের চরিত্র সংশোধনের চেষ্টা করে।
দুনিয়ার আদালতে কোনো অপরাধী কখনো প্রমাণের অভাবে মুক্তি পেতে পারে; কিন্তু আল্লাহর জ্ঞানের বাইরে কোনো কাজ নেই। তাই মুমিনের প্রকৃত সতর্কতা হলো—মানুষের বিচার থেকে নয়, আল্লাহর বিচারের জন্য নিজেকে প্রস্তুত করা।
তাওয়াক্কুল—ঈমান ও নির্ভরতার শক্তি
সূরার শেষাংশে অত্যন্ত সুন্দরভাবে ঘোষণা করা হয়েছে—আল্লাহই পরম দয়াময়; মুমিন তাঁর ওপর ঈমান আনে এবং তাঁরই ওপর তাওয়াক্কুল করে।
তাওয়াক্কুল মানে দায়িত্ব ছেড়ে দেওয়া নয়। বরং নিজের সাধ্য অনুযায়ী বৈধ চেষ্টা করা, সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়া এবং ফলাফলের ব্যাপারে আল্লাহর ওপর নির্ভর করা।
কৃষক জমি প্রস্তুত করবে, বীজ বপন করবে, পানি দেবে—তারপর ফলনের জন্য আল্লাহর ওপর ভরসা করবে।
শিক্ষার্থী পড়াশোনা করবে, পরিশ্রম করবে, সময়কে কাজে লাগাবে—তারপর ফলাফলের জন্য আল্লাহর ওপর নির্ভর করবে।
ব্যবসায়ী সততা ও দক্ষতার সঙ্গে ব্যবসা করবে—তারপর রিযিকের জন্য আল্লাহর ওপর ভরসা করবে।
এই হলো ভারসাম্যপূর্ণ তাওয়াক্কুল—চেষ্টা থাকবে হাতে, ভরসা থাকবে আল্লাহর ওপর।
কিয়ামতের সময়ের জ্ঞান আল্লাহর কাছে
কিয়ামত কখন সংঘটিত হবে—এই জ্ঞান আল্লাহর কাছেই। মানুষকে এ বিষয়ে অযথা অনুমান না করে সতর্ক ও প্রস্তুত থাকতে শিক্ষা দেওয়া হয়েছে।
এখানে মানুষের জ্ঞানের সীমাবদ্ধতার কথাও স্পষ্ট হয়। মানুষ অনেক কিছু জানতে পারে, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে অনেক অগ্রসর হতে পারে, কিন্তু অদৃশ্য জগতের সব জ্ঞান তার আয়ত্তে নয়।
তাই জ্ঞান অর্জনের পাশাপাশি বিনয়ও প্রয়োজন। সত্যিকারের জ্ঞান মানুষকে অহংকারী নয়, বরং আল্লাহর প্রতি আরও বিনয়ী ও কৃতজ্ঞ করে।
পানির নিয়ামত—জীবনের এক অনন্য স্মরণ
সূরা আল-মুলকের শেষ আয়াতে পানির কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে প্রশ্ন করা হয়েছে—পানি যদি ভূগর্ভে গভীরে চলে যায় বা নাগালের বাইরে চলে যায়, তাহলে কে প্রবহমান পানি এনে দেবে?
মানুষ প্রতিদিন পানি পান করে, গোসল করে, রান্না করে, কৃষিকাজ করে; কিন্তু পানির মূল্য সবসময় উপলব্ধি করে না। অথচ পানি ছাড়া জীবন কল্পনা করা কঠিন।
তাই পানি শুধু ব্যবহার করার বস্তু নয়; এটি আল্লাহর মহান নিয়ামত। পানি অপচয় না করা, পরিবেশ রক্ষা করা এবং আল্লাহর দেওয়া সম্পদের যথাযথ ব্যবহার করা একজন দায়িত্বশীল মানুষের কর্তব্য।
সূরা আল-মুলকের সামগ্রিক শিক্ষা
সূরা আল-মুলক আমাদের সামনে একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনদর্শন উপস্থাপন করে। এর শিক্ষা হলো—
আল্লাহ সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী—তাই অহংকার নয়, বিনয়।
জীবন-মৃত্যু পরীক্ষা—তাই সময়ের অপচয় নয়, উত্তম আমল।
সৃষ্টি নিখুঁত—তাই চিন্তা ও গবেষণা।
জাহান্নাম সত্য—তাই গুনাহ থেকে সতর্কতা।
আল্লাহ অন্তরের খবর জানেন—তাই প্রকাশ্য ও গোপনে তাকওয়া।
পৃথিবী সুগম—তাই বৈধ শ্রম ও কর্মপ্রচেষ্টা।
রিযিক আল্লাহর হাতে—তাই হালাল উপার্জন ও কৃতজ্ঞতা।
আখিরাত নিশ্চিত—তাই জবাবদিহির প্রস্তুতি।
শ্রবণ, দৃষ্টি ও বিবেক নিয়ামত—তাই সঠিক কাজে তার ব্যবহার।
আল্লাহর ওপর তাওয়াক্কুল—তাই চেষ্টা, ধৈর্য ও আল্লাহনির্ভরতা।
পানি মহান নিয়ামত—তাই অপচয় নয়, সংরক্ষণ ও কৃতজ্ঞতা।
উপসংহার
সূরা আল-মুলক মানুষের হৃদয়ে ঈমানের আলো জ্বালায়, চিন্তার দুয়ার খুলে দেয় এবং জীবনকে দায়িত্বশীলতার পথে পরিচালিত করে। এটি মানুষকে স্মরণ করিয়ে দেয়—এই বিশাল পৃথিবী আমাদের চূড়ান্ত গন্তব্য নয়; আমরা পরীক্ষার মধ্য দিয়ে এগিয়ে চলেছি। আমাদের ক্ষমতা সীমিত, জীবন ক্ষণস্থায়ী, কিন্তু আল্লাহর কর্তৃত্ব চিরস্থায়ী।
তাই আমাদের উচিত আল্লাহর সার্বভৌমত্বে দৃঢ় ঈমান রাখা, তাঁর সৃষ্টির নিদর্শন নিয়ে চিন্তা করা, জীবনকে উত্তম আমলে সাজানো, অন্তরকে তাকওয়ায় পরিশুদ্ধ করা, শ্রবণ ও দৃষ্টির নিয়ামতের কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা, হালাল পথে রিযিক অনুসন্ধান করা, মানুষের অধিকার রক্ষা করা এবং সব কাজে আল্লাহর ওপর তাওয়াক্কুল করা।
জীবনের প্রতিটি সকাল হোক দায়িত্বের স্মরণে, প্রতিটি দিন হোক সৎকর্মে, প্রতিটি রাত হোক আত্মসমালোচনা ও তাওবার মাধ্যমে। আমাদের চোখ যেন সত্য দেখে, কান যেন সত্য শোনে, অন্তর যেন সত্য গ্রহণ করে এবং হাত-পা যেন কল্যাণের পথে পরিচালিত হয়।
সর্বোপরি, আমরা যেন এমন জীবন গড়ে তুলতে পারি—যে জীবনের প্রতিটি মুহূর্ত আল্লাহর সন্তুষ্টির দিকে এগিয়ে যায় এবং মৃত্যুর পর তাঁর ক্ষমা ও মহাপুরস্কারের আশায় শেষ হয়।
হে মহান আল্লাহ! আমাদের ঈমানকে দৃঢ় করো, আমলকে সুন্দর করো, অন্তরকে তাকওয়ায় পূর্ণ করো, তোমার নিয়ামতের কৃতজ্ঞ বানাও, হালাল রিযিক দাও, সত্য ও সরল পথে অবিচল রাখো এবং আখিরাতের সফলতার জন্য প্রস্তুত হওয়ার তৌফিক দাও। আমিন।
১৫
২৫ মন্তব্য