অধ্যক্ষ
২৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ০৭:২৪ পূর্বাহ্ণ
কেন কিছু মানুষ সবকিছু পেয়েও শান্তি পায় না?
কেন কিছু মানুষ সবকিছু পেয়েও শান্তি পায় না?
মানুষ মনে করে—অর্থ থাকলে শান্তি আসবে, ভালো চাকরি হলে শান্তি আসবে, নিজের বাড়ি, গাড়ি, সম্মান, সফলতা কিংবা প্রিয় মানুষ পাশে থাকলে জীবন পরিপূর্ণ হয়ে যাবে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, অনেক মানুষ এসবের অধিকাংশ পেয়েও মনের ভেতর অস্থিরতা, শূন্যতা ও অশান্তি অনুভব করেন।
ইসলাম এই বিষয়টিকে খুব গভীরভাবে ব্যাখ্যা করেছে। ইসলামের দৃষ্টিতে মানুষের প্রকৃত শান্তি কেবল দুনিয়ার সম্পদ বা অর্জনের ওপর নির্ভর করে না; বরং অন্তরের সঙ্গে আল্লাহর সম্পর্কের ওপর নির্ভর করে।
অন্তরের শান্তির আসল উৎস
আল্লাহ তাআলা পবিত্র কোরআনে বলেন—
“জেনে রাখো, আল্লাহর স্মরণেই অন্তরসমূহ প্রশান্ত হয়।”
—সূরা আর-রাদ, ১৩:২৮
এই আয়াতটি মানুষের অস্থিরতার একটি মৌলিক কারণ তুলে ধরে। মানুষ যখন জীবনের শান্তি শুধু অর্থ, সম্পর্ক, সাফল্য কিংবা বস্তুগত অর্জনের মধ্যে খুঁজতে থাকে, তখন তার চাহিদার শেষ থাকে না।
আজ যা পেয়েছে, কাল তার চেয়ে বেশি চাইবে। একটি ইচ্ছা পূরণ হলে আরেকটি ইচ্ছা জন্ম নেবে। ফলে বাহ্যিকভাবে জীবন যতই সমৃদ্ধ হোক, অন্তরের ক্ষুধা থেকেই যেতে পারে।
কারণ মানুষের হৃদয়ের এমন একটি প্রয়োজন আছে, যা দুনিয়ার কোনো সম্পদ দিয়ে সম্পূর্ণ করা যায় না। সেই প্রয়োজন হলো আল্লাহর সঙ্গে সম্পর্ক।
বেশি পাওয়া মানেই বেশি তৃপ্তি নয়
রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেন,
“আদম সন্তানের যদি দুই উপত্যকা পরিমাণ সম্পদ থাকে,
তবে সে তৃতীয়টির
আকাঙ্ক্ষা করবে। আর আদম সন্তানের মুখ মাটি ছাড়া অন্য কিছু দিয়ে পূর্ণ হবে না। আর
যে তওবা করে, আল্লাহ তার তওবা কবুল করেন।”
—সহিহ বুখারি ও সহিহ মুসলিম
এই হাদিস মানুষের স্বভাবের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক তুলে ধরে। মানুষের চাহিদা যদি নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে যায়, তাহলে সম্পদের পরিমাণ বাড়লেও তৃপ্তি বাড়ে না।
তাই সমস্যা সবসময় সম্পদের অভাব নয়; অনেক সময় সমস্যা হলো অতৃপ্ত মন।
কৃতজ্ঞতা হারিয়ে গেলে
আল্লাহ বলেন—
“তোমরা কৃতজ্ঞ হলে অবশ্যই আমি তোমাদের আরও বাড়িয়ে দেব।”
—সূরা ইবরাহিম, ১৪:৭
আমরা অনেক সময় যে জিনিসগুলো পেয়েছি, সেগুলোকে স্বাভাবিক বলে ধরে নিই। সুস্থ শরীর, পরিবার, খাবার, নিরাপদ জীবন, ঈমান—এসবের মূল্য বুঝি না। বরং যা নেই, সেদিকেই আমাদের দৃষ্টি আটকে থাকে।
ফলে নিয়ামত সামনে থাকার পরও মন অশান্ত থাকে।
কৃতজ্ঞতা মানুষকে তার প্রাপ্তির দিকে তাকাতে শেখায়। আর অকৃতজ্ঞতা তাকে সবসময় অপূর্ণতার দিকে তাকিয়ে রাখে।
দুনিয়া নিয়ে অতিরিক্ত আসক্তি
আল্লাহ তাআলা বলেন—
“জেনে রাখো, দুনিয়ার জীবন তো খেল-তামাশা,
সাজসজ্জা,
পারস্পরিক
অহংকার এবং ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততিতে একে অন্যের ওপর আধিক্য লাভের প্রতিযোগিতা
ছাড়া আর কিছু নয়।”
—সূরা আল-হাদীদ, ৫৭:২০
ইসলাম দুনিয়ার সম্পদ অর্জন করতে নিষেধ করেনি। বরং হালাল উপায়ে উপার্জন ও সম্পদ ব্যবহার করা বৈধ। কিন্তু যখন দুনিয়ার অর্জনই মানুষের জীবনের চূড়ান্ত উদ্দেশ্য হয়ে যায়, তখন তার অন্তরে ভয়, লোভ, প্রতিযোগিতা ও অস্থিরতা বাড়তে পারে।
কারণ দুনিয়ার কোনো অর্জনই স্থায়ী নয়।
তাহলে প্রকৃত শান্তির পথ কী?
ইসলাম আমাদের দুনিয়া ছেড়ে দিতে বলে না; বরং দুনিয়াকে হাতে রাখতে বলে, হৃদয়ে নয়।
নামাজ, জিকির, দোয়া, কোরআন তিলাওয়াত, তওবা, কৃতজ্ঞতা এবং আল্লাহর ওপর তাওয়াক্কুল মানুষের অন্তরকে আল্লাহর সঙ্গে যুক্ত করে।
রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেন—
“দুনিয়াতে এমনভাবে থাকো যেন তুমি একজন অপরিচিত ব্যক্তি অথবা
পথিক।”
—সহিহ বুখারি
এর অর্থ দুনিয়ার দায়িত্ব ছেড়ে দেওয়া নয়। বরং মনে রাখা—এই জীবন চূড়ান্ত গন্তব্য নয়।
আমরা যত কিছু অর্জন করি, একদিন সবকিছু রেখে চলে যেতে হবে। তাই সম্পদ থাকবে, কিন্তু সম্পদ যেন আমাদের নিয়ন্ত্রণ না করে; সফলতা থাকবে, কিন্তু অহংকার যেন আমাদের গ্রাস না করে; দুঃখ আসবে, কিন্তু আল্লাহর ওপর আশা যেন হারিয়ে না যায়।
শেষ কথা
কিছু মানুষ সবকিছু পেয়েও শান্তি পান না, কারণ তারা হয়তো শান্তিকে ভুল জায়গায় খুঁজছেন।
শান্তি শুধু ব্যাংক ব্যালেন্সে নেই, বড় বাড়িতে নেই, মানুষের প্রশংসাতেও নেই। কোরআনের ভাষায়, আল্লাহর স্মরণেই অন্তরের প্রশান্তি।
তাই জীবনে আরও কিছু পাওয়ার আগে আমাদের মাঝে মাঝে নিজেকেই প্রশ্ন করা উচিত—
“আমি কি আল্লাহর সঙ্গে আমার সম্পর্ককে ঠিক করছি?”
কারণ দুনিয়া আমাদের অনেক কিছু দিতে পারে, কিন্তু অন্তরের প্রকৃত প্রশান্তি আল্লাহর কাছ থেকেই আসে।
“হে আমাদের রব, আমাদের অন্তরগুলোকে হেদায়াত দেওয়ার পর
বক্র করে দিও না এবং আমাদেরকে তোমার পক্ষ থেকে রহমত দান করো। নিশ্চয়ই তুমি
মহাদাতা।”
—সূরা আলে ইমরান, ৩:৮
১
২ মন্তব্য