Loading..

ব্লগ

রিসেট

২৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ০৩:৩৭ পূর্বাহ্ণ

অহংকারের আগুনে পতন -মোঃ মুজিবুর রহমান

                                                                    অহংকারের আগুনে পতন

(সূরা আল-মাসাদের(লাহাব) আলোকে সত্য, ঈমান, বিনয় ও আখিরাতের জবাবদিহির কাব্যগাথা)

মোঃ মুজিবুর রহমান
সহকারী অধ্যাপক
মোজাদ্দেদীয়া ইসলামিয়া আলিম মাদ্রাসা, কালিয়াকৈর, গাজীপুর।

যাঁর হুকুমে জীবন জাগে, মুছে মনের ভয়,
তাঁরই নামে সত্যের পথে জাগুক শুভময়।
কুরআনেরই আলো নিয়ে খুলুক জ্ঞানের দ্বার,
মিথ্যা ছেড়ে সত্য ধরুক মানবজীবন সবার।

মক্কার বুকে সত্য এলো, জাগল নতুন ভোর,
তাওহিদেরই ডাক উঠল—ভাঙল মিথ্যার ঘোর।
রাসুল এলেন সত্য নিয়ে, করলেন মানুষ ডাক,
এক আল্লাহর ইবাদতে ফিরুক জীবন-পাক।

কিন্তু কেউ বা সত্য শুনে অহংকারে রয়,
কেউ বা সত্যের পথ রোধে গড়ে বিদ্বেষময়।
আত্মীয়তার বন্ধন ছিল, তবু হলো দূর,
অহংকারে সত্য ঢাকল, হৃদয় হলো পাষাণ-পুর।

আবু লাহাব নামটি আজ ইতিহাসের পাতা,
সত্যবিরোধী অহংকারের জ্বলন্ত এক কথা।
সম্পদ ছিল, শক্তি ছিল, ছিল সামাজিক মান,
তবু সত্য অস্বীকারে হলো না কোনো ত্রাণ।

কুরআনেরই বাণী এলো সতর্কতার স্বর,
অন্যায় শক্তি টিকবে না যে—সত্য হবে জোর।
যে হাত দিয়ে সত্য রোধে করেছিল সে চেষ্টা,
সে প্রচেষ্টাই পরিণামে হলো ব্যর্থ, নিঃশেষ।

ধ্বংস হোক সে দুই হাত—বাণী হলো কঠিন,
অন্যায়ের সব শক্তি শেষে হয় যে মলিন।
মানুষ যত গর্ব করুক নিজের শক্তি নিয়ে,
আল্লাহরই হুকুম সবার মাথার উপর দিয়ে।

ধন-সম্পদে গর্ব কেন, সবই তো ক্ষণস্থায়ী?
আজ যে ঘরে সোনার হাসি, কাল সে ঘরই শূন্যভাই।
অর্থ দিয়ে কেনা যায় না মৃত্যুর পরে প্রাণ,
ক্ষমতা দিয়ে রোধ করা যায় না হিসাবের দান।

যত সম্পদ সঞ্চয় করি, যত করি আয়,
মৃত্যু এলে সবকিছুই পেছনে পড়ে রয়।
সঙ্গে থাকে না প্রাসাদ, থাকে না ধনভাণ্ডার,
সঙ্গে থাকে নিজের আমল—সত্য, ন্যায়, আর চরিত্রের ভার।

সম্পদ যদি কল্যাণে লাগে—হোক সে নেক নিয়ামত,
অসহায়ের পাশে দাঁড়াক, মুছে দিক বিপদ।
যদি সম্পদ অহংকারে হৃদয় করে কঠিন,
তবে সে সম্পদই একদিন হতে পারে দুঃখের ঋণ।

বংশ নিয়ে গর্ব কোরো না, পদ নিয়ে নয় মান,
রূপ নিয়ে অহংকারে করো না আত্মগান।
মানুষের শ্রেষ্ঠ পরিচয় ঈমানেরই আলো,
তাকওয়ার পথে যে চলে, তার জীবনই ভালো।

আত্মীয়তা সম্মানিত, সম্পর্ক অমূল্য ধন,
তবু সত্যের ঊর্ধ্বে নয় কোনো পারিবারিক বন্ধন।
সত্য যখন সামনে আসে, সত্যকেই ধরতে হয়,
আল্লাহর বিধান মেনে তবেই মুক্তির জয়।

অহংকার হৃদয় ঢাকে কালো মেঘের মতো,
সত্য কথা শুনেও তখন মনে লাগে ক্ষত।
নম্র হৃদয় সত্য শোনে, ভুল হলে নেয় মান,
বিনয়ী মানুষ পায় যে সত্য জ্ঞানের সম্মান।

অহংকারে মানুষ ভাবে—“আমিই বড়, আমি,”
ভুলে যায় সে ক্ষণিক পথের ক্ষুদ্র পথিক আমি।
মাটির দেহ মাটিতেই একদিন যাবে মিশে,
কীসের এত গর্ব তবে পৃথিবীর এ জীবনে?

যে জ্ঞান পেয়েছ, তা তো তোমার নিজের সৃষ্টি নয়,
জ্ঞান দিয়েছেন পরম রব, তাঁরই অনুগ্রহময়।
যে সম্পদ পেয়েছ তুমি, তিনিই দিয়েছেন দান,
যে শক্তিতে দাঁড়িয়ে আছ, তাঁরই তো অবদান।

তাই তো বলো—“হে আমার রব, তোমারই সব দান,”
কৃতজ্ঞ হৃদয় রাখো জাগ্রত, রাখো ঈমান-প্রাণ।
নিয়ামতের শুকরিয়া দাও, করো সৎ ব্যবহার,
দান-সদকায় আলোকিত হোক জীবন বারবার।

সূরার মাঝে আরও আছে সতর্ক বাণী ভার,
মানুষ যেন ক্ষতি করে না কথার আঘাত-ধার।
কাঠ বহনের উপমাতে শিক্ষা গভীর রয়,
বিদ্বেষ ছড়িয়ে মানুষের মাঝে কেউ যেন না ক্ষয়।

কথা দিয়ে আগুন জ্বলে, কথা দিয়ে হয় ক্ষত,
কথা দিয়ে ভাঙে বন্ধন, নষ্ট হয় সম্পর্ক।
একটি মিথ্যা ছড়িয়ে দিলে শত হৃদয়ে ব্যথা,
তাই তো মুমিন সংযত রাখে নিজের মুখের কথা।

গীবত থেকে দূরে থাকো, অপবাদ দিও না,
যাচাই ছাড়া কোনো কথা মানুষের মাঝে ছড়িও না।
কারও দোষের গল্প করে নিজে হয়ো না গর্বিত,
অন্যের সম্মান রক্ষা করো—হৃদয় রাখো পবিত্র।

সামাজিক মাধ্যমে আজ কথা ছড়ায় দ্রুতগতি,
একটি ভুল সংবাদে নষ্ট হতে পারে বহু জনের গতি।
তাই কিছু লেখার আগে ভাবো বারবার,
এ কথাটি কি সত্য, নাকি ক্ষতির অন্ধকার?

কথা যদি কল্যাণ আনে, বলো সুন্দর করে,
না হলে চুপ থাকো ভাই, নীরব থাকো ভেবে।
জিহ্বা ছোট, কিন্তু তারই প্রভাব অনেক দূর,
ভালো কথায় হৃদয় হাসে, মন্দ কথায় হয় চুরমার।

যে মানুষ সত্যের পথে অন্যায় বাধা দেয়,
সে নিজেরই অন্তরটাকে অন্ধকারে ঢেকে নেয়।
সত্যের সূর্য ঢেকে রাখা মানুষের সাধ্য নয়,
রাত যতই দীর্ঘ হোক, প্রভাত শেষে হয়।

মুমিন তাই ভয় পায় না সত্য বলার দিনে,
ধৈর্য ধরে এগিয়ে চলে রবের বিধান চিনে।
বিপদ এলে ভেঙে পড়ে না, করে না হাহাকার,
আল্লাহর ওপর ভরসা রেখে করে সঠিক চেষ্টা বারবার।

তাওয়াক্কুল মানে নয় যে বসে থাকা চুপ,
চেষ্টা করে আল্লাহর ওপর রাখো ভরসার রূপ।
সঠিক পথে শ্রম দাও, গ্রহণ করো বৈধ উপায়,
ফলাফলটি আল্লাহর হাতে—তাঁর হুকুমেই হয়।

জীবন যখন শেষের পথে, থামবে দুনিয়ার মেলা,
কেউ তখন আর সঙ্গে নেবে না সোনার থালা-বাটি মেলা।
বন্ধ হবে বাজার-হাট, থামবে সব আয়োজন,
সামনে তখন খুলবে শুধু আমলেরই পৃষ্ঠা-পত্র।

কে কত ধনী, কে বা কত ক্ষমতাবান ছিল,
কে কত বড় পদে থেকে কত সম্মান পেল—
এসব দিয়ে হবে না তখন মুক্তির কোনো পথ,
ঈমান ও সৎকর্মই হবে জীবনের প্রকৃত রথ।

কুরআনের এই ছোট সূরা বড় শিক্ষা দেয়,
অহংকারের মিথ্যা প্রাসাদ মুহূর্তে ভেঙে যায়।
সম্পদ যদি ঈমানহীন হয়, কী তার মূল্য বলো?
সত্যহীন শক্তির শেষে থাকে শুধু অন্ধকার কালো।

তাই হে মানুষ, অহংকারে নিজের মন ভরো না,
অন্যকে ছোট করে নিজেকে বড় কোরো না।
আজ যে শক্তি হাতে আছে, কাল তা থাকবে না,
আজ যে জীবন তোমার হাতে, কাল তা আর থাকবে না।

মানুষ হও বিনয়ী, সত্যনিষ্ঠ, সৎ,
আমানত রক্ষা করো, রাখো হৃদয় পবিত্র।
অন্যের হক নষ্ট কোরো না, করো না অবিচার,
মজলুমের পাশে দাঁড়াও, করো না তাকে পরাভার।

সম্পদ থাকলে দান করো, ক্ষমতা থাকলে ন্যায়,
জ্ঞান থাকলে মানুষ গড়ো, সত্য থাকলে বলো তা।
পদ যদি পাও, দায়িত্ব নাও, করো না অহংকার,
নেতৃত্ব মানে সেবার পথ, নয় যে নিজের অধিকার।

পরিবারে হোক ভালোবাসা, সমাজে হোক শান্তি,
সত্যের পথে হাতে হাত রেখে গড়ি ন্যায়ের ভুবনখানি।
হিংসা ছেড়ে সহযোগিতায় গড়ি সুন্দর দেশ,
সততারই আলো জ্বেলে দূর করি সব ক্লেশ।

যে হৃদয়ে তাকওয়া থাকে, সে হৃদয় হয় নম্র,
আল্লাহভীরু মানুষ কখনো অন্যায় করে না অবিরত।
গোপনেও সে ভয় করে রবের মহিমাময় নাম,
মানুষ না দেখলেও জানে—আল্লাহ দেখেন সব কাম।

তাই চলি কুরআনের পথে, সুন্নাহরই আলোয়,
সত্য, ন্যায় ও তাকওয়া থাকুক জীবনজুড়ে ভালোয়।
দুনিয়ার মোহ পেরিয়ে গড়ি আখিরাতের ঘর,
আল্লাহর সন্তুষ্টিই হোক জীবনের শ্রেষ্ঠ বর।

আবু লাহাবের কাহিনি শুধু ইতিহাস নয়,
প্রতিটি যুগের মানুষের জন্য সতর্কবাণী হয়।
অহংকারে সত্য হারালে হারায় জীবনের মান,
মিথ্যা শক্তি ক্ষণিক জ্বলে, সত্য পায় সম্মান।

যে মানুষ আল্লাহকে মানে, সত্যকে ভালোবাসে,
সৎকর্ম নিয়ে জীবন গড়ে, ন্যায়ের পথে হাসে,
তার জীবনেই শান্তি নামে, অন্তর পায় আলো,
দুনিয়া পেরিয়ে আখিরাতেও আশা থাকে ভালো।

এসো তবে অহংকারের পথটি ছেড়ে দিই,
অন্যায়-অসত্যের সব বন্ধন ছিন্ন করি।
ধন নয়, মান নয়, পদ নয়—ঈমান হোক প্রাণ,
তাকওয়া হোক পথের আলো, সৎকর্ম হোক গান।

মিথ্যার পথে নয় যে জীবন, সত্যের পথে চলি,
অন্যের দুঃখ নিজের মনে অনুভব করি বলি।
জিহ্বাকে রাখি সংযত, অন্তর রাখি নির্মল,
মানুষের হক রক্ষা করে জীবন করি সফল।

যে সম্পদ রব দিয়েছেন, রাখি তারই আমানত,
যে শক্তি তিনি দিয়েছেন, করি ন্যায়ের খিদমত।
যে জ্ঞান তিনি দিয়েছেন, বিলাই মানুষের মাঝে,
যে জীবন তিনি দিয়েছেন, ব্যয় করি তাঁর কাজে।

শেষে যখন ডাক আসবে, থামবে জীবনের গান,
সেদিন কেবল কাজে আসবে ঈমান ও নেক আমল-দান।
তাই আজই প্রস্তুত হও, কালকে ভরসা নয়,
মৃত্যু কখন আসবে মানুষ জানে না তার ক্ষয়।

হে আল্লাহ, অহংকার থেকে রাখো আমাদের দূর,
সত্যের পথে অটল রেখো, করো হৃদয় নূর।
মিথ্যা, গীবত, অপবাদ থেকে রাখো আমাদের মুক্ত,
জুলুম, বিদ্বেষ, হিংসা থেকে রাখো অন্তর পবিত্র।

হালাল পথে রিজিক দাও, দাও আমলের শক্তি,
সত্যের পথে চলার তাওফিক, দাও ঈমানের ভক্তি।
সম্পদ দাও—কিন্তু যেন অহংকার না হয়,
ক্ষমতা দাও—ন্যায়ের পথে ব্যবহার যেন হয়।

কথায় দাও সংযম, কাজে দাও সততা,
হৃদয়ে দাও তাকওয়া, জীবনে দাও পবিত্রতা।
শেষ নিশ্বাসে ঈমান দাও, কবুল করো প্রাণ,
আখিরাতে দাও তোমার রহমত, জান্নাতের সম্মান।

সূরা আল-মাসাদের শিক্ষা হোক জীবনের পথ,
অহংকার ছেড়ে সত্য ধরি—এই হোক দৃঢ় শপথ।
ধন নয়, মান নয়, সত্য-ঈমান হোক জীবনের আলো,
আল্লাহর সন্তুষ্টির পথে চলাই হোক আমাদের ভালো।

হে পরম রব, তোমার পথে রাখো আমাদের স্থির,
তোমার রহমতের ছায়ায় করো জীবন আলোকিত ও ধীর।
দুনিয়া-আখিরাতের কল্যাণ দাও, মুছে দাও সব ভয়—
তোমার সন্তুষ্টিই হোক আমাদের জীবনের পরম জয়।

আমিন।

 

মন্তব্য করুন

ব্লগ