Loading..

ব্লগ

রিসেট

২৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ০৩:৩৫ পূর্বাহ্ণ

অহংকার ও সত্যবিরোধিতার পরিণতি -মোঃ মুজিবুর রহমান সহকারী অধ্যাপক

অহংকার ও সত্যবিরোধিতার পরিণতি

সূ(রা আল-মাসাদের (লাহাব)আলোকে ঈমান, সত্যের প্রতি আনুগত্য, সম্পদের অসারতা, অহংকারের পরিণতি ও আখিরাতের জবাবদিহির শিক্ষা)

মোঃ মুজিবুর রহমান
সহকারী অধ্যাপক
মোজাদ্দেদীয়া ইসলামিয়া আলিম মাদ্রাসা, কালিয়াকৈর, গাজীপুর।

মানুষ পৃথিবীতে সম্মান, সম্পদ, ক্ষমতা, বংশমর্যাদা ও সামাজিক প্রতিষ্ঠা অর্জনের জন্য নানা চেষ্টা করে। কিন্তু মানুষের প্রকৃত সাফল্য কেবল দুনিয়ার প্রাচুর্য বা বাহ্যিক মর্যাদার মধ্যে নিহিত নয়। মানুষের আসল সফলতা নির্ভর করে তার ঈমান, আমল, সত্যনিষ্ঠা, নৈতিক চরিত্র এবং আল্লাহর প্রতি আনুগত্যের ওপর। দুনিয়ার সম্পদ একদিন শেষ হয়ে যায়, ক্ষমতা একদিন চলে যায়, যৌবন বার্ধক্যে পৌঁছে, আর জীবন একসময় মৃত্যুর মাধ্যমে থেমে যায়। কিন্তু মানুষের কর্মের হিসাব থেকে যায় এবং আখিরাতে তার যথাযথ প্রতিফল পাওয়া যায়।

পবিত্র কুরআনের ১১১তম সূরা আল-মাসাদ বা আল-লাহাব মাত্র পাঁচ আয়াতের একটি সংক্ষিপ্ত অথচ গভীর তাৎপর্যপূর্ণ মক্কী সূরা। এ সূরায় রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর চাচা আবু লাহাব ও তার স্ত্রীর সত্যবিরোধী অবস্থান, অহংকার, বিরোধিতা এবং পরিণতির কথা উল্লেখ করা হয়েছে। সূরাটি শুধু একটি ঐতিহাসিক ব্যক্তির পরিণতির বিবরণ নয়; বরং এর মধ্যে রয়েছে সব যুগের মানুষের জন্য সতর্কবার্তা—সত্যের বিরোধিতা, অহংকার, সম্পদের গর্ব, অন্যায় প্রচেষ্টা এবং আল্লাহর বিধানের প্রতি অবজ্ঞা মানুষের জন্য কখনো কল্যাণ বয়ে আনে না।

সূরা আল-মাসাদের পরিচয়

সূরা আল-মাসাদ কুরআনের ১১১তম সূরা। এতে পাঁচটি আয়াত রয়েছে। সূরাটির আরেক নাম সূরা আল-লাহাব। ‘মাসাদ’ শব্দের অর্থ পাকানো রজ্জু বা শক্তভাবে পাকানো দড়ি। আর ‘লাহাব’ অর্থ আগুনের শিখা।

সূরার প্রথম আয়াতেই আবু লাহাবের পরিণতি সম্পর্কে কঠোর সতর্কবাণী এসেছে—

“ধ্বংস হোক আবু লাহাবের দুই হাত এবং সে নিজেও ধ্বংস হোক।”

এখানে ‘দুই হাত’ শুধু শারীরিক হাত বোঝানোর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং তার শক্তি, কর্মপ্রচেষ্টা ও কর্মকাণ্ডের ব্যর্থতার দিকও এতে প্রতিফলিত হয়। সে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর দাওয়াতের বিরোধিতা করেছিল এবং সত্যকে প্রতিহত করার জন্য নিজের সামাজিক প্রভাব ও শক্তি ব্যবহার করেছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তার সেই শক্তি তাকে রক্ষা করতে পারেনি।

সত্যের বিরুদ্ধে অবস্থানের পরিণতি

রাসুলুল্লাহ (সা.) যখন মানুষকে এক আল্লাহর ইবাদত, তাওহিদ, ন্যায়নীতি ও পরকালের জবাবদিহির দিকে আহ্বান করলেন, তখন মক্কার অনেক মানুষ তাঁর বিরোধিতা করেছিল। তাদের মধ্যে আবু লাহাব ছিল অন্যতম।

আত্মীয়তার সম্পর্ক থাকা সত্ত্বেও সে সত্যের আহ্বান গ্রহণ করেনি। বরং রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর দাওয়াতের বিরোধিতা করেছে। এতে আমাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হলো—সত্যকে গ্রহণ করার ক্ষেত্রে বংশ, আত্মীয়তা, সামাজিক মর্যাদা বা ব্যক্তিগত স্বার্থ কোনো বিকল্প নয়।

কেউ বড় পরিবারের সন্তান হলেই সত্যের অধিকারী হয়ে যায় না; আবার সাধারণ পরিবারের মানুষ হলেই সত্য থেকে বঞ্চিত হয় না। আল্লাহর কাছে মানুষের মর্যাদার প্রকৃত মানদণ্ড হলো ঈমান ও তাকওয়া।

তাই একজন মুসলিমের কর্তব্য হলো—সত্যকে চিনে নেওয়া, সত্যকে গ্রহণ করা এবং সত্যের পথে দৃঢ় থাকা।

সম্পদ ও উপার্জনের অসারতা

দ্বিতীয় আয়াতে বলা হয়েছে—

“তার ধন-সম্পদ এবং সে যা উপার্জন করেছে, তা তার কোনো কাজে আসেনি।”

এ আয়াত মানুষের দুনিয়াবি অহংকারের ভিত্তিকে নাড়িয়ে দেয়। মানুষ মনে করে—অর্থ থাকলে সব সমস্যার সমাধান করা যাবে, ক্ষমতা থাকলে সব বাধা দূর করা যাবে, পরিচিতি থাকলে বিপদ থেকে রক্ষা পাওয়া যাবে। কিন্তু মৃত্যুর পর মানুষের সঙ্গে তার সম্পদ যায় না; সঙ্গে যায় তার আমল।

ধন-সম্পদ নিজে খারাপ নয়। ইসলাম হালাল উপায়ে সম্পদ অর্জন ও সঠিক পথে ব্যয় করার অনুমতি দিয়েছে। সমস্যা তখনই সৃষ্টি হয়, যখন সম্পদ মানুষের অন্তরে অহংকার সৃষ্টি করে, তাকে আল্লাহর স্মরণ থেকে দূরে সরিয়ে দেয়, মানুষের অধিকার নষ্ট করতে উদ্বুদ্ধ করে এবং সত্যের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর শক্তি হিসেবে ব্যবহৃত হয়।

তাই সম্পদ হবে মানুষের হাতে, হৃদয়ে নয়। সম্পদ হবে আল্লাহর দেওয়া আমানত; মানুষের অহংকারের কারণ নয়।

বংশমর্যাদা ও সামাজিক ক্ষমতার সীমাবদ্ধতা

আবু লাহাব ছিলেন রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর চাচা। অর্থাৎ তাঁর সঙ্গে নবীজি (সা.)-এর নিকট আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিল। কিন্তু সেই আত্মীয়তা তাকে সত্যের বিরোধিতা থেকে রক্ষা করতে পারেনি।

এখানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি শিক্ষা রয়েছে—আল্লাহর নৈকট্য বংশের মাধ্যমে অর্জিত হয় না; ঈমান ও আনুগত্যের মাধ্যমে অর্জিত হয়।

কেউ কোনো সম্মানিত পরিবারের সন্তান হতে পারে, বড় পদে থাকতে পারে, প্রচুর সম্পদের মালিক হতে পারে, সমাজে পরিচিত ব্যক্তি হতে পারে; কিন্তু এসব কিছুই আখিরাতের সফলতার নিশ্চয়তা নয়।

অন্যদিকে একজন সাধারণ মানুষও ঈমান, তাকওয়া, সৎকর্ম ও উত্তম চরিত্রের মাধ্যমে আল্লাহর কাছে সম্মানিত হতে পারে।

সুতরাং মুসলিমের পরিচয়ের মূল ভিত্তি হবে ঈমান, চরিত্র ও আমল।

অহংকার মানুষের পতনের কারণ

অহংকার মানুষের অন্তরকে অন্ধ করে দেয়। অহংকারী ব্যক্তি নিজের ভুল দেখতে চায় না, অন্যের সত্য কথা শুনতে চায় না এবং নিজের অবস্থানকে সবসময় সঠিক মনে করে।

শয়তানের পতনের ইতিহাসেও অহংকারের ভয়াবহতা দেখা যায়। সে আল্লাহর নির্দেশের সামনে নিজের যুক্তিকে প্রাধান্য দিয়েছিল। ফলে তার অবাধ্যতা তাকে মর্যাদা থেকে পতনের দিকে নিয়ে যায়।

সূরা আল-মাসাদ আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়—মানুষ যত শক্তিশালীই হোক, আল্লাহর সামনে সে একজন বান্দা। তাই ক্ষমতা পেলে বিনয়ী হতে হবে, সম্পদ পেলে কৃতজ্ঞ হতে হবে, জ্ঞান পেলে নম্র হতে হবে এবং মর্যাদা পেলে মানুষের প্রতি দায়িত্বশীল হতে হবে।

সত্যের বিরোধিতা কখনো স্থায়ী সাফল্য আনে না

আবু লাহাব রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর দাওয়াতকে থামিয়ে দিতে চেয়েছিল। কিন্তু আল্লাহর সত্য দ্বীনকে থামানো তার পক্ষে সম্ভব হয়নি।

এখান থেকে বোঝা যায়—মানুষ সত্যের বিরুদ্ধে সাময়িক বাধা সৃষ্টি করতে পারে, কিন্তু আল্লাহর সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে চূড়ান্ত বিজয় অর্জন করতে পারে না।

সত্যের পথে চলতে গিয়ে কখনো কখনো কষ্ট আসতে পারে, বিরোধিতা হতে পারে, ভুল বোঝাবুঝি সৃষ্টি হতে পারে। কিন্তু একজন মুমিনের দায়িত্ব হলো ধৈর্য ধারণ করা, উত্তম পদ্ধতিতে সত্যের ওপর অটল থাকা এবং ফলাফল আল্লাহর ওপর ছেড়ে দেওয়া।

তবে তাওয়াক্কুলের অর্থ নিষ্ক্রিয় থাকা নয়। বরং যথাসাধ্য সঠিক চেষ্টা করা, বৈধ উপায় অবলম্বন করা এবং ফলাফলের জন্য আল্লাহর ওপর নির্ভর করাই প্রকৃত তাওয়াক্কুল।

অন্যায় প্রচার ও ক্ষতি সাধনের ভয়াবহতা

সূরার চতুর্থ আয়াতে আবু লাহাবের স্ত্রীকে “হাম্মালাতাল-হাতাব”—অর্থাৎ ‘কাঠ বহনকারিণী’ বলা হয়েছে। মুফাসসিরগণ এর ব্যাখ্যায় বাস্তবভাবে কাঠ বহনের পাশাপাশি রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর বিরোধিতা ও মানুষের মধ্যে ক্ষতিকর কথা ছড়ানোর সঙ্গে সম্পর্কিত অর্থও উল্লেখ করেছেন।

এখানে মানুষের জন্য বড় শিক্ষা হলো—কথা দিয়ে মানুষকে আঘাত করা, অপবাদ ছড়ানো, গীবত করা, মানুষের মধ্যে বিবাদ সৃষ্টি করা এবং সত্যের বিরুদ্ধে বিদ্বেষ ছড়ানো অত্যন্ত ক্ষতিকর কাজ।

একটি বিষাক্ত কথা যেমন মানুষের হৃদয়ে দীর্ঘদিন ক্ষত সৃষ্টি করতে পারে, তেমনি একটি মিথ্যা সংবাদ পরিবার, সমাজ ও বন্ধুত্বের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি করতে পারে।

তাই মুমিনের জিহ্বা হবে সংযত। সে সত্য কথা বলবে, কল্যাণকর কথা বলবে এবং অকল্যাণকর কথা থেকে নিজেকে বিরত রাখবে।

গীবত, অপবাদ ও বিভেদ থেকে বেঁচে থাকা

বর্তমান যুগে মানুষের হাতে প্রযুক্তি ও যোগাযোগের অসাধারণ সুযোগ এসেছে। একটি কথা মুহূর্তের মধ্যে বহু মানুষের কাছে পৌঁছে যায়। ফলে মানুষের দায়িত্বও বেড়েছে।

কোনো সংবাদ যাচাই না করে প্রচার করা, কারও সম্মান নষ্ট করার উদ্দেশ্যে কথা বলা, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অপমানজনক মন্তব্য করা কিংবা ব্যক্তিগত বিরোধকে জনসমক্ষে ছড়িয়ে দেওয়া—এসব কাজ মানুষের জন্য বড় ক্ষতির কারণ হতে পারে।

একজন মুসলিমের উচিত কোনো কথা বলার আগে নিজেকে প্রশ্ন করা—

এ কথা কি সত্য?
এ কথা কি প্রয়োজনীয়?
এ কথা কি কারও অযথা ক্ষতি করবে?
এ কথা কি আল্লাহর কাছে জবাবদিহির সময় আমার পক্ষে সাক্ষ্য দেবে?

এই আত্মজিজ্ঞাসা মানুষের চরিত্রকে সুন্দর করতে পারে।

আখিরাতের জবাবদিহি

সূরা আল-মাসাদের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষাগুলোর একটি হলো—মানুষকে তার কর্মের ফল ভোগ করতে হবে।

দুনিয়ায় কেউ অপরাধ করে সাময়িকভাবে পার পেয়ে যেতে পারে। কেউ নিজের প্রভাব, অর্থ বা পরিচিতির কারণে মানুষের কাছ থেকে শাস্তি এড়াতে পারে। কিন্তু আল্লাহর বিচার থেকে কেউ পালাতে পারবে না।

আখিরাতের জবাবদিহির বিশ্বাস একজন মানুষকে দায়িত্বশীল করে। সে জানে—তার কথা, কাজ, সম্পদ অর্জনের পদ্ধতি, মানুষের সঙ্গে আচরণ এবং আল্লাহর সঙ্গে সম্পর্ক—সবকিছুর হিসাব দিতে হবে।

এই বিশ্বাস মানুষকে গোপনেও সৎ থাকতে শেখায়।

সম্পদ হবে আমানত, অহংকারের উপকরণ নয়

সূরা আল-মাসাদ আমাদের সম্পদের প্রকৃত অবস্থান বুঝতে শেখায়। সম্পদ মানুষের জীবনের প্রয়োজন পূরণ করে, পরিবার পরিচালনায় সহায়তা করে এবং মানুষের কল্যাণে ব্যয় করা যায়। কিন্তু সম্পদকে যদি মানুষ নিজের শ্রেষ্ঠত্বের প্রমাণ মনে করে, তখন তা বিপদের কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে।

অতএব সম্পদ অর্জন করতে হবে হালাল পথে, ব্যয় করতে হবে সঠিক পথে এবং এর প্রতি কৃতজ্ঞ থাকতে হবে।

দরিদ্রকে অবজ্ঞা করা যাবে না, অসহায়কে ঠকানো যাবে না, শ্রমিকের অধিকার নষ্ট করা যাবে না, মানুষের আমানত আত্মসাৎ করা যাবে না এবং অর্থের কারণে সত্যকে বিক্রি করা যাবে না।

কারণ দুনিয়ার সম্পদ ক্ষণস্থায়ী; কিন্তু আমলের ফল স্থায়ী।

আত্মীয়তা নয়, ঈমানই মুক্তির পথ

সূরা আল-মাসাদ একটি গভীর সত্য স্পষ্ট করে—শুধু রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর আত্মীয় হওয়া মুক্তির জন্য যথেষ্ট ছিল না। এতে মুসলিম উম্মাহর জন্য সতর্কতা রয়েছে।

আমরা যেন শুধু মুসলিম পরিবারে জন্ম নেওয়া, কোনো ধর্মীয় পরিচয় বহন করা বা কোনো সম্মানিত বংশের সঙ্গে সম্পর্ককে যথেষ্ট মনে না করি। ঈমানের দাবি হলো আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস, তাঁর রাসুলের প্রতি বিশ্বাস, তাঁর নির্দেশের আনুগত্য এবং সৎকর্মের মাধ্যমে সেই ঈমানকে জীবনে প্রকাশ করা।

পরিবারের পরিচয় আমাদের সামাজিক পরিচয় দিতে পারে; কিন্তু আখিরাতের সফলতা নির্ধারিত হবে আমাদের ঈমান ও আমলের ভিত্তিতে।

শত্রুতার জবাব অন্যায় দিয়ে নয়

সূরা আল-মাসাদে আবু লাহাবের পরিণতি উল্লেখ করা হয়েছে। কিন্তু এর শিক্ষা গ্রহণ করে কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর প্রতি ব্যক্তিগত বিদ্বেষ, প্রতিশোধপরায়ণতা বা অভিশাপের সংস্কৃতি তৈরি করা ইসলামের শিক্ষা নয়।

মুমিনের দায়িত্ব হলো সত্যের ওপর অটল থাকা, অন্যায় থেকে বিরত থাকা, ন্যায় প্রতিষ্ঠা করা এবং মানুষের সঙ্গে যথাসম্ভব উত্তম আচরণ করা।

কেউ অন্যায় করলে ন্যায়সংগত উপায়ে তার প্রতিকার চাওয়া যেতে পারে; কিন্তু ব্যক্তিগত রাগকে অন্যায়, অপবাদ, জুলুম বা প্রতিশোধের পথে নিয়ে যাওয়া উচিত নয়।

সূরা আল-মাসাদ থেকে আমাদের জীবনের শিক্ষা

সূরা আল-মাসাদের পাঁচটি আয়াতের মধ্যে অত্যন্ত গভীর জীবনদর্শন রয়েছে। এ সূরা আমাদের শেখায়—

১. সত্যের বিরোধিতা করে কেউ সফল হতে পারে না।
২. ধন-সম্পদ আখিরাতের শাস্তি থেকে কাউকে রক্ষা করতে পারে না।
৩. বংশমর্যাদা ও আত্মীয়তা ঈমানের বিকল্প নয়।
৪. অহংকার মানুষের পতনের কারণ হতে পারে।
৫. আল্লাহর বিধানের সামনে আত্মসমর্পণই মুমিনের পথ।
৬. মানুষের ক্ষতি করার উদ্দেশ্যে কথা ও কাজ করা ভয়াবহ পরিণতি ডেকে আনতে পারে।
৭. গীবত, অপবাদ ও বিবাদ সৃষ্টিকারী আচরণ থেকে দূরে থাকতে হবে।
৮. সম্পদকে আল্লাহর আমানত হিসেবে ব্যবহার করতে হবে।
৯. মানুষের বাহ্যিক মর্যাদা নয়, ঈমান ও সৎকর্মই প্রকৃত মূল্য বহন করে।
১০. আখিরাতের জবাবদিহির বিশ্বাস মানুষকে সৎ ও দায়িত্বশীল করে।
১১. সত্যের পথে বাধা এলেও ধৈর্য ও দৃঢ়তা অবলম্বন করতে হবে।
১২. জীবনের চূড়ান্ত সফলতা দুনিয়ার প্রাচুর্যে নয়; আল্লাহর সন্তুষ্টি ও আখিরাতের নাজাতে।

বর্তমান সমাজে সূরা আল-মাসাদের প্রাসঙ্গিকতা

আজকের পৃথিবীতে মানুষ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে অনেক এগিয়েছে। যোগাযোগব্যবস্থা সহজ হয়েছে, অর্থনৈতিক সুযোগ বেড়েছে, মানুষের জীবনযাত্রায় পরিবর্তন এসেছে। কিন্তু মানুষের অন্তরের রোগ—অহংকার, হিংসা, বিদ্বেষ, লোভ, মিথ্যা, অপবাদ ও সত্যবিরোধিতা—এখনো বিদ্যমান।

কেউ অর্থের অহংকার করে, কেউ ক্ষমতার অহংকার করে, কেউ জ্ঞানের অহংকার করে, কেউ বংশের অহংকার করে, আবার কেউ সামাজিক পরিচিতিকে নিজের শ্রেষ্ঠত্বের কারণ মনে করে।

সূরা আল-মাসাদ আমাদের এসব ভ্রান্ত ধারণা থেকে সতর্ক করে। এটি মনে করিয়ে দেয়—মানুষের আসল পরিচয় তার সম্পদের পরিমাণে নয়, তার চরিত্রে; তার মর্যাদা পদে নয়, তার তাকওয়ায়; তার শক্তি বাহ্যিক ক্ষমতায় নয়, আল্লাহর আনুগত্যে।

তাই আধুনিক জীবনে এই সূরার শিক্ষা আরও গভীরভাবে ধারণ করা প্রয়োজন।

উপসংহার

সূরা আল-মাসাদ ছোট হলেও এর শিক্ষা অত্যন্ত ব্যাপক। মাত্র পাঁচটি আয়াতে আল্লাহ তাআলা মানুষের সামনে অহংকার, সত্যবিরোধিতা, সম্পদের গর্ব, অন্যায় প্রচেষ্টা এবং আখিরাতের পরিণতির একটি শক্তিশালী চিত্র তুলে ধরেছেন।

আবু লাহাবের ঘটনা আমাদের শেখায়—মানুষ যত বড় পরিচয়ের অধিকারী হোক, যদি সে সত্যকে প্রত্যাখ্যান করে এবং আল্লাহর বিধানের বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়, তাহলে তার বাহ্যিক শক্তি তাকে প্রকৃত মুক্তি দিতে পারে না। সম্পদ, ক্ষমতা, বংশমর্যাদা ও সামাজিক প্রভাব—সবই দুনিয়ার সাময়িক উপকরণ। এগুলো তখনই কল্যাণকর, যখন আল্লাহর সন্তুষ্টির পথে ব্যবহার করা হয়।

অতএব আমাদের প্রত্যেকের উচিত নিজের অন্তরকে অহংকার থেকে পবিত্র করা, সত্যকে গ্রহণ করা, মিথ্যা ও অপবাদ থেকে দূরে থাকা, মানুষের অধিকার রক্ষা করা, হালাল পথে উপার্জন করা, আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞ থাকা এবং আখিরাতের জবাবদিহির জন্য প্রস্তুতি নেওয়া।

জীবনের প্রতিটি মুহূর্ত আমাদের স্মরণ করুক—

সম্পদ নয়, ঈমানই মূল;
অহংকার নয়, বিনয়ই সৌন্দর্য;
বংশ নয়, তাকওয়াই মর্যাদার মানদণ্ড;
শক্তি নয়, সত্যের আনুগত্যই প্রকৃত সফলতা।

আল্লাহ তাআলা আমাদের অহংকার, হিংসা, বিদ্বেষ, অপবাদ, অন্যায় ও সত্যবিরোধিতা থেকে হেফাজত করুন। আমাদের অন্তরে ঈমানের দৃঢ়তা, চরিত্রে সততা, কথায় সংযম, কাজে ন্যায়, জীবনে তাকওয়া এবং আখিরাতের জন্য উত্তম আমল করার তাওফিক দান করুন।

আমিন।

 

মন্তব্য করুন

ব্লগ