সহকারী অধ্যাপক
২৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ০৪:৩৬ পূর্বাহ্ণ
কিয়ামতের পথে আমলের পাথেয় (সূরা আল-মা‘আরিজের আলোকে কিয়ামতের স্মরণ, মুমিনের গুণ ও সফল জীবনের শিক্ষা) মোঃ মুজিবুর রহমান
|
|
কিয়ামতের পথে আমলের পাথেয়
(সূরা আল-মা‘আরিজের আলোকে কিয়ামতের স্মরণ, মুমিনের গুণ ও সফল জীবনের শিক্ষা)
মোঃ মুজিবুর রহমান
সহকারী অধ্যাপক
মোজাদ্দেদীয়া ইসলামিয়া আলিম মাদ্রাসা, কালিয়াকৈর, গাজীপুর।
যাঁর হুকুমে জীবন জাগে, মুছে মনের ভয়,
তাঁরই বাণী কুরআনজুড়ে সত্যের পরিচয়।
সেই বাণীরই আলো ধরে জাগুক অন্তরপ্রাণ,
আখিরাতের পথের পাথেয় হোক ঈমানের গান।
দুনিয়ার এই ক্ষণিক জীবন, ক্ষণিক তার আয়োজন,
হাসি-কান্না, সুখ-দুঃখ মিলে ক্ষণস্থায়ী এ ভুবন।
আজকে যারা আপনজন, কালকে তারা দূর,
মৃত্যু এসে থামিয়ে দেবে জীবনেরই সুর।
একদিন হবে মহাসমাগম, কিয়ামতের সেই দিন,
খুলে যাবে কর্মের খাতা, প্রকাশ পাবে ঋণ।
লুকানো যত কথা সেদিন সামনে আসবে সব,
কর্মের ভারেই নির্ধারিত হবে সবার রব।
সূরা আল-মা‘আরিজ শোনায় সেই দিনেরই কথা,
অবশ্যম্ভাবী আখিরাত—নেই কোনোই ব্যর্থতা।
মানুষ যত দূরে ভাবুক, সত্য হবে তাই,
আল্লাহ যেদিন ডাকবেন, সেদিন পালাবার পথ নাই।
আকাশ সেদিন বদলে যাবে, কাঁপবে ধরার বুক,
পর্বত হবে তুলার মতো, হারাবে দৃঢ় রূপ।
চেনা পৃথিবী চেনা থাকবে না আর সেদিন শেষে,
মানুষ ছুটবে নিজের হিসাব নিয়ে ভীত হৃদয় নিয়ে।
আপনজনও আপন থাকবে না কিয়ামতের ভয়েতে,
ভাই চিনবে না ভাইকে সেদিন নিজের প্রাণের চেয়ে।
সন্তান, স্ত্রী, স্বজন তখন কাছে থেকেও দূর,
প্রত্যেকে শুধু ভাববে—বাঁচি কীভাবে একটুখানি সুর!
অপরাধী চাইবে দিতে আপন সন্তান বিনিময়ে,
স্ত্রী, ভাই, পরিবার দেবে মুক্তির আশায় নিয়ে।
পৃথিবীর সব মানুষ দিলেও হবে না পার,
আল্লাহর নির্ধারিত বিচার ঠেকানোর সাধ্য কার?
কখনো নয়! সে মুক্তি সেদিন মিলবে না আর কভু,
কর্মের ফল এড়ায় না কেউ, যতই থাকুক প্রভু।
দুনিয়ার ধন, দম্ভ, ক্ষমতা—সবই হবে ক্ষয়,
সত্যিকার যে পাথেয়, সেটি নেক আমলময়।
মানুষ বড়ই দুর্বল সৃষ্ট, অস্থির তার মন,
বিপদ এলে হাহাকার করে, হারায় ধৈর্যক্ষণ।
সুখ এলে সে কৃপণ হয়ে আঁকড়ে ধরে ধন,
ভুলে যায় কে দিয়েছেন তাকে জীবন, সুখ ও মন।
তবু যারা সালাত কায়েম করে যত্নভরে,
তাদের জীবন আলাদা হয় আল্লাহরই নূরে।
নামাজ তাদের হৃদয় ধোয়, জাগায় রবের ভয়,
সঠিক পথে চলার শক্তি অন্তর মাঝে রয়।
সালাত শুধু দেহের কাজ নয়, হৃদয়েরও সাধনা,
সালাত মানুষকে শেখায় রবের সামনে দাঁড়ানো।
সিজদাতে যে মাথা নত হয় মহান রবের তরে,
অহংকারের দেয়াল ভাঙে অন্তরেরই ঘরে।
নামাজ যার জীবনের মাঝে সত্য হয়ে রয়,
অন্যায় পথে পা বাড়াতে তার অন্তর কাঁপে ভয়।
সালাত যদি চরিত্রজুড়ে আনে সত্য আলো,
তবেই তো তার জীবনের প্রতিটি পথ হয় ভালো।
যার সম্পদে নির্ধারিত হক, সে হক দেয় ঠিক,
অভাবী আর বঞ্চিত মানুষ পায় তার ন্যায্য অংশ।
সম্পদ শুধু নিজের জন্য—এ ধারণা ভুল,
দান করলে সম্পদ কমে না, বরং বাড়ে তারই মূল।
যাকাত যখন ফরজ হয়, তা আদায় করা কর্তব্য,
সদকার মাধ্যমে গড়ে ওঠে মানবতার সৌন্দর্য।
অসহায়ের চোখের পানি মুছিয়ে দেওয়া দান,
দুর্বলের পাশে দাঁড়ানো মুমিনেরই সম্মান।
যে জানে একদিন তাকে রবের সামনে দাঁড়াতে হবে,
সে অন্যের অধিকার নষ্ট করে কীভাবে তবে?
গোপনে করা অন্যায়ও আল্লাহর কাছে প্রকাশ,
কোনো কর্মই হারায় না তার প্রকৃত হিসাব।
কিয়ামতের দিনের প্রতি যার অন্তরে বিশ্বাস,
তার জীবনজুড়ে জাগে আল্লাহর ভয় ও আশ্বাস।
সে জানে—আজকের কর্মই আগামী দিনের ফল,
তাই সে বেছে নেয় সত্যপথ, ত্যাগ করে ছল।
আল্লাহর আযাব থেকে মুমিন থাকে সতর্ক,
তাঁর রহমতের আশায়ও থাকে হৃদয় নত।
ভয় ও আশা—দুই ডানায় চলে তার জীবন,
রবের রহমত চেয়ে চলে নেক আমলের ক্ষণ।
পবিত্র রাখে দেহ-মন, পবিত্র রাখে দৃষ্টি,
হারাম থেকে দূরে থাকে, সংযমে তার সৃষ্টি।
বৈধ পথে ভালোবাসা পায় মর্যাদার মান,
অবৈধতার অন্ধকারে হারায় না সে প্রাণ।
লজ্জাশীলতা মুমিনের এক সুন্দর অলংকার,
শালীনতায় ফুটে ওঠে চরিত্রেরই বাহার।
চোখ, মন ও আচরণে রাখে সংযমের রেখা,
কুরআনের আদর্শ ধরে জীবন করে দেখা।
আমানত যার হাতে আসে, রক্ষা করে তাই,
বিশ্বাস ভেঙে মানুষের হক কেড়ে নেয় না ভাই।
অঙ্গীকার দিলে রাখে কথা, সত্যে থাকে স্থির,
এমন মানুষ সমাজজুড়ে করে জীবন ধীর।
আমানত শুধু অর্থ নয়—দায়িত্বও আমানত,
পদ-পদবি, জ্ঞান ও ক্ষমতা—সবই তার দায়িত্ব।
শিক্ষকের দায়িত্ব যেমন জ্ঞানের আলো দেওয়া,
অভিভাবকের কর্তব্য সন্তানকে সৎ করে গড়া।
যে দায়িত্ব পেয়েছে কেউ, তা যদি ঠিক রাখে,
আল্লাহর সন্তুষ্টি পেতে সে-ই এগিয়ে থাকে।
বিশ্বাস যার হাতে রাখা, সে যেন না করে ক্ষয়,
আমানতদার মানুষেরই সমাজে সত্য জয়।
সাক্ষ্য দিতে হলে মুমিন সত্য কথাই বলে,
স্বার্থ যদি বিরুদ্ধ হয়, তবু সত্য না টলে।
বন্ধু বলে অন্যায় ঢাকে না, শত্রু বলে মিথ্যা নয়,
ন্যায়ের পথে অবিচল থাকা মুমিনের পরিচয়।
মিথ্যার ওপর গড়ে উঠলে সমাজের ভিত্তিভূমি,
বিশ্বাস হারায় মানুষ, অশান্ত হয় জন্মভূমি।
সত্য যদি প্রতিষ্ঠিত হয় ন্যায়নীতির দ্বার,
শান্তি নামে সমাজজুড়ে, কমে অন্যায় ভার।
আবার সালাত—জীবনজুড়ে সালাতেরই পাহারা,
আল্লাহর স্মরণে ভরে উঠুক হৃদয়ের কারাগার।
নামাজ হবে জীবনের এক আলোকিত পথ,
তাতে মুছে যাবে অন্তরের অন্ধকারের ক্ষত।
যারা এসব গুণ ধারণ করে ঈমানেরই সাথে,
তাদের জন্য জান্নাত আছে সম্মানিত প্রাসাদে।
সেখানে নেই দুঃখ-কষ্ট, নেই কোনো বিচ্ছেদ,
আল্লাহর সন্তুষ্টিই হবে সর্বোচ্চ সম্পদ।
তাই দুনিয়ার মোহে পড়ে ভুলে যেও না রব,
ধন-সম্পদ, ঘরবাড়ি সব—থাকবে না তো সব।
ক্ষমতা, সৌন্দর্য, যৌবন—সবই ক্ষণিক ছায়া,
মৃত্যু এসে বলে দেবে—‘চলো, এবার মায়া ছাড়ো।’
আজ যে মানুষ শক্তিশালী, কাল সে হবে ক্ষীণ,
আজ যে মানুষ সম্পদশালী, কাল সে নিঃস্ব দিন।
আজ যে মানুষ সম্মান পায় মানুষেরই মাঝে,
কাল সে একা দাঁড়াবে রবের ন্যায়বিচারের সাজে।
তাই সময় থাকতে ফিরে এসো পরম দয়াময়ের পথে,
তওবার দরজা খোলা আছে—ফিরে এসো সত্য রথে।
গুনাহ যত বড়ই হোক, তওবা যদি হয় খাঁটি,
রবের রহমত আশা করে বদলে দাও জীবনখানি।
বিপদ এলে ধৈর্য ধরো, ভেঙে যেও না মন,
সবরের মাঝে লুকিয়ে থাকে মুমিনেরই ধন।
সুখ এলে শুকর করো, ভুলে যেও না দাতা,
নিয়ামতের কৃতজ্ঞতাতেই বাড়ে রবের দয়া।
ধন পেলে অহংকার নয়, দাও হকের অংশ,
অসহায়ের মুখে হাসি ফুটুক—এই হোক তোমার আনন্দ।
জ্ঞান পেলে অহংকার নয়, বিলাও জ্ঞানের আলো,
নিজে ভালো, অন্যকেও করো সত্যেরই ভালো।
ক্ষমতা পেলে জুলুম নয়, ন্যায় করো প্রতিষ্ঠা,
দায়িত্ব পেলে বিশ্বস্ত হও, এটাই ঈমানের শিক্ষা।
কথা দিলে কথা রাখো, সত্যে থাকো দৃঢ়,
মানুষ তোমায় বিশ্বাস করুক—এই হোক জীবনের নীর।
বন্ধুত্বে থাকুক বিশ্বস্ততা, সম্পর্কে থাকুক মান,
পরের হক না মেরে গড়ো শান্তিরই স্থান।
প্রতিবেশী, আত্মীয়, অসহায়—সবার প্রতি দয়া,
মানবতার এই সৌন্দর্যেই মুমিনের পরিচয় পাওয়া।
কিয়ামতের সেই দিনটি কখন আসবে কেউ জানে না,
মৃত্যুর ডাকও আগাম বলে কারও ঘরে আসে না।
তাই আগামী দিনের আশায় আজকে রেখো না ঋণ,
আজকের নেক আমলই হোক আগামী দিনের দিন।
কবরের নীরব ঘরে যখন একা হবে প্রাণ,
সঙ্গে যাবে না ধনরত্ন, যাবে না কোনো মান।
সঙ্গে যাবে ঈমান, যাবে আমল, যাবে সৎকর্ম,
সঙ্গে যাবে সত্যপথে কাটানো জীবনের মর্ম।
তাই হে মানুষ, ঘুম ভাঙাও, সময় এখনও আছে,
অন্যায়ের পথ ছেড়ে দাও, সত্যের আলো কাছে।
সালাত দিয়ে জীবন সাজাও, কুরআন করো সাথি,
রবের হুকুম মেনে চলো—তাতেই জীবনের গতি।
হিংসা ছেড়ে ভালোবাসা, অহংকার ছেড়ে নত,
মিথ্যা ছেড়ে সত্য গ্রহণ—হোক জীবনের ব্রত।
কৃপণতা ছেড়ে দাও, দাও অসহায়ের হক,
আমানত রক্ষা করে গড়ো চরিত্রেরই পক্ব।
কিয়ামতের ভয়াবহতা স্মরণে রাখো নিত্য,
আজকের ক্ষুদ্র কাজও সেদিন হবে মূল্যবান সত্য।
একটি ভালো কথা, একটি দয়া, একটি সৎ কাজ,
আল্লাহর কাছে হারায় না—থাকে তারই সাজ।
আবার একটি অন্যায় কথা, একটি জুলুমের দাগ,
মানুষ ভুলে গেলেও আল্লাহ রাখেন তার হিসাব।
তাই মুখের কথা মেপে বলো, হাতে রেখো সংযম,
চোখে রাখো পবিত্রতা, মনে রাখো আল্লাহর নাম।
দুনিয়ার পথে চলব আমরা আখিরাতকে সাথে,
হালাল পথে রুজি খুঁজব, সত্য থাকব কথাতে।
পরিবারে ন্যায় করব, সমাজে দেব দান,
মানুষের হক ফিরিয়ে দেব—এই হোক অঙ্গীকার মহান।
একদিন সবাই উঠবে যখন কবরের অন্ধকার ছেড়ে,
ছুটবে মানুষ নির্ধারিত সেই মহাসমাবেশে।
দৃষ্টি হবে অবনত সেদিন, থাকবে ভয়ের ছায়া,
তখন শুধু নেক আমলই হবে সত্যিকারের মায়া।
যে দিনটির কথা কুরআন আজ আমাদের জানায়,
সে দিন থেকে বাঁচতে হলে আজই জীবন সাজায়।
দুনিয়ার পথ ক্ষণিক হলেও দায়িত্ব তার বড়,
আখিরাতের সফলতার জন্য আজই হও দৃঢ়।
হে আল্লাহ, আমাদের অন্তর করো ঈমানে ভরা,
সালাতের প্রতি ভালোবাসা দাও অন্তরে ধরা।
বিপদে দাও ধৈর্য, সুখে দাও শুকরিয়া,
অন্যের হক আদায়ের তাওফিক দাও হে দয়াময়।
আমানত রক্ষার শক্তি দাও, সত্যের পথে রাখো,
হারাম থেকে দূরে রেখে হালাল পথে ডাকো।
তাকওয়ার আলো জ্বালিয়ে দাও অন্তরেরই ঘরে,
কিয়ামতের কঠিন দিনে রেখো আপন করে।
দুনিয়ার মোহে যেন আমরা আখিরাত না ভুলি,
গুনাহের অন্ধকার ছেড়ে নেকির পথে চলি।
শেষ নিঃশ্বাসে ঈমান দিও, কবরে দিও নূর,
হাশরের দিনে দয়া করে রেখো তোমার সুর।
যাদের তুমি ভালোবাসো, তাদের সাথে দিও স্থান,
নেককারদের সঙ্গ দিও, দিও জান্নাতের সম্মান।
তোমার সন্তুষ্টিই হোক আমাদের জীবনের জয়,
তোমার রহমতের ছায়াতেই মুছে যাক সব ভয়।
সূরা আল-মা‘আরিজের শিক্ষা হোক জীবনের গান—
ঈমান, সালাত, সবর, শুকর, সত্য ও আমান।
দুনিয়া পেরিয়ে আখিরাতে সফল হোক প্রাণ,
আল্লাহর সন্তুষ্টিই হোক জীবনের চূড়ান্ত সম্মান।
হে আল্লাহ! আমাদের সঠিক বুঝ দাও, সঠিক পথে চলার তাওফিক দাও এবং কিয়ামতের দিনে তোমার রহমতের ছায়ায় স্থান দাও। আমিন।
২
৫ মন্তব্য