Loading..

ব্লগ

রিসেট

২৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ০৫:১৬ পূর্বাহ্ণ

তাওহিদের ডাক ও সত্যের পথে অবিচলতা (সূরা নূহের আলোকে ) মোঃ মুজিবুর রহমান

                                            তাওহিদের ডাক ও সত্যের পথে অবিচলতা

(সূরা নূহের আলোকে )

মোঃ মুজিবুর রহমান
সহকারী অধ্যাপক
মোজাদ্দেদীয়া ইসলামিয়া আলিম মাদ্রাসা, কালিয়াকৈর, গাজীপুর।

যাঁর হুকুমে জীবনজাগে, মুছে মনের ভয়,
যাঁর দানে ধরণি হাসে, ফুলে ভরে রয়।
সেই মহান রবের নামে হৃদয় করি নত,
তাঁরই পথে জীবন গড়ি—তাঁরই হোক মতি।

আকাশজুড়ে নক্ষত্র জ্বলে, সূর্য দেয় আলো,
চাঁদের হাসি রাতকে সাজায়, পৃথিবী কত ভালো।
সাগর, নদী, পাহাড়, প্রান্তর—সবই তাঁর দান,
তাঁরই কুদরত জানিয়ে দেয় সৃষ্টির প্রতিটি প্রাণ।

মানুষ তুমি ভুলে যেও না, কে তোমার স্রষ্টা,
কার দয়াতে জীবন পেল, কার দানে এ বসতি।
ধন-সম্পদ, সন্তান-সন্ততি, স্বাস্থ্য, জ্ঞান আর প্রাণ—
সবই তো তাঁর অনুগ্রহ, সবই তাঁর দান।

একদিন এক জনপদে উঠল সত্যের বাণী,
নূহ (আ.) এলেন নিয়ে রবের দেওয়া বাণী।
বললেন, “হে আমার জাতি, রবের পথে চলো,
শিরক ছেড়ে এক আল্লাহর ইবাদতে মন দাও।”

“তাঁকে ভয় কর, তাঁকে মানো, তাঁরই হুকুম ধরো,
রাসুলের আনুগত্যে সত্যপথে চলো।
জীবন ক্ষণিক, মৃত্যু নিশ্চিত, ফিরতে হবে শেষে,
আজই ফিরে এসো তোমরা রবের রহমতের দেশে।”

দিনের পরে দিন পেরোয়, রাতের পরে রাত,
সত্যের পথে ডাকতে থাকেন নূহ (আ.) অবিরত।
কখনো তিনি প্রকাশ্যে ডাকেন, কখনো নীরব ক্ষণে,
রবের পথে আহ্বান জানান ভালোবাসার সনে।

কত মানুষ মুখ ফিরিয়ে নেয়, কত করে বিরোধ,
তবু নূহের কণ্ঠে থামে না সত্যের সেই বোধ।
উপহাস আসে, বাধা আসে, আসে কত ভয়,
তবু সত্যের পথিক জানে—রবই তার আশ্রয়।

যে সত্যের জন্য দাঁড়ায়, তাকে সহতে হয়,
পথের মাঝে কাঁটা থাকে, থাকে নানা ভয়।
কিন্তু মুমিন হার মানে না বাধার আঘাত পেয়ে,
আল্লাহর ওপর ভরসা রাখে বুকের মাঝে নিয়ে।

ফল কখন আসবে—সেটা বান্দার হাতে নয়,
চেষ্টা করা দায়িত্ব শুধু, ফল দেন মহানময়।
বীজ বুনে যে কৃষক থাকে বৃষ্টির আশায়,
তেমনি মুমিন চেষ্টা করে আল্লাহর ভরসায়।

নূহ (আ.) বললেন, “ফিরে এসো তোমাদের রবের পানে,
ক্ষমা চাও, অনুতপ্ত হও হৃদয়েরই টানে।
তিনি তো রব, মহাক্ষমাশীল, রহমতেরই দ্বার,
তাঁর রহমতের ছায়ায় মুছে যায় গুনাহের ভার।”

হে মানুষ, তুমি ভুল করেছ—ফিরে এসো আজ,
তাওবার পথে খুলে দাও অন্তরের সব লাজ।
পাপের পথে যতই যাও, ফিরে আসার পথ,
রবের রহমত ঢেকে দিতে পারে গুনাহের ক্ষত।

ইস্তিগফার শুধু মুখের বুলি নয় যে ভাই,
হৃদয় দিয়ে ভুল স্বীকারে তাওবার সত্যি চাই।
পাপ ছেড়ে সৎপথ ধরো, অন্যায় থেকে ফেরো,
রবের কাছে মাথা নত করে নতুন জীবন গড়ো।

যে হৃদয়ে তাওবার আলো, সে হৃদয় হয় নির্মল,
গুনাহ ধুয়ে সৎকর্ম গড়ে জীবন করে উজ্জ্বল।
আজকের ভুল আগামী দিনের শিক্ষা হয়ে থাক,
রবের পথে ফিরে এসে সত্যের প্রদীপ জ্বালাও।

আকাশ থেকে বৃষ্টি নামে, সিক্ত হয় ধরা,
শুষ্ক মাটি সবুজ হয়ে নতুন প্রাণে ভরা।
ফসল ফলে মাঠের বুকে, ফুল ফোটে বনে,
রহমতেরই নিদর্শন যেন ছড়িয়ে আছে ক্ষণে।

সন্তান, সম্পদ, জীবন-জীবিকা—সবই রবের দান,
কৃতজ্ঞ হয়ে ব্যবহার করো তাঁর দেওয়া সম্মান।
ধন পেয়ে অহংকার নয়, দাও অভাবীর হক,
নেয়ামতের শুকরিয়া দাও, দূর করো সব শোক।

সন্তান শুধু ঘরের শোভা—এমন ভাবনা নয়,
তাদের ঈমান, চরিত্র গড়ার দায়িত্বও হয়।
জ্ঞান যদি পাও, জ্ঞানের আলো ছড়িয়ে দাও প্রাণে,
শক্তি যদি পাও, দুর্বলের পাশে দাঁড়াও টানে।

সময় যদি পাও, সৎকর্মে করো তার ব্যবহার,
স্বাস্থ্য যদি পাও, সেবায় দাও জীবনের উপহার।
রবের দান যে নেয়ামত, ভুলে যেও না তাই,
শুকরিয়ার পথে চললে হৃদয় শান্তি পায়।

দেখো আকাশ স্তরে স্তরে, বিস্ময় তার সীমাহীন,
চাঁদের আলো রাতকে সাজায়, সূর্য করে দিন।
পৃথিবী যেন বিস্তৃত পথ, চলার জন্য স্থান,
সবকিছুরই পেছনে আছে স্রষ্টার মহিমান।

মানুষ তুমি চিন্তা করো—কে দিল এই প্রাণ?
কে দিল চোখ, কে দিল কান, কে দিল জ্ঞান-জান?
কে দিল তোমার হৃদয়জুড়ে অনুভবের আলো?
কে সাজাল এই পৃথিবীকে এত মধুর ভালো?

সৃষ্টি যত গভীর দেখো, তত বুঝবে শেষে,
স্রষ্টার কুদরত ছড়িয়ে আছে জগৎজুড়ে মিশে।
জ্ঞান যেন তোমাকে নিয়ে যায় বিনয়েরই দ্বার,
সত্য জ্ঞানেই বাড়ুক তোমার রবের প্রতি ইকরার।

সত্য যখন সামনে আসে, অহংকার যদি জাগে,
মানুষ তখন সত্য ছেড়ে মিথ্যার পথে ভাগে।
নিজের মত, নিজের গর্ব, নিজের শক্তি নিয়ে
সত্যের আলো ঢেকে রাখে অন্ধকারে গিয়ে।

অহংকারে মানুষ ভাবে—“আমিই সঠিক সব,”
উপদেশকে বোঝে অপমান, ভুলকে ভাবে রব!
এমন মন যে সত্য শোনে, তবু সত্য মানে না,
নিজের ভুলের কাছে গিয়ে নিজের মাথা নোয়ায় না।

মুমিন কিন্তু সত্য পেলে সত্যকেই গ্রহণ করে,
ভুল বুঝিলে ফিরে আসে বিনয়েরই ঘরে।
জ্ঞানী সে-ই, ভুল বুঝিলে যে সংশোধন চায়,
বিনয় যার অলংকার, রবের রহমত পায়।

পূর্বপুরুষ যা করেছে—সেটাই কি সব সত্য?
প্রমাণ ছাড়া মানলেই কি মুছে যাবে সংশয়?
সত্যের মাপকাঠি আল্লাহর ওহির বাণী,
রাসুলের সুন্নাহতেই রয়েছে হেদায়াতখানি।

নূহ (আ.)-এর জাতি আঁকড়ে ধরল পুরোনো উপাসনা,
সত্যের ডাকে ফিরল না আর, ছাড়ল না বাসনা।
ওয়াদ্দ, সুয়া, ইয়াগূস, ইয়াঊক, নাসর নাম—
শিরকের পথে মানুষ হারায় ঈমানেরই দাম।

নেককারকে সম্মান করা সুন্দর ইসলামী রীতি,
কিন্তু ইবাদতের অধিকার এক আল্লাহরই নীতি।
সিজদা, ইবাদত, চূড়ান্ত দোয়া—রবের জন্যই হয়,
তাঁর সঙ্গে কাউকে শরিক করা ঈমানবিরোধী ভয়।

তাওহিদের এই নির্মল পথে রাখো দৃঢ় পা,
আল্লাহ ছাড়া কারও কাছে ইবাদতে নত না হওয়া।

অন্যায় করে মানুষ ভাবে—“কোথায় শাস্তি আজ?”
সময় পেরোয়, দিনও যায়, বাড়ে পাপের সাজ।
কিন্তু রবের আদালতে কিছুই গোপন নয়,
প্রতিটি কর্ম একদিন তার হিসাবের বিষয়।

দুনিয়ার চোখ এড়িয়ে গেলেও এড়াবে না বিচার,
গোপন পাপও প্রকাশ পাবে রবের আদালতদ্বার।
তাই পাপকে ছোট ভেবো না, অন্যায় কোরো না,
অন্যের হক নষ্ট করে শান্তির স্বপ্ন দেখো না।

যতদিন প্রাণ আছে বুকে, ততদিন সুযোগ আছে,
তাওবার পথে ফিরে এসো রবের রহমতের কাছে।
মৃত্যু এলে বন্ধ হবে দুনিয়ার সব দ্বার,
তাই আজই সংশোধন করো জীবন-চলার ভার।

ঘর যদি হয় ঈমানের ঘর, শান্তি নামে তাতে,
সত্য, আদব, ভালোবাসা ফুটুক ঘরের সাথে।
সন্তান যেন শুধু বড় না হয় অর্থের পরিচয়ে,
মানুষ হোক ঈমান নিয়ে, উত্তম চরিত্র লয়ে।

পিতা-মাতা দায়িত্ব নিক সন্তানেরই গড়ে,
শিক্ষক জ্ঞানের আলো জ্বালুক কোমল হৃদয় ঘরে।
সন্তান শিখুক সত্য কথা, আমানতের মান,
বড়দের সম্মান করে, রাখুক সবার সম্মান।

পরিবারে সন্দেহ নয়, থাকুক মায়া-মমতা,
ক্ষমা, ধৈর্য, সহযোগিতা—হোক ঘরের কথা।
যে ঘরে আল্লাহর স্মরণ, সে ঘর শান্তিময়,
ভালোবাসার বন্ধনে সেখানে অশান্তি ক্ষয়।

তাওয়াক্কুল মানে নয় যে বসে থাকা চুপ,
চেষ্টা ছেড়ে ভাগ্যের নামে থাকা শুধু নিশ্চুপ।
নূহ (আ.)-এর জীবন শেখায় চেষ্টা অবিরাম,
রবের ওপর ভরসা রেখে পালন করো কাম।

দায়িত্ব তোমার চেষ্টা করা, ফল আল্লাহর হাতে,
সৎ পথে যে পরিশ্রম করে, সে-ই থাকে প্রভুর সাথে।
ঝড় এলেও নৌকা চালাও, রবের নামে ভর,
তাঁর সাহায্য চেয়ে চলো, হারিয়ে যেও না পথ।

যদি সবাই মুখ ফিরিয়ে নেয়, তবু সত্য ছাড়ো না,
সংখ্যা কম বলে কখনো সত্যকে হারিও না।
একজন মুমিন সত্য ধরে থাকলে দৃঢ় প্রাণে,
তারই জীবন সাক্ষী হবে কালের পরিক্রমণে।

বন্ধু যদি ভুল পথে যায়, ভালোবাসায় বোঝাও,
শত্রু হলেও ন্যায়ের কথা ন্যায়ভাবেই শোনাও।
কঠিন কথা নয়, হিকমতেরই ভাষা হোক সাথি,
সত্যের সঙ্গে কোমলতা হোক মুমিনের বাতি।

দাওয়াত মানে অপমান নয়, দাওয়াত মানে আলো,
মানুষকে পথ দেখানো, ভালোবাসার ভালো।
হৃদয় জিতে সত্য বলো, অহংকারকে হারাও,
নিজের আমল আগে শুদ্ধ করে অন্যকে পথ দেখাও।

হে মানুষ, আজ থামো একটু, নিজের দিকে চাও,
কোথায় আছ, কোন পথে আছ—নিজেকেই বোঝাও।
জীবন কি শুধু ধন-সম্পদ, খ্যাতি আর সম্মান?
নাকি রবের সন্তুষ্টিই জীবনের প্রধান প্রাণ?

মোবাইল, বাজার, ব্যস্ততা আর দুনিয়ারই টান,
সবকিছুর মাঝেও রেখো আল্লাহর স্মরণ-জ্ঞান।
পৃথিবীর কাজ করবে তুমি, তবু ভুলে যেও না,
যে রব তোমায় জীবন দিলেন, তাঁকে দূরে রেখো না।

সম্পদ থাকুক—হৃদয় যেন সম্পদের দাস না হয়,
ক্ষমতা থাকুক—অহংকার যেন হৃদয়েতে না রয়।
জ্ঞান থাকুক—বিনয় যেন সঙ্গে থাকে চির,
সত্য থাকুক মুখের মাঝে, আমল হোক নির্মল স্থির।

সত্যের পথে চলব আমরা, যতই আসুক ভয়,
আল্লাহর ওপর ভরসা রেখে চলব নির্ভয়।
শিরক থেকে বাঁচব আমরা, তাওহিদ রাখব প্রাণে,
কুরআন-সুন্নাহ আঁকড়ে থাকব জীবন-মরণের টানে।

ভুল হলে আর দেরি নয়, তাওবাতে ফিরব আজ,
ইস্তিগফারে ধুয়ে নেব হৃদয়ের সব লাজ।
অন্যের হক ফিরিয়ে দেব, মুছে দেব অন্যায়,
সৎকর্ম দিয়ে জীবন সাজাব রবের সন্তোষ-পথে।

অহংকারকে দূরে রেখে বিনয় করব সাথি,
সত্য কথা বলব সদা, ন্যায়ের রাখব বাতি।
বিপদ এলে ধৈর্য ধরব, হতাশ হব না,
রবের রহমত থেকে কখনো নিরাশ হব না।

হে আল্লাহ, আমাদের অন্তর তাওহিদে ভরাও,
শিরকের সব অন্ধকার থেকে আমাদের বাঁচাও।
নূহ (আ.)-এর মতো সত্যে রাখো অবিচল,
দাওয়াতের পথে দাও আমাদের ধৈর্যেরই বল।

গুনাহ হলে তাওবার পথে ফিরিয়ে নাও প্রভু,
ইস্তিগফারে শুদ্ধ করো হৃদয়ের কালো ক্ষতও।
অহংকারের বিষ থেকে রাখো আমাদের দূরে,
সত্য গ্রহণের শক্তি দাও বিনয়েরই সুরে।

আমাদের ঘর করো তুমি ঈমানেরই ঘর,
সন্তানদের চরিত্র দাও সুন্দর ও পবিত্র পর।
জ্ঞান দাও, হিকমত দাও, সৎকর্মেরই আলো,
মানুষের কল্যাণে যেন জীবন করি ভালো।

যে মজলুম কাঁদে, তার পাশে দাঁড়াবার শক্তি দাও,
অসহায়ের অশ্রু মুছে দেওয়ার তাওফিক দাও।
অন্যের হক নষ্ট না করি, জুলুম থেকে রাখো দূর,
ন্যায়, সত্য, আমানতদারিতে করো জীবন ভরপুর।

দুনিয়ার মোহ পেরিয়ে যেন আখিরাতকে চাই,
তোমার সন্তুষ্টির বাইরে কোনো লক্ষ্য যেন নাই।
মৃত্যুর আগে ঈমান নিয়ে জীবন করি শেষ,
তোমার রহমত ছায়া দিক আখিরাতের দেশ।

নূহ (আ.)-এর ডাকের মতো হৃদয়ে জাগুক বাণী—
“
এক আল্লাহর ইবাদত করো”—এই হোক জীবনের জানি।
তাঁরই পথে চলব আমরা, তাঁরই কাছে চাই,
ঈমান, তাওবা, সৎকর্ম নিয়ে শেষ ঠিকানায় যাই।

হে আমাদের রব, আমাদের ক্ষমা করো,
আমাদের হেদায়াত দাও, অন্তরকে পবিত্র করো,
সত্যের পথে অবিচল রাখো,
কুরআন-সুন্নাহর আলোয় জীবন সাজানোর তাওফিক দাও।

আমিন, ইয়া রব্বাল আলামিন।

 

মন্তব্য করুন