Loading..

ব্লগ

রিসেট

৩০ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ০৩:৫২ অপরাহ্ণ

জিহ্বা ও হাতের নিরাপত্তায় প্রকৃত মুসলিমের - মোঃ মুজিবুর রহমান

জিহ্বা ও হাতের নিরাপত্তায় প্রকৃত মুসলিমের

মোঃ মুজিবুর রহমান
সহকারী অধ্যাপক
মোজাদ্দেদীয়া ইসলামিয়া আলিম মাদ্রাসা, কালিয়াকৈর, গাজীপুর।

মানুষ সামাজিক জীব। একে অপরের সঙ্গে সম্পর্ক, সহযোগিতা ও সহমর্মিতার মধ্য দিয়েই মানুষের পারিবারিক, সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় জীবন সুন্দর হয়ে ওঠে। কিন্তু মানুষের মুখের অসতর্ক কথা, কটু মন্তব্য, অপবাদ, গীবত ও মিথ্যা যেমন সম্পর্ক নষ্ট করতে পারে, তেমনি হাতের অন্যায় ব্যবহার, জুলুম, নির্যাতন ও অধিকার হরণ সমাজে অশান্তি সৃষ্টি করে। তাই ইসলাম মানুষের ঈমান ও ইবাদতের পাশাপাশি তার চরিত্র, আচরণ ও মানুষের সঙ্গে ব্যবহারের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছে।

রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেন—

«المسلم من سلم المسلمون من لسانه ويده»

অর্থ: “মুসলিম সে-ই, যার জিহ্বা ও হাত থেকে মুসলিমরা নিরাপদ থাকে।”
—
সহিহ বুখারি ও সহিহ মুসলিম

হাদিসটি ইসলামী নৈতিকতার একটি মৌলিক শিক্ষা বহন করে। এখানে প্রকৃত মুসলিমের পরিচয় শুধু নাম, পরিচয় বা বাহ্যিক আচরণের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা হয়নি; বরং মানুষের প্রতি তার নিরাপদ, কল্যাণকর ও দায়িত্বশীল আচরণকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। একজন মুসলিমের জিহ্বা যেন মানুষের সম্মান নষ্ট না করে এবং তার হাত যেন কারও ওপর জুলুম বা ক্ষতির কারণ না হয়—এটাই এই হাদিসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা।

জিহ্বার হেফাজত

মানুষের শরীরের অঙ্গগুলোর মধ্যে জিহ্বা ছোট হলেও এর প্রভাব অত্যন্ত ব্যাপক। একটি সুন্দর কথা মানুষের হৃদয়ে আনন্দ সৃষ্টি করতে পারে, আবার একটি কটু কথা বহুদিনের সম্পর্কেও ফাটল ধরাতে পারে। একটি সত্য কথা মানুষকে সঠিক পথে উৎসাহিত করতে পারে, আর একটি মিথ্যা কথা নিরপরাধ মানুষের ক্ষতির কারণ হতে পারে।

কুরআন মুমিনদের কথা বলার ক্ষেত্রে সতর্ক করেছে। আল্লাহ তাআলা বলেন, “হে মুমিনগণ! আল্লাহকে ভয় করো এবং সঠিক কথা বলো।” — সূরা আল-আহযাব, ৩৩:৭০

তাই মুসলিমের মুখ থেকে বের হওয়া কথায় সত্য, শালীনতা, সৌজন্য ও কল্যাণের ছাপ থাকা উচিত। মিথ্যা, গীবত, অপবাদ, বিদ্রূপ, অশ্লীলতা, কুৎসা ও মানুষের মনে আঘাত করে এমন কথা থেকে নিজেকে সংযত রাখা জরুরি।

গীবত ও অপবাদ থেকে বাঁচা

অনেক সময় মানুষ সরাসরি কারও ক্ষতি করে না; কিন্তু তার অনুপস্থিতিতে এমন কথা বলে, যা সে শুনলে কষ্ট পেত। এটিই গীবত। আল্লাহ তাআলা গীবতকে অত্যন্ত নিন্দনীয় কাজ হিসেবে উল্লেখ করেছেন।

কুরআনে বলা হয়েছে, “তোমাদের কেউ কি তার মৃত ভাইয়ের গোশত খেতে পছন্দ করবে?” — সূরা আল-হুজুরাত, ৪৯:১২

এই উপমার মাধ্যমে গীবতের ভয়াবহতা বোঝানো হয়েছে। তাই একজন সচেতন মুসলিম নিজের জিহ্বাকে অন্যের সম্মানহানির হাতিয়ার বানায় না।

অন্যদিকে অপবাদ আরও ভয়াবহ। কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে যাচাই ছাড়া অভিযোগ ছড়িয়ে দেওয়া, মিথ্যা কথা প্রচার করা কিংবা মানুষের সম্মান নষ্ট করা ইসলামের নৈতিকতার পরিপন্থী। সংবাদ বা অভিযোগ শুনে তা যাচাই করার নির্দেশও কুরআনে দেওয়া হয়েছে। — সূরা আল-হুজুরাত, ৪৯:৬

কটু কথা নয়, সুন্দর কথা

ইসলাম শুধু মন্দ কথা নিষেধ করেনি; বরং সুন্দর কথা বলতেও উৎসাহিত করেছে। আল্লাহ তাআলা বলেন, “আমার বান্দাদের বলে দাও, তারা যেন এমন কথা বলে যা সর্বোত্তম।” — সূরা আল-ইসরা, ১৭:৫৩

সুন্দর কথা মানুষের মন জয় করে, সম্পর্ক দৃঢ় করে এবং সমাজে ভালোবাসা বাড়ায়। একজন শিক্ষক শিক্ষার্থীকে উৎসাহের কথা বলতে পারেন, বাবা-মা সন্তানকে স্নেহের ভাষায় সংশোধন করতে পারেন, স্বামী-স্ত্রী পরস্পরের প্রতি সম্মানজনক ভাষা ব্যবহার করতে পারেন, প্রতিবেশী প্রতিবেশীর সঙ্গে সৌজন্য বজায় রাখতে পারেন। এভাবেই একটি সুন্দর কথা একটি সুন্দর সমাজ নির্মাণে ভূমিকা রাখে।

হাতের হেফাজত

হাদিসে ‘হাত’ শব্দের মাধ্যমে মানুষের কর্ম ও কার্যকলাপের ক্ষতিকর দিক থেকেও সতর্ক করা হয়েছে। কারও ওপর শারীরিক আঘাত করা, অন্যায়ভাবে সম্পদ দখল করা, চুরি করা, জুলুম করা, অধিকার নষ্ট করা কিংবা কোনোভাবে মানুষের ক্ষতি করা একজন মুসলিমের চরিত্র হতে পারে না।

রাসুলুল্লাহ ﷺ মানুষের জান, মাল ও সম্মানের নিরাপত্তার প্রতি বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছেন। তাই মুসলিমের হাত হবে কল্যাণের হাত—অন্যায়ের নয়; সাহায্যের হাত—ক্ষতির নয়; সহযোগিতার হাত—জুলুমের নয়।

জুলুমের কোনো স্থান নেই

ইসলামে জুলুম কঠোরভাবে নিষিদ্ধ। আল্লাহ তাআলা বলেন, “নিশ্চয়ই আল্লাহ জুলুম করেন না।” — সূরা ইউনুস, ১০:৪৪

মানুষের ওপর অন্যায় করা, দুর্বলকে নির্যাতন করা, এতিমের অধিকার নষ্ট করা, শ্রমিকের প্রাপ্য আটকে রাখা, আমানতের খেয়ানত করা কিংবা কারও সম্পদ অন্যায়ভাবে আত্মসাৎ করা—সবই ইসলামের ন্যায়বিচারের আদর্শের বিপরীত।

একজন প্রকৃত মুসলিম শক্তিশালী হয়েও দুর্বলকে অত্যাচার করে না। বরং নিজের সামর্থ্যকে মানুষের কল্যাণে ব্যবহার করে।

মানুষের সম্মান রক্ষা

ইসলাম মানুষের জীবন ও সম্পদের পাশাপাশি তার সম্মানকেও গুরুত্ব দিয়েছে। কোনো ব্যক্তিকে অপমান করা, উপহাস করা, তুচ্ছতাচ্ছিল্য করা কিংবা তার দোষ প্রচার করা সামাজিক শান্তি নষ্ট করে।

সূরা আল-হুজুরাতে আল্লাহ তাআলা একে অপরকে উপহাস করতে নিষেধ করেছেন এবং কু-ধারণা, গীবত ও দোষ অনুসন্ধান থেকে বিরত থাকতে নির্দেশ দিয়েছেন। — সূরা আল-হুজুরাত, ৪৯:১১–১২

তাই মানুষের মর্যাদা রক্ষা করা ইসলামী চরিত্রের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও হাদিসটির শিক্ষা

বর্তমান যুগে মানুষের ‘জিহ্বা’ শুধু মুখের কথায় সীমাবদ্ধ নেই। মোবাইল ফোন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, বার্তা, মন্তব্য, ছবি ও ভিডিও—এসবের মাধ্যমেও মানুষের কথা ও আচরণ অন্যের কাছে পৌঁছে যায়।

কোনো যাচাইহীন সংবাদ ছড়িয়ে দেওয়া, কারও বিরুদ্ধে অপমানজনক মন্তব্য করা, ব্যক্তিগত বিষয় প্রকাশ করা, মিথ্যা তথ্য প্রচার করা কিংবা কাউকে হেয় করার উদ্দেশ্যে কোনো পোস্ট দেওয়া—এসব থেকেও মুসলিমকে সতর্ক থাকতে হবে।

কথা বলার আগে যেমন চিন্তা করা দরকার, তেমনি কিছু লেখার বা শেয়ার করার আগেও চিন্তা করা দরকার—এতে কি কারও অধিকার নষ্ট হবে? কারও সম্মান ক্ষুণ্ন হবে? সমাজে অশান্তি ছড়াবে? নাকি এতে কল্যাণ হবে?

পরিবারে হাদিসটির প্রয়োগ

পরিবার মানুষের চরিত্র গঠনের প্রথম বিদ্যালয়। পরিবারের সদস্যদের মধ্যে সুন্দর আচরণ থাকলে সেখানে শান্তি ও ভালোবাসা বৃদ্ধি পায়।

স্বামী-স্ত্রী পরস্পরের সঙ্গে কোমল ভাষায় কথা বলবে, বাবা-মা সন্তানের সঙ্গে স্নেহ ও প্রজ্ঞার আচরণ করবে, সন্তান বাবা-মায়ের প্রতি সম্মান দেখাবে এবং ভাই-বোন পরস্পরের অধিকার রক্ষা করবে—এগুলোই ইসলামী পারিবারিক জীবনের সৌন্দর্য।

রাগের সময় কটু কথা না বলা, পুরোনো ভুল টেনে অপমান না করা এবং মতভেদকে শত্রুতায় পরিণত না করা—এসবও জিহ্বা সংযমের অংশ।

প্রতিবেশীর নিরাপত্তা

ইসলাম প্রতিবেশীর অধিকারকে অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়েছে। একজন মুসলিমের আচরণে তার প্রতিবেশী যেন নিরাপত্তাহীনতা বা কষ্ট অনুভব না করে—এটি ইসলামী ভ্রাতৃত্বের গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা।

প্রতিবেশীকে কষ্ট দেওয়া, তার সম্পদ বা সম্মানের ক্ষতি করা, অযথা বিরক্ত করা কিংবা তার অধিকার নষ্ট করা ইসলামী আদর্শের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। বরং প্রতিবেশীর বিপদে পাশে দাঁড়ানো, প্রয়োজনের সময় সহযোগিতা করা এবং তার সঙ্গে সদাচরণ করা একজন মুমিনের উত্তম চরিত্রের পরিচয়।

রাগ নিয়ন্ত্রণ ও আত্মসংযম

অনেক ক্ষতি ঘটে মুহূর্তের রাগ থেকে। রাগের সময় মানুষ এমন কথা বলে ফেলতে পারে, যা পরে অনুতাপের কারণ হয়; এমন কাজও করতে পারে, যার ক্ষতি সহজে পূরণ করা যায় না।

রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, “শক্তিশালী সে নয়, যে কুস্তিতে অন্যকে পরাজিত করে; বরং শক্তিশালী সে, যে রাগের সময় নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে।” — সহিহ বুখারি ও সহিহ মুসলিম

তাই প্রকৃত শক্তি অন্যকে দমন করার মধ্যে নয়; বরং নিজের জিহ্বা, হাত ও প্রবৃত্তিকে নিয়ন্ত্রণ করার মধ্যে।

মুসলিমের জীবন হবে নিরাপত্তার আশ্রয়

একজন মুসলিমের কাছ থেকে মানুষ ভয় নয়, নিরাপত্তা প্রত্যাশা করবে; অপমান নয়, সম্মান পাবে; ক্ষতি নয়, কল্যাণ পাবে। তার কথায় মানুষ সান্ত্বনা পাবে, তার কাজে মানুষ উপকৃত হবে এবং তার উপস্থিতিতে মানুষ নিরাপদ বোধ করবে।

এটাই ইসলামের সৌন্দর্য—মানুষের প্রতি দয়া, ন্যায়, সততা, আমানতদারি, সহমর্মিতা ও উত্তম আচরণ।

প্রকৃত মুসলিম হওয়ার সাধনা

শুধু মুখে মুসলিম পরিচয় ধারণ করাই যথেষ্ট নয়; ইসলামের শিক্ষা চরিত্রে প্রকাশ করতে হয়। নামাজ মানুষকে আল্লাহর স্মরণে রাখে, রোজা আত্মসংযম শেখায়, যাকাত মানুষের প্রতি দায়িত্ববোধ জাগায় এবং ইসলামী নৈতিকতা মানুষের আচরণকে সুন্দর করে।

তাই একজন মুসলিম প্রতিদিন নিজের কাছে প্রশ্ন করতে পারে—

আমার কথায় কি কেউ কষ্ট পেল?
আমার কাজে কি কারও অধিকার নষ্ট হলো?
আমার আচরণে কি কেউ অপমানিত হলো?
আমার উপস্থিতিতে মানুষ কি নিরাপদ বোধ করে?

এই আত্মজিজ্ঞাসা মানুষকে নিজের চরিত্র সংশোধনের পথে এগিয়ে নিতে পারে।

উপসংহার

“المسلم من سلم المسلمون من لسانه ويده”—এই সংক্ষিপ্ত হাদিসের মধ্যে একজন মুসলিমের সামাজিক চরিত্রের এক গভীর আদর্শ নিহিত রয়েছে। মুসলিমের জিহ্বা হবে সত্য, সৌজন্য ও কল্যাণের বাহন; তার হাত হবে সাহায্য, ন্যায় ও নিরাপত্তার মাধ্যম। সে মানুষের সম্মান রক্ষা করবে, অন্যায় থেকে দূরে থাকবে, জুলুম পরিহার করবে এবং নিজের আচরণে শান্তি ও কল্যাণ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করবে।

ইসলাম এমন মানুষ গড়ে তুলতে চায়, যার ঈমান তার চরিত্রে প্রকাশ পায়, যার ইবাদত তাকে সংযমী করে এবং যার উপস্থিতি অন্য মানুষের জন্য নিরাপত্তা ও কল্যাণের কারণ হয়।

আসুন, আমরা আমাদের জিহ্বাকে মিথ্যা, গীবত, অপবাদ ও কটু কথা থেকে এবং আমাদের হাতকে জুলুম, অন্যায় ও ক্ষতি থেকে হেফাজত করি। মানুষের জান, মাল, সম্মান ও অধিকার রক্ষায় সচেতন হই এবং উত্তম চরিত্রের মাধ্যমে ইসলামের সৌন্দর্য প্রকাশ করি।

হে আল্লাহ! আমাদের জিহ্বাকে সত্য ও কল্যাণের জন্য ব্যবহার করার, আমাদের হাতকে ন্যায় ও মানবসেবায় নিয়োজিত রাখার এবং আপনার সন্তুষ্টির পথে উত্তম চরিত্র ধারণ করার তাওফিক দান করুন। আমিন।

 

মন্তব্য করুন