Loading..

ব্লগ

রিসেট

২৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ০৭:৪৭ পূর্বাহ্ণ

তাওয়াক্কুল মানে কি সবকিছু ছেড়ে দেওয়া?

                 তাওয়াক্কুল মানে কি সবকিছু ছেড়ে দেওয়া?

“আল্লাহর ওপর ভরসা করি”—এই কথাটি আমরা প্রায়ই বলি। কিন্তু তাওয়াক্কুল আসলে কী? এর অর্থ কি জীবনের সব চেষ্টা ছেড়ে দিয়ে শুধু বসে থাকা? চাকরি খুঁজব না, ব্যবসার পরিকল্পনা করব না, অসুস্থ হলে চিকিৎসা নেব না—শুধু বলব, “আল্লাহ ভরসা”?

না। ইসলামে তাওয়াক্কুল কখনো অলসতা বা দায়িত্বহীনতার নাম নয়।

তাওয়াক্কুল হলো—নিজের সাধ্য অনুযায়ী সঠিক ও বৈধ উপায় অবলম্বন করা, সর্বোচ্চ চেষ্টা করা এবং তারপর ফলাফলের জন্য আল্লাহর ওপর পূর্ণ ভরসা রাখা।

আল্লাহর ওপর ভরসা, কিন্তু চেষ্টা নিজের

আল্লাহ তাআলা বলেন,

“আর যে ব্যক্তি আল্লাহর ওপর তাওয়াক্কুল করে, তিনিই তার জন্য যথেষ্ট।”
—সূরা আত-তালাক, ৬৫:৩

এই আয়াত আমাদের শেখায় যে মুমিনের চূড়ান্ত নির্ভরতা আল্লাহর ওপর। কিন্তু এর অর্থ এই নয় যে মানুষ নিজের দায়িত্ব পালন করবে না।

বরং ইসলাম মানুষকে চেষ্টা করতে উৎসাহিত করেছে। কৃষক জমিতে বীজ বোনে, ব্যবসায়ী পরিকল্পনা করে, শিক্ষার্থী পড়াশোনা করে, চাকরিপ্রার্থী আবেদন করে—এরপর ফলাফল আল্লাহর হাতে ছেড়ে দেয়।

অর্থাৎ চেষ্টা মানুষের দায়িত্ব, ফলাফল আল্লাহর সিদ্ধান্ত।

“উটটি বেঁধে রাখো, তারপর তাওয়াক্কুল করো”

তাওয়াক্কুল বোঝাতে রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর একটি প্রসিদ্ধ হাদিস রয়েছে। এক ব্যক্তি জিজ্ঞেস করলেন, তিনি কি তাঁর উট ছেড়ে দিয়ে আল্লাহর ওপর ভরসা করবেন, নাকি উটটি বেঁধে রাখবেন?

রাসুলুল্লাহ ﷺ বললেন:

“তুমি সেটিকে বেঁধে রাখো এবং আল্লাহর ওপর তাওয়াক্কুল করো।”
—জামে আত-তিরমিজি

এই হাদিসের শিক্ষা অত্যন্ত গভীর।

উট বেঁধে রাখা হলো প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা। আর আল্লাহর ওপর ভরসা করা হলো তাওয়াক্কুল।

অর্থাৎ, “আল্লাহ ভরসা” বলে নিজের দায়িত্ব থেকে পালিয়ে যাওয়া তাওয়াক্কুল নয়।

নবীজির জীবনেও ছিল পরিকল্পনা ও চেষ্টা

রাসুলুল্লাহ ﷺ ছিলেন আল্লাহর ওপর সর্বাধিক নির্ভরশীল মানুষ। অথচ তাঁর জীবন ছিল পরিকল্পনা, পরিশ্রম ও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণে পূর্ণ।

হিজরতের সময় তিনি নিরাপদে মদিনায় যাওয়ার জন্য পরিকল্পনা করেছিলেন, সঙ্গী নির্বাচন করেছিলেন এবং গোপন পথ ব্যবহার করেছিলেন। গুহায় অবস্থানের সময় যখন শত্রুরা খুব কাছে চলে এসেছিল, তখন তিনি আবু বকর (রা.)-কে বলেছিলেন:

“দুশ্চিন্তা করো না, নিশ্চয়ই আল্লাহ আমাদের সঙ্গে আছেন।”
—সূরা আত-তাওবা, ৯:৪০

এখানে তাওয়াক্কুলের একটি অসাধারণ দৃষ্টান্ত দেখা যায়—পরিকল্পনা ও চেষ্টা আছে, আবার অন্তরের নির্ভরতাও আল্লাহর ওপর।

তাওয়াক্কুল আর অলসতা এক নয়

অনেক সময় মানুষ নিজের নিষ্ক্রিয়তাকে তাওয়াক্কুলের নাম দেয়।

“চাকরি পাচ্ছি না, তাই চেষ্টা করব না—আল্লাহ চাইলে চাকরি নিজে থেকেই হয়ে যাবে।”

“পরীক্ষা আছে, পড়াশোনা করব না—আল্লাহ চাইলে ভালো ফল হবে।”

“অসুস্থ হয়েছি, ডাক্তার দেখাব না—আল্লাহ চাইলে ভালো হয়ে যাব।”

এগুলো তাওয়াক্কুলের সঠিক ধারণা নয়।

তাওয়াক্কুলের অর্থ হলো—আপনি আপনার দায়িত্বটুকু যথাসাধ্য পালন করবেন, তারপর যে বিষয়টি আপনার নিয়ন্ত্রণের বাইরে, সেটি আল্লাহর হাতে ছেড়ে দেবেন।

চেষ্টা করার পর ব্যর্থ হলে?

এখানেই তাওয়াক্কুলের আসল সৌন্দর্য।

একজন মানুষ চাকরির জন্য চেষ্টা করল, কিন্তু চাকরি হলো না। সে ব্যবসা শুরু করল, কিন্তু ক্ষতি হলো। সে কোনো একটি লক্ষ্য অর্জনের জন্য পরিশ্রম করল, কিন্তু সফল হলো না।

তাহলে কি তার তাওয়াক্কুল ব্যর্থ হয়েছে?

না।

কারণ তাওয়াক্কুলের অর্থ এই নয় যে আপনি যা চাইবেন, আল্লাহ অবশ্যই সেটাই দেবেন। বরং তাওয়াক্কুল হলো—আমি আমার দায়িত্ব পালন করেছি; এখন ফলাফল আল্লাহর হাতে।

আল্লাহ হয়তো এমন কিছু জানেন, যা আমরা জানি না।

কোরআনে আল্লাহ বলেন:

“হতে পারে তোমরা কোনো বিষয় অপছন্দ কর অথচ তাতে তোমাদের কল্যাণ রয়েছে; আর হতে পারে তোমরা কোনো বিষয় পছন্দ কর অথচ তাতে তোমাদের অকল্যাণ রয়েছে। আল্লাহ জানেন, তোমরা জানো না।”
—সূরা আল-বাকারা, ২:২১৬

তাই কোনো দরজা বন্ধ হয়ে গেলে মুমিন হতাশ হয়ে পড়ে না। সে আবার চেষ্টা করে, নিজের ভুল সংশোধন করে এবং আল্লাহর ওপর ভরসা রাখে।

তাওয়াক্কুল আমাদের কী শেখায়?

তাওয়াক্কুল মানুষকে দায়িত্বশীলও করে, আবার মানসিকভাবে শান্তও করে।

কারণ সে জানে—আমার কাজ হলো সঠিক পথে চেষ্টা করা। প্রতিটি ফলাফল আমার হাতে নেই।

তাই ব্যর্থ হলে সে নিজেকে সম্পূর্ণ ধ্বংস করে না, আর সফল হলে অহংকারেও ডুবে যায় না।

সে জানে, সাফল্য আল্লাহর অনুগ্রহ এবং ব্যর্থতার মধ্যেও কোনো না কোনো শিক্ষা থাকতে পারে।

শেষ কথা

তাওয়াক্কুল মানে জীবন থেকে চেষ্টা বাদ দেওয়া নয়। তাওয়াক্কুল মানে হলো চেষ্টা থাকবে, পরিকল্পনা থাকবে, পরিশ্রম থাকবে—কিন্তু হৃদয়ের চূড়ান্ত ভরসা থাকবে আল্লাহর ওপর।

আপনি বীজ বুনবেন, জমি প্রস্তুত করবেন, পানি দেবেন। কিন্তু বীজকে অঙ্কুরিত করার ক্ষমতা আপনার হাতে নয়।

আপনি পড়াশোনা করবেন, কিন্তু ফলাফল আপনার হাতে নয়।

আপনি চিকিৎসা নেবেন, কিন্তু শিফা আল্লাহর হাতে।

আপনি রিজিকের জন্য চেষ্টা করবেন, কিন্তু রিজিকের মালিক আল্লাহ।

তাই তাওয়াক্কুলের সবচেয়ে সুন্দর সংজ্ঞা হতে পারে—

“হাত থাকবে কাজে, আর হৃদয় থাকবে আল্লাহর ওপর।”

এটাই তাওয়াক্কুল।
সবকিছু ছেড়ে দেওয়া নয়; বরং নিজের সাধ্য অনুযায়ী সবকিছু করার পর সবকিছুর মালিকের ওপর ভরসা করা।

 

 

মন্তব্য করুন