Loading..

ব্লগ

রিসেট

২৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ০৪:১৯ পূর্বাহ্ণ

সূরা আল-মা‘আরিজের আলোকে আখিরাতের জবাবদিহি ও সফল জীবনের পথ মোঃ মুজিবুর রহমান

সূরা আল-মা‘আরিজের আলোকে আখিরাতের জবাবদিহি ও সফল জীবনের পথ

মোঃ মুজিবুর রহমান
সহকারী অধ্যাপক
মোজাদ্দেদীয়া ইসলামিয়া আলিম মাদ্রাসা, কালিয়াকৈর, গাজীপুর।

পবিত্র কুরআন মানবজাতির জন্য আল্লাহ তাআলার হিদায়াতের গ্রন্থ। এতে মানুষের ব্যক্তিগত জীবন, পারিবারিক জীবন, সামাজিক দায়িত্ব, নৈতিকতা, ইবাদত এবং পরকালীন মুক্তির পথ সম্পর্কে সুস্পষ্ট নির্দেশনা রয়েছে। মক্কায় অবতীর্ণ সূরা আল-মা‘আরিজও মানুষের হৃদয়কে আখিরাতের বাস্তবতার দিকে ফিরিয়ে দেওয়ার এক শক্তিশালী আহ্বান।

এই সূরায় কিয়ামতের ভয়াবহতা, অবিশ্বাসীদের পরিণতি, মানুষের স্বভাবগত দুর্বলতা এবং তার বিপরীতে মুমিনদের উত্তম গুণাবলি তুলে ধরা হয়েছে। মানুষ সাধারণত বিপদে অধৈর্য হয়ে পড়ে এবং সুখ-সমৃদ্ধি পেলে কৃপণ হয়ে যায়। কিন্তু ঈমানদার ব্যক্তি সালাতের মাধ্যমে আল্লাহর সঙ্গে সম্পর্ক দৃঢ় করে, নিজের সম্পদে অভাবী মানুষের অধিকার স্বীকার করে, কিয়ামতের দিনের প্রতি বিশ্বাস রাখে, আল্লাহর শাস্তিকে ভয় করে, নিজের পবিত্রতা রক্ষা করে, আমানত ও অঙ্গীকার পূরণ করে এবং সত্য সাক্ষ্যে অবিচল থাকে।

অতএব, সূরা আল-মা‘আরিজ কেবল কিয়ামতের ভয়াবহতার বর্ণনা নয়; বরং কীভাবে একজন মানুষ দুনিয়ার মোহ অতিক্রম করে আখিরাতের সফলতার জন্য নিজেকে প্রস্তুত করবে—তারও একটি গুরুত্বপূর্ণ দিকনির্দেশনা।

কিয়ামত অবশ্যম্ভাবী

সূরার শুরুতেই এমন এক আযাবের কথা বলা হয়েছে, যার আগমন অবশ্যম্ভাবী। মানুষ তা নিয়ে প্রশ্ন করতে পারে, অস্বীকার করতে পারে কিংবা দূরে মনে করতে পারে; কিন্তু আল্লাহর প্রতিশ্রুত কিয়ামত অবশ্যই সংঘটিত হবে।

মানুষের সবচেয়ে বড় ভুলগুলোর একটি হলো—দুনিয়ার জীবনকে স্থায়ী মনে করা। অথচ দুনিয়া ক্ষণস্থায়ী এবং আখিরাত চিরস্থায়ী। মানুষের চোখের সামনে প্রতিদিন জন্ম, মৃত্যু, পরিবর্তন ও বিচ্ছেদ ঘটছে। তবু সে অনেক সময় এমনভাবে জীবনযাপন করে, যেন তাকে কখনো হিসাবের মুখোমুখি হতে হবে না।

সূরা আল-মা‘আরিজ সেই ভুল ধারণাকে ভেঙে দেয়। কিয়ামত এমন একটি সত্য, যাকে অস্বীকার করে কেউ তা থেকে মুক্তি পাবে না। সেদিন মানুষের বাহ্যিক পরিচয়, সম্পদ, ক্ষমতা কিংবা সামাজিক মর্যাদা কোনো কাজে আসবে না; বরং তার ঈমান ও আমলই হবে তার প্রকৃত সম্বল।

কিয়ামতের দিনের ভয়াবহতা

সূরার পরবর্তী আয়াতগুলোতে কিয়ামতের দিনের ভয়াবহ দৃশ্য তুলে ধরা হয়েছে। আকাশের অবস্থা হবে পরিবর্তিত, পাহাড়গুলো হবে ভঙ্গুর ও ছিন্ন-বিচ্ছিন্ন। মানুষের পরিচিত পৃথিবী সেদিন সম্পূর্ণ ভিন্ন রূপ ধারণ করবে।

সবচেয়ে ভয়াবহ বিষয় হলো—সেদিন মানুষ নিজের সবচেয়ে আপনজনের কাছ থেকেও বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়বে। যে মানুষ দুনিয়ায় সন্তান, স্ত্রী, ভাই, পরিবার ও আত্মীয়স্বজনকে নিজের সবচেয়ে বড় আশ্রয় মনে করত, কিয়ামতের ভয়াবহতায় সে তাদের বিনিময়ে নিজেকে রক্ষা করার আকাঙ্ক্ষা করবে।

কিন্তু সেদিন কোনো পার্থিব সম্পদ, আত্মীয়তা কিংবা বিনিময় তাকে আল্লাহর শাস্তি থেকে রক্ষা করতে পারবে না।

এ শিক্ষা আমাদের মনে করিয়ে দেয়—দুনিয়ার সম্পর্কগুলো গুরুত্বপূর্ণ হলেও আখিরাতের সফলতার জন্য প্রত্যেক মানুষকে নিজ নিজ ঈমান ও আমলের দায়িত্ব নিজেকেই বহন করতে হবে।

মানুষের স্বভাবগত দুর্বলতা

সূরা আল-মা‘আরিজ মানুষের একটি গুরুত্বপূর্ণ দুর্বলতার কথা তুলে ধরে—মানুষ বিপদে পড়লে অত্যন্ত অধৈর্য ও হতাশ হয়ে পড়ে, আর কল্যাণ ও সম্পদ লাভ করলে অনেক সময় কৃপণ হয়ে যায়।

এটি মানুষের মনোজগতের একটি বাস্তব চিত্র। বিপদ এলে সে বলে, ‘আমারই কেন এমন হলো?’ সুখ এলে ভুলে যায়—এই নিয়ামত কার পক্ষ থেকে এসেছে। দুঃখের সময় ধৈর্য হারায়, আর সুখের সময় কৃতজ্ঞতা ভুলে যায়।

ইসলাম মানুষকে এই দুই চরম দুর্বলতা থেকে বের করে আনে। বিপদে সবর, আর নিয়ামতে শুকর—এই দুই গুণ মুমিনের জীবনকে ভারসাম্যপূর্ণ করে।

সবর মানে নিষ্ক্রিয় হয়ে বসে থাকা নয়; বরং আল্লাহর ওপর ভরসা রেখে বৈধ উপায়ে প্রয়োজনীয় চেষ্টা করা এবং বিপদের সময় নিজেকে সংযত রাখা। আর শুকর শুধু মুখে আলহামদুলিল্লাহ বলা নয়; বরং নিয়ামতের প্রকৃত দাতাকে স্বীকার করা এবং সেই নিয়ামতকে আল্লাহর সন্তুষ্টির পথে ব্যবহার করা।

সালাত মুমিনের জীবনের ভিত্তি

এই সূরায় মানুষের দুর্বলতার ব্যতিক্রম হিসেবে প্রথমেই সালাত আদায়কারীদের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। তারা এমন মানুষ, যারা নিজেদের নামাজের ব্যাপারে যত্নবান।

সালাত মানুষকে আল্লাহর সঙ্গে সম্পর্কিত করে। এটি শুধু একটি আনুষ্ঠানিক ইবাদত নয়; বরং একজন মুমিনের আত্মশুদ্ধি, শৃঙ্খলা ও আল্লাহসচেতনতার অন্যতম প্রধান মাধ্যম।

যে ব্যক্তি নিয়মিত সালাত আদায় করে, সে দিনে বারবার নিজের জীবনের প্রকৃত উদ্দেশ্য স্মরণ করে। সে বুঝতে শেখে—আমি স্বাধীন ও দায়িত্বহীন নই; আমি আমার রবের বান্দা এবং একদিন তাঁর কাছে ফিরে যেতে হবে।

তাই সালাত শুধু মসজিদে বা নির্দিষ্ট সময়ে সম্পন্ন করার একটি কাজ নয়; বরং সালাতের শিক্ষা যেন মানুষের চরিত্র, আচরণ, কথা ও কাজে প্রতিফলিত হয়—এটাই তার প্রকৃত সার্থকতা।

সম্পদে দরিদ্রের অধিকার

সূরা আল-মা‘আরিজ মুমিনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ গুণ হিসেবে সম্পদে নির্ধারিত হক আদায়ের কথা বলে। এর মাধ্যমে ইসলামের সামাজিক ন্যায়বোধ স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

ইসলাম সম্পদ অর্জনকে নিষিদ্ধ করেনি; বরং হালাল উপায়ে সম্পদ অর্জন, তার যথাযথ ব্যবহার এবং নির্ধারিত অধিকার আদায়ের নির্দেশ দিয়েছে।

সমাজে কেউ অভাবী, কেউ অসহায়, কেউ উপার্জনে অক্ষম—এ বাস্তবতাকে ইসলাম উপেক্ষা করে না। যাদের ওপর যাকাত ফরজ হয়েছে, তাদের সম্পদে শরিয়ত নির্ধারিত হক রয়েছে। এর পাশাপাশি সাধারণ দান-সদকা, সাহায্য ও মানবিক সহযোগিতারও রয়েছে বিশেষ মর্যাদা।

একজন মুমিন নিজের সম্পদকে শুধু নিজের ভোগের উপকরণ মনে করে না। সে জানে—সম্পদ আল্লাহর দেওয়া আমানত। তাই সম্পদের মাধ্যমে সে নিজের প্রয়োজন পূরণ করার পাশাপাশি অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ায়।

কিয়ামতের প্রতি বিশ্বাস

মুমিনের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো প্রতিদান দিবসের প্রতি বিশ্বাস। সে জানে, এই পৃথিবীর জীবনই শেষ নয়। মৃত্যুর পর পুনরুত্থান হবে এবং প্রত্যেক মানুষকে তার কর্মের হিসাব দিতে হবে।

এই বিশ্বাস মানুষের চরিত্রে গভীর প্রভাব ফেলে।

যে ব্যক্তি জানে তাকে একদিন আল্লাহর সামনে দাঁড়াতে হবে, সে অন্যায় করতে ভয় পায়। গোপনে অন্যের অধিকার নষ্ট করার সাহস করে না। মানুষের চোখ এড়িয়ে গেলেও আল্লাহর দৃষ্টি এড়ানো যায় না—এই বিশ্বাস তাকে সৎ থাকতে সাহায্য করে।

আখিরাতের বিশ্বাস তাই মানুষের জন্য নৈতিক নিয়ন্ত্রণের এক শক্তিশালী ভিত্তি।

আল্লাহভীতি ও আত্মসংযম

সূরায় মুমিনদের এমন মানুষ হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে, যারা তাদের প্রতিপালকের শাস্তিকে ভয় করে। এই ভয় হতাশার ভয় নয়; এটি দায়িত্বশীলতা ও আল্লাহসচেতনতার ভয়।

তাকওয়া মানুষকে ভেতর থেকে পরিবর্তন করে। আইন বা মানুষের নজরদারি না থাকলেও তাকওয়াবান ব্যক্তি নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করে। কারণ সে জানে—আল্লাহ সবকিছু দেখেন এবং প্রত্যেক কাজের হিসাব হবে।

তাকওয়া মানুষকে অন্যায় থেকে দূরে রাখে, অহংকার কমায়, অন্তরকে পরিশুদ্ধ করে এবং ন্যায় ও কল্যাণের পথে পরিচালিত করে।

চরিত্রের পবিত্রতা

সূরা আল-মা‘আরিজে মুমিনদের একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হিসেবে লজ্জাস্থান সংরক্ষণের কথা বলা হয়েছে। এর মাধ্যমে ব্যক্তিগত পবিত্রতা, লজ্জাশীলতা ও বৈধতার সীমারেখা রক্ষার শিক্ষা পাওয়া যায়।

ইসলাম মানুষের স্বাভাবিক প্রবৃত্তিকে অস্বীকার করে না; বরং তা বৈধ ও মর্যাদাপূর্ণ পথে পরিচালিত করে। বিবাহকে বৈধ সম্পর্কের মাধ্যম হিসেবে গ্রহণ করে এবং অবৈধ যৌনাচার থেকে বিরত থাকার নির্দেশ দেয়।

বর্তমান সময়ে অশ্লীলতা, অবাধ সম্পর্ক ও নৈতিক অবক্ষয়ের নানা উপকরণ মানুষের সামনে উপস্থিত। এ অবস্থায় কুরআনের এই শিক্ষা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ—চোখ, মন, চিন্তা ও আচরণকে পবিত্র রাখা এবং শরিয়তের সীমারেখা রক্ষা করা মুমিনের দায়িত্ব।

আমানত ও অঙ্গীকার রক্ষা

মুমিনদের আরেকটি গুণ হলো—তারা আমানত ও অঙ্গীকার রক্ষা করে।

আমানত শুধু টাকা-পয়সা বা কোনো বস্তু নয়। দায়িত্বও আমানত, পদও আমানত, জ্ঞানও আমানত, মানুষের গোপন কথাও আমানত। শিক্ষকতার দায়িত্ব, ব্যবসার দায়িত্ব, পারিবারিক দায়িত্ব, সামাজিক দায়িত্ব—সবই আল্লাহর দেওয়া পরীক্ষার অংশ।

একজন বিশ্বস্ত মানুষ কথা দিলে কথা রাখে। দায়িত্ব পেলে যথাযথভাবে পালন করে। অন্যের সম্পদ বা অধিকার নিজের স্বার্থে ব্যবহার করে না।

বিশ্বাসযোগ্যতা হারিয়ে গেলে ব্যক্তি ও সমাজ—উভয়ের ভিত্তি দুর্বল হয়ে যায়। তাই আমানতদারি ইসলামী চরিত্রের অন্যতম প্রধান সৌন্দর্য।

সত্য সাক্ষ্য ও ন্যায়বোধ

সূরায় সত্য সাক্ষ্যে অবিচল থাকার কথাও বলা হয়েছে। সত্য সাক্ষ্য শুধু আদালতের বিষয় নয়; বরং জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রেই সত্যনিষ্ঠ থাকা প্রয়োজন।

ব্যক্তিগত লাভের জন্য মিথ্যা বলা, পক্ষপাতিত্ব করা, নিরপরাধকে দোষী বানানো কিংবা অপরাধীকে রক্ষা করা—এসব ন্যায়বিচারের পরিপন্থী।

একজন মুমিনের কাছে সত্য সত্যই, আর অন্যায় অন্যায়ই। নিজের স্বার্থের বিরুদ্ধেও সত্য কথা বলার সাহস তার থাকতে হবে।

সমাজে ন্যায় প্রতিষ্ঠার জন্য এমন মানুষ প্রয়োজন, যারা সত্যকে ব্যক্তিগত সম্পর্ক, অর্থ, ভয় বা স্বার্থের কাছে বিক্রি করে না।

সালাতের মাধ্যমে শুরু, সালাতের মাধ্যমে পূর্ণতা

লক্ষণীয় বিষয় হলো—এই গুণাবলির তালিকায় সালাতের গুরুত্ব শুরুতেও এসেছে এবং শেষের দিকেও এসেছে। এর মাধ্যমে বোঝা যায়, সালাত মুমিনের জীবনের কেন্দ্রীয় ইবাদত।

কিন্তু সালাতের প্রকৃত প্রভাব তখনই প্রকাশ পায়, যখন তা মানুষের চরিত্রকে উন্নত করে। নামাজ পড়েও যদি কেউ অন্যের অধিকার নষ্ট করে, আমানতের খেয়ানত করে, মিথ্যা বলে কিংবা অন্যায় কাজে লিপ্ত থাকে, তবে তাকে নিজের আমল ও চরিত্র গভীরভাবে পর্যালোচনা করতে হবে।

সত্যিকারের সালাত মানুষকে আল্লাহসচেতন, সংযমী ও দায়িত্বশীল হতে সাহায্য করে।

জান্নাত মুমিনের চূড়ান্ত পুরস্কার

সূরার মাঝামাঝি অংশে যেসব গুণের কথা বলা হয়েছে, সেগুলোর অধিকারীদের জন্য সম্মানিত জান্নাতের সুসংবাদ রয়েছে।

এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হলো—জান্নাত শুধু দাবি করার বিষয় নয়; বরং ঈমান, ইবাদত, নৈতিকতা ও সৎকর্মের মাধ্যমে তার জন্য প্রস্তুতি নিতে হয়।

ঈমান মানুষের অন্তরের ভিত্তি, আর সৎকর্ম সেই ঈমানের বাস্তব প্রকাশ। সালাত, দান, আমানতদারি, সত্যবাদিতা, পবিত্রতা, তাকওয়া ও ধৈর্য—এসব গুণ মুমিনের জীবনে একে অপরের সঙ্গে সম্পর্কিত।

দুনিয়ার মোহ থেকে আখিরাতের প্রস্তুতি

মানুষ দুনিয়ায় সম্পদ, মর্যাদা, ক্ষমতা ও আরামের পেছনে ছুটে। কিন্তু সূরা আল-মা‘আরিজ স্মরণ করিয়ে দেয়—এসব কোনো কিছুই স্থায়ী নয়।

সম্পদ থাকবে না, পদ থাকবে না, দেহ থাকবে না, পরিচিত পরিবেশও থাকবে না; মানুষ একদিন একাই তার রবের সামনে উপস্থিত হবে।

তাই দুনিয়ার বৈধ সম্পদ ও সুযোগকে অস্বীকার না করে এগুলোকে আখিরাতের পাথেয় বানানোই বুদ্ধিমানের কাজ। সম্পদ থাকলে যাকাত ও সদকা দিতে হবে, ক্ষমতা থাকলে ন্যায় প্রতিষ্ঠা করতে হবে, জ্ঞান থাকলে মানুষের উপকার করতে হবে, সময় থাকলে ইবাদত ও কল্যাণকর কাজে ব্যয় করতে হবে।

অহংকার ও অবহেলার পরিণতি

সূরার শেষাংশে এমন মানুষদের সতর্ক করা হয়েছে, যারা কুরআনের সত্য বার্তা থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয় এবং দুনিয়ার খেলাধুলা ও অনর্থক কাজে ডুবে থাকে।

মানুষ যতই শক্তিশালী হোক, আল্লাহর ক্ষমতার বাইরে নয়। আল্লাহ চাইলে একটি জাতির পরিবর্তে অন্য জাতি সৃষ্টি করতে পারেন। মানুষের মর্যাদা তার অহংকারে নয়; বরং ঈমান, তাকওয়া ও সৎকর্মে।

অতএব, কুরআনের আহ্বানকে অবহেলা না করে নিজের জীবনকে সংশোধন করা জরুরি।

কিয়ামতের দিনের একাকিত্ব

সূরার শেষ আয়াতগুলোতে কিয়ামতের দিনের মানুষের অবস্থা আবারও স্মরণ করানো হয়েছে। মানুষ কবর থেকে উঠে দ্রুত নির্ধারিত স্থানের দিকে যাবে। তাদের দৃষ্টি থাকবে অবনত, আর তাদের ওপর থাকবে লাঞ্ছনার ছাপ।

এই দৃশ্য মানুষকে গভীরভাবে আত্মসমালোচনার দিকে আহ্বান করে।

আজ আমাদের হাতে সময় আছে। আজ আমরা তওবা করতে পারি, সালাত ঠিক করতে পারি, মানুষের অধিকার ফিরিয়ে দিতে পারি, হারাম থেকে বাঁচতে পারি, আমানত আদায় করতে পারি, দরিদ্রের পাশে দাঁড়াতে পারি এবং নিজের জীবনকে আল্লাহর সন্তুষ্টির পথে পরিচালিত করতে পারি।

কিন্তু মৃত্যুর পর আমলের সুযোগ থাকবে না।

আমাদের জীবনে সূরা আল-মা‘আরিজের শিক্ষা

সূরা আল-মা‘আরিজের আলোকে একজন সচেতন মুসলিমের জীবনে কয়েকটি বিষয় বিশেষভাবে গুরুত্ব পাওয়া উচিত—

প্রথমত— কিয়ামতের প্রতি দৃঢ় বিশ্বাস রাখতে হবে।

দ্বিতীয়ত— বিপদে অধৈর্য না হয়ে সবর করতে হবে এবং নিয়ামতে কৃতজ্ঞ হতে হবে।

তৃতীয়ত— পাঁচ ওয়াক্ত সালাত যথাযথভাবে আদায় ও সংরক্ষণ করতে হবে।

চতুর্থত— যাকাত ফরজ হলে তা যথাযথভাবে আদায় করতে হবে এবং সামর্থ্য অনুযায়ী দরিদ্র-অসহায়ের পাশে দাঁড়াতে হবে।

পঞ্চমত— নিজের পবিত্রতা, লজ্জাশীলতা ও নৈতিক চরিত্র রক্ষা করতে হবে।

ষষ্ঠত— আমানত ও অঙ্গীকার রক্ষা করতে হবে।

সপ্তমত— সত্য সাক্ষ্য দিতে হবে এবং ন্যায়বিচারে অবিচল থাকতে হবে।

অষ্টমত— সম্পদের মোহে আখিরাতকে ভুলে যাওয়া যাবে না।

নবমত— আল্লাহর রহমতের আশা রাখতে হবে এবং তাঁর শাস্তি থেকে সতর্ক থাকতে হবে।

দশমত— প্রতিদিন নিজের আমল ও চরিত্রের হিসাব নিতে হবে, কারণ একদিন আল্লাহর সামনে পূর্ণ হিসাব দিতে হবে।

উপসংহার

সূরা আল-মা‘আরিজ মানুষের সামনে দুনিয়া ও আখিরাতের প্রকৃত সম্পর্ক স্পষ্ট করে। দুনিয়া হলো পরীক্ষার ক্ষেত্র, আর আখিরাত হলো চূড়ান্ত পরিণতির স্থান। মানুষ এখানে তার ঈমান, ইবাদত, চরিত্র, সম্পদ, দায়িত্ব ও আচরণের মাধ্যমে নিজের ভবিষ্যৎ গড়ে নেয়।

মানুষ স্বভাবতই বিপদে অস্থির এবং সুখে কৃপণ হতে পারে; কিন্তু ঈমান তাকে এই দুর্বলতা অতিক্রম করতে শেখায়। সালাত তাকে আল্লাহর সঙ্গে যুক্ত করে, তাকওয়া তাকে অন্যায় থেকে দূরে রাখে, দান তাকে স্বার্থপরতা থেকে মুক্ত করে, পবিত্রতা তাকে নৈতিক অবক্ষয় থেকে রক্ষা করে, আমানতদারি তাকে বিশ্বস্ত করে এবং সত্যনিষ্ঠা তাকে ন্যায়ের পথে প্রতিষ্ঠিত করে।

তাই সূরা আল-মা‘আরিজের শিক্ষা হৃদয়ে ধারণ করে আমাদের প্রত্যেকের উচিত—আজই নিজের জীবনকে সংশোধন করা, সালাতকে সুদৃঢ় করা, মানুষের অধিকার আদায় করা, সম্পদের প্রতি সংযমী হওয়া, আমানত রক্ষা করা, সত্য ও ন্যায়ের পথে অবিচল থাকা এবং কিয়ামতের দিনের জন্য প্রস্তুতি নেওয়া।

দুনিয়ার জীবন যতই দীর্ঘ মনে হোক, তা একদিন শেষ হবে। কিন্তু আখিরাতের জীবন চিরস্থায়ী। তাই ক্ষণস্থায়ী জীবনের মোহে চিরস্থায়ী জীবনের সফলতা যেন নষ্ট না হয়—এটাই সূরা আল-মা‘আরিজের অন্যতম গভীর শিক্ষা।

হে আল্লাহ! আমাদের ঈমানকে দৃঢ় করুন, সালাতকে সুন্দর করুন, চরিত্রকে পবিত্র করুন, আমানত ও অঙ্গীকার রক্ষার তাওফিক দিন, বিপদে সবর ও নিয়ামতে শুকর করার শক্তি দিন এবং কিয়ামতের দিনের জবাবদিহির জন্য প্রস্তুত হওয়ার তাওফিক দান করুন। আমাদের দুনিয়ার জীবনকে আপনার সন্তুষ্টির পথে পরিচালিত করুন এবং আখিরাতে নেককার বান্দাদের সঙ্গে জান্নাতুল ফিরদাউস নসিব করুন। আমিন।

 

মন্তব্য করুন